মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান উসমান ইবনে তালহা (রা.)। মক্কার সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের বনু আবদিদ দার গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বংশপরম্পরায় তাদের পরিবারের ওপর ন্যস্ত ছিল কাবা শরীফের চাবি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব। আরব সমাজে এটি ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব।
মহানবীর (সা.) মক্কী জীবনে কাবার চাবিকে ঘিরে একটি ঘটনার জন্য তিনি ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত। তৎকালীন সময়ে কেউ কাবায় প্রবেশ করতে চাইলে অপেক্ষা করতে হতো উসমান ইবনে তালহার (রা.) গোত্রের লোকদের জন্য। কারণ, কাবার চাবি থাকতো তাদের কাছে। একবারের ঘটনা—
একদিন হারাম শরীফের চত্বরে সাহাবিদের নিয়ে বসেছিলেন নবীজি (সা.)। হঠাৎ ভাবলেন, কাবা শরীফের ভেতরে ঢুকবেন। উসমান ইবনে তালহা তখনও মুসলিম হননি। তার কাছে কাবা ঘর খুলে দেওয়ার আবেদন করলেন নবীজি। উসমান ইবনে তালহা নবীজিকে চাবি দিলেন না। তখন নবীজি (সা.) শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘একদিন তুমি এই চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে।’ উসমান বিস্মিত হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তাহলে কি সেদিন কুরাইশরা অপমানিত হবে?’ উত্তরে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘না, বরং সেদিন কুরাইশরা সম্মানিত হবে।’
এরপর দিন গড়ায়। যুগ পার হয়। এক সময় মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন মহানবী (সা.)। হিজরতেরও প্রায় আট বছর পর ঘটে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর মহানবীর (সা.) সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নেয়। পুরো মক্কার অধিপতি তখন নবীজি (সা.)। কাবার চাবি ওসমান ইবনে তালহার কাছ থেকে চেয়ে নিলেন নবীজি (সা.)। হজরত আব্বাস (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) নবীজির পেছনে পেছন ছুটছেন। মনের ভেতর তীব্র প্রতীক্ষা কাবার চাবির দায়িত্ব যদি দিয়ে দেন নবীজি। দু’একজন বলেও ফেলেছেন মুখ ফুটে। সবার ভেতর প্রচণ্ড কৌতুহল কাকে দেওয়া হবে চাবি ?
উসমান ইবনে তালহা অসহায় ভাবে নবীজির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নবীজি (সা.) কাবার চাবি আবার উসমান ইবনে তালহার (রা.) হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনা এখানে শেষ হয়নি। এরপর নবীজি ঘোষণা করলেন, ‘হে বনু তালহা! কিয়ামত পর্যন্ত এই চাবি তোমাদের কাছেই থাকবে।’
নবীজির এই মহানুভবতায় তিনি আপ্লুত হলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাবার চাবি তার বংশধররাই বহন করছেন। এখনো সৌদি বাদশা এসে কাবার দুয়ারে অপেক্ষা করেন। ওসমান ইবনে তালহার (রা.) বংশের বর্তমান দায়িত্বশীল এসে দরজা খুলে দিলে ভেতরে প্রবেশ করেন।
ইসলাম গ্রহণের আগে জাহেলি যুগেও উসমান ইবনে তালহার (রা.) চরিত্রে ছিল সততা, আত্মমর্যাদা ও মানবিকতার উজ্জ্বল ছাপ। এর অন্যতম প্রমাণ হজরত উম্মে সালামা (রা.)-এর হিজরতের ঘটনা। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে একা ও অসহায় উম্মে সালামা (রা.) ও তার শিশুপুত্রকে দীর্ঘ পথ নিরাপদে মদিনার উপকণ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। কোনো স্বার্থ ছাড়াই একজন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.)একনিষ্ঠ সাহাবিতে পরিণত হন। জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে মদিনায় নবীজির সান্নিধ্যে হিজরত করেন। মক্কা বিজয়ের আগেই হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আমর ইবনে আসের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। জীবনভর তিনি কাবা শরিফের খিদমত, আমানত রক্ষা এবং ইসলামের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করেন। তার বর্ণিত বেশ কয়েকটি হাদিস হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে সংরক্ষিত হয়েছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—সম্মান বংশে নয়, সত্যকে গ্রহণ করার মধ্যেই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা। ৪২ হিজরীতে মক্কায় ইন্তেকাল করেন তিনি।




