• ই-পেপার

দ্রুততম রায়ের নজির

  • কার্যকরেও সৃষ্টি হোক দৃষ্টান্ত

স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামের উচ্চবৈষম্য নিরসনের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামের উচ্চবৈষম্য নিরসনের কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্রকে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা যেন চিরকাল অধরা। জটিল নয়, সরলীকরণ করেও যদি বলা হয়, নিতান্তই ব্রাত্য দেশের স্বাস্থ্য খাত। যুগের পর যুগ নিজেই আক্রান্ত জটিল ও দুরারোগ্য রোগে। কখনো পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হয়নি। বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র পদে পদে। শহুরে ও গ্রাম্য স্বাস্থ্য কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য দূর হয়নি আজও। স্বাস্থ্যের নাজুক দশা কাটাতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের চোখে ‘স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার’। এই নীতিকে রাজনৈতিক বয়ানে নয়, বাস্তবে রূপ দিয়ে একটি উন্নত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতি গ্রহণ করেছেন।

শহরের চেয়ে গ্রামে জনসংখ্যার হার বেশি। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের বসবাস করে ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ আর গ্রামে ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সংখ্যার দিক দিয়ে গ্রামে বসবাস করে ১১ কোটি ৬১ লাখ মানুষ। আর শহরে ৫ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও দেশের মোট চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই শহর এলাকায় সেবা দেন। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নিদারুণভাবে। 

গ্রাম ও শহরের এই স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করতে সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও। যেখানে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। অভিজাত শ্রেণি আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারিভাবে সমান স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ফিরবে সেবার সমতা। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানায় সরকার। 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বেশ মনোযোগী সরকারপ্রধান তারেক রহমান গত মাসে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে বলেন, ‘দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এই মানুষগুলোর দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা চালাবে।’

দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় রকমের মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন ফিরিয়ে এনে তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর সেবাপ্রাপ্তি সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে বড় রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সরকার এ ক্ষেত্রে সমস্যার গোড়ায় নজর দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো নিজেই নানা সংকটে ভারাক্রান্ত। শয্যা সংকটে গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসাসেবা। জনবল ও সরঞ্জাম সংকটেও সুফল পাচ্ছে না রোগীরা। সব রকমের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ধার-কর্য করে টাকার বিনিময়ে উপজেলা পর্যায়েও দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পেতে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন রোগীরা।

কোন কোন ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছে না মোটেও। যাদের সাধ্য নেই তাঁরাই বাধ্য হয়েই কোনোমতে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব হাসপাতালের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই। জনস্বার্থে এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে সরকার একটি বিস্তৃত, সুচিন্তিত এবং সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সর বিদ্যমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে গ্রাম শহরের স্বাস্থ্য বৈষম্য নিরসন করতে এরই মধ্যে ৫০ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দিয়েছেন। এরইমধ্যে আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এতে করে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ৫টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করার কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে নারীদের জন্য ১ হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে ছক কষে এগোচ্ছে সরকার। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এখন থেকে সব মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবেন তাদের প্রয়োজন অনুসারে, আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নয়। এমন স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা হবে যেন কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত না হতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর বক্তব্য থেকেও পরিস্কার সরকার শহুরে সুবিধা গ্রামেও পৌঁছে দেওয়ার বাস্তব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে চাচ্ছে। 

প্রধানমন্ত্রীর জীবনসঙ্গী জানেন শহরে চিকিৎসক, হাসপাতাল আর  অ্যাম্বুলেন্স মেলে হাতের নাগালেই। কিন্তু গ্রামের ক্ষেত্রে এটি সহজ নয় মোটেও। সেখানে দূরত্ব ও ব্যয়ের বিবেচনায় ঘরেই সন্তান জন্ম দেন গ্রামীণ নারী। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সেবা তাদের জন্য 'গরিবের ঘোড়ারোগ'। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলভিত্তি ও স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে জোর দিয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।' 

সরকার যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) মডেল অনুসরণ করে একটি সমন্বিত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে সবার জন্য যাতে ডাক্তার থাকে, সে ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বড় রকমের পরিবর্তন করা হবে। এমনভাবে পরিবর্তন করা হবে একদিকে যেমন শয্যার পরিমাণ বাড়ানো হবে, তার চেয়ে সেবা বড় হবে যাতে করে শিশুদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, নারীদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, ফিজিওথেরাপির ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোও ঢেলে সাজানো হবে। যেহেতু ডিজিজ বার্ডেন চেঞ্জ হয়েছে, অর্থাৎ আগে ছিল সংক্রামক রোগ, এখন লাইফস্টাইল ডিজিজ হচ্ছে, সে কারণে প্রতিটি জেলায় করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো এ বিষয়গুলোর দিকে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা নেবে।’ 

স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের অচলায়তন ভাঙার মধ্যে দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন শহর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও সহায়তা ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে বেশ কিছু বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। প্রথমত, উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অর্থ বরাদ্দ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ ফোকাস দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের গ্রামে অবস্থান করতে উৎসাহিত করতে হবে। নানা প্রতিকূলতায় সীমিত সাধ্যের মধ্যেও যারা চিকিৎসা ব্যবস্থা সচল রেখেছেন তাদের সাধুবাদ জানাতে হবে। তাদের জন্য ভালো বাসস্থান, নিরাপত্তা ও সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার বন্দোবস্তসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিধি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের পেশাগত উন্নতির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব অভাব বা দুর্বলতা দূর করতে পারলে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবু সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।’ 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।
[email protected] 

জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়

অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন
জ্বালানি নিরাপত্তা থেকে জ্বালানি স্বাধীনতার পথে: বাজেটের করণীয়
অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা। গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বরং প্রয়োজন একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই এবং অর্থনৈতিকভাবে সহনশীল জ্বালানি ব্যবস্থা, যা বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলা করে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা আজ আর শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্প প্রতিযোগিতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জ্বালানি খাতে নেওয়া প্রতিটি নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব উদ্যোগ কতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।

আরো পড়ুন
নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

নেহরুকে ছাড়িয়ে ভারতের দীর্ঘতম সময়ের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি

 

বর্তমানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ৫.৪৯ শতাংশ। অথচ বহু বছর ধরে বিভিন্ন জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১০ শতাংশে উন্নীত করা, কিন্তু বাস্তবতা এখনো সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। এই ব্যবধান শুধু নীতিগত দুর্বলতার নয়; এটি বাস্তবায়ন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিরও প্রতিফলন। একদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছি, অন্যদিকে বাস্তব বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সেই অনুপাতে এগোয়নি। ফলে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা এখন দূর করা জরুরি।

বাংলাদেশে জ্বালানিতে আমদানিনির্ভরতা রয়েছে। এলএনজি, কয়লা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা দেখিয়েছে যে,  আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থনীতিকে বহিরাগত ধাক্কার প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে। তাই জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এখন কেবল পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজনও।

আরো পড়ুন
বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

বৃক্ষরোপণে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রণোদনা

 

এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যদি জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা উভয়ই শক্তিশালী করতে পারবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বিশেষভাবে সম্ভাবনাময়। সীমিত ভূমি সম্পদের কারণে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সবসময় সহজ নয়। কিন্তু শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন এবং আবাসিক স্থাপনায় রুফটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। ইতোমধ্যে শিল্প খাতে এর সফল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, সহজ অর্থায়ন এবং আমদানি শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে এই খাতকে আরো এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বিদ্যুৎ হুইলিং সুবিধা এবং বিনিয়োগবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে।

আরো পড়ুন
ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা

 

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দেওয়া হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সেই হারে উন্নত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজনের জন্যও শক্তিশালী গ্রিড অবকাঠামো অপরিহার্য। 

ভবিষ্যতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস সবসময় সমানভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তাই ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিইএসএসে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখনই যদি প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বৃহৎ পরিসরের সংযোজন এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি প্রযুক্তির খরচও দ্রুত কমছে। ফলে জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তিকে বৃহত্তর পরিসরে গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

আরো পড়ুন
মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

মারা গেছেন প্রখ্যাত তামিল চলচ্চিত্র পরিচালক ভারতীরাজা

 

বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পরিবহন খাত আমদানিকৃত জ্বালানির অন্যতম বড় ভোক্তা। তাই ইভি ব্যবহারের বিস্তার, চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় ব্যাটারি শিল্পের বিকাশ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে অবহেলিত ক্ষেত্র সম্ভবত জ্বালানি দক্ষতা। শিল্প, বাণিজ্য এবং আবাসিক খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। যে জ্বালানি ব্যবহারই করতে হয় না, সেটিই সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি। তাই জ্বালানি দক্ষতাকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, কারণ সাশ্রয় করা জ্বালানিই সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে টেকসই জ্বালানি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগের আর্থিক প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনায় দ্রুত পাওয়া যায়। ফলে এটি একই সঙ্গে ব্যয় সাশ্রয়, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে।

আরো পড়ুন
কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

কেনিয়ায় ইবোলা কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গুলিতে নিহত ১

 

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জ্বালানি নীতিতে সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং জ্বালানি দক্ষতায় বিনিয়োগ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি রচনা করতে পারে। আজকের বিনিয়োগই আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি নির্ধারণ করবে। এখন প্রয়োজন সঠিক অগ্রাধিকার, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। যদি আমরা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগোতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই অর্জন করবে না; বরং জ্বালানি স্বাধীনতার দিকে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

লেখক: অর্থনীতি বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
জ্বালানি অর্থনীতি, জলবায়ু নীতি ও টেকসই উন্নয়ন গবেষক
 

পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট

প্রদীপ্ত মোবারক
পবিত্রতার আড়ালে অন্ধকার: মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষার সংকট
সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ধারা হলো মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাদরাসাগুলো ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং পরবর্তীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। ফলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার আলোকে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি এই ব্যবস্থার অভ্যন্তরে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করাও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

তবে একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসাকেন্দ্রিক শিশু যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি এবং বলাৎকারের একাধিক ঘটনা জনসমক্ষে এসেছে। গণমাধ্যম, আদালত এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে এমন বহু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব ঘটনা কেবল ফৌজদারি অপরাধ নয়; এগুলো ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কের প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন অভিভাবক, পথ প্রদর্শক ও আদর্শ নির্মাতা। সেই শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধ সমাজে আরো গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকতার নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।

তবে একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করা প্রয়োজন, যৌন নির্যাতন কোনো একক শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা নয়। সাধারণ বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, এতিমখানা, এমনকি পারিবারিক পরিবেশেও শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা যৌন সহিংসতার শিকার হয়। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র “মাদরাসার সমস্যা” হিসেবে চিহ্নিত করলে প্রকৃত সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। মূল সমস্যা হলো ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহিতার অভাব, নীরবতার সংস্কৃতি এবং শিশু সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা।

তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, মাদরাসাকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো কেন বিশেষভাবে আলোচিত হয়? এর অন্যতম কারণ হলো দেশের বহু মাদরাসা আবাসিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য, অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতিও সমস্যা সৃষ্টি করে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হলেও ভয়, সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা কিংবা প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে না।

বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার বিষয়ক গবেষণাগুলো দেখায় যে, অধিকাংশ যৌন নির্যাতনের ঘটনা অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা নয়; বরং পরিচিত, বিশ্বাসভাজন এবং কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এ বাস্তবতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শিশু সুরক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা জরুরি। প্রতিটি মাদরাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের জন্য যৌন নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, অভিযোগ গ্রহণের স্বাধীন কাঠামো এবং প্রয়োজনে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক যোগ্যতা নয়, নৈতিকতা, আচরণগত ইতিহাস এবং পেশাগত উপযুক্ততাও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা প্রতিষ্ঠান রক্ষার নামে গোপন করা যাবে না। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ অপরাধ আড়াল করা মানে অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে আরো শিশুদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

এখানে আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং মাদরাসা পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামসহ বিশ্বের সব প্রধান ধর্মই শিশু নির্যাতন, শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলে ধর্মের নামে অপরাধীকে রক্ষা করা বা প্রতিষ্ঠানের সুনামের অজুহাতে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী। বরং সত্য প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে অপরাধকে আড়াল করা যাবে না, অন্যদিকে কয়েকজন অপরাধীর কারণে পুরো মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বা একটি বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দোষারোপ করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ।

পরিশেষে বলা যায়, মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান মানুষের নৈতিক বিকাশের কথা বলে, সেখানে যদি শিশু নির্যাতন বা বলাৎকারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, সমগ্র সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়। এই কলঙ্ক দূর করার একমাত্র পথ হলো সত্যকে স্বীকার করা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করা, শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি জবাবদিহিমূলক ও মানবিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত পরিচয় তার ভবন, পাঠ্যক্রম বা সুনামে নয়; বরং সেখানে অধ্যয়নরত প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার মধ্যেই নিহিত।

লেখক : কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পুলিশি ক্ষমতা ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্র একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্ব বিদ্যমান থাকে। এই চারটি উপাদান ছাড়া কোনো রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজস্ব ভূখণ্ডে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখে। এই ক্ষমতার অন্যতম বাস্তব রূপ হলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পুলিশকে রাষ্ট্রের “ভৌত ক্ষমতার একমাত্র বৈধ প্রয়োগকারী বাহিনী” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন আইনগতভাবে বলপ্রয়োগের অধিকার রাখে না।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সংঘটিত দুটি দৃশ্যমান ঘটনা—একটিতে ট্রাফিক পুলিশকে প্রকাশ্যে আক্রমণ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চিত্র, অন্যটিতে একটি জনসমাগমে পুলিশি যানবাহন ঘিরে ভাঙচুর ও আক্রমণাত্মক আচরণ—রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, আইন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই ঘটনাগুলো শুধুমাত্র একটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যত্যয় নয়, বরং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ও বৈধ ক্ষমতার উপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

প্রথম ঘটনাটিতে দেখা যায়, নগর সড়কে দায়িত্ব পালনরত একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে কয়েকজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে আক্রমণ করছে। একজন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাকে কর্তব্যরত অবস্থায় আঘাত করা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে আক্রমণের শামিল। কারণ পুলিশ ব্যক্তি হিসেবে সেখানে উপস্থিত নয়; সে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রয়োগ করছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন চলাচল নিয়মিত রাখা, এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে দেখা যায়, একটি এলাকায় পুলিশি যানবাহনকে ঘিরে জনসমাগম সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে উত্তেজিত জনতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। এমন পরিস্থিতি কেবল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না, বরং রাষ্ট্রের চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকেও অকার্যকর করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। কারণ পুলিশের যানবাহন রাষ্ট্রীয় শক্তির চলমান প্রতীক, যা আইন প্রয়োগের সরাসরি মাধ্যম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশেষ করে ম্যাক্স ওয়েবারের ধারণা অনুসারে, রাষ্ট্র হলো এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাখে। এই “একচেটিয়া বলপ্রয়োগের অধিকার” (Monopoly of Legitimate Violence) রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া বলপ্রয়োগ শুরু করে বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বাহিনীর উপর আক্রমণ করে, তবে তা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।

এই দুটি ঘটনার আলোকে আমরা দেখতে পাই, পুলিশ কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রতিফলন। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন, শৃঙ্খলা এবং কর্তৃত্বের ওপর আঘাত। এই কারণে বিশ্বের সকল আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই পুলিশকে বিশেষ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণা আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই দিক বিবেচনা করতে হয়। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে অন্য কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা, আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব মানে নিজের ভূখণ্ডে আইন প্রয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা। পুলিশ এই অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বের বাস্তব রূপ। যখন কোনো জনতা বা ব্যক্তি পুলিশের ওপর আক্রমণ করে, তখন তা অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আইনের দৃষ্টিতে এই ধরনের আক্রমণ গুরুতর অপরাধ। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীর ওপর আক্রমণ, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, তা হলো সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তার নাগরিকরা স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলে। আইনকে বাধ্যতামূলক শাস্তির ভয় থেকে নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মানা উচিত। কিন্তু যখন এই দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রকে তার বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয়। পুলিশ সেই বলপ্রয়োগের বৈধ বাহন।

ট্রাফিক পুলিশ একজন সাধারণ নাগরিকের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করছে না; বরং সকল নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ট্রাফিক নিয়ম না মানা হয়, তবে সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়, প্রাণহানি ঘটে এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তাই পুলিশের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা আসলে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্যই।

দ্বিতীয় ঘটনায় দেখা ভিড় বা আক্রমণাত্মক আচরণ সমাজে এক ধরনের ভ্রান্ত বার্তা দেয় যে, আইন ভাঙা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। রাষ্ট্র যদি তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতা হারায়, তবে সেটি আর রাষ্ট্র থাকে না; সেটি বিশৃঙ্খল জনসমষ্টিতে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর—আইন, শৃঙ্খলা এবং বৈধ বলপ্রয়োগ। পুলিশ এই তিনটির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। বিচার বিভাগ আইন ব্যাখ্যা করে, প্রশাসন নীতি বাস্তবায়ন করে, আর পুলিশ মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করে। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে রাষ্ট্র অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া, পুলিশের ওপর আক্রমণ সমাজে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলে। এটি আইন মানার প্রবণতা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ অপরাধীরা তখন মনে করে যে রাষ্ট্রের প্রয়োগ ক্ষমতা দুর্বল। ফলে ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে বড় ধরনের অপরাধ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।

তবে এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে শুধু শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, সামাজিক ও আচরণগত বিশ্লেষণও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে জনঅসন্তোষ, ভুল বোঝাবুঝি, বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনা থেকেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপর আক্রমণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো—সে তার নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করবে, আবার একই সঙ্গে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চ্যালেঞ্জ। পুলিশ এই ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে।

উল্লেখিত দুটি ঘটনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধান বা লিখিত নথিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের বাস্তব কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। একজন ট্রাফিক পুলিশ যখন সড়কে দাঁড়িয়ে নিয়ম বাস্তবায়ন করে, তখনই রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে। আবার সেই পুলিশ যদি আক্রমণের শিকার হয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

অতএব, রাষ্ট্র, পুলিশ এবং জনগণ—এই তিনটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক। জনগণ ছাড়া রাষ্ট্র অর্থহীন, রাষ্ট্র ছাড়া পুলিশ অকার্যকর, আর পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের আইন বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই এই তিনটির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, পুলিশের কাজে সহযোগিতা করা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। পুলিশের ওপর আক্রমণ মানে কেবল একটি ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্র কাঠামোর ওপর আঘাত। তাই এই ধরনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ, আইননিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠন করা, যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি