অর্থনীতিতে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা যেমন ছিল

আসআদ শাহীন
আসআদ শাহীন
শেয়ার
অর্থনীতিতে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা যেমন ছিল

মানব ইতিহাসে ইবনে খালদুনের অনন্য স্থান আছে। তিনি ইতিহাসবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদ (Sociologist) ছিলেন। জ্ঞানের অন্য ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান (Sociology)  দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা অত্যন্ত প্রভাবশালী, যা তাঁর দর্শনের বিস্তৃতি এবং তাঁর যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইবনে খালদুন তাঁর যুগে তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি, ফলে তাঁর যুগে তাঁর চিন্তাধারা, দর্শন ও কর্মপন্থা সমৃদ্ধি ঘটাতে পারেনি। কিন্তু  যখন আমরা এই আধুনিক বিশ্বে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা, দর্শন ও কর্মপন্থা অনুযায়ী চলি, তখন নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে তিনি অর্থনীতিসহ আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

বিখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জে জে স্পেংলার  (J.J Spengler) Zuvi eB ‘Economic Thoughts of Islam’-এ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে ইবনে খালদুন নিঃসন্দেহে একজন মহান অর্থনীতিবিদ এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার সর্বোত্তম প্রবক্তা ছিলেন। (খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-২৬৮)

অ্যাডাম স্মিথের  (Adam Smith)  বহু আগে ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন’ গ্রন্থে লিখেছেন যে সম্পদের একমাত্র উৎস হলো উৎপাদন।

একটি দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। (আল মুকাদ্দামা, পৃষ্ঠা-২৭২)

তিনি ভাগ্যের প্রথাগত ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না এবং দারিদ্র্য দূর করার জন্য উৎপাদনশীল কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেন। এ ছাড়া তিনি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম বিভাজনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং এ বিষয়ে তিনি ‘মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

যখন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষের কার্যক্রম শামিল হবে, তখন এর মজুরি বা লাভ নির্ধারিত হয় তার শ্রমের উৎপাদনশীলতার (মূল্য) ওপর ভিত্তি করে।

উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যত বেশি শ্রম বৃদ্ধি হবে, মজুরি তত বেশি হবে। তবে মজুরিতে সমতা সম্ভব নয়। (আল মুকাদ্দামা, পৃষ্ঠা-২৭৫)

ইবনে খালদুন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে জোগান ও চাহিদায় বিশ্বাস করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইবনে খালদুন স্বর্ণ ও রৌপ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতেন না, এগুলোকে শুধু ধাতু হিসেবেই বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, সম্পদ শুধু উৎপাদন।

তিনি এই মুদ্রাগুলো বিনিময়ের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা পাওয়া যায়। একটি সমাজ যত বেশি সমৃদ্ধ হয়, সেখানে সেবার বাজার তত বেশি বিকাশ লাভ করে।

ইবনে খালদুন লাভবর্ধককে অর্থনৈতিকের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং তাঁর সমগ্র অর্থনৈতিক দর্শন এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তিনি আয়ের  (Tax)  ন্যূনতম স্তরে বিশ্বাস করেন, তবে উচ্চ করকে লাভবর্ধক এবং উৎপাদনশীলতার ঘাতক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে একটি সুস্থ অর্থনীতি হলো, যেখানে ব্যবসা মুনাফা অর্জন করবে এবং লাভবর্ধক অর্থনৈতিক কার্যক্রম অগ্রগামী করবে।

ইবনে খালদুন অবকাঠামো নির্মাণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন প্রকল্পকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ধ্বংস করে দেয়। এর সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা ও রাষ্ট্রের আলোচনায় তিনি রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় ক্রেতা মনে করেন এবং বলেন যে সরকার যত বেশি ক্রয় করবে উৎপাদন প্রক্রিয়া তত বৃদ্ধি হবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তত বাড়বে। তাঁর মতে, সরকার কেনাকাটা বন্ধ করে দিলে অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেবে।

রাষ্ট্র সম্পর্কে পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মতো ইবনে খালদুনেরও একটি সংশয় আছে, জাতির উত্থান-পতনের আলোচনায় তিনি রাষ্ট্রীয় করকে (Tax)  পতনের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং লিখেছেন যে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ব্যয়ের জন্য কর আরোপ করে থাকে। কেননা কর যত বেশি হবে, ব্যয়ও তত বেশি হবে। আর এভাবেই সরকারের মধ্যে বেশি ধন-সম্পদ সংগ্রহ ও উচ্চ করের সাহায্যে অধিক ব্যয় করার লোভ দেখা দেয়। সে জন্যই তাদের কর বৃদ্ধির প্রণোদনা আছে।

যদি কর কম হয় এবং ব্যাবসায়িক কর্মপদ্ধতিতে মুনাফা বেশি হয়, তাহলে অর্থনীতির উন্নতি হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সরকারকে সার্বিকভাবে বেশি কর  (Tax) দেবে, যা উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করবে। এভাবেই বেশি উৎপাদন আরো সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে, এটিই উন্নতির একমাত্র উপায়।

অধঃপতনের পথ হলো রাষ্ট্র যদি তাড়াহুড়া বা লোভ বা অন্য কোনো কারণে কর (Tax) বাড়ায়। কর বৃদ্ধির ফলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে মুনাফা কমে যায়। মুনাফা হ্রাসের ফলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম হ্রাস পায়, ব্যাবসায়িক কার্যক্রম হ্রাসের ফলে আয়ের (Tax) পরিমাণ হ্রাস পায়।

সুতরাং এ ধরনের ব্যবসায় লোকসান আছে। ফলে রাষ্ট্র অন্যান্য ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে উচ্ছেদ করে দেয় এবং নিজস্ব একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান দাঁড় করায়। এতে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম আরো ব্যাহত হয় এবং সরকারি কর আরো হ্রাস পায়। এভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ আরো দরিদ্র থেকে দরিদ্র হয় এবং জাতি অধঃপতনের কবলে পড়ে। সেখান থেকে তাদের একমাত্র মুক্তির পথ হলো কর হ্রাস করা, ব্যবসার সুযোগ প্রসারিত করা, উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করা এবং সরকারের উচিত যুক্তিসংগত কর ও ব্যয়ের মাধ্যমে চাহিদা বৃদ্ধি করা। আর দেশে শতভাগ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা।

তথ্যঋণ

মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন/আল্লামা ইবনে খালদুন

The Economic Thought of Ibn Khaldun/Mohammad Abdul Qadir  

Economic Thoughts of Islam: Ibn Khaldun/J.J Spengler

Ibn Khaldun’s Analysis of Economic Issues/Charles Issawi

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

কোরআন থেকে শিক্ষা

যাদের আমল মরুভূমির মরীচিকার মতো

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামী জীবন ডেস্ক
শেয়ার
যাদের আমল মরুভূমির মরীচিকার মতো

আয়াতের অর্থ : ‘যারা কুফরি করে তাদের কাজ মরুভূমির মরীচিকাসদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে, কিন্তু সে তার কাছে উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছু নয় এবং সে পাবে সেখানে আল্লাহকে, অতঃপর তিনি তার কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেবেন। আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর। অথবা তাদের কাজ গভীর সমুদ্রতলের অন্ধকারসদৃশ, যাকে আচ্ছন্ন করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ঊর্ধ্বে মেঘপুঞ্জ, অন্ধকারপুঞ্জ স্তরের ওপর স্তর...।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৯-৪০)

আয়াতদ্বয়ে পরকালের ব্যাপারে অবিশ্বাসীদের অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. উপদেশ প্রদানে কোরআনের রীতি হলো সুসংবাদ ও হুঁশিয়ারি পাশাপাশি নিয়ে আসা। যেন মানুষের ভেতর আশা বা ভয় কোনোটাই প্রবল না হয়।

২. পরকালের ব্যাপারে অবিশ্বাসীদের প্রত্যাশা মিথ্যা ও মূল্যহীন। পরকালে তাদের কোনো প্রাপ্য নেই।

৩. অবিশ্বাসীদের ভালো কাজগুলো মরীচিকার মতো নিষ্ফল ও বিভ্রম মাত্র, যা দূর থেকে পানি মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে পানি নয়। (আত-তাহরির ওয়াত তানভির : ৩৯-৪০)

৪. তিন জিনিসের অভাবে মানুষের আমল নিষ্ফল হয় : ক. ঈমান, খ. ইখলাস বা নিষ্ঠা, গ. শরিয়তের অনুসরণ।

৫. ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তরঙ্গ আচ্ছন্ন করে’ বাক্য দ্বারা অবিশ্বাসীদের অন্তর, চোখ ও কানের ওপর বিরাজমান পর্দা উদ্দেশ্য। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৮/১৩৪)

 

 

মন্তব্য

২৭ রমজানের রাতে মসজিদুল আকসায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামী জীবন ডেস্ক
শেয়ার
২৭ রমজানের রাতে মসজিদুল আকসায় ২ লাখ ফিলিস্তিনি

ফিলিস্তিনের আল-আকসা মসজিদে রমজানের ২৬ তম রাতে তারাবির নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৭ মার্চ) অনুষ্ঠিত এ নামাজে প্রায় দুই লাখ ফিলিস্তিনি মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছেন।

আল-আকসা মসজিদ পরিচালনাকারী ওয়াকফ বিভাগ জানায়, রমজান মাসে আল-আকসায় সর্বোচ্চ সংখ্যক মুসল্লির রেকর্ড করা হয়েছে। জেরুজালেমে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ সত্ত্বেও এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি মুসল্লি তারাবির নামাজে অংশ নেন।

 

লাইলাতুল কদর বা শবেকদর একটি মহিমান্বিত রাত। এই রাতে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। তবে রাতটি সুনির্দিষ্ট করা হয়নি; বরং রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের যেকোনো একদিন তা হতে পারে। পবিত্র কোরআনে এই রাতকে হাজার রাতের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে।

তাই এই রাতে ইবাদতের জন্য মুসল্লিরা পবিত্র মসজিদুল আকসায় অবস্থান করেন। 

সূত্র : আরব নিউজ

মন্তব্য
হাদিসের কথা

রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামী জীবন ডেস্ক
শেয়ার
রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব

রোজাদারকে ইফতার করানো সওয়াবের কাজ। এরমাধ্যমে রোজাদারের সমান সওয়াব লাভ করা যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, 

 عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا كَانَ لَهُ مِثْلُ أَجْرِهِ غَيْرَ أَنَّهُ لاَ يَنْقُصُ مِنْ أَجْرِ الصَّائِمِ شَيْئًا ‏"‏ ‏‏

জায়েদ বিন খালিদ আল-জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তার জন্য রোজাদারের মতোই প্রতিদান রয়েছে। তবে এর ফলে রোজা পালনকারীর সাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না।

মন্তব্য
প্রতিদিনের আমল

শত্রুর ক্ষতি থেকে বাঁচার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামী জীবন ডেস্ক
শেয়ার
শত্রুর ক্ষতি থেকে বাঁচার দোয়া

শত্রুরা মুমিনের ক্ষতি করার জন্য ওত পেতে থাকে। তাই সব ধরনের ক্ষতি বাঁচতে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা মুমিনের কর্তব্য। রাসুল (সা.) শত্রুর হামলার ভয় করলে একটি দোয়া পড়তেন। তা হলো-

 اللَّهُمَّ إنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফি নুহুরিহিম অনাউযু বিকা মিন শুরুরিহিম।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের মোকাবেলায় রাখছি এবং তাদের অনিষ্টতা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

হাদিস আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) যখন কোনো শত্রুদলকে ভয় করতেন তখন এই দোয়া পড়তেন।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। আমিন।


 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ