নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরঘেঁষা গ্রামটির নাম ‘পঙ্কবিলা’। গ্রামটিতে ঢুকতে চোখে পড়ে গাছে গাছে ঝুলছে লাল টসটসে লিচু। গাছতলায় বসা একদল নারী-পুরুষ। তারা কেউ লিচু সংগ্রহ করছেন, কেউ বা সেগুলো বাছাই করছেন। প্রতিবছর এ গ্রাম থেকে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়।
গ্রামটি এখন অনেকের কাছে ‘লিচু গ্রাম’ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের দাবি, ব্রিটিশ আমল থেকে পঙ্কবিলায় লিচু চাষ হয়ে আসছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গ্রামের অধিকাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে তারা লিচু চাষের সঙ্গে যুক্ত।
চলতি মৌসুমে ভালো ফলন ও দাম পেয়ে খুশি চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, অনুকূল আবা হাওয়ার কারণে গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার গাছে গাছে লিচুর ফলন ভালো হয়েছে, বিষমুক্ত (অর্গানিক) হওয়ায় এলাকার লিচুর চাহিদা ও বেশি। পঙ্কবিলা গ্রামের এ লিচু স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, চট্টগ্রাম, ঢাকা সহ দেশের অন্তত ২০ জেলায়।
পঙ্কবিলা গ্রামের বাসিন্দা তুহিন খান বলেন, পূর্বে যে পরিমাণ লিচু হতো এখন সেই রকম লিচু হয় ন। তবে যা হয় সেটিও কম না। পঙ্কবিলার লিচু জেলার চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাগুলোতে বিক্রি হয়। মৌসুমে বাগনসহ লিচু গাছ কিনে নেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। গাছ চুক্তিতে বিক্রি হয় যায় লিচু। যারা পারিবারিকভাবে অল্প চাষ করেন তারা কেউ নিজেরা বিক্রি করেন। কেউবা পাইকারি দরে পিস হিসাবে বিক্রি করেন।
আক্তার খান নামে আরেক লিচু চাষি বলেন, চলতি মৌসুমে খুচরা বাজারে ১০০ টি লিচু ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর পাইকারি বাজারে প্রতি হাজার লিচু ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে গাছ গুলো থেকে লিচু পাড়া, সাজানো, আঁটি বাঁধা, গণনা করা। এসব কাজে পাইকারি ব্যবসায়ীরা নিজেরাই শ্রমিক নিয়ে আসেন। অল্প কিছু শ্রমিক স্থানীয়রা।
তিনি বলেন, প্রতিবছর এ গ্রাম থেকে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা হয়। লিচুর সাফল্য দেখে আশপাশের গ্রামের কৃষকরাও এখন লিচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
পঙ্গবিলা গ্রামের লাল টসটসে লিচুর বাগানের সুনাম দীর্ঘদিনের। এ গ্রামের লিচু কিনতে জেলা শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভিন্ন জেলার লিচু ব্যবসায়ীরা এখানে এসে লিচু কিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন।
খুলনা ফুলতলা থেকে আসা লিচু ব্যবসায়ী করিম শেখ বলেন, ‘প্রতিবছর পঙ্কবিলা এসে পাইকারি মূল্যে লিচু নিয়ে খুলনা বাজারে বিক্রি করি। আমরা বেশির ভাগ সময়ে গাছ যুক্তিতে লিচু কিনি। লিচুগুলো গাছে থাকে। আমরা বাজার দর ও সময় উপযোগী মনে করে লিচু তুলে বাজারে বিক্রি করি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে পঙ্কবিলা গ্রামে ৪২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ করা হয়েছে। এখানে দেশি জাতের পাশাপাশি বোম্বাই, মোজাফফর ও চায়না -৩ জাতের লিচু চাষ করেছেন চাষিরা।এ বছর ৪০০ শত মেট্রিক টন লিচু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
নড়াইল সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, সদর উপজেলার পঙ্কবিলা গ্রামে ৪২ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। যা থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকার লিচু বিক্রি করতে পারবেন ওই এলাকার লিচু চাষিরা। পঙ্কবিলা গ্রামের লিচু চাষের ফলন থেকে আশপাশের গ্রামের মানুষেরা লিচু চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। আমরা কৃষি বিভাগ থেকে লিচু চাষিদের খোঁজখবর নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।




