• ই-পেপার

শব্দের চেয়ে কাজে ফিরুক বাংলাদেশ

পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট

প্রদীপ্ত মোবারক
পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ধারা হলো মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদরাসাগুলো ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। ফলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার আলোকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

তবে একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং বলাৎকারের একাধিক ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। গণমাধ্যম, আদালত এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে এমন বহু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব ঘটনা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয়; এগুলো ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কের প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, পথ প্রদর্শক ও আদর্শ নির্মাতা। সেই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধ সমাজে আরো গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা প্রয়োজন, যৌন নির্যাতন কোনো একক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নয়। সাধারণ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এতিমখানা, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র “মাদরাসার সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহিতার অভাব, নীরবতার সংস্কৃতি এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, মাদরাসাকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো কেন বিশেষভাবে আলোচিত হয়? এর অন্যতম কারণ হলো দেশের বহু মাদরাসা আবাসিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতিও সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়, সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে না।

বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার বিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায় যে, অধিকাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং পরিচিত, বিশ্বাসভাজন এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ বাস্তবতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শিশু সুরক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা জরুরি। প্রতিটি মাদরাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের জন্য যৌন নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন কাঠামো এবং প্রয়োজনে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নৈতিকতা, আচরণগত ইতিহাস এবং পেশাগত উপযুক্ততাও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা প্রতিষ্ঠান রক্ষার নামে গোপন করা যাবে না। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ অপরাধ আড়াল করা মানে অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে আরো শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

এখানে আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং মাদরাসা পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামসহ বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই শিশু নির্যাতন, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মের নামে অপরাধীকে রক্ষা করা বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে অপরাধকে আড়াল করা যাবে না, অন্যদিকে কয়েকজন অপরাধীর কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বা একটি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ।

পরিশেষে বলা যায়, মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক বিকাশের কথা বলে, সেখানে যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়। এই কলঙ্ক দূর করার একমাত্র পথ হলো সত্যকে স্বীকার করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা, শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার ভবন, পাঠ্যক্রম বা সুনামে নয়; বরং সেখানে অধ্যয়নরত প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্র একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান থাকে। এই চারটি উপাদান ছাড়া কোনো রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এই ক্ষমতার অন্যতম বাস্তব রূপ হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পুলিশকে রাষ্ট্রের “ভৌত ক্ষমতার একমাত্র বৈধ প্রয়োগকারী বাহিনী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন আইনগতভাবে বলপ্রয়োগের অধিকার রাখে না।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সংঘটিত দুটি দৃশ্যমান ঘটনা—একটিতে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে আক্রমণ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চিত্র, অন্যটিতে একটি জনসমাগমে পুলিশি যানবাহন ঘিরে ভাঙচুর ও আক্রমণাত্মক আচরণ—রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, আইন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলো শুধুমাত্র একটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যত্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও বৈধ ক্ষমতার উপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম ঘটনাটিতে দেখা যায়, নগর সড়কে দায়িত্ব পালনরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে কয়েকজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে আক্রমণ করছে। একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কর্তব্যরত অবস্থায় আঘাত করা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে আক্রমণের শামিল। কারণ পুলিশ ব্যক্তি হিসেবে সেখানে উপস্থিত নয়; সে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রয়োগ করছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচল নিয়মিত রাখা, এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে দেখা যায়, একটি এলাকায় পুলিশি যানবাহনকে ঘিরে জনসমাগম সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে উত্তেজিত জনতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতি কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, বরং রাষ্ট্রের চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেও অকার্যকর করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। কারণ পুলিশের যানবাহন রাষ্ট্রীয় শক্তির চলমান প্রতীক, যা আইন প্রয়োগের সরাসরি মাধ্যম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশেষ করে ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণা অনুসারে, রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাখে। এই “একচেটিয়া বলপ্রয়োগের অধিকার” (Monopoly of Legitimate Violence) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বলপ্রয়োগ শুরু করে বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বাহিনীর উপর আক্রমণ করে, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই দুটি ঘটনার আলোকে আমরা দেখতে পাই, পুলিশ কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রতিফলন। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন, শৃঙ্খলা এবং কর্তৃত্বের ওপর আঘাত। এই কারণে বিশ্বের সকল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই পুলিশকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণা আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই দিক বিবেচনা করতে হয়। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা, আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব মানে নিজের ভূখণ্ডে আইন প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা। পুলিশ এই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপ। যখন কোনো জনতা বা ব্যক্তি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে, তখন তা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইনের দৃষ্টিতে এই ধরনের আক্রমণ গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর ওপর আক্রমণ, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, তা হলো সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে। আইনকে বাধ্যতামূলক শাস্তির ভয় থেকে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মানা উচিত। কিন্তু যখন এই দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে তার বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয়। পুলিশ সেই বলপ্রয়োগের বৈধ বাহন।

ট্রাফিক পুলিশ একজন সাধারণ নাগরিকের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করছে না; বরং সকল নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ট্রাফিক নিয়ম না মানা হয়, তবে সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়, প্রাণহানি ঘটে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা আসলে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই।

দ্বিতীয় ঘটনায় দেখা ভিড় বা আক্রমণাত্মক আচরণ সমাজে এক ধরনের ভ্রান্ত বার্তা দেয় যে, আইন ভাঙা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্র যদি তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হারায়, তবে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না; সেটি বিশৃঙ্খল জনসমষ্টিতে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর—আইন, শৃঙ্খলা এবং বৈধ বলপ্রয়োগ। পুলিশ এই তিনটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে, প্রশাসন নীতি বাস্তবায়ন করে, আর পুলিশ মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করে। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া, পুলিশের ওপর আক্রমণ সমাজে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি আইন মানার প্রবণতা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ অপরাধীরা তখন মনে করে যে রাষ্ট্রের প্রয়োগ ক্ষমতা দুর্বল। ফলে ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।

তবে এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শুধু শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, সামাজিক ও আচরণগত বিশ্লেষণও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে জনঅসন্তোষ, ভুল বোঝাবুঝি, বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপর আক্রমণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো—সে তার নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে, আবার একই সঙ্গে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ। পুলিশ এই ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

উল্লেখিত দুটি ঘটনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধান বা লিখিত নথিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন সড়কে দাঁড়িয়ে নিয়ম বাস্তবায়ন করে, তখনই রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আবার সেই পুলিশ যদি আক্রমণের শিকার হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

অতএব, রাষ্ট্র, পুলিশ এবং জনগণ—এই তিনটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক। জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র অর্থহীন, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ অকার্যকর, আর পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের আইন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই এই তিনটির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, পুলিশের কাজে সহযোগিতা করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে কেবল একটি ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর আঘাত। তাই এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আইননিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন করা, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ : বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের রূপরেখা

ড. মোঃ মিজানুর রহমান
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ : বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের রূপরেখা
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ আজ এক গভীর পরিবেশগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়নের চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা-খরা-ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘনতা এবং বায়ুদূষণ এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। এমন প্রেক্ষাপটে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সরকারি উদ্যোগ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতীয় পরিবেশগত পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা।

আধুনিক বিশ্ব বর্তমানে এক অভিন্ন পরিবেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতা আরো কঠিন পরিবেশগত ঝুঁকিতে পড়বে। এই সংকট মোকাবিলায় বনভূমি একটি প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এখন বিশ্বের নীতি-নির্ধারকরা বনায়ন ও পুনর্বনায়নকে জলবায়ু কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের রিও আর্থ সামিট টেকসই উন্নয়নের ধারণাকে বৈশ্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো সনদ (UNFCCC), কিয়োটো প্রটোকল এবং ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রগুলোর দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-তেও বন সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে আজকের বিশ্বে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং বনায়ন কার্যক্রমকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চীন তার 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল' প্রকল্পের মাধ্যমে মরুকরণ রোধ ও বনায়ন সম্প্রসারণে সফল হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান গণভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক সবুজায়ন ঘটিয়েছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়া একদিনে শত কোটি গাছ লাগানোর মাধ্যমে বৈশ্বিক নজর কেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে সবুজ অর্থনীতির উদাহরণ তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে বৃহৎ বনায়ন কর্মসূচি বাস্তব ফল দিতে পারে।

বাংলাদেশের মোট ভূমির তুলনায় বন আচ্ছাদনের হার আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কম বলে পরিবেশবিদরা মনে করেন। সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, শালবন এবং উপকূলীয় বনাঞ্চল দেশের প্রধান সবুজ সম্পদ হলেও এগুলো ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যার চাপ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বনভূমি সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সবুজ স্থান কমে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য আরো দুর্বল হচ্ছে।

বাংলাদেশে বনায়নের ইতিহাসে সামাজিক বনায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। রাস্তার ধারে, বাঁধে ও সরকারি খাসজমিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অনেক নিম্নআয়ের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হয়েছে। উপকূলীয় বনায়ন ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। তবে এসব কর্মসূচির একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো রোপিত চারার টিকে থাকার হার তুলনামূলকভাবে কম।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বনসম্পদ বৃদ্ধি, উপকূলীয় সুরক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে আশির দশক থেকে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ কর্মসূচির মূল দর্শন ছিল বন সংরক্ষণকে কেবল সরকারি দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জনগণকে এর সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে রাস্তার ধারে, রেললাইনের পাশে, বাঁধের ওপর ও সরকারি খাসজমিতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।

বঙ্গোপসাগর উপকূলে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ লবণাক্ততা সহনশীল গাছ লাগিয়ে গড়ে ওঠা সবুজ বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঢেউয়ের গতি কমিয়ে জনপদকে আংশিক সুরক্ষা দিয়েছে। সিডর, আইলা, রোয়ান ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় এসব বনাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ভূমি গঠনে অবদান রেখেছে।

এই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রতি বছর গড়ে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি, নগর তাপমাত্রা হ্রাস, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি হতে পারে।

জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান, বৃক্ষমেলা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বৃক্ষরোপণ কেবল সরকারি উদ্যোগনির্ভর না করে ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে গাছ লাগাতে আগ্রহী করতে হবে। পরিবেশ সচেতনতার মাধ্যমে বাংলাদেশের বনায়ন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এই কর্মসূচির ফলে দেশের সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়বে। বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো নগর সমস্যার মোকাবিলায় এটি সহায়ক হবে। উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলজ ও বনজ গাছের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতেও এই কর্মসূচি অবদান রাখতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের মতো সীমিত ভূমির দেশে ২৫ কোটি গাছ কোথায় লাগানো হবে তা ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও এমন বহু এলাকা, যেমন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দুপাশ, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা, নদী ও খালের পাড়, বাঁধ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন অব্যবহৃত সরকারি জমি রয়েছে যেখানে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ সম্ভব। গ্রামীণ এলাকায় বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, কৃষিজমির আইল ও পতিত জমিতে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলের পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ শহরের পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাদবাগান, কমিউনিটি গার্ডেন ও নগর কৃষিকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।

এ উদ্যোগের সাফল্যে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ কোটি গাছ কেবল সরকারি উদ্যোগে রোপণ সম্ভব নয়। এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে, যেখানে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, যুবসমাজ, নারী সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। জনগণের মধ্যে চারা বিতরণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করলে প্রকল্পের ব্যাপ্তি ও গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পাবে।

তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে চারা রোপণের পর পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্পষ্ট না থাকায় অনেক এলাকায় গাছ টিকে থাকতে পারেনি। কোথাও কোথাও অবৈধ দখল, বন উজাড় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাও বনায়ন কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে অতীত অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে বলে যে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কত গাছ লাগানো হয়েছে তা নয়, বরং কত গাছ দীর্ঘমেয়াদে টিকে আছে এবং পরিবেশগতভাবে কতটা অবদান রাখছে, সেটিকেই প্রধান বিবেচনায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণ। জনগণ যদি বৃক্ষরোপণের সঙ্গে সরাসরি স্বার্থগতভাবে যুক্ত না হয়, তাহলে গাছ টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। তাই ব্যক্তিগত জমিতে গাছের মালিকানা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছেই থাকা উচিত এবং সরকারি জমিতে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে জনগণকে লাভের অংশীদার করা প্রয়োজন। এতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে।

অতীত অভিজ্ঞতা আরো দেখায় যে, বৃক্ষরোপণের প্রধান দুর্বলতা হলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। প্রথম কয়েক বছর সঠিক যত্ন না পেলে বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সেচ, বেড়া, পরিচর্যা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন জিও-ট্যাগিং ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি গাছ ট্র্যাক করা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে।

এই ধরনের বৃহৎ কর্মসূচিতে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি ও অনিয়মের ঝুঁকি। চারা সংগ্রহ, পরিবহন, বিতরণ ও রোপণের প্রতিটি ধাপে আর্থিক লেনদেন জড়িত থাকায় অতীতে নিম্নমানের চারা ক্রয়, অতিরিক্ত মূল্য প্রদর্শন, কাগজে-কলমে গাছ লাগানো দেখানো বা বাস্তবে অনুপস্থিত গাছকে হিসাবভুক্ত করার মতো অভিযোগ দেখা গেছে। ২৫ কোটি গাছের মতো বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এই ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। তাই শুরু থেকেই শক্তিশালী স্বচ্ছতা কাঠামো, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বড় কর্মসূচি একক কোনো সংস্থার পক্ষে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বন অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা ও কৃষি বিভাগ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এজন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো থাকা জরুরি, যা নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারা উৎপাদন, রোপণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণে বড় বাজেটের প্রয়োজন হবে। তবে এটিকে ব্যয় নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ পরিবেশগত ভারসাম্য, দুর্যোগ হ্রাস ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে বহুগুণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল দিতে সক্ষম। তবে অর্থায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহিতা। প্রতিটি গাছের তথ্য, অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। জিও-ট্যাগিং, অনলাইন ডাটাবেস এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট কাগুজে সাফল্য কমিয়ে বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নকে সহজ করবে। এতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সামাজিক পর্যবেক্ষণও বৃদ্ধি পাবে।

এই কর্মসূচির সাফল্যের জন্য সঠিক প্রজাতি নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর উপযোগিতা অনুযায়ী গাছ নির্বাচন করতে হবে—উপকূলে লবণসহিষ্ণু প্রজাতি, পাহাড়ে মাটি ধারণকারী প্রজাতি এবং শহরে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম গাছ উপযুক্ত। বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন। পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণকে কেবল আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত মালিকানার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে সামাজিক মালিকানা নিশ্চিত করা গেলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।

সবশেষে বলা যায়, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কেবল একটি পরিসংখ্যানগত লক্ষ্য নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই উদ্যোগ যদি পরিকল্পিতভাবে, স্বচ্ছভাবে এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি একটি সবুজ বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে। আর যদি কেবল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর সম্ভাবনা অপূর্ণই থেকে যাবে। প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন রোপিত প্রতিটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত আশ্রয় হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বর্তমান সরকার যা করতে পারে

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি: বর্তমান সরকার যা করতে পারে
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দোহাই দিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ ও রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় আমদানিতব্য দ্রব্যাদির উপর অযৌক্তিক হারে (১০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত) শুল্কারোপ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার খেয়ালখুশিমতো বিভিন্ন দেশের উপর আরোপিত এ শুল্ক আবার হ্রাস-বৃদ্ধিও করেন। যখন মনে করেন, কোনো দেশ তার প্রস্তাবিত শুল্কারোপে নতজানু হয়ে অনুকূল সাড়া দিচ্ছে না, তখন শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে চীনের রপ্তানির উপর ১৪৫ শতাংশ এবং ভারতের রপ্তানির উপর ১০০ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেন। ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকে জুলাই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকারপ্রাপ্ত ৬০টি দেশের ওপর শুল্কারোপের তাণ্ডব চলতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে  এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। গত ২ এপ্রিল ২০২৫ ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী  আদেশ নং- ১৪২৫৭ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যের উপর ৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
 
বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার পর এ  শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ৮.২ থেকে ৮.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য যা একক রাষ্ট্র হিসেবে সর্বোচ্চ রপ্তানি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে বার্ষিক আমদানি প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য, অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১.২বিলিয়ন মূল্যের সেবা রপ্তানি করে। তাছাড়া বাংলাদেশে আমেরিকার বৈদেশিক বিনিয়োগ একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্কারোপ। এর ফলে আমেরিকায় বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্কের পরিমাণ (২০ +১৫)= ৩৫ শতাংশ দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আহ্বান করলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ ৯টি দেশ আলাদা আলাদা এআরটি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) স্বাক্ষর করে। দেশগুলো হলো কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, ইকুয়েডর, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র এআরটি স্বাক্ষরিত হয়  ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ। এ চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে শুল্ক আরও ১ শতাংশ কমে  ১৯ শতাংশে স্থির হয়। 

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেশের সুশীল সমাজ, গবেষক, সাংবাদিক, থিংক ট্যাংক এ চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন যে, এটি একটি অসম বাণিজ্য চুক্তি, যা বাস্তবায়িত হলে আমেরিকা-যুক্তরাষ্ট্র বেশি লাভবান হবে, বাংলাদেশের লাভ হবে সামান্য। প্রথম আলোর বিশিষ্ট সাংবাদিক ও অর্থনীতিবিদ শওকত হোসেন ৪-৫ মে, ২০২৬ উক্ত কাগজে প্রকাশিত তার নিবন্ধে এ চুক্তি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের এ সম্পর্কীত নিবন্ধটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ৯ মে, ২০২৬ তারিখে। এর আগে লেখক  ও গবেষক কল্লোল মোস্তফার বিশ্লেষণ প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ২০-২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। অধ্যাপক এম এম আকাশের লেখা পর্যালোচনা দৈনিক বার্তায় প্রকাশিত হয় ১৩ মে, ২০২৬। এছাড়াও পত্রিকার পাতায় বিভিন্ন লেখকের বেশ ক’টি বিশ্লেষণ/অভিমত/আলোচনা পড়ে আমার মনে হয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের চিন্তা ও বিবেচনার জন্য কিছু লেখা প্রয়োজন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, অর্থাৎ দেশের ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রণীত খসড়া চুক্তিটি পাওয়ার পর সরকারের হাতে বেশ কয়েক মাস সময় ছিল। এ সময়ে পর্যাপ্ত হোম ওয়ার্ক অর্থাৎ স্টেক হোল্ডারস কনসালটেশন, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক কিংবা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা, ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ব্যবসায়ী বা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাউকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়নি। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চুক্তিটি পর্যালোচনা ও স্বাক্ষরিত হয়। সাবেক উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকগণ তাকে এ চুক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে, চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামাতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করেছে, যদিও জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে বলে দিয়েছে যে, তাদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আলোচনা করেনি।

অভিজ্ঞ মহলের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এমন একটি স্পর্শকাতর বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরে তাড়াহুড়ার কি প্রয়োজন ছিল? কয়েকদিন পরেই নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার আসবে জেনেও চুক্তিটি স্বাক্ষরে কিছুদিন বিলম্ব করা গেল না কেন? দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ ইত্যাদি বিবেচনায় যারা ভুক্তভোগী, উপকারভোগী কিংবা বাস্তবায়নকারী তাদের সঙ্গে কি চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে? চুক্তিটির বিষয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখারই বা কারণ কি? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আছে বলে মনে হয় না।

তাড়াহুড়া করে চুক্তি করায় জনমনে সন্দেহে দানা বেঁধেছে। যদিও চুক্তিটি যেকোনো পক্ষের ৬০ দিনের নোটিশে বাতিল করার শর্ত আছে, তথাপি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করা যেকোনো সরকারের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কয়েকটি বিদেশী সংস্থার সাথে আরও বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে, যেগুলোতে দরকষাকষি (নেগোসিয়েশন) হয়েছে সামান্যই। বিএনপি-জামাত উভয় দলই নির্বাচনের বিষয়ে এত বেশি আগ্রহী ছিল যে, তারা মুহম্মদ ইউনুস সরকারের কোনো কাজেই প্রশ্ন তোলেনি। নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে যায় এরূপ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে অন্তর্বর্তী সরকার এর বাস্তবায়নের দায় চাপিয়ে গেলেন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ঘাড়ে।

চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারার বিষয়াবলী নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হচ্ছে: 

৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে মাত্র ৬টি ধারায় অসংখ্য অনুচ্ছেদ রয়েছে। আবার চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তার উল্লেখ পরিশিষ্টে রয়েছে। পরিশিষ্টের সব সংযুক্তিই চুক্তির অংশ। এই পারস্পরিক বাণিজ্যিক চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর বাধ্যবাধকতাই বেশি, সে তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাধ্যবাধকতা খুবই কম। সাংবাদিক শওকত হোসেনের ভাষায় ‘বাংলাদেশকে মানতে হবে ১৩১ শর্ত, আর যুক্তরাষ্ট্রকে মানতে হবে মাত্র ৬টি শর্ত’। 

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক (১৬+৩৭=৫৩ শতাংশ) আরোপের কারণে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিকারক তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের হৈচৈ ও হা-হুতাশ বন্ধ করার জন্য যে চুক্তি করা হলো তার মাধ্যমে ৩৪ শতাংশ শুল্কে আমাদের তৈরি পোশাক আমেরিকার বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হলো। কিন্তু বিনিময়ে দেশের ১৮ কোটি মানুষের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯২২টি পণ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে শুল্কমুক্ত হবে এবং আগামী ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৭১৩২টি পণ্যের শুল্ক তুলে নিতে হবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ ১৬৩৮টি পণ্যে শুল্ক ছাড় সুবিধা পাবে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, এ শুল্ক ছাড়ের ফলে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৩২৭ কোটি টাকা শুল্ক হারাবে (সিপিডি), তবে উপরিউক্ত নির্ধারিত পণ্য ব্যতিত অন্যান্য পণ্যে বাংলাদেশ নির্ধারিত হারে শুল্ক বসাতে পারবে, যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বসাবে।

অশুল্ক বাধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ক ধারায় ১১টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। পরীক্ষা, মান যাচাই বা ব্র্যান্ড উল্লেখ ইত্যাদির অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার থেকে সনদপ্রাপ্ত হলে বাংলাদেশ কোনো অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের মান যাচাই চলবে না। চুক্তির শর্তানুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তা হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিভিত্তিক। বাংলাদেশ এমন কোনো স্বাস্থ্যবিধি বা মানদণ্ড দেবে না, যাতে মার্কিন পণ্য অন্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশ মেধাস্বত্বের সুরক্ষা দেবে, অর্থাৎ মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। মেধাস্বত্ব যাচাইয়ের জন্য শুল্ক স্টেশনে বাংলাদেশ যে ব্যবস্থা নেবে তা যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যাচাই করতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শ্রমিক ও ব্যবসা রক্ষায় সীমান্তে কোনো নিয়ম চালু করে, বাংলাদেশ সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিল রেখে কাজ করবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের রপ্তানিকারকদের কর ছাড় দেয়, বাংলাদেশ এর বিরোধিতা করবে না। বাংলাদেশ এমন ভ্যাট ধার্য করবে না যাতে যুক্তরাষ্ট্রের কম্পানির প্রতি বৈষম্য হয়।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামাফিক চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নিজের স্বার্থে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শুল্ক বা অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে চুক্তির এই ধারা অনুযায়ী সে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য যতই লাভজনক হোক বা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হোক, বাংলাদেশকে তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার তৃতীয় দেশের মালিকানাধীন কোনো কম্পানি বাংলাদেশ থেকে খুব কম দামে রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করলে বাংলাদেশ ব্যবস্থা নেবে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তথ্য দেবে। 

জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমনভাবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেবে যাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম বা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বাংলাদেশ নিজের আইনের সীমার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে, যাতে কেউ লেনদেনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি আইন ভঙ্গ করতে না পারে। বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের তথ্যও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদান করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। ‘ব্যবসা প্রয়োজনে’ বাংলাদেশের ডিজিটাল তথ্যের ডাটা অন্য দেশে বা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ধরনের বাধা দিতে পারবে না।

বাংলাদেশ তার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতকে এমনভাবে মার্কিন কম্পানির জন্য উন্মুক্ত করবে, যাতে মার্কিন কম্পানি বাংলাদেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি কেবল অনুসন্ধান, উত্তোলন, শোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবহন ও বিতরণই করতে পারবে না, মার্কিন কম্পানি সেটা ইচ্ছামাফিক রপ্তানিও  করতে পারবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন কম্পানির সঙ্গে কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্র লিখিতভাবে চাইলে বাংলাদেশ ভর্তুকি সংক্রান্ত তথ্য দেবে। এ ধরনের ভর্তুকি বা সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অসাম্য তৈরি হলে বাংলাদেশ তা কমাতে পদক্ষেপ নেবে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি ব্যতিত ভর্তুকি দেওয়া যাবে না।

অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কীত ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিদেশ থেকে কী কী বিনিয়োগ, কী কী শর্তে আসছে তার তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা করবে। যদি তারা মনে করে বাংলাদেশে আসা প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাহলে সেই বিনিয়োগ বন্ধ করার জন্য চাপ দিতে পারবে। 

বাংলাদেশ অবাজার (নন মার্কেট) অর্থনীতির কোনো দেশের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না। অবাজার অর্থনীতির দেশ বলতে চীন, রাশিয়া ও ভিয়েতনামকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এসব দেশের সঙ্গে কোনো ধরনের নতুন বাণিজ্য চুক্তি করা থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে। 

আরো বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর ও জোরদার করবে। প্রকারান্তরে সাময়িক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী করে তোলা হয়েছে। 

পারমানবিক প্রযুক্তি ব্যবহারে কতিপয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। মার্কিন স্বার্থকে হুমকীর মুখে ফেলে এমন কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ নতুন করে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার চুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি নতুন করে কোনো পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই করতে হবে। তবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র চুক্তি এর বাইরে থাকবে।

দ্রব্যাদি ক্রয় বিক্রয়ের জন্য বীমা করার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রিইন্সুরেন্স প্রথা তুলে নিতে হবে। ফলে মার্কিন বীমা কম্পানিগুলোকে তাদের অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যবসা সাধারণ বীমা করপোরেশনকে দিতে হবে না।
 
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রপ্তানি মূল্যের চেয়ে আমদানি মূল্য কম। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি থাকে। সেজন্য এ চুক্তি অনুযায়ীই বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে আরো বেশি আমদানি করতে হবে। এখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন কিংবা মূল্য কিছুই বিবেচ্য নয়। আমরা ভারত কিংবা চীন থেকে যত আমদানি করি তার প্রায় এক দশমাংশ রপ্তানি করি। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের জন্য আমরা ভারত ও চীনকে অধিক আমদানির জন্য বাধ্য করতে পারি না। চুক্তির শর্তানুযায়ী, কিছু পণ্য আমাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রায় বিনা শুল্কে আমদানি করতে হবে। যেমন- মাছ, হাঁস-মুরগি, ডিম, মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত কয়েকশ পণ্য। এগুলো আমাদের দেশেই উৎপন্ন হয়। এসবের উৎপাদনে দেশে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করপোরেট গোষ্ঠীর ব্যবসা নিশ্চিত করার জন্য এগুলো আমাদের বাধ্যতামূলক আমদানি করতে হবে, যাতে দেশে বহু মানুষের কর্মসংস্থান বিপন্ন হবে। এসব আমদানিতে পণ্যের মান যাচাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড সেফটি অ্যান্ড ইনসপেকশন সার্ভিসের সার্টিফিকেটই মেনে নিতে হবে। বাংলাদেশ যদি হালাল সনদ বাধ্যতামূলক করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সনদদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শর্ত পূরণ করবে, তাদের হালাল সনদ বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে। বার্ড ফ্লু ধরা পড়লে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো অঙ্গরাজ্য থেকে পোলট্রি, ডিম বা সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। নিষেধাজ্ঞা শুধু আক্রান্ত এলাকার ১০ কিলোমিটার জোনে সীমিত রাখতে হবে।
 
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের ঔষধ শিল্প বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা প্রথম আলোতে ২২ এপ্রিল, ২০২৬ প্রকাশিত মাহা মির্জার বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়। আইপি আইনের বাধ্যবাধকতা, বন্দরে ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট, আমেরিকা থেকে অবাধে ঔষধ আমদানি আমাদের ঔষধ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অথচ এলডিসি হওয়ার কারণে আমাদের ঔষধ কম্পানিগুলো এতদিন ঔষধ কাঁচামাল ক্রয়ে ব্র্যান্ডগুলোকে পেটেন্ট ফি দিতে হতো না। এ সুবিধা আমাদের ঔষধ কম্পানীগুলোর ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ভোগ করার কথা থাকলেও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে পেটেন্ট ফি দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি পূরণের জন্য বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে কতিপয় পণ্য ক্রয় করতে হবে। যথা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিবছর ৭ লাখ মেট্রিকটন গম, ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন, ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের তুলা কিনতে হবে। এছাড়া কিনতে হবে ১৪টি বোয়িং বিমান, ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি।

এ যাবৎ বাংলাদেশ তুলা, সয়াবিন, গম, এলএনজি প্রতিযোগিতামূলক দরে যেখানে অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায় সেখান থেকে কিনত। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে সেগুলো কিনতে হবে, যদিও গম, সয়াবিন প্রভুতি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র গুণগত মানের দিক দিয়ে উঁচু মানের যুক্তি দেখাচ্ছে।

চুক্তি কার্যকর করার জন্য দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে লিখিতভাবে জানালে ৬০ দিন পর চুক্তি চালু হবে। আবার যেকোনো পক্ষ ৬০ দিনের নোটিশ দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারবে।

বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে এ যাবৎ যে ৯টি দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভাষা সর্বাধিক কঠোর, আধিপত্যপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক শর্তাদিযুক্ত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূল, তথা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। চুক্তিপত্রে কেবল আমদানি পণ্যের শুল্ক নয় বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণকাঠামো ঢেলে সাজানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যকে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দিলে এমএফএন নীতির কারণে অন্য দেশগুলোকে একই সুবিধা দিতে হতে পারে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ রুদ্ধ হতে পারে। প্রয়োজন থাকুক আর নাই থাকুক ‘খাদ্য নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, পোলট্রি ও ডেইরি পণ্য আমদানি করতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তার অজুহাতে তেল ও এলএনজি আমদানি করতে হবে। অতিরিক্ত সংখ্যক বিমান চালানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের চুক্তি করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অপেক্ষাকৃত কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজনের কারণেই তাদের আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনে। এটি তাদের কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। বাংলাদেশ থেকে না কিনলে অন্য কোনো দেশ থেকে তাদের এসব সামগ্রী ক্রয় করতে হবে। বাণিজ্য সমতা আনার অজুহাতে বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয়ের তালিকায় যেসব দ্রব্যাদি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেসব এ যাবৎ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ীমূল্যে ক্রয় করে আসছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের যে পাল্টা শুল্কের কারণে অতি দ্রুততার সঙ্গে বাংলাদেশ এ চুক্তিতে রাজি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ আদালত দুই দফায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক বাতিল করেছে। ফলে চুক্তির তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে গেছে। এ চুক্তির দরকষাকষি ও স্বাক্ষরের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ পক্ষের অন্যতম ব্যক্তি সাবেক বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জাতীয় নির্বাচনের পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘হয়তো এ চুক্তি বাতিল হতে পারে।’ নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার এ চুক্তি মানবে কি না, এ বিষয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতিহারে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মূলনীতির কথা বলা হয়েছে। ‘পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।’
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন ধারায় যেভাবে আমাদের সার্বভৌমত্ব জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি রয়েছে এবং

বাংলাদেশের জন্য অসমতা, অন্যায্যতা এবং অসম্মানজনক ধারা রয়েছে তা বিএনপির রাষ্ট্রনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি নির্বাচনের ৩ দিন পূর্বে এটি স্বাক্ষর না করত, তবে রাজনৈতিক সরকার চুক্তির বর্তমান অবস্থায় এটি স্বাক্ষর করত কিনা সন্দেহ রয়েছে। কোনো জবাবদিহিমূলক সরকার জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে না।

বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। এটি মন্ত্রিসভা অনুসমর্থন করার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে জানানো হলে একটি নির্দিষ্ট তারিখ থেকে চুক্তিটি কার্যকর হবে। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার পূর্বেই অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকার এর বাস্তবায়ন শুরু করেছে। গম আমদানির চুক্তি হয়েছে ২০২৫ সালের ২০ জুলাই। প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন করে ৫ বছর গম কিনতে হবে। বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান আমদানির চুক্তি হয়েছে ৩০ এপ্রিল ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি আমদানির চুক্তি হয়েছে ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি কিনবে। আরো আমদানি চুক্তি পাইপলাইনে আছে বলে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া মে’ ২০২৬ মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন।

এমতাবস্থায় এ অসম এবং বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী চুক্তি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে সরকার যদি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন বা বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে চুক্তিটি পর্যালোচনা করে অনুসমর্থনের পূর্বেই সংশোধনের পদক্ষেপ নেয় এবং উভয়পক্ষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও লাভজনক একটি চুক্তিতে উপনীত হতে পারে তবে দেশ ও সরকারের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে। কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের সঙ্গে জোটভুক্ত না হয়ে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোর মোট আমদানি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র যে রপ্তানি সুবিধা চাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো তা চাইলে বাংলাদেশকে অনুরূপ সুবিধা দিতে হবে। ব্যবসা বাণিজ্য ও সামরিক ক্ষেত্রে কোন বিশেষ দেশের সঙ্গে বিশেষ চুক্তি করা হলে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি চুক্তির শর্তাদি পরিবর্তন  করতে নমনীয় না হয়, তবে চুক্তি বাতিলের পথে এগুতে হবে।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত