প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন, সদ্য ঘোষিত বাজেট তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গত বৃহস্পতিবার বিএনপি সরকার তার প্রথম বাজেটে জনগণের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করেছে। জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটেছে প্রস্তাবিত বাজেটে। নতুন সরকার ক্রান্তিকালে বাজেট পেশ করেছে এবং সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর প্রয়াস চালিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। দেশিবিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, সুষম উন্নয়ন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা-স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনজীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান বহুমাত্রিক সংকট কাটানোর যে রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে তা জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্য তেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হারে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ এবং প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সাধুবাদযোগ্য। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, এসব বাস্তবায়িত হলে শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে আরও এগিয়ে যাবে।
কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব যথোপযুক্ত। কৃষি খাত আমাদের অর্থনীতির অন্যতম জোগানদার। কৃষি ও কৃষকের জন্য যা কিছু কল্যাণকর সেগুলোর দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হয়েছে। ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্পকারখানায় উৎপাদনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে জোরালো আইনি সমন্বয়ের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাহসী বাজেট। এ বাজেটে যেমন ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ আছে, তেমনি স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টাও বিদ্যমান। এ বাজেটে সরকারের দেশপ্রেমের অনেক স্বাক্ষর রয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। বন্ধ কলকারখানা চালুসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু বাজেট পেশ করার পর অনেকেই এর বাস্তবায়নের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন।
সিপিডিসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে আরও বেশি কাজ করতে হবে। এ চ্যালেঞ্জটাই নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা’ ও ‘বাস্তবসম্মত ভিত্তির’ বড় ধরনের অভাব রয়েছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বাজেটে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাড়তি সম্পদ আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে হলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এক বছরের মধ্যে এ বিশাল রাজস্ব আদায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। যদি রাজস্ব আদায় কম হয় এবং সরকারি ব্যয় অপরিবর্তিত থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং তা পরিশোধের চাপ সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে, যেভাবে মাঠপর্যায়ে তদারকি করছেন সেটা যদি অব্যাহত রাখতে পারেন তাহলে এ বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের সরকারকে তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।
প্রথমত, কর আদায়ে জনগণকে সচেতন করা।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি বন্ধ করা।
তৃতীয়ত, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং অর্থ পাচার রোধ করা।
এই তিনটি কাজ করতে পারলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে না। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, বাজেট ঘোষণার পর সবাই বাজেটকে জনকল্যাণমুখী হিসেবে দেখছেন। সবার সংশয় এর বাস্তবায়ন সম্ভব কি না তা নিয়ে।
বাজেট রাজস্ব আদায়কেই সরকারের ব্যয় নির্বাহের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন না, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার অনেক কম। একটি বিশাল পরিমাণ জনগোষ্ঠী কর কাঠামোর বাইরে। এবারের বাজেটে কর নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সক্ষমতার অভাবের চেয়ে মানসিকতার অভাব বেশি বাধা। এবারের বাজেটে কর কাঠামোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ের জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। দেশের জনগণকে বোঝাতে হবে, এ দেশ তাদের। জনগণের করের টাকায় তাদের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করা হবে। কর প্রদানে অনীহা দূর করার জন্য সরকার সংসদ সদস্যদের কাজে লাগাতে পারে। তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় জনগণের কাছে গিয়ে তারা যদি কর প্রদানের যৌক্তিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তাহলে নাগরিকদের মানসিকতার পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যায়। একজন নাগরিক যদি বুঝতে পারেন, তার জীবন মানের উন্নয়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজে এ টাকা ব্যবহার করা হবে, তাহলে জনগণ কর দিতে উৎসাহিত হবে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন। জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করছেন। ইতোমধ্যে তাঁর ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস জন্মেছে। প্রধানমন্ত্রী যদি এ জনসচেতনতা সৃষ্টির কাজে নেতৃত্ব দেন তাহলে কাজটা অনেক সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করতে হবে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বাজেটের অন্তত ত্রিশ শতাংশ অর্থ দুর্নীতি ও অপচয় হয়। তাই এই দুর্নীতির ছিদ্র বন্ধ করতে হবে। এখন এ সংকটকালে সব ধরনের অপচয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। দেশের জনগণ যদি বুঝতে পারে তাদের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তাহলে তারা কর প্রদানে উৎসাহিত হবে। আশার কথা হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরই দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সরকারের অপচয় কমাতে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ব্যয় সংকোচ, বিনা কারণে বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করাসহ তারেক রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগ ব্যপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে দুর্নীতির রাহু থেকে বাংলাদেশ মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। আশাকরি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি প্রতিরোধে সাহসী পদক্ষেপ নেবেন। দেশের জনগণ এ বিষয়ে তাঁর পাশে থাকবে সবসময়।
তৃতীয়ত, অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে হবে যেকোনো মূল্যে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে (২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩ হাজার ৪০০ কোটি (২৩৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে, যা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। জাতীয় সংসদে দেওয়া সরকারি হিসাব এবং অর্থনীতি পুনর্গঠনে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। এই টাকা ফেরত আনতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি পাল্টে যাবে। আশার কথা এ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য এবারের বাজেটে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সরকারকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইউনূস সরকার তাঁর দেড় বছরের শাসনকালে এ পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
ইউনূস এবং তৎকালীন গভর্নর পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের নামে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিদেশে সফর করেছেন। রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করেছেন। ইউনূস সরকারের অনেকের বিরুদ্ধেও এখন দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আশা করি, বিএনপি বিগত সব আমলের অর্থ পাচার নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। নতুন করে যেন অর্থ পাচার না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে সরকারকে। সরকার যদি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে তেমনি দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। ব্যাংকিং খাতে ফিরবে শৃঙ্খলা এবং স্বস্তি। তাই আপাতদৃষ্টিতে এ বাজেট বাস্তবায়নকে যারা কঠিন এবং অবাস্তব মনে করছেন, তারা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং বিচক্ষণতাকে বিবেচনায় নিতে পারেননি। দেশের মানুষ আশাবাদী কারণ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে, তারেক রহমান আন্তরিক। তিনি পিতা ও মাতার মতোই জনকল্যাণে নিবেদিত। আপাতত দৃষ্টিতে কঠিন মনে হলেও এ বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব। সম্ভব অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন



































