• ই-পেপার

মহানবী (সা.) ভুল শুধরে দিতেন যেভাবে

বৃষ্টির সময় মুমিনের পঠিতব্য দোয়া ও করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
বৃষ্টির সময় মুমিনের পঠিতব্য দোয়া ও করণীয়
সংগৃহীত ছবি

বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; এটি মহান আল্লাহ তাআলার অসীম রহমত, করুণা ও অনুগ্রহের এক জীবন্ত নিদর্শন। আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বৃষ্টিবিন্দু মানুষের হৃদয়ে নতুন আশা জাগায়, মৃত ভূমিকে পুনর্জীবিত করে এবং সৃষ্টিজগতের জন্য নিয়ে আসে কল্যাণের বার্তা। তাই ইসলামে বৃষ্টিকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর রহমতের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষের নিরাশ হওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই অভিভাবক, সর্বপ্রশংসিত।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ২৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টি দেখলে বিশেষ দোয়া পড়তেন, বৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করতেন এবং উম্মতকে শিখিয়েছেন—এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা থাকে। তাই একজন মুমিনের উচিত বৃষ্টিকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং এ সময়কে ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে মূল্যবান করে তোলা।

বৃষ্টি দেখলে যে দোয়া পড়া সুন্নত
রহমতের বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ দোয়াটি পড়তেন : 

اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! এই বর্ষণকে আমাদের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী করে দিন।’

হাদিস : আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বৃষ্টি হতে দেখতেন, তখন এ দোয়া পাঠ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩২)
এ দোয়ার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর কাছে শুধু বৃষ্টি নয়; বরং কল্যাণকর, উপকারী ও বরকতময় বৃষ্টি কামনা করেন।

বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ
ইসলামে কিছু সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃষ্টির সময় তার অন্যতম। সাহল ইবন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই সময়ের দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না, অথবা খুব কমই প্রত্যাখ্যান করা হয়—আজানের সময়ের দোয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময়ের দোয়া।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে—‘বৃষ্টির সময়ের দোয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৪০)

এ হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বৃষ্টি শুরু হলে শুধু তা উপভোগ করাই নয়; বরং হাত তুলে নিজের, পরিবারের, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।

বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বিশ্বাষ করা
অনেক মানুষ বৃষ্টির প্রকৃত উৎস ভুলে বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বা কুসংস্কারপূর্ণ ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়—বৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। জায়েদ ইবন খালিদ জুহানী (রা.) বর্ণনা করেন, হুদাইবিয়ায় এক রাতে বৃষ্টি হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন—‘আমার বান্দাদের কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হয়েছে, আবার কেউ আমার প্রতি কুফরি করেছে। যে বলেছে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি’, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তারকার প্রতি কুফরি করেছে। আর যে বলেছে, ‘অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে’, সে আমার প্রতি কুফরি করেছে এবং তারকার প্রতি ঈমান এনেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭১)

অতএব একজন মুমিনের মুখে থাকা উচিত—‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতেই আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি।’

অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পঠিতব্য দোয়া
কখনো কখনো অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের একটি সুন্দর দোয়া শিখিয়েছেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক জুমার দিনে এক সাহাবি এসে অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করেন,

اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالْآجَامِ وَالظِّرَابِ وَالْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াল জিবালি ওয়াল আজামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের ওপর নয়, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, বনভূমি, উপত্যকা এবং বৃক্ষরাজির স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৩৩)
এ দোয়া আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে এমন বৃষ্টি চাইতে হবে যা রহমত হয়ে আসে, কষ্টের কারণ না হয়।

বৃষ্টি আল্লাহর মহান নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে বরকতময় পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তা দ্বারা উদ্যান ও শস্য উৎপন্ন করেছি।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ৯)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা মৃত ভূমিকে জীবিত করেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬৫)
এসব আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বৃষ্টি কেবল পানির ফোঁটা নয়; এটি আল্লাহর কুদরত, রহমত এবং পুনরুত্থানেরও একটি জীবন্ত নিদর্শন।

বৃষ্টির সময় আমাদের ছয়টি করণীয়
১. বৃষ্টি শুরু হলে আল্লাহর প্রশংসা করা।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া।
৩. বৃষ্টির সময় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
৪. বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বিশ্বাস করা।
৫. অতিবৃষ্টি বা দুর্যোগ দেখা দিলে নববী দোয়া পাঠ করা।
৬. আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং গুনাহ থেকে তওবা করা।

অতএব, বৃষ্টির প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। তাই বৃষ্টি নামলেই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে, নবী করিম (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে দোয়া পাঠ করা, আল্লাহর রহমতের শুকরিয়া আদায় করা এবং নিজের ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় হাত তুলে প্রার্থনা করাই একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বৃষ্টির রহমত থেকে উপকৃত হওয়ার এবং এ সময়ের দোয়া কবুল হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

আপনজন ক্ষতি করলে যা করবেন

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
আপনজন ক্ষতি করলে যা করবেন
সংগৃহীত ছবি

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদাচরণের নির্দেশ এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক কোরো না এবং মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের আয়ত্তাধীন দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ওই লোককে ভালোবাসেন না, যে অহংকারী, দাম্ভিক।’(সুরা :  নিসা, আয়াত : ৩৬)

কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রশ্ন হলো, যদি সেই নিকটাত্মীয়রাই একজন মানুষের ঈমান ও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে পড়ে, কিংবা জীবনের জন্য হুমকি না হলেও সবচেয়ে বড় মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে ওঠেন? যদি প্রতিদিন নতুন অভিযোগ, অপমান, আবেগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ, অযথা দোষারোপ, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে বা কালো জাদুর আশ্রয় নিয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন, তাহলে একজন মুমিন কী করবেন?

আল্লাহকে হাজির নাজির রেখে চিন্তার পর যদি ফলাফল এই যে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা কোনো স্বার্থ নয়, বরং ব্যক্তি আসলেই নিকটাত্মীয়দের মানসিক শোষণে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে, অতিরিক্ত মানসিক অস্থিরতা থেকে ঈমান হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে (নাউজুবিল্লাহ), তবে এ ক্ষেত্রে তাকে মনে রাখতে হবে, ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে বলে, কিন্তু আত্মবিনাশের নির্দেশ দেয় না। শারীরিক আঘাতের মতো মানসিক শোষণও মানুষের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘদিনের অপমান, অবমূল্যায়ন, কটূক্তি ও মানসিক নির্যাতন একজন মানুষের ঈমান, ব্যক্তিত্ব, দাম্পত্য জীবন এবং সন্তানদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের ওপর আমল করা যেতে পারে, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৮৬)


রক্তের সম্পর্ক অটুট রাখা প্রতিটি মুমিনের জন্য আবশ্যক। এটা বজায় রাখার জন্য ইখলাসের সহিত সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু যদি তা বড় ক্ষতির কারণ হয়ে বসে, তখন বিকল্প উপায়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কারণ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)

তবে কেউ যদি এই অসহনীয় কষ্টেও ধৈর্য ধারণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে এর জন্য বিশেষ পুরস্কার পাবে। আর আত্মীয়রাও তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। আবু হুরায়রা‌ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমার আত্মীয়-স্বজন আছেন। আমি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করি; কিন্তু তারা আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। আমি তাদের উপকার করে থাকি; কিন্তু তারা আমার অপকার করে। আমি তাদের সহনশীলতা প্রদর্শন করি আর তারা আমার সঙ্গে মূর্খসুলভ আচরণ করে।’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যা বললে, তাহলে যদি প্রকৃত অবস্থা তা-ই হয়, তুমি যেন তাদের ওপর জ্বলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করছ। আর সর্বদা তোমার সঙ্গে আল্লাহর তরফ থেকে তাদের বিপক্ষে একজন সাহায্যকারী (ফেরেশতা) থাকবে, যতক্ষণ তুমি এ অবস্থায় বহাল থাকবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৪১৯)

তবে কেউ যদি অসহনীয় নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে আত্মীয়তা বজায় রাখে, তা দোষনীয় নয়। কারণ ইসলামের একটি সর্বজনস্বীকৃত নীতি হলো, ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সওয়াও যাবে না। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪১)

যদি কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নিয়মিত মানসিক অশান্তি, অপমান ও পারিবারিক ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে যোগাযোগ সীমিত করা, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা আত্মীয়তা ছিন্ন করার শামিল নয়। এ বিষয়ে ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। কোরআনে এসেছে, ‘ইবরাহিম বলল, আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব, তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান।  আমি পরিত্যাগ করছি আপনাদের আর আপনারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ডাকেন তাদের।’ (সুরা : মারিয়াম, আয়াত : ৪৭-৪৮)

এ থেকে বোঝা যায়, আত্মীয়তা বজায় রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। তা যদি জীবন ও ঈমানকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, প্রয়োজন শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে দূর থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা ও দোয়ার মাধ্যমে আত্মীয়তা রক্ষা করার অবকাশ আছে।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১০ ‍জুলাই, ২০২৬

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ১০ ‍জুলাই, ২০২৬
সংগৃহীত ছবি

আজ শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, ২৪ মহররম, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—


জুমার সময় শুরু ১২টা ০৭ মিনিটে।
আসরের সময় শুরু ৪টা ৪৩ মিনিটে।
মাগরিব ৬টা ৫৩ মিনিটে।
এশার সময় শুরু ৮টা ১৯ মিনিটে।
আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৫৪ মিনিটে 
আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৫০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১৪ মিনিটে।
সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

ডিজিটাল যুগে যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ডিজিটাল যুগে যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে পৃথিবী যেন একটি ছোট্ট স্ক্রিনে বন্দি। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে অসীম এক ভার্চুয়াল জগৎ। এক ক্লিকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। যোগাযোগ সহজ হয়েছে, জ্ঞান অর্জনের পথ বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির ঝলমলে আলোর আড়ালে নীরবে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়ের, যা মূলত নৈতিকতা ও লজ্জাশীলতার অপমৃত্যু। তথাকথিত আধুনিকার যুগে বেহায়াপনা আর লজ্জার বিষয় নয়; বরং অনেকের কাছে এটি প্রগতি, আধুনিকতা, এমনকি নিজেকে বিকশিত করার নাম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মানুষ পাপ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌছে যাচ্ছে, যেখানে গুনাহকে আর গুনাহ বলেও মনে হচ্ছে না।

ইসলাম লজ্জাশীলতাকে শুধু একটি নৈতিক গুণ হিসেবে শেখায়নি; বরং এটিকে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা। (মুসলিম, হাদিস : ৩৫) 
আরেক হাদিসে তিনি বলেন, প্রত্যেক দ্বিনের একটি স্বতন্ত্র চরিত্র আছে; ইসলামের চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৮১) 

লজ্জাশীলতার উপকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, লজ্জাশীলতা সর্বদা কল্যাণ বয়ে আনে। (বুখারি, হাদিস : ৬১১৭)

এই হাদিসগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়, যেখানে লজ্জাশীলতা দুর্বল হয়, সেখানে ঈমানও দুর্বল হতে শুরু করে। লজ্জাশীলতা মানুষের অন্তরের এমন এক আলোকবর্তিকা, যা তাকে ঈমান, পবিত্রতা ও সততার পথে পরিচালিত করে। এটি বিবেকের নীরব প্রহরী, যার উপস্থিতিতে মানুষ পাপের দ্বারপ্রান্তে এসেও ফিরে দাঁড়ায়। তাই যার হৃদয়ে হায়ার দীপ্তি যত উজ্জ্বল, অন্যায় ও অশ্লীলতার প্রতি তার সংকোচ তত গভীর। কিন্তু যখন হায়া চলে যায়, তখন আর কোনো বাঁধ অবশিষ্ট থাকে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমার লজ্জা থাকবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই করবে। (বুখারি, হাদিস : ৬১২০)

আজকের ডিজিটাল সমাজ যেন এই হাদিসের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। মুসলিম সমাজের ঘর থেকে ঘরে এটি পাপের সুনামি বইয়ে দিচ্ছে। কারণ ভার্চুয়াল জগতের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এখানে মানুষ নিজেকে অদৃশ্য ভাবতে শুরু করে। মনে হয়, 'আমি তো একা', 'কেউ তো দেখছে না', 'এটা তো শুধু অনলাইন।' কিন্তু একজন মুমিনের জন্য এই ভাবনা কত বড় আত্মপ্রবঞ্চনা! অথচ আল্লাহ সবকিছু দেখেন। তাঁর নজর এড়িয়ে কোনো কিছু করাই সম্ভব নয়। আমাদের দুই কাঁধে নিয়োজিত ফেরেশতারা আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই লিখে রাখেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, চোখের খিয়ানত এবং অন্তরের গোপন বিষয়ও তিনি জানেন। (সুরা : গাফির, আয়াত : ১৯)

স্ক্রিনের সামনে বসে মানুষ কী দেখছে, কোন ছবিতে দৃষ্টি থামছে, কার সঙ্গে কী কথোপকথন চলছে-সবই ডেটা বেইসে থেকে যায়। এআই অ্যালগরিদম, তার প্রতিটি গতিবিধি অনুসরণ করে তার মানসিকতা ও চাহিদা সম্পর্কে জেনে রাখে-যাতে তাকে সে হিসেবে বিজ্ঞাপন দেখানো যায়। সেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র অধিপতি প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে তো সবকিছু আরো বেশি স্পষ্ট। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় লজ্জাশীলতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তিন জায়গায়-চোখে, কথায় ও আঙুলে। চোখ হারামের দিকে ছুটে যায়, কথা শালীনতা হারায়, আঙুল এমন বার্তা লিখে ফেলে, যা মুখে উচ্চারণ করা লজ্জাজনক ছিল। আল্লাহ বলেন, 'মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে।' (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

বর্তমান যুগে এই আয়াত শুধু রাস্তা বা বাজারের জন্য প্রযোজ্য নয়: বরং মোবাইল স্ক্রিন, ভিডিও ফিড এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি স্কুলের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। মানুষের অন্তরকে হেদায়েতের আলোয় আলোকিত রাখতে হলে তাকে সব ধরনের গুনাহ থেকে পবিত্র রাখতে হবে। মানুষের যেসব অঙ্গের মাধ্যমে তার ঈমান-আমল ও অন্তর কলুষিত হয়, সব অঙ্গের ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। যার অন্যতম মাধ্যম হলো লজ্জাশীলতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পর্দাকারী; তিনি লজ্জাশীলতা ও পর্দা ভালোবাসেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০১২) 

যে আল্লাহ লজ্জাশীলকে ভালোবাসেন, তাঁর বান্দা কিভাবে নির্লজ্জতাকে নিজের পরিচয় বানায়?
আমাদের স্মরণ রাখা উচিত ভার্চুয়াল জগতে করা প্রতিটি কাজ রেকর্ড হচ্ছে। শুধু প্রযুক্তির ডেটা বেইসে নয়, আমলনামায়ও। আল্লাহ বলেন, 'মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে।' (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)

আজ যে কমেন্ট লিখছেন, যে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, যে ভিডিও দেখছেন, কিয়ামতের দিন সেগুলোই আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পারে। ভার্চুয়াল জগৎ ক্ষণস্থায়ী, যা কিছু সময়ের ট্রেন্ড, তা একসময় হারিয়ে যায়। আজকের ভাইরাল পোস্ট আগামীকাল বিস্মৃত হয়। কিন্তু গুনাহের দাগ হৃদয়ে থেকে যায়, আমলনামায় থেকে যায়, যতক্ষণ না বান্দা সত্যিকারের তাওবা করে।

ভার্চুয়াল যুগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এখানে মানুষ নিজের অজান্তেই অনেক জঘন্য কাজের অংশীদার হয়ে যায়, যার পরিণাম ভয়াবহ। যেমন-এখানে মানুষ মজার ছলে এমন অনেক কিছু শেয়ার করে বসে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বা পরোক্ষভাবে অশ্লীলতার প্রচার। অথচ বিনোদনের নামেও অশ্লীলতা প্রচার করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার-প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।' (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯) 

লজ্জাশীলতা রক্ষা করা এখন আর শুধু পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজেদের প্রোফাইলে, পোস্টে, কমেন্টে, ইনবক্সে, এমনকি স্ক্রিনের সামনে একাকী মুহূর্তেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার এই অদৃশ্য ফাঁদ থেকে সতর্ক থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মহানবী (সা.) ভুল শুধরে দিতেন যেভাবে | কালের কণ্ঠ