বন্যার হাত থেকে ফেনী জেলাকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে এক হাজার ৫৪২ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন প্রতিরোধে ২০১২ সালে মুহুরী-কহুয়া এফসিডিআই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছিল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় তা বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর প্রত্যেক উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ২৯ জনের মৃত্যু হয়।
প্রকল্প অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বিদ্যমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, একটি আধুনিক হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ, তিনটি নতুন রেগুলেটর এবং ২৭টি বিদ্যমান সেচ অবকাঠামোর পুনর্বাসন কাজ সম্পন্ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার কৃষিজমিসহ আনুমানিক ১৪ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে। এ ছাড়া বার্ষিক পৌনে চার লাখ টন অতিরিক্ত শস্য ও মৎস্য সম্পদ উৎপাদন বন্যার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে দুই হাজার ৩৭০ জন এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এদিকে, প্রকল্পটি অনুমোদনের খবর ফেনীতে পৌঁছালে বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল হোসেন এবং ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল এই জনদাবি পূরণ করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। আশা করি এ টেকসই বাঁধ নির্মাণের ফলে আমরা ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট বন্যা থেকে রক্ষা পাব।
ফেনীর জেলা প্রশাসক মনিরা হক কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পটি পাস হওয়ায় আমি অত্যন্ত খুশি। প্রকল্পটির বিষয়ে আমি এর আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে বারবার তাগাদাপত্র দিয়েছি। বিশেষ করে ২০২৪-এর বন্যা পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা যেন আর না হয়। যেহেতু জমি অধিগ্রহণের ঝামেলা নেই, তাই আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে পারব।
২০২৪ সালে ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা উজানের পানিতে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও আশপাশের জেলাগুলো ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ফেনীকে বন্যার হাত থেকে রক্ষার জন্য বারবার অর্থ বরাদ্দ দিলেও স্থায়ীভাবে কোনো সমাধান হয়নি। এ নিয়ে ফেনীর মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল।
জানা গেছে, ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং জেলার মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে ‘ফেনী জেলাধীন মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।