• ই-পেপার

বিশ্বখ্যাত ইসলামী অর্থনীতিবিদ ড. উমর চাপড়ার ইন্তেকাল

যেসব কারণে মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেসব কারণে মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে
সংগৃহীত ছবি

মানুষ স্বভাবগতভাবে দুর্বল। মহান আল্লাহ তাকে বিবেক, জ্ঞান ও সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছেন, আবার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনাও রেখেছেন। ফলে জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। গুনাহ বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যকার সম্পর্ক দুর্বল করে আখেরাতের সফলতাকে বিপন্ন করে তোলে। তাই পাপের কারণগুলো জানা এবং সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

১. ঈমানের দুর্বলতা : পাপের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ঈমানের দুর্বলতা। যখন মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভয় ও জবাবদিহির অনুভূতি কমে যায়, তখন সে সহজেই পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারো অন্তরে যদি এই অনুভূতি জাগ্রত থাকে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেওয়া হবে, তাহলে পাপ করার আগে সে বহুবার চিন্তা করবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে (পূর্ণ) ঈমানদার থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮২)

অর্থাৎ ঈমান যত শক্তিশালী হবে, পাপ থেকে দূরে থাকা তত সহজ হবে। ঈমান দুর্বল হলেই পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

২. শয়তানের কুমন্ত্রণা : মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান। আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে লিপ্ত। শয়তান সাধারণত মানুষকে বড় পাপের দিকে সরাসরি আহ্বান করে না। প্রথমে সে ছোটোখাটো অবাধ্যতাকে তুচ্ছ ও স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, এরপর পর্যায়ক্রমে বড় পাপে জড়িয়ে ফেলে। শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে জেনে রাখুক, শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২১)
মুমিনের কর্তব্য হলো শয়তানের প্রতিটি কুমন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা।

৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ : মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে বিভিন্ন কামনা-বাসনা ও ভোগবিলাসের দিকে আহ্বান করে। ইসলামে বৈধ চাহিদা পূরণের সুযোগ থাকলেও অবাধ প্রবৃত্তির অনুসরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কেউ যখন আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছা, আবেগ ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তখনই গুনাহের জন্ম হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা : সাদ, আয়াত : ২৬)
তাই কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে শরয়ি নির্দেশনার আলোকে নিজের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। 

৪. অসৎ সঙ্গ ও পরিবেশ : মানুষ তার সঙ্গ ও পরিবেশ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। ভালো মানুষের সাহচর্য যেমন নেক আমল, আল্লাহভীতি ও সৎ চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, তেমনি অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, সুতরাং সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা লক্ষ্য করা উচিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৮)

অশ্লীল সংস্কৃতি, অনৈতিক বিনোদন এবং পাপকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনকারী পরিবেশও মানুষকে পাপের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাই পাপ থেকে বাঁচতে হলে সৎসঙ্গ গ্রহণ এবং পাপের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

৫. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব : দ্বীনি জ্ঞানের অভাব গুনাহের একটি বড় কারণ। অনেক মানুষ জানেই না কোন কাজ হালাল আর কোনটি হারাম। আবার কেউ কেউ পাপের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে সহজেই গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। এজন্যই আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)
পাপ থেকে বাঁচতে হলে তাই জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।

৬. দুনিয়ার মোহ : পার্থিব জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে গুনাহে নিমজ্জিত করে। যখন পার্থিব সম্পদ অর্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন অনেকেই বৈধ-অবৈধের সীমারেখা অতিক্রম করে।
নবীজি (সা.) দুনিয়ার মোহ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের জন্য দুনিয়া উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন তোমরাও তাদের মতো এর জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, আর তা তোমাদেরও ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩১৫৮)

৭. তওবার প্রতি উদাসীনতা : মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর কাছে ফিরে না আসা এবং সংশোধনের চেষ্টা না করা তাকে আরো বেশি গুনাহের দিকে ধাবিত করে। তওবার প্রতি উদাসীনতা মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যেন সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
তাই কোনো কারণে পাপ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে অন্যান্য গুনাহ থেকেও বাঁচা যাবে। কারণ অনুতপ্ত হৃদয় খুব সহজে পুনর্বার পাপে জড়ায় না।

ইসলামের দৃষ্টিতে ফেক আইডি ব্যবহারের বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামের দৃষ্টিতে ফেক আইডি ব্যবহারের বিধান
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নানাবিধ নৈতিক ও ধর্মীয় চ্যালেঞ্জ। ফেসবুক, টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফরমে অনেকেই প্রকৃত পরিচয় গোপন করে ভিন্ন পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষ করে কোনো পুরুষ যদি নিজেকে নারী পরিচয়ে উপস্থাপন করেন বা নারীর নাম-পরিচয় ব্যবহার করেন, তবে তা শুধু একটি সাধারণ বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সত্যবাদিতা, আমানতদারির শিক্ষা।

ইসলাম মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য ও সততার শিক্ষা দেয়। একজন মুসলিমের পরিচয় হবে স্বচ্ছ, সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করে বিপরীত লিঙ্গের পরিচয় গ্রহণ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ধোঁকা, প্রতারণা ও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’(সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

যখন কোনো পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে নারীর নাম, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে, তখন সে মানুষের কাছে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে যা বাস্তবতার বিপরীত। যদিও সে সরাসরি মুখে মিথ্যা না বলুক, তথাপি তার পরিচয়ই মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যা কথা থেকে দূরে থাকো।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩০)
মুফাসসিরা বলেন, মিথ্যা কথা বলতে প্রত্যেক ধরনের অসত্য, প্রতারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও আচরণকে বোঝায়।

পুরুষ হয়ে নারী পরিচয় ব্যবহার করার অন্যতম বড় সমস্যা হলো এতে অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়। মানুষ তাকে নারী মনে করে যোগাযোগ করে, অথচ বাস্তবে সে পুরুষ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১)
এই হাদিসে প্রতারণার প্রতি অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। কারণ প্রতারণা মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসকে ধ্বংস করে দেয়।


মিথ্যাবাদীদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ
আল্লাহ তাআলা মিথ্যাবাদীদের প্রতি কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তাহলে আমি মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ নিক্ষেপ করব।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৬১)
যদিও এই আয়াত একটি বিশেষ ঘটনার প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছে, তবে এতে মিথ্যার ভয়াবহতা ও মিথ্যাবাদীদের প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা
ইসলামে পুরুষ ও নারীর স্বতন্ত্র পরিচয় সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই পুরুষদের প্রতি অভিশাপ করেছেন যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে এবং সেই নারীদের প্রতিও অভিশাপ করেছেন যারা পুরুষদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৮৫)
যদিও এই হাদিস মূলত পোশাক-পরিচ্ছদ ও বাহ্যিক সাদৃশ্যের ব্যাপারে এসেছে, তবুও এর দ্বারা বোঝা যায় যে ইচ্ছাকৃতভাবে বিপরীত লিঙ্গের পরিচয় ধারণ করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।

অতএব, একজন মুসলিমের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো তার সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একজন মুমিনের চরিত্র হবে বাস্তবজীবনের মতোই স্বচ্ছ, সৎ ও প্রতারণামুক্ত। তাই কোনো পুরুষের জন্য নারীর পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা, নারীর নাম ব্যবহার করে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা এমন কোনো পরিচয় গ্রহণ করা যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে— বৈধ নয়। কেননা এতে মিথ্যা, ধোঁকা ও বিশ্বাসভঙ্গের উপাদান বিদ্যমান থাকে, যা ইসলামে কঠোরভাবে নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও ইসলামী আদর্শের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

খেলাধুলায় কোনো দেশকে সমর্থন করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
খেলাধুলায় কোনো দেশকে সমর্থন করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

খেলাধুলা মানুষের বিনোদন, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানসিক প্রশান্তির একটি বৈধ মাধ্যম। যুগে যুগে মানুষ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসব করেছে এবং প্রিয় দল বা দেশের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-ফুটবল প্রতিযোগিতার সময় দেশ-সমর্থনের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তবে একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—খেলাধুলায় কোনো দেশ বা দলকে সমর্থন করা কি শরীয়তসম্মত? এটি কি বৈধ ভালোবাসা ও স্বাভাবিক আগ্রহের অন্তর্ভুক্ত, নাকি তা অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও গুনাহের পর্যায়ে পড়ে?

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং তা সঠিক নীতিমালার মধ্যে পরিচালিত করতে শিক্ষা দেয়। তাই খেলাধুলায় দেশ-সমর্থনের বিষয়টিও ইসলামের মূলনীতি, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডে বিচার করা প্রয়োজন।

ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলার বৈধতা
ইসলাম উপকারী ও কল্যাণকর খেলাধুলাকে বৈধ ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজি, কুস্তি ইত্যাদি উৎসাহিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
এ থেকে বোঝা যায়, শরীরচর্চা ও উপকারী খেলাধুলা ইসলামে প্রশংসনীয়।


দেশকে সমর্থন করার হুকুম
কোনো খেলায় একটি দেশকে সমর্থন করা মূলত নাজায়েজ নয়। কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক পছন্দ ও আবেগের বিষয়। কেউ নিজের জন্মভূমি, সংস্কৃতি কিংবা পছন্দের খেলোয়াড়ের কারণে একটি দলকে সমর্থন করতে পারে। তবে এই সমর্থন তখনই বৈধ থাকবে, যখন তা শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকবে এবং অন্ধ পক্ষপাতিত্বে পরিণত হবে না। কেননা ইসলাম অন্ধ দলীয় পক্ষপাতিত্ব নিষিদ্ধ করেছে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনরা! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)
এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে, কোনো ব্যক্তি, দল বা দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন আমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে।

আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৮)
অতএব, খেলার মাঠেও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার হারিয়ে ফেলা যাবে না।

কাফিরদের ধর্ম ও আদর্শের প্রতি ভালোবাসা নিষিদ্ধ
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি এমন কোনো সম্প্রদায় পাবেন না যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে অথচ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতাকারীদের প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করে।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ২২)
এ আয়াতের অর্থ হলো, একজন মুসলিম কাফিরদের কুফর, ইসলামবিরোধিতা বা আল্লাহ-রাসুলের বিরোধিতাকে ভালোবাসতে পারে না। তাই মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে বিধর্মীদের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত ঘৃণিত একটি কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের (অন্তরঙ্গ অভিভাবক ও আনুগত্যের কেন্দ্র হিসেবে) গ্রহণ কোরো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৫১

মুফাসসিররা ব্যাখ্যা করে, এখানে সাধারণ সৌহার্দ্য বা লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং এমন বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও সমর্থন নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা মুসলিম পরিচয় ও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও উত্তম আচরণ করেছেন; কিন্তু তাদের কুফর ও বাতিল বিশ্বাসকে কখনো সমর্থন করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা দ্বীনের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।’ (সুরা : মুমতাহিনাহ, আয়াত : ৮)

পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারে সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গোত্রবাদ বা অন্ধ পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২১)
আরেক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব পরিত্যাগ করো; এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৪)
সুতরাং কোনো দেশের সমর্থন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেলে যে, অন্যদের গালি দেওয়া, ঝগড়া করা, শত্রুতা সৃষ্টি করা বা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করা শুরু হয়, তাহলে তা হারাম বা অন্তত গুরুতরভাবে নিন্দনীয় হয়ে যায়।

খেলাধুলায় সমর্থনের ক্ষেত্রে মুসলিমের করণীয়
১. খেলাকে খেলাই মনে করা। খেলাকে জীবনের প্রধান বিষয় বানানো যাবে না। এটি বিনোদনের একটি মাধ্যম মাত্র।
২. ফরজ ইবাদত অবহেলা না করা। কোনো ম্যাচের কারণে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য দ্বীনি দায়িত্ব অবহেলা করা বৈধ নয়।
৩. গালি ও কটূক্তি পরিহার করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন গালি দেয় না এবং অভিশাপও দেয় না।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)
৪. ভ্রাতৃত্ব নষ্ট না করা। একটি খেলার কারণে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা বা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করা অত্যন্ত অনুচিত।
৫. জুয়া ও হারাম কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা। খেলার ফলাফল নিয়ে বাজি ধরা, জুয়া খেলা বা অর্থ লেনদেন করা স্পষ্ট হারাম।


অত্খএব, লাধুলায় কোনো দেশ বা দলকে সমর্থন করা নাজায়েজ বা অবৈধ কোনো বিষয় নয়। তবে তা হতে হবে সীমিত, শালীন এবং শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে। যদি সমর্থন অন্ধ পক্ষপাতিত্ব, গালিগালাজ, বিদ্বেষ, মারামারি, অহংকার, জুয়া কিংবা দ্বীনি দায়িত্ব অবহেলার কারণ হয়ে যায়, তাহলে তা গুনাহে পরিণত হবে।

একটি ম্যাচের ফলাফল কখনো মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা বা আল্লাহর আনুগত্যের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই একজন মুমিন খেলাকে বিনোদনের পর্যায়ে রাখবে, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব থেকে বেঁচে থাকবে এবং সর্বদা কোরআন-সুন্নাহর আদর্শকে নিজের আবেগের ওপর প্রাধান্য দেবে। তাহলেই তার আনন্দও হবে বৈধ, আর তার চরিত্রও থাকবে ইসলামের সৌন্দর্যে অলংকৃত।

ভুল হলে অনুতপ্ত হয়ে যে দোয়া পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ভুল হলে অনুতপ্ত হয়ে যে দোয়া পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষ ভুল করে, গুনাহে জড়িয়ে পড়ে—এটাই মানবজাতির স্বভাব। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলার অসীম দয়া ও অনুগ্রহের দরজা সব সময় খোলা। বান্দা যখন আন্তরিক অনুশোচনা নিয়ে নিজের পাপের জন্য লজ্জিত হয়, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং চোখের অশ্রুতে তাওবা করে, তখন আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।  তাই একজন মুমিনের উচিত তাওবার পর এমন দোয়া করা, যা তার হৃদয়কে পবিত্র করবে, ঈমানকে দৃঢ় করবে এবং তাকে পুনরায় গুনাহে ফিরে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে। তেমনি একটি দোয়া হলো-

 رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতমিম লানা নুরানা ওয়াগফির লানা ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির।’

অর্থ : হে আমাদের রব। আপনি আমাদের জ্যোতিতে পরিপূর্ণতা দান করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছুর ওপর শক্তিমান। (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৮)