মানবসমাজে অর্থনৈতিক শোষণের ইতিহাস যত পুরনো, সুদের (রিবা) ইতিহাসও ততটাই প্রাচীন। যুগে যুগে ক্ষমতাবান ও ধনীরা সুদের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। ঋণের বোঝা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, সমাজে সৃষ্টি করেছে বৈষম্য, শত্রুতা ও অবিচার। ইসলাম যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়, তখন আরব সমাজেও সুদের ভয়াবহ প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমনকি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার সম্পদ, পরিবার এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়ত।
এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলাম ধাপে ধাপে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটায়। কোরআনুল কারিম সুদকে শুধু একটি আর্থিক অপরাধই বলেনি; বরং এটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার সমতুল্য ভয়াবহ গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
জাহেলি যুগে সুদের প্রচলন
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে সবচেয়ে প্রচলিত সুদের ধরন ছিল ‘রিবা আন-নাসিয়াহ’। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো এবং সময় বাড়ানো হতো। তারা বলত, ‘ঋণ পরিশোধ কর, নতুবা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি কর।’ ফলে একজন দরিদ্র ব্যক্তি অল্প ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বহুগুণ ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হতো। এতে ধনীরা আরো ধনী এবং গরিবরা আরো দরিদ্র হয়ে পড়ত।
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ধাপসমূহ
ইসলাম মানুষের স্বভাব ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সুদ নিষিদ্ধ করেছে।
প্রথম ধাপ : সুদের অনৈতিকতা তুলে ধরা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার উদ্দেশ্যে যে সুদ দিয়ে থাক, তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৩৯)
এ আয়াতে সুদের নৈতিক অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ : পূর্ববর্তী জাতির ওপর সুদের কারণে শাস্তির কথা উল্লেখ
আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সুদ গ্রহণের কারণে (তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল), অথচ তাদেরকে তা থেকে নিষেধ করা হয়েছিল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৬১)
এখানে ইহুদিদের সুদখোরির কারণে আল্লাহর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় ধাপ : সুদের কঠোর নিন্দা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ কর না।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৩০)
এ আয়াতে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে।
চতুর্থ ধাপ : চূড়ান্ত ও পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
সুরা বাকারার শেষাংশে সুদ সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৮)
এরপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ‘যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৯)
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তাফসিরবিদদের মতে, বনু সাকীফ ও বনু মুগিরা গোত্রের মধ্যে সুদের লেনদেন ছিল। ইসলাম গ্রহণের পরও পূর্বের কিছু সুদের দাবি অবশিষ্ট ছিল। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সকল প্রকার বকেয়া সুদ বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘সাবধান! জাহেলি যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)
এরপর তিনি সর্বপ্রথম তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)-এর সমস্ত সুদ বাতিল ঘোষণা করেন, যাতে কেউ মনে না করে যে ইসলাম শুধু অন্যদের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে।
সুদ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী
১. সুদ সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের একটি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘...সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাক।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলে তিনি সুদ ভক্ষণকেও তার মধ্যে উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)
২. সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিশপ্ত
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সামাজিক পরিবর্তন
১. অর্থনৈতিক শোষণের অবসান : দরিদ্রদের ওপর ধনীদের অন্যায় আধিপত্য কমে যায় এবং ঋণের ফাঁদ থেকে মানুষ মুক্তি পেতে শুরু করে।
২. দান ও সদকার সংস্কৃতি বৃদ্ধি : সুদের পরিবর্তে ইসলাম ক্বারযে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ), যাকাত, সদকা ও ওয়াকফের ব্যবস্থা চালু করে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৬)
৩. সামাজিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা : সুদ মানুষকে স্বার্থপর করে, কিন্তু দান ও সহযোগিতা সমাজে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে।
৪. সম্পদের সুষম বণ্টন : সুদের মাধ্যমে সম্পদ ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়; ইসলাম ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে।
৫. ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : ইসলাম লাভের অধিকারকে ঝুঁকি ও পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাই ব্যবসা হালাল এবং সুদ হারাম।
সুতরাং সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। এটি শুধু একটি আর্থিক বিধান নয়; বরং মানবমর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মহান ঘোষণা। ইসলাম এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ধনী-গরিবের মধ্যে শোষণ নয়, বরং সহযোগিতা থাকবে; স্বার্থপরতা নয়, বরং মানবকল্যাণ হবে মূলনীতি।
আজও বিশ্বের বহু অর্থনৈতিক সংকট, ঋণদাসত্ব ও বৈষম্যের মূল কারণ সুদভিত্তিক ব্যবস্থা। তাই কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণকর সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুদের সকল প্রকার লেনদেন থেকে বেঁচে থাকার এবং হালাল উপার্জনের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




