অর্থনীতিতে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা যেমন ছিল

আসআদ শাহীন
আসআদ শাহীন
শেয়ার
অর্থনীতিতে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা যেমন ছিল

মানব ইতিহাসে ইবনে খালদুনের অনন্য স্থান আছে। তিনি ইতিহাসবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদ (Sociologist) ছিলেন। জ্ঞানের অন্য ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান (Sociology)  দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা অত্যন্ত প্রভাবশালী, যা তাঁর দর্শনের বিস্তৃতি এবং তাঁর যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইবনে খালদুন তাঁর যুগে তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি, ফলে তাঁর যুগে তাঁর চিন্তাধারা, দর্শন ও কর্মপন্থা সমৃদ্ধি ঘটাতে পারেনি। কিন্তু  যখন আমরা এই আধুনিক বিশ্বে ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা, দর্শন ও কর্মপন্থা অনুযায়ী চলি, তখন নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে তিনি অর্থনীতিসহ আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

বিখ্যাত অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ জে জে স্পেংলার  (J.J Spengler) Zuvi eB ‘Economic Thoughts of Islam’-এ তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে ইবনে খালদুন নিঃসন্দেহে একজন মহান অর্থনীতিবিদ এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার সর্বোত্তম প্রবক্তা ছিলেন। (খণ্ড-৬, পৃষ্ঠা-২৬৮)

অ্যাডাম স্মিথের  (Adam Smith)  বহু আগে ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন’ গ্রন্থে লিখেছেন যে সম্পদের একমাত্র উৎস হলো উৎপাদন।

একটি দেশকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে হলে তার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। (আল মুকাদ্দামা, পৃষ্ঠা-২৭২)

তিনি ভাগ্যের প্রথাগত ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না এবং দারিদ্র্য দূর করার জন্য উৎপাদনশীল কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দেন। এ ছাড়া তিনি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম বিভাজনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং এ বিষয়ে তিনি ‘মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

যখন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় মানুষের কার্যক্রম শামিল হবে, তখন এর মজুরি বা লাভ নির্ধারিত হয় তার শ্রমের উৎপাদনশীলতার (মূল্য) ওপর ভিত্তি করে।

উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যত বেশি শ্রম বৃদ্ধি হবে, মজুরি তত বেশি হবে। তবে মজুরিতে সমতা সম্ভব নয়। (আল মুকাদ্দামা, পৃষ্ঠা-২৭৫)

ইবনে খালদুন মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে জোগান ও চাহিদায় বিশ্বাস করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইবনে খালদুন স্বর্ণ ও রৌপ্যকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতেন না, এগুলোকে শুধু ধাতু হিসেবেই বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, সম্পদ শুধু উৎপাদন।

তিনি এই মুদ্রাগুলো বিনিময়ের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা পাওয়া যায়। একটি সমাজ যত বেশি সমৃদ্ধ হয়, সেখানে সেবার বাজার তত বেশি বিকাশ লাভ করে।

ইবনে খালদুন লাভবর্ধককে অর্থনৈতিকের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং তাঁর সমগ্র অর্থনৈতিক দর্শন এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তিনি আয়ের  (Tax)  ন্যূনতম স্তরে বিশ্বাস করেন, তবে উচ্চ করকে লাভবর্ধক এবং উৎপাদনশীলতার ঘাতক হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর দৃষ্টিতে একটি সুস্থ অর্থনীতি হলো, যেখানে ব্যবসা মুনাফা অর্জন করবে এবং লাভবর্ধক অর্থনৈতিক কার্যক্রম অগ্রগামী করবে।

ইবনে খালদুন অবকাঠামো নির্মাণ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন প্রকল্পকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করেন। তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ধ্বংস করে দেয়। এর সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা ও রাষ্ট্রের আলোচনায় তিনি রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় ক্রেতা মনে করেন এবং বলেন যে সরকার যত বেশি ক্রয় করবে উৎপাদন প্রক্রিয়া তত বৃদ্ধি হবে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তত বাড়বে। তাঁর মতে, সরকার কেনাকাটা বন্ধ করে দিলে অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেবে।

রাষ্ট্র সম্পর্কে পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মতো ইবনে খালদুনেরও একটি সংশয় আছে, জাতির উত্থান-পতনের আলোচনায় তিনি রাষ্ট্রীয় করকে (Tax)  পতনের প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং লিখেছেন যে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ব্যয়ের জন্য কর আরোপ করে থাকে। কেননা কর যত বেশি হবে, ব্যয়ও তত বেশি হবে। আর এভাবেই সরকারের মধ্যে বেশি ধন-সম্পদ সংগ্রহ ও উচ্চ করের সাহায্যে অধিক ব্যয় করার লোভ দেখা দেয়। সে জন্যই তাদের কর বৃদ্ধির প্রণোদনা আছে।

যদি কর কম হয় এবং ব্যাবসায়িক কর্মপদ্ধতিতে মুনাফা বেশি হয়, তাহলে অর্থনীতির উন্নতি হবে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সরকারকে সার্বিকভাবে বেশি কর  (Tax) দেবে, যা উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি করবে। এভাবেই বেশি উৎপাদন আরো সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে, এটিই উন্নতির একমাত্র উপায়।

অধঃপতনের পথ হলো রাষ্ট্র যদি তাড়াহুড়া বা লোভ বা অন্য কোনো কারণে কর (Tax) বাড়ায়। কর বৃদ্ধির ফলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রমে মুনাফা কমে যায়। মুনাফা হ্রাসের ফলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম হ্রাস পায়, ব্যাবসায়িক কার্যক্রম হ্রাসের ফলে আয়ের (Tax) পরিমাণ হ্রাস পায়।

সুতরাং এ ধরনের ব্যবসায় লোকসান আছে। ফলে রাষ্ট্র অন্যান্য ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে উচ্ছেদ করে দেয় এবং নিজস্ব একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান দাঁড় করায়। এতে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম আরো ব্যাহত হয় এবং সরকারি কর আরো হ্রাস পায়। এভাবে রাষ্ট্র ও সমাজ আরো দরিদ্র থেকে দরিদ্র হয় এবং জাতি অধঃপতনের কবলে পড়ে। সেখান থেকে তাদের একমাত্র মুক্তির পথ হলো কর হ্রাস করা, ব্যবসার সুযোগ প্রসারিত করা, উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করা এবং সরকারের উচিত যুক্তিসংগত কর ও ব্যয়ের মাধ্যমে চাহিদা বৃদ্ধি করা। আর দেশে শতভাগ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা।

তথ্যঋণ

মুকাদ্দামায়ে ইবনে খালদুন/আল্লামা ইবনে খালদুন

The Economic Thought of Ibn Khaldun/Mohammad Abdul Qadir  

Economic Thoughts of Islam: Ibn Khaldun/J.J Spengler

Ibn Khaldun’s Analysis of Economic Issues/Charles Issawi

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহমানদারি

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
শেয়ার
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মেহমানদারি

মেহমানের সমাদর করা মুমিনের ভূষণ। মুমিন মেহমানের আগমনে খুশি হয়। মেহমানকে সাদরে গ্রহণ করে। কেননা নবীজি (সা.) মেহমানকে সম্মান করার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

এখানে মেহমানের আপ্যায়নের গুরুত্ব ও আদব সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

মেহমান আপ্যায়নের গুরুত্ব : ইসলামে মেহমান আপ্যায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু সামাজিকতা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় করলে এক ধরনের ইবাদতও বটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, অতিথিকে সমাদর করে, আর ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।

’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)

এই হাদিসে মেহমানের সমাদরকে ঈমানের দাবি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। যে ঈমান রাখে, তার উচিত মেহমানকে সম্মান করা। তার আগমনে বিরক্ত না হওয়া।

মেহমানের হক : প্রতিটি মুসলমানের ওপর তার কাছে আসা মেহমানের হক রয়েছে।

তাইতো নবীজি (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-কে লাগাতার রোজা রাখতে নিরুৎসাহ করার সময় বলেন, কয়েক দিন রোজা পালন করো, আর কয়েক দিন ইফতার করো (রোজা ভঙ্গ করো)। তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে। তোমার ওপর তোমার চোখের হক আছে, তোমার ওপর তোমার মেহমানের হক আছে, আর তোমার ওপর তোমার স্ত্রীরও হক আছে। নিশ্চয়ই তুমি তোমার আয়ু দীর্ঘ হওয়ার আশা করো। (বুখারি, হাদিস : ৬১৩৪)

আপ্যায়নের সময়সীমা : বাড়িতে কোনো মেহমান এলে মেজবানের দায়িত্ব তার মেহমানদারি করা, মেহমানের হক আদায় করা।

প্রশ্ন হলো, এর কি কোনো সময়সীমা আছে, নাকি মেহমান যত দিন ইচ্ছা থাকতে পারবে, মেজবান সামর্থ্য না থাকলেও তার মেহমানদারি করে যাবে? এর উত্তরও পবিত্র হাদিসেই রয়েছে। আবু কারিম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক রাত মেহমানদারি করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। যার আঙিনায় মেহমান নামে, এক দিন মেহমানদারি করা তার ওপর ঋণ পরিশোধের সমান। সে ইচ্ছা করলে তার ঋণ পরিশোধ করবে বা ত্যাগ করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৫০)

তবে তিন দিন পর্যন্ত মেহমানদারি করা সুন্নত। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু শুরাইহ খুযাঈ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মেহমানদারি তিন দিন এবং উত্তমরূপে মেহমানদারি এক দিন ও এক রাত। কোনো মুসলিম ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের নিকট অবস্থান করে তাকে পাপে নিপতিত করবে। তখন সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! কিভাবে সে তাকে পাপে নিপতিত করবে? তিনি বললেন, সে (মেহমান) তার নিকট (এমন বেশি দিন) থাকবে, অথচ তার (মেজবানের) এমন সম্বল নেই, যা দ্বারা সে তার মেহমেনদারি করবে। (মুসলিম, হাদিস : ৪৪০৬)

মেহমানদারির ফজিলত

সম্মানজনক জীবন লাভ : কিছু গুণ এমন আছে, যেগুলো কারো মধ্যে থাকলে মহান আল্লাহ তাকে সর্বাবস্থায় সাহায্য  করেন, সম্মানিত করেন। তিনি কোথাও তাঁকে অপমানিত হতে দেন না। যেমন—খাদিজা (রা.) রাসুল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! তিনি কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না। আল্লাহর কসম! আপনি স্বজনদের খোঁজখবর রাখেন, সত্য কথা বলেন, দুঃখীদের দুঃখ নিবারণ করেন, দরিদ্রদের বাঁচার ব্যবস্থা করেন, মেহমানের সেবা করেন এবং প্রকৃত দুর্দশাগ্রস্তদের সাহায্য করেন। (মুসলিম, হাদিস : ২৯৩)

জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম : আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় সাধ্যমতো মেহমানের আপ্যায়ন করা জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম হতে পারে। হাদিস শরিফে জান্নাতে যাওয়ার যে আমলগুলো বাতলে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো মানুষকে খাওয়ানো। নবীজি (সা.) মদিনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম যে নসিহত করেছেন তা ছিল, ‘হে মানুষ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান করো এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাক অবস্থায় (তাহাজ্জুদ) নামাজ আদায় করো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সহিহ-সালামতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৫)

জান্নাতে প্রাসাদ লাভ : যেসব অভ্যাসে জান্নাতে বিশেষ প্রাসাদ পাওয়া যাবে, তার মধ্যে একটি কাজ হলো মেহমানদারি করা, মানুষকে খাওয়ানো। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাতের মধ্যে একটি বালাখানা (প্রাসাদ) আছে। এর ভেতর থেকে বাইরের এবং বাইরে থেকে  ভেতরের দৃশ্য দেখা যায়। এক বেদুইন (গ্রাম্য লোক) দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! এই বালাখানা কোন ব্যক্তির জন্য? তিনি বলেন, যে লোক মানুষের সঙ্গে উত্তমভাবে কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেয়, সর্বদা রোজা পালন করে এবং মানুষ যখন রাতে ঘুমিয়ে থাকে, তখন আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে নামাজ আদায় করে। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৮৪)

আল্লাহর সন্তুষ্টি : মেহমানদারির দ্বারা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়া যায়। নবীজি (সা.)-এর যুগে এক আনসারি দম্পতি নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও মেহমানের সমাদর করেছিল। এতে মহান আল্লাহ এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে তিনি এ ব্যাপারে কোরআনে আয়াত নাজিল করেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক লোক নবী (সা.)-এর খিদমতে এলো। তিনি (সা.) তাঁর স্ত্রীদের কাছে লোক পাঠালেন। তাঁরা জানালেন, আমাদের কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, কে আছ যে এই ব্যক্তিকে মেহমান হিসেবে নিয়ে নিজের সঙ্গে খাওয়াতে পারো? তখন এক আনসারি সাহাবি [আবু ত্বলহা (রা.)] বললেন, আমি। এই বলে তিনি মেহমানকে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মেহমানকে সম্মান করো। স্ত্রী বললেন, বাচ্চাদের খাবার ছাড়া আমাদের ঘরে অন্য কিছুই নেই। আনসারি বললেন, তুমি আহার প্রস্তুত করো, বাতি জ্বালাও এবং বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। স্ত্রী বাতি জ্বালালেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়ালেন এবং সামান্য খাবার যা তৈরি ছিল তা উপস্থিত করলেন। বাতি ঠিক করার বাহানা করে তিনি উঠে গিয়ে বাতিটি নিভিয়ে দিলেন। তারপর স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্ধকারের মধ্যে আহার করার মতো শব্দ করতে লাগলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে লাগলেন যে তাঁরাও খাচ্ছেন। উভয়েই সারা রাত অভুক্ত অবস্থায় কাটালেন। ভোরে যখন তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলেন, তখন তিনি (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের গত রাতের কাণ্ড দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা বলেছেন খুশি হয়েছেন এবং এই আয়াত নাজিল করেছেন—‘তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রগণ্য করে থাকে। আর যাদের অন্তরের কৃপণতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলতাপ্রাপ্ত।’ [সুরা : হাশর, আয়াত : ৯] (বুখারি, হাদিস : ৩৭৯৮)

আদব ও নিয়ম-কানুন

মেহমানকে স্বাগত জানানো : আল্লাহর রাসুল (সা.) আগত মেহমানদের স্বাগত জানাতেন। তাদের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৬১৭৬)

আন্তরিকতা প্রদর্শন করা : মেজবানের উচিত নিজ হাতে তার মেহমানদের সেবা করা, আন্তরিকভাবে তাদের হাসিমুখে গ্রহণ করা, তাদের আগমনে খুশি হয় এমন কথা বলা, যা তাদের মনকে আকর্ষণ করে। আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-এর মেহমানদারি প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতঃপর তিনি (খাবারটি) তাদের সামনে রেখে বললেন, তোমরা কি খাচ্ছ না?’ (সুরা : জারিয়াহ, আয়াত : ২৭০)

অন্তত তিন দিন পর্যন্ত মেহমানদারি করা : তিন দিন পর্যন্ত মেহমানের আপ্যায়ন করা সুন্নত। (মুসলিম, হাদিস : ৪৪০৬)

অতিথির জন্য বাড়তি চাপ নেওয়া নিষেধ : রাসুল (সা.) মেহমানদারি করতে গিয়ে সাধ্যের বাইরে অহেতুক খরচ করে আপ্যায়নের কৃত্রিমতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। সালমান (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাঁর কাছে প্রবেশ করল (মেহমান হলো)। তখন তিনি (সালমান) যা তাঁর কাছে ছিল তা দিয়ে তার আপ্যায়ন করলেন। তারপর বললেন, যদি না রাসুল (সা.) আমাদের নিষেধ করতেন, (অথবা বলেছেন) যদি না আমাদের নিষেধ করা হতো যে আমাদের কেউ যেন তার সাথির জন্য কষ্ট স্বীকার না করে, তাহলে আমরা অবশ্যই তোমার জন্য কষ্ট স্বীকার করতাম (অর্থাৎ মেহমানদারিতে অহেতুক খরচ করতাম)। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৭৭৪)

হাফেজ ইবন রজব (রহ.) জামি‘উল উলুম ওয়াল হিকাম’-এ বলেছেন, ‘এটি এ বিষয়ে প্রমাণ যে মেহমানকে আতিথেয়তা দেওয়ার দায়িত্ব কেবল তখনই বাধ্যতামূলক, যখন কারো কাছে কিছু অতিরিক্ত থাকে। যদি তার কাছে অতিরিক্ত কিছু না থাকে, তাহলে তার ওপর কিছুই আবশ্যক নয়। আর কেউ যদি নিজেকে অগ্রাহ্য করে (অর্থাৎ নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও) অন্যকে প্রাধান্য দেয়, যেমন—সেই আনসারি সাহাবি করেছিলেন, যাঁর সম্পর্কে আল্লাহ নাজিল করেছেন—‘তাহলে সেটা উত্তম মর্যাদা ও ইহসানের স্তরে পড়ে, কিন্তু তা ফরজ নয়।’

নিজ হাতে অতিথিদের আপ্যায়ন করা : সাহাবায়ে কেরাম মেহমানকে নিজ হাতে আপ্যায়ন করতেন। খাবার পরিবেশন করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫১৮৩)

খাবার পরিবেশনে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রাধান্য দেওয়া : খাবার পরিবেশনের সময় তুলনামূলক বয়স্কদের প্রাধান্য দেওয়া, এরপর ডান দিক থেকে পরিবেশন করাও সুন্নত। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো কওমকে পান করাতেন, তখন বলতেন, ‘বড় থেকে শুরু করো।’ (মুসনাদে আবি ইয়া‘লা)

মেহমানকে এগিয়ে দেওয়া : বিদায়ের সময় মেহমানকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়াও মেহমানদারির গুরুত্বপূর্ণ আদব। (ফাতহুল বারি : ৯/৫২৮)

মেহমানের আদব

আবুল লায়স সমরকন্দী বলেন, মেহমানের ওপর চারটি বিষয় রয়েছে—

প্রথমত, তাকে যেখানে বসানো হয়, সেখানেই বসবে।

দ্বিতীয়ত, মেজবান যা কিছু দেয়, তাতে সে সন্তুষ্ট থাকবে।

তৃতীয়ত, মেজবানের অনুমতি ছাড়া সে উঠবে না।

চতুর্থত, বিদায়ের সময় সে মেজবানের জন্য দোয়া করবে।

কোরআন-হাদিসে মেহমানের পালনীয় আরো কিছু আদব পাওয়া যায়—

খাবার শেষ হলে সেখানে আর দেরি না করা। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৩)

দাওয়াতের বাইরে অতিরিক্ত কোনো মেহমান সঙ্গে এলে মেজবানের অনুমতি নেওয়া। (বুখারি, হাদিস : ৫৪৩৪)

মন্তব্য

মুসলমানের জীবনযাপনে শালীনতা

আলেমা হাবিবা আক্তার
আলেমা হাবিবা আক্তার
শেয়ার
মুসলমানের জীবনযাপনে শালীনতা

আরবিতে ‘হায়া’ অর্থ লজ্জা বা সংকোচ বোধ করা, ইতস্তত বোধ করা ইত্যাদি। সহজভাবে বলা যায়, লজ্জা হচ্ছে এক ধরনের মানবীয় অনুভূতি, যা মানুষকে মন্দ কাজে বাধা দেয় এবং জনসমক্ষে সম্মানহানির ভয় সৃষ্টি করে। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘হায়া’ অর্থ শরম, বৃষ্টি, তরতাজা ইত্যাদি, যা ‘হায়াত’ শব্দমূল থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ হলো ‘জীবন’।

আর ‘হায়াত’ বললে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনকে বোঝানো হয়। অতএব, যার হায়া অর্থাৎ লজ্জা নেই, সে দুনিয়ায় মৃত এবং আখিরাতে হতভাগ্য।...অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতা করার সময় তাঁকে লজ্জা করে, আখিরাতে সাক্ষাৎকালে আল্লাহ তাকে শাস্তিদানে লজ্জা বোধ করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অবাধ্যতায় লজ্জা বোধ করে না, আল্লাহ তাকে শাস্তিদানে লজ্জা বোধ করবেন না।

(ইবনুল কাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফি লিমান সাআলা আনিদ দাওয়াইশ শাফি, পৃষ্ঠা-৬৯)

আরো পড়ুন
আজ থেকে ব্যাংক লেনদেন ১০-৪টা

আজ থেকে ব্যাংক লেনদেন ১০-৪টা

 

 

ইসলামে লজ্জা ও শালীনতার গুরুত্ব

ইসলামের দৃষ্টিতে লজ্জা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যেমন—

১. লজ্জা ঈমানের অংশ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫১)

২. আল্লাহর গুণ : লজ্জা মহান আল্লাহর গুণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীল, লজ্জাশীল।

তিনি লজ্জা ও শালীনতা পছন্দ করেন। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪০৬)

৩. নবী-রাসুলদের গুণ : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মুসা (আ.) ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল একজন ব্যক্তি। অধিক লজ্জার কারণে তাঁর শরীরের সামান্য ত্বকও দেখা যায়নি। (বুখারি, হাদিস : ৩৪০৪)

৪. লজ্জা কল্যাণের বাহক : মহানবী (সা.) বলেছেন, লজ্জা-শালীনতার পুরোটাই কল্যাণ। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৭৯৬)

৫. লজ্জা জান্নাত লাভের মাধ্যম : লজ্জা ঈমানের অঙ্গ, আর ঈমানদারদের স্থান জান্নাত।

অন্যদিকে নির্লজ্জতা দুশ্চরিত্রের অঙ্গ, আর দুশ্চরিত্রের স্থান জাহান্নাম। (তিরমিজি, হাদিস : ২০০৯)

৬. লজ্জা ইসলামের চরিত্র : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিটি ধর্মের একটা চরিত্র আছে, আর ইসলামের মূল চরিত্র হলো লজ্জাশীলতা।
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৮১)

আরো পড়ুন
মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জন্মদিন আজ

মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জন্মদিন আজ

 

জীবনযাপনে লজ্জার প্রয়োগ
১. স্বভাবজাত লজ্জা রক্ষা : আল্লাহ সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে লজ্জা ও শালীনতার বোধ রেখেছেন। মুমিনের উচিত তা রক্ষা করা। এ জন্য নবীজি (সা.) কারো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতেন না, তিনি খোলা স্থানে গোসল করতেন না। পাপকাজে সংকোচ বোধ করা স্বভাবজাত লজ্জার একটি দিক। তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
২. একান্ত ব্যক্তিগত জীবনে শালীনতা : একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও মুমিন লজ্জা ও শালীনতা রক্ষা করবে। যেমন—আয়েশা (রা.) বলেছেন, আমি ও রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো পরস্পরের লজ্জাস্থান দেখিনি।

৩. কথা ও কাজে শালীনতা রক্ষা করা : মুমিন তার কথা ও কাজে লজ্জা ও শালীনতা রক্ষা করে চলবে। কেননা লজ্জা ও শালীনতা না থাকলে ব্যক্তি যেকোনো অন্যায় কাজও করে ফেলতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তুমি নির্লজ্জ হয়ে পড়বে, তখন যা ইচ্ছা তা-ই করো।
(বুখারি, হাদিস : ৬১২০)

আরো পড়ুন
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ফ্ল্যাট নিয়ে টিউলিপের মিথ্যাচারের অভিযোগ

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে ফ্ল্যাট নিয়ে টিউলিপের মিথ্যাচারের অভিযোগ

 

৪. পোশাক-আশাকে শালীনতা রক্ষা করা : নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক পরা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ পোশাককে লজ্জা নিবারণের মাধ্যম বানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বনি আদম! তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদের পোশাক দিয়েছি। আর তাকওয়ার পোশাক, এটাই সর্বোৎকৃষ্ট।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ২৬)

৫. সমাজ থেকে অশ্লীলতা দূর করা : সামাজিক জীবন থেকে অশ্লীলতা দূর করা না গেলে শালীন জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

আল্লাহ সবাইকে সুমতি দান করুন। আমিন।

মন্তব্য

আজকের নামাজের সময়সূচি, ৬ এপ্রিল ২০২৫

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
আজকের নামাজের সময়সূচি, ৬ এপ্রিল ২০২৫

আজ শনিবার ৬ এপ্রিল ২০২৫, ২৩ চৈত্র ১৪৩১, ০৬ শাওয়াল ১৪৪৬

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু- ১২টা ৫ মিনিট। 

আসরের সময় শুরু - ৪টা ২৯ মিনিট।

মাগরিব- ৬টা ২০ মিনিট।

এশার সময় শুরু - ৭টা ৩৫ মিনিট।

আগামীকাল ফজর শুরু - ৪টা ৩১ মিনিট।

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত - ৬টা ১৬ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয়- ৫টা ৪৭ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য
প্রশ্ন-উত্তর

বদলি হজ করলে কি নিজের ফরজ হজ আদায় হয়?

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
শেয়ার
বদলি হজ করলে কি নিজের ফরজ হজ আদায় হয়?
প্রতীকী ছবি

প্রশ্ন : নিজের ওপর হজ ফরজ থাকলে বদলি হজ আদায় হবে কি?

-মুনির, গুলশান, ঢাকা

উত্তর : যাঁর ওপর হজ ফরজ—এমন ব্যক্তি নিজের হজ আদায় না করে অন্যের বদলি হজ করলে তা আদায় হলেও মাকরুহে তাহরিমি বলে বিবেচিত হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৪/২৫, আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/৫১২)।

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ