পৃথিবীতে এমন একটি কবরস্থান রয়েছে, যা শুধু মৃতদের আবাসস্থলই নয়; বরং ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সভ্যতার এক বিস্ময়কর সাক্ষী। আধুনিক ইরাকের পবিত্র নাজাফ নগরীতে অবস্থিত ‘ওয়াদি আসসালাম’ বা ‘শান্তির উপত্যকা’ পৃথিবীর বৃহত্তম ও প্রাচীনতম কবরস্থান হিসেবে সুপরিচিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠা এই কবরস্থান আজও বিশ্বের মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ একর বা ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল কবরস্থানকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কবরস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রায় চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে অসংখ্য মানুষকে দাফন করা হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে এখানে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি মৃতদেহ সমাহিত রয়েছে। এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১১ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ওয়াদি আসসালাম মুসলিম বিশ্বের, বিশেষত শিয়া মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্থান। এই কবরস্থানের পাশেই অবস্থিত ইসলামের চতুর্থ খলিফা, মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা আলী (রা.)-এর পবিত্র মাজার। একই সঙ্গে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থানও এখানে অবস্থিত। এছাড়া স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জনশ্রুতি অনুসারে আল্লাহর নবী হুদ (আ.) এবং সালেহ (আ.)-এর কবরও এই এলাকায় রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
জনশ্রুতি আছে যে, ইবরাহিম (আ.) একবার তাঁর পুত্র ইসহাক (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে বর্তমান নাজাফ অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। সে সময় এলাকাটি নিয়মিত ভূমিকম্পপ্রবণ ছিল। কিন্তু তিনি সেখানে অবস্থানকালে ভূমিকম্প বন্ধ হয়ে যায়। এক রাতে তিনি পাশের একটি গ্রামে গেলে পুনরায় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এতে এলাকাবাসী তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাসের অনুরোধ জানায়। যদিও তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি, তবে স্থানীয়দের কাছ থেকে নিজের নামে একখণ্ড জমি ক্রয় করেন। আর সেই জমিই পরবর্তীকালে ‘ওয়াদি আসসালাম’ কবরস্থানে রূপ নেয়।
ওয়াদি আসসালামের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, দূর থেকে এটি কোনো সাধারণ কবরস্থান বলে মনে হয় না। বরং এটি যেন মৃতদের এক বিশাল শহর। সারি সারি কবর, সমাধিকক্ষ, গম্বুজ এবং বিশেষ স্থাপত্যশৈলী পুরো এলাকাকে একটি স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। অধিকাংশ কবর পোড়ামাটির ইট দিয়ে নির্মিত এবং সেগুলোর ওপর প্লাস্টার করে কোরআনের আয়াত, দোয়া ও বিভিন্ন ধর্মীয় বাণী খোদাই করা হয়েছে। এখানে শুধু একক কবর নয়, রয়েছে বহু পারিবারিক সমাধিকক্ষও।
জায়গার সংকট মোকাবিলায় ওয়াদি আসসালামে গড়ে তোলা হয়েছে ভূগর্ভস্থ সমাধিকক্ষ ও সুড়ঙ্গপথ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাওয়া যায় এমন অনেক কক্ষে একসঙ্গে ৩০ থেকে ৫০ জন পর্যন্ত মৃতদেহ দাফনের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের বহুস্তরবিশিষ্ট সমাধি ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো কবরস্থানে খুব কমই দেখা যায়। ফলে ওয়াদি আসসালাম শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে নির্মিত কবরগুলোর অধিকাংশই প্রায় তিন মিটার উঁচু এবং গোলাকার চূড়াবিশিষ্ট ছিল। এগুলো দূর থেকেও সহজে চোখে পড়ত। বর্তমানে নতুন নির্মিত কবরগুলোতে আধুনিক স্থাপত্যের ছোঁয়া স্পষ্ট। আগের ইট ও প্লাস্টারের পরিবর্তে এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মার্বেল, গ্রানাইট ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর। হাতে খোদাইয়ের পরিবর্তে অত্যাধুনিক লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে মৃত ব্যক্তির নাম, ছবি এবং কোরআনের আয়াত খোদাই করা হচ্ছে।
ইরাকের বিপুলসংখ্যক শিয়া মুসলমানের কবর এই কবরস্থানে রয়েছে। অতীতে ভারত, লেবানন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও মৃতদেহ এনে এখানে দাফন করার প্রচলন ছিল। তবে কবরস্থানটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নয়। ধনী-গরিব, আলেম-উলামা, রাজনীতিবিদ কিংবা সাধারণ মানুষ—সবার জন্যই এখানে সমাহিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ওয়াদি আসসালাম শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম কবরস্থানই নয়; এটি মানবসভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মৃত্যুচিন্তার এক অনন্য প্রতীক। শত শত বছর ধরে লাখো মানুষের শেষ ঠিকানা হয়ে থাকা এই বিশাল কবরস্থান মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবী সত্যকে। সব মিলিয়ে ওয়াদি আসসালাম আজ বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর ও আলোচিত কবরস্থানে পরিণত হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে চলেছে গবেষক, পর্যটক এবং ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়। (তথ্যঋণ : আনাদোলা এজেন্সী, উইকিপিডিয়া)




