ফেনীর ছাগলনাইয়ার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসা ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন পুশ করার কারণে মনিকা আক্তার তিশা নামের এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
শুক্রবার (১২ জুন) সকালে ‘মানারাত হাসপাতাল’ নামের হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করে দেয়।
নিহতের স্বামী ওমান প্রবাসী করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার বাসিন্দা এবং নিহত তিশার ৫ বছরের এক কন্যাসন্তান রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ডা. আশিক এলাহী নামের এক চিকিৎসকের মাধ্যমে টনসিল অপারেশনের জন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু অপারেশনের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভুয়া ইনজেকশন দেওয়ার পরেই রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে এবং তিনি মারা যান।
নিহত রোগীর বোন বলেন, ‘বিকাল ৪টার দিকে আমার বোনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ডাক্তার আশিক এলাহীর মারফতে অপারেশন করানোর কথা ছিল। কিন্তু তারা আমার বোনকে একটা ভুয়া ইনজেকশন দেয়, যেটার কোনো মেয়াদ (ডেট) ছিল না। ইনজেকশন দেওয়ার পরই আমার বোন মারা যায়।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘বোন মারা যাওয়ার পর আমি যখন অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— রোগীর গাল আর পেট এভাবে ফুলে গেছে কেন? আপনাদের ইনজেকশনে তো কোনো ডেট নেই, এটা কেন দিলেন? তখন ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করে। এই মহিলা বেশি কথা বলে- বলে ডাক্তার আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। আমি এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং আমার বোন হত্যার বিচার চাই।’
নিহতের ভগ্নিপতি আলম জানান, ঈদের (কোরবানি) কয়েকদিন আগে টনসিলের সমস্যার কারণে প্রথমে তাকে ছাগলনাইয়ার এই হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তখন চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসার পরিবর্তে সরাসরি অপারেশনের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, ‘শ্যালিকা গতকালকে ফোন করে জানায় তার খাওয়া-দাওয়া করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তখন আমরা তাকে আবারও ছাগলনাইয়ার মানারাত হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেখানে ডা. আশিক এলাহী রোগীকে দেখে দ্রুত অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। আমি রোগীর অভিভাবক না হওয়ায় তার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আধা ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীকে ভর্তি করাই।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘অপারেশনের খরচের বিষয়ে ডাক্তারের চেম্বারে কথা বললে তারা ২৫ হাজার টাকা দাবি করে। আমি কিছুটা কম রাখার অনুরোধ করলে তারা ২ হাজার টাকা স্যাক্রিফাইস করে ২৩ হাজার টাকায় অপারেশন করতে রাজি হয়। কিন্তু টাকার লোভে পড়ে তারা এভাবে আমার শ্যালিকাকে ভুল চিকিৎসা আর মেয়াদোত্তীর্ণ ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অপারেশন থিয়েটারে রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুর শুরু করলে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পালিয়ে যান। পর ছাগলনাইয়া থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আবু তাহের কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাথমিক তদন্তে চিকিৎসার অবহেলা ও হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়ায় মানারাত হাসপাতালটির ওটি সাময়িকভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তাদের তদন্তের রিপোর্ট মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের এমডি জয়নাল আবেদীন কালের কণ্ঠকে জানান, রোগীটি বৃহস্পতিবার আমাদের এখানে নিয়ে এলে তাকে ভর্তি করা হয়। পরে জানতে পারি ওষুধের রিঅ্যাকশনজনিত কারণে তিনি মারা যান। এ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। শুক্রবার ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ একদল যুবক মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে হাসপাতালে এসে ভাঙচুর চালিয়ে তছনছ করে দেয়। বিষয়টি আমরা প্রশাসনকে অবহিত করেছি।
ছাগলনাইয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শাহিন মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, রোগীর মৃত্যুর পর আমরা ওনাকে ময়নাতদন্তের জন্য ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছি। হাসপাতাল ভাঙচুরের বিষয়টি রোগীর স্বজন না বহিরাগত এসব বিষয়ে আমরা তদন্ত করছি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে।