বিপদ থেকে মুক্ত হতে পারছে না সরকার। পাহাড়সম বোঝা নিয়ে সরকার গঠন করার পর একটার পর একটা বিপদে পড়ছে। কোনো কোনো বিপদ অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্ট। কোনো কোনো বিপদ প্রাকৃতিক। আবার কোনো বিপদ বৈশ্বিক। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১১ দিনের মাথায় শুরু হয় আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ। এ যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। ১৫ মার্চ থেকে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৩ শিশু। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের দ্রব্যমূলের ওপর প্রভাব পড়েছে। ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ে নাভিশ্বাস মানুষের। হামের মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে এবারের পরিস্থিতি। আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ। ছিনতাইকারীর হাতে পথেঘাটে খুন হচ্ছে মানুষ। সামাজিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে অস্থিরতা দেশজুড়ে। দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পুশইনের চেষ্টা করছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সবকিছু মিলে বিপদ যেন বাড়ছেই।
ভূরাজনীতির সংকট : বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন সংকট। একের পর এক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ধাক্কায় সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। একদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশছোঁয়া নিত্যপণ্যের বাজার, অন্যদিকে হাম ও ডেঙ্গুর মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি। অর্থনীতির চাকা সচল করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ। কোনোভাবেই এই ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। নতুন ঋণের জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকেও ঋণের সাড়া মিলছে না। সব মিলিয়ে আরও ঘনীভূত হচ্ছে সমস্যা।
দ্রব্যমূল্যের চরম কশাঘাত : আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। বাংলাদেশেও পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দামও। এর ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় চাল, ডাল, তেলসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বর্ধিত খরচের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ চরম বিপাকে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য মেলাতে না পেরে হিমশিম খাচ্ছে কোটি পরিবার।
স্বাস্থ্য খাতে জোড়া আঘাত- হাম ও ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি : অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই দেশে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়। ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে গতকাল পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে মারা গেছে ৬১৩ শিশু। সরকারি হিসাবে ৬১৩ শিশুর মৃত্যুর কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনায় অনাগ্রহের বলি হতে হচ্ছে অবুঝ শিশুদের। হামের এই ভয়াবহতার মধ্যেই নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার ডেঙ্গুর পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হাম ও ডেঙ্গুর এই জোড়া আক্রমণে অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এখানেই শেষ নয়, আছে আগাম ঝুঁকিও। অন্তঃসত্ত্বা অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই শিশুরা যে রোগের থাবায় ভুগবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।
সামাজিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি : অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসংকটের সমান্তরালে দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতা। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, যা সুশীল সমাজকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। শুধু শিশু ধর্ষণই নয়, নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এখন বিঘ্নিত। সড়ক-মহাসড়ক থেকে শুরু করে খোদ রাজধানীতে ছিনতাইকারীদের আনাগোনা ও সহিংসতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামান্য মোবাইল বা টাকার জন্য ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা সত্ত্বেও অপরাধীদের এই দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না।
সুখবর নেই অর্থনীতিতেও : আইএমএফের সঙ্গে চলমান ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তির সর্বশেষ দুই কিস্তিু ছাড় করছে না। বরং নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংকট সামলাতে এডিবির কাছেও ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা চেয়েছে সরকার। সেখানেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। একইভাবে আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যা মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটে প্রাক্কলনের চেয়েও ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতি অগগ্রতির বড় বাধা খেলাপি ঋণ : দুর্বল ঋণ আদায় ও সুশাসনের অভাবের মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাস পর ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। গত ডিসেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এই তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ব্যাপক পরিমাণ ঋণ পুনঃ তফসিলের ফলে গত বছরের শেষে খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৩১ শতাংশে নেমে এসেছিল।
সংকটে ব্যবসায়ীরা : ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারসংকট, জ্বালানিসংকট, নিরাপত্তাহীনতা, মামলা-হামলাসহ নানান রকম সংকটে থাকা ব্যবসায়ীরা এখন অসহায়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সহায়তা না পেয়ে শিল্পমালিকরা অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গড়ে তোলা শিল্পকারখানা নিয়ে এখন চরমভাবে শঙ্কিত, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলেছেন, নতুন করে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া নানা রকম সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বর্তমানে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট করা হয়েছে। ডলারসহ নানান সংকটে সবদিকে কেবলই শূন্যতা তৈরি করে রেখে গেছে শেখ হাসিনা সরকার। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। ছোট, মাঝারি ও বৃহৎ সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই কমবেশি এই সমস্যার প্রভাব অনুভব করছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনা, কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং লাভজনক অবস্থায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজধানী ও বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বিনিয়োগে অনীহা তৈরি হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থসংকটে বেশি ভুগছেন। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধি করলে তাঁরা সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।
পুশইনের চেষ্টা : দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় গত কয়েক দিন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) অপচেষ্টা ঠেকানোর কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে এ ধরনের সম্ভাব্য ‘পুশইন’ প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি গোয়েন্দা নজরদারিসহ টহল কার্যক্রম জোরদার করেছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাচ্ছে, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি যেকোনো পুশইন করার প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন



































