• ই-পেপার

হজ নিয়ে ব্রিটিশ মুসলমানদের দুশ্চিন্তা

যে পাঁচ শ্রেণির মানুষকে কবরে প্রশ্ন করা হবে না

মুফতি ওমর বিন নাছির
যে পাঁচ শ্রেণির মানুষকে কবরে প্রশ্ন করা হবে না
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এটি এক নতুন জীবনের সূচনা। দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যবর্তী যে জীবন, তাকে বলা হয় আলমে বরজখ। এখানেই শুরু হবে মানুষের প্রথম হিসাব। কবর হবে হয় জান্নাতের বাগান, নয়তো জাহান্নামের একটি গর্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদেরকে আমাদের কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৫৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কবর হয় জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান, অথবা জাহান্নামের গর্তসমূহের একটি গর্ত।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬০)
কবরের প্রশ্ন, কবরের নেয়ামত ও শাস্তি—সবই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদার অন্তর্ভুক্ত। তবে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে কবরে কয়েক শ্রেণির সৌভাগ্যবান মানুষকে প্রশ্ন করা হবে না। তারা হলেন— 

১. সীমান্ত পাহারাদার (মুরাবিত)
রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারা দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তিনি মৃত্যুর পরও তার নেক আমলের সওয়াব পেতে থাকেন এবং কবরের পরীক্ষার সম্মুখীন হন না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সীমান্ত পাহারা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে যে আমল করছিল তা কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য অব্যাহত থাকবে। তার রিজিকও জারি থাকবে, সে কবরের পরীক্ষার ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে এবং কিয়ামতের ভয় থেকেও নিরাপদ অবস্থায় উঠবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৭৬৭)

২. শহিদ
শহিদের মর্যাদা ইসলামে অতুলনীয়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহর বিশেষ রহমতের অন্তর্ভুক্ত হন। কবরের প্রশ্ন ও আজাব থেকেও তিনি নিরাপদ থাকবেন। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘শহিদের মাথার উপর তরবারির ঝলকই তার জন্য কবরের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য যথেষ্ট।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২০৫৩)

৩. পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী
যারা দীর্ঘদিন পেটের কঠিন রোগে ধৈর্যসহকারে কষ্ট ভোগ করে মৃত্যুবরণ করেন, তাদের জন্যও সুসংবাদ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পেটের রোগে মৃত্যুবরণ করবে, তাকে কবরে আজাব দেওয়া হবে না।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১০৬৪)

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.) আরো বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ছাড়াও আরো সাত ধরনের শহিদ রয়েছে—মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, পার্শ্বব্যাধিতে মৃত ব্যক্তি, পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১১১)
এটি আল্লাহর অসীম দয়ারই প্রকাশ যে, কঠিন রোগে ধৈর্যধারণকারীদের তিনি বিশেষ প্রতিদান দান করেন।

৪. নিয়মিত সুরা মুলক তিলাওয়াতকারী
সুরা মুলককে হাদিসে কবরের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী সূরা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোরআনে ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা রয়েছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সেটি হলো 'তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক'।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৯১)

তাই প্রতিদিন বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত করার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।

৫. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণকারী
জুমার দিন মুসলমানদের জন্য বরকতময় দিন। এ দিনে মৃত্যুবরণকারীদের ব্যাপারেও বিশেষ সুসংবাদ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে মুসলমান জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করবে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখবেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৭৪)

তবে মনে রাখতে হবে, এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের সুসংবাদ। কারো জন্য গুনাহ করার অবকাশ বা নিশ্চিন্ত থাকার কারণ নয়। একজন মুমিনের উচিত সর্বদা তাকওয়া ও নেক আমলের ওপর অবিচল থাকা।

আরো যাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়
আলেমদের আলোচনা ও বিভিন্ন বর্ণনায় নবী-রাসুলগণ, সিদ্দীকগণ, নাবালেগ শিশু এবং শরিয়তের দায়িত্বমুক্ত (যেমন মানসিক ভারসাম্যহীন) ব্যক্তিদের ব্যাপারে কবরের আজাব বা প্রশ্ন থেকে অব্যাহতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সব বর্ণনার মান সমান নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সহিহ বর্ণনাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে কথা বলা উচিত।

আমাদের করণীয়

কবরের প্রশ্ন থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা লাভের জন্য শুধু কোনো একটি আমলের ওপর নির্ভর না করে একজন মুসলমানের উচিত—
১. বিশুদ্ধ আকিদা ধারণ করা।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা।
৩. কোরআন তিলাওয়াত ও আমল করা।
৪. নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
৫. সুরা মুলক পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৬. মানুষের হক আদায় করা।
৭. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেক আমলে অবিচল থাকা।

কবরের জীবন আখিরাতের প্রথম ধাপ। সেখানে সফলতা অর্জন করতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলো সহজ হবে, আর সেখানে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পথ আরো কঠিন হয়ে উঠবে। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত প্রস্তুতি হওয়া উচিত দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন নয়, বরং কবর ও আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ঈমানের ওপর অটল রাখেন, কবরের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেওয়ার তাওফিক দান করেন, কবরের শাস্তি থেকে হেফাজত করেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন। আমিন।

মসজিদে নববীতে চালু হলো ভ্রাম্যমাণ ধর্মীয় সেবাকেন্দ্র

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদে নববীতে চালু হলো ভ্রাম্যমাণ ধর্মীয় সেবাকেন্দ্র
সংগৃহীত ছবি

মসজিদে নববীতে আগত মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের ধর্মীয় সেবা আরো সহজ ও মানসম্মত করতে নতুন এক উদ্যোগ নিয়েছে গ্র্যান্ড মসজিদ ও মসজিদে নববীর ধর্মবিষয়ক প্রেসিডেন্সি। গত মঙ্গলবার মসজিদে নববীতে ভ্রাম্যমাণ ধর্মীয় সেবাকেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন গ্র্যান্ড মসজিদ ও মসজিদে নববীর ধর্মবিষয়ক সভাপতি শেখ ড. আবদুল রহমান বিন আবদুল আজিজ আস-সুদাইস।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শেখ সুদাইস বলেন, এই ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো মাঠপর্যায়ে ধর্মীয় সেবার পরিধি আরো বিস্তৃত করা, মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের কাছে সেবাকে সহজে পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের চাহিদার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ ধর্মীয় সেবা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মসজিদে নববীতে আগত আল্লাহর মেহমানদের সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্সি এমন একটি সমন্বিত সেবাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে, যা দর্শনার্থীদের আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করবে। পাশাপাশি হেদায়েত, সহনশীলতা ও মধ্যপন্থার ইসলামী মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে নবীর মসজিদের বিশ্বজনীন বার্তা আরো সুদৃঢ় করবে।

নতুন এই ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ও দিকনির্দেশনামূলক সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে শরিয়াহসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান, ধর্মীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা, ইসলামী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষামূলক ও জ্ঞানবর্ধক বই-পুস্তিকা ও তথ্যসামগ্রী বিতরণ। বহুজাতিক মুসল্লিদের কথা বিবেচনায় রেখে কেন্দটি এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে বিভিন্ন ভাষাভাষী দর্শনার্থীরাও সহজে সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

ধর্মবিষয়ক প্রেসিডেন্সি জানিয়েছে, আল্লাহর মেহমানদের সেবাকে আরো উন্নত করা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করা এবং নবীর মসজিদে প্রদত্ত সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে এটি সৌদি ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে হজ ও ওমরাহ পালনকারী এবং মসজিদে নববীর দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক, সহজলভ্য ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখার ৮ নীতিমালা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সমাজে ভারসাম্য বজায় রাখার ৮ নীতিমালা
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীতে মানুষ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল। পারস্পরিক স্নেহ, মমতা ও সহযোগিতা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। তাই মানুষের সঙ্গে মানুষের বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ও আচরণই পারস্পরিক এই সম্পর্ক ও তার সৌন্দর্য রক্ষা করে। ইসলাম মানুষকে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় যে নির্দেশনা দিয়েছে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—

১. নিজের মূল্য ও সীমা জানুন : মুমিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে মূল্যায়ন করবে এবং নিজের সীমা সম্পর্কেও সচেতন থাকবে। সে অন্যকে খুশি করতে নিজের অসম্মান করবে না। আবার নিজের মূল্য রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অসম্মানও করবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুমিনের উচিত নয় নিজেকে অসম্মান করা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২২৫৪)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, মানুষকে তার মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দাও। (রিয়াজুস সালিহিন, হাদিস : ৩৫৬)

২. বিনয়ী হোন, দুর্বল নয় : সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুমিন পরস্পরের প্রতি বিনয়ী আচরণ করবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেছেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’
(সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)
তবে নিজের ক্ষতি ও অসম্মান মেনে নেওয়া বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ক্ষতি কোরো না নিজের বা অন্যের। (বায়হাকি, হাদিস : ১১৭১৭)

৩. প্রয়োজনে ‘না’ বলুন : যে কাজে আপনি সক্ষম নন, যে কাজ আপনার জন্য শোভন নয়, তাতে ‘না’ বলতে শিখুন। যেখানে আল্লাহ আপনাকে সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ দেননি, সেখানে কেন আপনি অন্যের কথায় সাধ্যাতীত বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেবেন? ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যাতীত। সে ভালো যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই এবং সে মন্দ যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)

বিশেষত যখন মানুষের সন্তুষ্টি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তখন কোনো সংকোচ ছাড়াই ‘না’ করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৪)

৪. সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয় : মুমিনকে অবশ্যই একটি বাস্তবতা মনে রাখতে হবে যে সব মানুষকে খুশি করা সম্ভব নয়। বরং সবাইকে খুশি করার মনোভাব মানুষকে বিভ্রান্ত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তুমি দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের কথামতো চলো তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু অনুমানের অনুসরণ করে, আর তারা শুধু অনুমানভিত্তিক কথা বলে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১১৬)

৫. অপছন্দ হলেই বিরোধিতা নয় : সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও জরুরি। তাই কোনো কিছু অপছন্দ হলে তার বিরোধিতা করা কিংবা কেউ কষ্ট দিলেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং কখনো কখনো ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমা সম্পর্কের ধরন পাল্টে দেয় এবং সুফল বয়ে আনে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)

৬. সুধারণা রাখুন, অন্ধবিশ্বাস নয় : ইসলাম মানুষের প্রতি সুধারণা রাখতে বলে এবং অহেতুক মন্দ ধারণা পোষণ করতে নিষেধ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অধিক পরিমাণ ধারণা পোষণ থেকে দূরে থাকো। কেননা ধারণা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

তবে সুধারণার কারণে মুমিন কারো প্রতি অন্ধবিশ্বাস পোষণ করবে না; বিশেষত কারো থেকে মন্দ প্রবণতা প্রকাশের পর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৩)

৭. সম্পর্ক অনিবার্য নয় : আল্লাহ যে সম্পর্ক রক্ষা করা আবশ্যক করেননি, এমন কোনো সম্পর্ক অনিবার্য নয়। তাই যখন কোনো সঙ্গী থেকে মন্দ কথা, কাজ ও প্রবণতা প্রকাশ পাবে, তখন তাকে পরিহার করতে বিলম্ব করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে পরিচালিত হয়, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন ভেবে দেখে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)

৮. সম্পর্কে মধ্যপন্থা অবলম্বন : সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সবকিছুতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। সম্পর্ক, সম্মান, আবেগ, প্রত্যাশা, হতাশা, এমনকি বিরোধিতার ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যেন প্রয়োজনে সম্পর্কের ডানে বা বাঁয়ে মোড় নেওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সুরের মধ্যে গাধার সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’
(সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৯)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

যাকে আপন করলে কখনো পর হয় না

মাওলানা আল আমিন সরকার
যাকে আপন করলে কখনো পর হয় না

পৃথিবীতে মানুষ অনেক সম্পর্ক গড়ে তোলে। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী-প্রত্যেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময় আমাদের সঙ্গে জুড়ে থাকেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে মানুষ বদলায়, বদলায় সম্পর্কের রংও। সুসময়ে যারা চারপাশে ভিড় করে, দুঃখের দিনে তাদের অনেককেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা প্রভাব এসবও একদিন মানুষকে ছেড়ে চলে যায়। এমনকি নিজের শরীরও একসময় নিজের কথা শোনে না। তবু একজন আছেন, যিনি কখনো তার বান্দাকে একা ছাড়েন না। তিনি জন্মের আগেও ছিলেন, জন্মের পরও আছেন, মৃত্যুর পরও থাকবেন। বান্দা তাকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু তিনি কখনো বান্দাকে ভুলে যান না। অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন বিশেষ মর্যাদা।

আদম (আ.) থেকে যত মানুষ পৃথিবীতে এসেছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত আসবে, প্রত্যেকের স্রষ্টাও একমাত্র তিনিই। কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দুজনের চেহারা, কণ্ঠস্বর, আঙুলের ছাপ কিংবা স্বভাব একেবারে অভিন্ন না বানানোর অসীম কুদরতও তাঁরই। মানুষ যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন পৃথিবীর আলো-বাতাসের কোনো স্পর্শই সে পায় না। সেই অন্ধকার গর্ভেই আল্লাহ ধাপে ধাপে তাকে সৃষ্টি করেন। এক ফোঁটা তুচ্ছ বীর্য থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হওয়ার প্রতিটি স্তর তারই অসীম কুদরতের নিদর্শন।

মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আগমনের পরও আল্লাহর অনুগ্রহের ধারা থেমে যায় না। মায়ের অন্তরে সন্তানের জন্য সীমাহীন মমতা সৃষ্টি করেন তিনি। শিশুর উপযোগী করে মায়ের দুধে সব ধরনের পুষ্টি দান করেন। বাবা-মায়ের স্নেহ, ত্যাগ ও ভালোবাসার মাধ্যমে সন্তানকে ধীরে ধীরে বড় করে তোলেন। শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য- জীবনের প্রতিটি ধাপে তার অগণিত নিয়ামত মানুষকে ঘিরে রাখে। তবু মানুষ অনেক সময় এ নিয়ামতগুলোর মূল্য উপলব্ধি করতে পারে না। তাই কখনো কখনো আল্লাহ বান্দাকে বিপদ, রোগ কিংবা দুঃখের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেন ‘প্রকৃত আশ্রয় একমাত্র তিনিই। যখন শরীরের একটি ছোট্ট অঙ্গও অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন মানুষ উপলব্ধি করে সুস্থতা কত বড় নিয়ামত। আবার যখন আপনজনের কাছ থেকেও কষ্ট, অবহেলা বা প্রতারণা আসে তখন সে বুঝতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আল্লাহর দরবার ছাড়া আর কোথাও নেই।

বান্দা যখনই একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করেছে, আল্লাহ তাকে এমনভাবে সাহায্য করেছেন, যা মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। বদরের ময়দানে মাত্র ৩১৩ জন ইমানদারকে হাজারো সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় দান করেছিলেন তিনিই। মুসা (আ.)-এর জন্য সমুদ্র দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন তিনিই। ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেটের অন্ধকার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন তিনিই। নুহু (আ.)-কে মহাপ্লাবন থেকে, ইবরাহিম (আ.)-কে আগুন থেকে, ইউসুফ (আ.)-কে কূপ থেকে সম্মানের আসনে এবং আইয়ুব (আ.)-কে দীর্ঘ রোগভোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন সেই এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ।  বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীতিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, অনাদি ও অনন্ত। তাঁর রহমত ও করুণার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। তিনি ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, রাজা-প্রজা সবার রব। যে-ই আন্তরিক হৃদয়ে তাঁর দিকে ফিরে আসে, তিনি তাকে নিরাশ করেন না।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন বলে দাও আমি তো খুবই নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৬) আল্লাহ আরও বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাঁর জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত ৩)

দীনের নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দা যদি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। আর সে যদি হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ (সহি বুখারি, হাদিস ৭৪০৫, সহি মুসলিম, হাদিস ২৬৭৫) সুতরাং জীবনের প্রকৃত বন্ধু, সর্বশ্রেষ্ঠ সহায়ক এবং নির্ভরতার একমাত্র আশ্রয় মহান আল্লাহ। তার বন্ধুত্ব লাভ করতে পারাই মানুষের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। যে হৃদয় আল্লাহকে আপন করে নিতে পারে, তার কাছে দুঃখও ইবাদত হয়ে যায়, বিপদও শিক্ষা হয়ে যায় এবং জীবন হয়ে ওঠে প্রশান্তির এক সুন্দর সফর।

লেখক : পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসী রা. মাদরাসা, মুন্সিগঞ্জ

হজ নিয়ে ব্রিটিশ মুসলমানদের দুশ্চিন্তা | কালের কণ্ঠ