• ই-পেপার

উমাইয়া বংশের খ্যাতিমান মুহাদ্দিস ছিলেন যে নারী

পবিত্র আশুরা আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র আশুরা আজ

আজ শুক্রবার পবিত্র আশুরা, ১৪৪৮ হিজরি সনের ১০ মহররম। ইসলামী ইতিহাসে দিনটি একই সঙ্গে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও শোকের স্মৃতি বহন করে।

প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটি।

‘আশুরা’ শব্দের অর্থ দশম। মহররম মাসের ১০ তারিখে দিনটি পালিত হওয়ায় একে আশুরা বলা হয়।

আশুরা ইসলামী ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। হাদিস অনুযায়ী, এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা ফেরাউনের নির্যাতন থেকে মুক্তি পান। এ ঘটনার স্মরণে শুকরিয়াস্বরূপ এই দিনে রোজা রাখার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইহুদিদের অনুসৃত প্রথার সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার আগের বা পরের দিনসহ আরো একটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

একটি সহিহ হাদিসে আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরাঈলকে শত্রুর কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তাই হজরত মুসা (আ.) এই দিনে রোজা রাখতেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি তোমাদের চেয়ে অধিক নিকটবর্তী।’ এরপর তিনি নিজে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও এই রোজা পালনের নির্দেশ দেন (সহিহ বুখারি, হাদিস ২০০৪)।

মুসলমানদের একটি বড় অংশ এই দিনে নফল রোজা পালন করেন। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, আশুরার রোজার বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। নবী করিম (সা.) নিজেও এই রোজা পালন করেছেন এবং উম্মতকে তা পালনে উৎসাহিত করেছেন।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মম ঘটনাক্রমে, বহু বছর পর এই একই দিনে (১০ মহররম) ঘটে যায় কারবালা প্রান্তরে হৃদয়বিদারক ঘটনা। ৬১ হিজরির ১০ মহররমে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যসহ সঙ্গীরা শাহাদাতবরণ করেন।

আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পৃথক বাণীতে বলেন, পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী মানুষকে অন্যায়-অবিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখায় এবং সত্য, সুন্দর ও আলোর পথে চলার অনুপ্রেরণা দেয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, ইসলামে বিভেদ, হানাহানি, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বৈরিতার কোনো স্থান নেই। তিনি সবাইকে আশুরার শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করার আহবান জানান।

আশুরা উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদে কোরআনখানি, মিলাদ, দোয়া ও ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের অনেকে গতকাল (৯ মহররম) ও আজ নফল রোজা পালন করেছেন। শিয়া সম্প্রদায় কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এ উপলক্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে।

আশুরার রোজা কয়টি, কখন রাখবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আশুরার রোজা কয়টি, কখন রাখবেন

আশুরা তথা দশম মহররমের দিনটি অত্যন্ত সম্মানিত ও বরকতময় দিন। এই দিনের ফজিলত সম্পর্কে অনেক বানোয়াট, মিথ্যা কথা ও জঈফ (সনদের দিক থেকে দুর্বল) রেওয়ায়েত জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত। অতএব, সহিহ হাদিসের আলোকে আশুরার ফজিলতগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো—

এক. বরকতময় দিন।

দুই. ওই দিন মুসা (আ.) ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

তিন. মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ এ দিনে রোজা রাখতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০০৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২৫)

চার. রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনে রোজা রাখতেন এবং অন্যদেরও এই দিনে রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬২৫)

পাঁচ. সেদিন কাবা শরিফে গিলাফ আবৃত করা হয়েছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৯২)

ছয়. খায়বারের লোকেরা এই দিনে রোজা রাখত এবং এই দিনটিকে ঈদ হিসেবে পালন করত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২১)

সাত. মক্কার কুরাইশরাও জাহিলি যুগে এ দিনে রোজা রাখত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৩৭)

আশুরার রোজার ফজিলত

এক. পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহর কাফফারা। আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলার কাছে আমি আশা পোষণ করি যে তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ১১৬২; জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নম্বর ৭৫২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে আশুরার দিনে রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাবে তিনি বলেন, তা বিগত এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮০৪)

দুই. রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে আশুরার দিনে রোজা পালন করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার পর তিনি বললেন, এ দিন ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো দিনকে অন্য দিনের তুলনায় উত্তম মনে করে সেদিনে রোজা পালন করেছেন বলে আমার জানা নেই। অনুরূপভাবে রমজান ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো মাসকে অন্য মাসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে রোজা পালন করেছেন বলেও আমার জানা নেই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৩২)

জীবনের শেষ দিনগুলোতে নবী করিম (সা.) ইহুদিদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার জন্য বলেছিলেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে শুধু আশুরার রোজা রাখব না; বরং আমি এর সঙ্গে আরেকটি রোজা একত্র করব। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আশুরার দিন রোজা পালন করেন এবং লোকদের রোজা পালনের নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, ইহুদি ও নাসারারা এই দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা পালন করব। বর্ণনাকারী বললেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৩৪)

আশুরার দিনে রোজা রাখার বিধান

উপরোক্ত হাদিসের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ১০ মহররমের রোজা রাখবে, তার সঙ্গে অন্য দিনও রোজা রাখা বাঞ্ছনীয়। তা মহররমের ৯ তারিখ হোক বা ১১ তারিখ। অর্থাৎ আশুরার দিনের রোজার সঙ্গে মিলিয়ে মোট দুটি রোজা রাখা মুস্তাহাব। চাই তা ৯ তারিখে রাখুক বা ১১ তারিখ। যাতে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হয়ে যায়। কেননা তারা শুধু আশুরার দিনেই রোজা পালন করে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা- ৩৭৫, বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা- ৭৯)

একটি রোজা রাখা কি গুনাহ?

কেউ কেউ মনে করেন, শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখা গুনাহ। তাই আশুরার আগে বা পরে রোজা রাখতে হবে; কিন্তু এটি সত্য নয়। কেননা ১০ মহররমের সঙ্গে আরেকটি রোজা একত্র করা ওয়াজিব ও আবশ্যক নয়; বরং উত্তম ও মুস্তাহাব। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) যে ফজিলত বর্ণনা করেছেন, তা শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখার মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে যায়। তবে ইহুদিদের অনুকরণ এড়াতে আরেকটি রোজা মিলিয়ে রাখা একটি অতিরিক্ত ফজিলতপূর্ণ ও মুস্তাহাব আমল।

উল্লেখ্য, অনেক ফকিহ ১০ মহররমের রোজাকে শুধু মাকরুহে তানজিহি বলেছেন। তবে বেশির ভাগ ইমামের মতে, এটি মাকরুহে তানজিহিও নয়। কারণ মুসলমানদের অন্তরে শুধু আশুরার দিনে রোজা রাখার দ্বারা ইহুদিদের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা তো দূরের কথা, চিন্তা-ভাবনাও আসে না। অতএব, যে ব্যক্তি আশুরার আগে বা পরে রোজা রাখার সামর্থ্য রাখে, সে যেন তার আগে বা পরে একটি রোজা পালন করে। তবে যার সামর্থ্য নেই বা অন্য কোনো ওজর আছে, সে যেন শুধু আশুরার রোজা রাখে, যাতে সে তার ফজিলতপূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়। (ফাতাওয়ায়ে কাসেমিয়া, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা- ৫৯৬)

আল্লামা ইউসুফ বানুরী (রহ.) লিখেছেন, আশুরার রোজা তিন ধরনের :

এক. ৯, ১০ ও ১১- তিন দিনই রোজা রাখতে পারবে।

দুই. ৯ ও ১০ বা ১০ ও ১১ তারিখে রোজা রাখা।

তিন. শুধু ১০ তারিখে রোজা রাখা।

তন্মধ্যে প্রথম স্তরটি সর্বোত্তম, দ্বিতীয়টি তার চেয়ে কম এবং তৃতীয়টি সর্বনিম্ন। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) বলেন, তৃতীয় স্তর যা সর্বনিম্ন, তাকেই ফকিহরা মাকরুহ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং রাসুল (সা.) যে রোজা রেখেছিলেন এবং ভবিষ্যতে ৯ তারিখের রোজা রাখার তামান্না পোষণ করেছেন, তাকে কিভাবে মাকরুহ বলা যায়? (মাআরিফুস সুনান, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা- ৪৩৭)

সারকথা হলো এই যে ৯ মহররম বা ১১ মহররমের আরেকটি রোজা ১০ মহররম অর্থাৎ আশুরার সঙ্গে একত্র করা উত্তম। তবে কেউ যদি কোনো কারণে শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখে, তাহলে তার ফজিলত ও সওয়াব থেকে মাহরুম হবে না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের আশুরার গুরুত্ব উপলব্ধি করার এবং তদনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন

মুফতি ওমর বিন নাছির
আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও শিক্ষার এক মহিমান্বিত দিন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে কিছু দিন ও রাত এমন আছে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যে ভূষিত করেছেন। মুহাররম মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ ইয়াওমে আশুরা, তেমনই একটি মহিমান্বিত দিন। এই দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মারক নয়; বরং এটি আল্লাহর সাহায্য, সত্যের বিজয়, জুলুমের পরাজয় এবং ঈমানদারদের জন্য মহান শিক্ষার প্রতীক।

বর্তমান সময়ে আশুরাকে ঘিরে নানা ঘটনা প্রচলিত থাকলেও একজন মুসলিমের জন্য কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ দিনের প্রকৃত গুরুত্ব জানা অত্যন্ত জরুরি। আশুরার মর্যাদা কারবালার ঘটনার কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং কারবালার ঘটনা ঘটার বহু আগে থেকেই এ দিনটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মানিত ও ফজিলতপূর্ণ ছিল। তাই আশুরাকে বুঝতে হলে আমাদেরকে কোরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের আলোকে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে।

আশুরা অর্থ কী?
‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘عاشوراء’ থেকে এসেছে। এর মূল শব্দ ‘عشرة’ (আশারা), যার অর্থ দশ। তাই মুহাররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়।

আশুরা কারবালার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত নয়
অনেকেই মনে করেন, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণে আশুরার দিন মর্যাদা লাভ করেছে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। সহিহ হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তের আগেও কোরাইশরা এ দিনকে সম্মান করত এবং কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। আয়শা (রা.) বলেন, ‘রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মানুষ আশুরার রোজা রাখত। আর এ দিন কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যে ইচ্ছা রোজা রাখবে আর যে ইচ্ছা ছেড়ে দেবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৯২)

আশুরার ঐতিহাসিক ঘটনা: মুসা (আ.)-এর মুক্তি ও ফেরাউনের ধ্বংস
আশুরার দিনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহিহভাবে প্রমাণিত ঐতিহাসিক ঘটনা হলো—আল্লাহ তাআলা এ দিনে মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সমুদ্রে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আমি মূসা ও তাঁর সঙ্গীদের সবাইকে রক্ষা করলাম। তারপর অপর দলকে (ফেরাউন ও তার বাহিনীকে) ডুবিয়ে দিলাম।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৬৫-৬৬)

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন, ইহুদিরা আশুরার রোজা রাখছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, ‘এ দিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের ওপর বিজয় দান করেছেন।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘মুসার সঙ্গে তোমাদের চেয়ে আমাদের সম্পর্ক বেশি।’ অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯৪৩)

আশুরার রোজার ফজিলত
আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২) এটি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নফল রোজা হিসেবে গণ্য।

আশুরার রোজা রাখার সুন্নাহ পদ্ধতি
রাসুলুল্লাহ (সা.) চেয়েছিলেন মুসলমানরা যেন ইহুদিদের অনুকরণ না করে। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, সাহাবারা বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ দিন তো ইহুদি-খ্রিস্টানরাও সম্মান করে।’ তখন তিনি বললেন, ‘আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমরা নবম দিনও রোজা রাখব।’ কিন্তু পরবর্তী বছর আসার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তিকাল করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৩৪)

এ কারণে ফকীহগণ বলেছেন—
৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখা উত্তম। কেউ চাইলে ১০ ও ১১ মুহাররমও রাখতে পারে। শুধু ১০ তারিখ একা রোজা রাখা মাকরুহ নয়, তবে উত্তম হলো সঙ্গে আরেকটি দিন যোগ করা। ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন, ‘তোমরা নবম ও দশম তারিখ রোজা রাখ এবং ইহুদিদের বিরোধিতা কর।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৭৫৫)

সাহাবায়ে কেরামের আশুরার প্রতি গুরুত্ব
সাহাবারা শুধু নিজেরাই রোজা রাখতেন না; বরং শিশুদেরও এ আমলে অভ্যস্ত করতেন। রুবাইয়্যি‘ বিনতে মুআউয়িজ (রা.) বলেন, ‘আমরা নিজেরাও আশুরার রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখাতাম। তারা খাবারের জন্য কাঁদলে আমরা তাদের খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতাম, যাতে ইফতার পর্যন্ত সময় কাটিয়ে দিতে পারে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬০)
এ থেকে বোঝা যায়, সাহাবায়ে কেরাম আশুরার রোজাকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।

কারবালার ঘটনা ও আশুরা
৬১ হিজরির ১০ মুহাররমে কারবালার প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র, জান্নাতের যুবকদের নেতা হযরত হুসাইন (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক ঘটনা। মুসলিম উম্মাহ আজও গভীর বেদনার সঙ্গে এ ঘটনাকে স্মরণ করে। তবে মনে রাখতে হবে, হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত আশুরার মর্যাদা সৃষ্টি করেনি; বরং আশুরা পূর্ব থেকেই ফজিলতপূর্ণ ছিল।

আশুরার দিনে পরিবারের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন
কথিত আছে যে, একটি হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে তার পরিবারের জন্য স্বচ্ছলতার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ তার জন্য সারা বছর স্বচ্ছলতা দান করবেন।’ কিন্তু এ হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেকেই এটিকে দুর্বল বা জাল বলেছেন। তাই এ বিষয়টিকে আশুরার প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। তবে কেউ যদি সওয়াবের আশায় পরিবারের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন, তাকে এ নিয়ে দোষারোপ করাও সমীচীন নয়।

অতএব, আশুরা কোনো শোকের দিন নয়, আবার শুধু আনন্দের দিনও নয়; এটি ঈমান, শিক্ষা, ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির দিন। এ দিনের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত রয়েছে আল্লাহর সাহায্যে মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের মুক্তি লাভের ঘটনায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশিত রোজার আমলে। তাই আশুরাকে কেন্দ্র করে ভিত্তিহীন কাহিনি, অতিরঞ্জন কিংবা বিভ্রান্তিকর বিশ্বাস ছড়িয়ে না দিয়ে আমাদের উচিত সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করা, ৯ ও ১০ মুহাররম (অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম) রোজা রাখা এবং এ দিনের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক

যুবকদের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ইসলামে জিমের গুরুত্ব

মুফতি ওমর বিন নাছির
যুবকদের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ইসলামে জিমের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

শরীর সুস্থ রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু দুনিয়াবি প্রয়োজন নয়; বরং এটি আল্লাহর দেওয়া আমানতের যথাযথ হক আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মুমিনের শক্তি, কর্মক্ষমতা ও সুস্থতা তাকে ইবাদত, দাওয়াত, জিহাদ, জীবিকা অর্জন এবং মানবসেবার কাজে অধিক সক্ষম করে তোলে। বর্তমান যুগে জিম বা ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।  ইসলাম সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম শরীর গঠনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। তবে সেই শরীরচর্চা হতে হবে শালীনতা, সংযম ও সঠিক নিয়তের ভিত্তিতে। মহান আল্লাহ মানুষকে সুন্দর গঠন ও সামর্থ্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা : তীন, আয়াত : ৪)

শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এখানে শক্তি বলতে শুধু ঈমানের শক্তি নয়; বরং শারীরিক শক্তিও অন্তর্ভুক্ত। কারণ শারীরিক সক্ষমতা মানুষের নেক কাজ সম্পাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ইসলামে জিম করার বিধান
জিম করা বা আধুনিক ব্যায়ামাগারে শরীরচর্চা মূলত একটি বৈধ কাজ। বরং যদি এর উদ্দেশ্য হয়—শরীর সুস্থ রাখা, ইবাদতের শক্তি অর্জন, রোগ প্রতিরোধ করা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা, এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যত্ন নেওয়া তাহলে তা সওয়াবের কাজেও পরিণত হতে পারে।

তবে কয়েকটি শর্ত অবশ্যই মানতে হবে—
১. শরীরচর্চার উদ্দেশ্য অহংকার, প্রদর্শন বা অন্যকে হেয় করা হওয়া যাবে না।
২. পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে।
৩. নামাজ ও অন্যান্য ফরজ ইবাদত অবহেলা করা যাবে না।
৪. হারাম গান, অশ্লীলতা বা অনৈতিক পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
৫. শরীরের ক্ষতি হয় এমন স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের শরীরচর্চা
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শারীরিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি হাঁটতেন, সফর করতেন, ঘোড়ায় আরোহণ করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতেন এবং দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছেন।

১. তীরন্দাজি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তীরন্দাজি কর এবং ঘোড়সওয়ারি শিক্ষা কর। তবে আমার কাছে তীরন্দাজি অধিক প্রিয়।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৭)
তীরন্দাজি শুধু যুদ্ধবিদ্যা নয়; এটি মনোসংযোগ, ধৈর্য ও শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধির একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম।

২. ঘোড়দৌড়
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৭০)

৩. দৌড় প্রতিযোগিতা
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলাম এবং আমি তাঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭৮)
এ থেকে বোঝা যায়, সুস্থ বিনোদন ও শরীরচর্চা ইসলামে অনুমোদিত।

৪. মল্লযুদ্ধ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিখ্যাত মল্লযোদ্ধা রুকানা ইবনে ইয়াজিদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে তাকে পরাজিত করেছিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৩৯০)
এ ঘটনা তাঁর শারীরিক সক্ষমতারও প্রমাণ বহন করে।

৫. ভারোত্তোলনের চর্চা
সাহাবিদের যুগে পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে শক্তি পরীক্ষা করার প্রচলন ছিল। এটি বর্তমান যুগের ভারোত্তোলন বা ওয়েট ট্রেনিংয়ের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ।

জিম ও ইবাদতের সম্পর্ক
অনেকে মনে করেন, শরীরচর্চা শুধু খেলাধুলা বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্থ শরীর ইবাদতের অন্যতম সহায়ক। কেননা সুস্থ শরীর নামাজে একাগ্রতা বাড়ায়। রোজা পালনে সহায়তা করে। হজ ও ওমরার কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম করে। জীবিকা অর্জনে শক্তি যোগায়। পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার শরীরেরও তোমার ওপর অধিকার রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)


মুসলিম যুবকদের জন্য করণীয়
বর্তমান যুগে মোবাইল, অলসতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে অনেক তরুণ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন মুসলিম যুবকের উচিত—নিয়মিত ব্যায়াম করা, হাঁটাহাঁটি করা, সাইকেল চালানো, দৌড়ানো, সাঁতার শেখা, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুমানো, এবং ক্ষতিকর নেশা থেকে দূরে থাকা। এসব অভ্যাস একজন যুবককে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই উপকৃত করবে।

জিম করা বা শরীরচর্চা করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং সৎ উদ্দেশ্য, শালীনতা ও মধ্যপন্থা বজায় রেখে করা হলে তা প্রশংসনীয় আমল হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শক্তিশালী মুমিনের প্রশংসা করেছেন এবং তীরন্দাজি, দৌড়, ঘোড়সওয়ারি ও মল্লযুদ্ধের মতো শরীরচর্চামূলক কার্যক্রমে উৎসাহ দিয়েছেন। আজকের যুগে জিম সেই শরীরচর্চারই আধুনিক রূপ। অতএব একজন মুমিনের উচিত নিজের শরীরকে আল্লাহর আমানত মনে করে তার যথাযথ যত্ন নেওয়া, যেন সে সুস্থ দেহে ইবাদত করতে পারে, সমাজের কল্যাণে কাজ করতে পারে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। শরীরের শক্তি যখন তাকওয়া, ইবাদত ও মানবসেবার পথে ব্যয় হয়, তখন তা শুধু ব্যায়াম নয়—বরং ইবাদতেরই একটি অংশে পরিণত হয়।

লেখক : আলেম ও সাংবাদিক