রাজনীতিমুক্ত খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কি খুলনায় ছাত্রদল-শিবির আবারো মুখোমুখি অবস্থান নিতে যাচ্ছে এমন প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তখন খুলনায় ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছিল। তাহলে আবারো কি সেদিকেই যাচ্ছে খুলনার ছাত্র রাজনীতি? এমন প্রশ্নও তোলেন কেউ কেউ। যদিও প্রকাশ্যে না আসলেও শিবিরকে দায়ী করে বিএনপির দেওয়া বিবৃতি থেকে এটি স্পষ্ট হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী নগরীর শিববাড়ি মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রদল-যুবদল নেতাদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এ প্রশ্ন আরো ঘণীভূত হয়। কেননা বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা কুয়েটের ঘটনাটি সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের মধ্যে ঘটনা বলে উল্লেখ করার চেষ্টা করলেও ছাত্রদল, যুবদল এমনকি বিএনপি নেতারা এটি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্র শিবিরই মূলত: কুয়েটকে অশান্ত করছে। তবে কুয়েট যে একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সে সম্পর্কে কোনো বক্তব্য না দিয়ে সেখানে ছাত্রদলের সদস্য ফর্ম বিতরণের ঘটনাটি পাশ কাটিয়ে বিষয়টির দায়ভার শিবিরের ওপর চাপিয়ে পুরো বিষয়টিকে অন্যদিকে নেওয়া হচ্ছে কি না সেটি নিয়েও ভাবনার দাবি তুলেছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
আর এটি স্থায়ী হলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিতে পারে এমন মন্তব্যও অনেকের। যেটি ফ্যাসিবাদীদের হাসির খোরাক হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কুয়েটে মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় যে সংঘর্ষ, হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে তার সূত্রপাতটি হয়েছিল ছাত্রদলের ফেসবুক পেজের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘কুয়েটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য ফর্ম বিতরণ অনুষ্ঠান, উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের খুলনা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ টিমের টিম লিডার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হাবিবুল বাশার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ও সোহেল রানা’।
মূলত: ওই পোস্টের মাধ্যমে কুয়েটে ছাত্রদলের রাজনীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আর বিগত দেড় দশকের ছাত্র রাজনীতির নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে স্টিম রোলার চালানো হয় সেজন্যই ছাত্র রাজনীতির প্রতি ঘৃণা জন্মে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। যে কারণে ওই পোস্টের পর সোমবার রাতে তাৎক্ষণিক মিছিল করে কুয়েটকে রাজনীতিমুক্ত রাখার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি মঙ্গলবার দুপুরে কুয়েট ভিসির কাছে এ দাবি জানাতে মিছিল শুরু করে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু ওই মিছিলের সময়ই ছাত্রদলের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয় শিক্ষার্থীদের।
যার ফলে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দফায় দফায় চলে হামলা-পাল্টা হামলা।
এরপর রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে শিববাড়ি মোড়ে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও কেন সেখানে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়ো হলেন সেটি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলেন, শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সেখানে মিছিল করে চলে গেলে হয়তো কোনো জটিলতা থাকতোই না। কিন্তু সেখানে অপর পক্ষ গিয়ে অবস্থান নেওয়ার ফলে উভয় পক্ষ থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও যুবদল ও ছাত্রদল নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ময়লাপোতার দিকে চলেও যাচ্ছিল। কিন্তু হোটেল টাইগার গার্ডেনের সামনে গিয়ে কিছু সময় অবস্থান নেওয়ার একপর্যায়ে সেখানে একটি ককটেল বিস্ফোরণ হলে আবারো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় ককটেল হামলা তাদের লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে। আবার যুবদল-ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই ককটেল ফাটিয়েছে ছাত্ররাই। এর ফলে সেখানে আরো কিছু সময় উত্তেজনা চলে। আবার ছাত্রদের পক্ষ থেকে এটিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বলার চেষ্টা করা হলেও যুবদল-ছাত্রদলের অনেকেই বলেন, ওটা ছাত্রশিবিরের আন্দোলন।
মূলত : এমন মন্তব্য এবং সর্বশেষ বিএনপির বিবৃতি প্রমাণ করে খুলনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের মধ্যে আবারো বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিতে পারে। যদিও মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য বা বিবৃতি না পাওয়া গেলেও সকালে নগর শিবিরের সভাপতি আরাফাত হোসেন মিলন বলেছিলেন, ‘কুয়েটের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে অনেককে আহত করেছে বলে শুনেছি। আমরা হামলার নিন্দা ও জড়িতদের বিচার চাই।’
খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ইশতিয়াক আহমেদ ইশতি বলেন, ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের বাঁধা দেয়। পরে তাদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র ২/১ বছরের মাথায়ই খুলনায় সরকারি বিএল কলেজ কেন্দ্রিক ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। যার ফলে মাত্র দু’বছরের মধ্যে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হন। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের বিরোধ কিছুটা মুছে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না থাকলেও নিজেদের অবস্থান ধরতে গিয়ে আবারো প্রকাশ্য বিরোধে জড়াতে যাচ্ছে এ দু’টি ছাত্র সংগঠন।
ভিসির পদত্যাগ দাবি কেন? মঙ্গলবারের ঘটনার পর কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যে পাঁচ দফা দাবি করা হয় তার সর্বশেষ দাবি হলো, এ ঘটনার দায়ভার নিয়ে কুয়েটের ভিসি-প্রোভিসি এবং ছাত্র কল্যাণ পরিচালককে পদত্যাগ করতে হবে। ছাত্রদল-শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় কেন ভিসি-প্রোভিসিকে পদত্যাগ করতে হবে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, রাজনীতিমুক্ত কুয়েট ক্যাম্পাসে একটি দলের সদস্য ফর্ম কেন বিতরণের সুযোগ দেওয়া হলো? তাহলে কি ভিসির প্রশ্রয়েই ছাত্র রাজনীতি শুরু করতে চাচ্ছে ছাত্রদল? আর একটি দলকে রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হলে তারাও ভবিষ্যতে কি ফ্যাসিবাদের আচরণ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে? তার নিশ্চয়তা কোথায়? এমন নানা প্রশ্ন সামনে এনেই মূলত: ভিসিকে দায়ী করার চেষ্টা করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে এখনই এটিকে দমন না করা গেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলেও মন্তব্য করেন অনেকে।