জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্ত। সম্প্রতি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা ঠেকানোর সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নির্দেশ দিয়েছিল গুলির। বিজিবির এক সদস্যের পাল্টা হুঁশিয়ারি ছিল এমন—‘আপনি গুলি করলে আমি বসে থাকব? আমার কাছে গুলি নেই?’ বিজিবি সদস্যের এমন উচ্চারণই যেন স্পষ্ট করে তুলেছে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্ত রক্ষায় নিজেদের ইস্পাত কঠিন মানসিকতাকে, যা অনুরণিত হচ্ছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। ছাড় দিচ্ছে না এক কদমও।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মহাপরিচালকের দৃঢ় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিজিবির অকুতোভয় সদস্যরা নস্যাৎ করে দিচ্ছে বিএসএফের অবৈধ পুশ ইন অপচেষ্টাকে। এখন পর্যন্ত গত এক মাসে ৬০০টি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা সফল হতে দেয়নি বিজিবি।
বিজিবির সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে জুওয়ান-বুড়োরাও। অবৈধ পুশ ইন প্রতিরোধে গাছের মগডালে ওঠে নজরদারি করছে শিশু-কিশোররা। এমন ভিডিও-ছবি ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিএসএফের পুশ ইন চেষ্টার বিপরীতে বিজিবির কঠোর অবস্থানের সঙ্গে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন সীমান্তবাসীরাও।
বিজিবির দৃঢ়তার ফলেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টার তিন দিন পর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা নারী-শিশুসহ ১২ জনকে গত সোমবার (১৫ জুন) ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। প্রতিটি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। জোরদার করা হয়েছে টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম। সীমান্ত সুরক্ষায় ক্ষিপ্র ও তৎপর রয়েছে তারা। রাতের নিরাপত্তায় ব্যবহার করা হচ্ছে থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর দিকনির্দেশনায় সীমান্তবাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ বুকে বুক মিলিয়ে সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছে বিজিবি। সীমান্ত হত্যা, পুশ ইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন উদ্দীপনায় রুখে দাঁড়াতে দেশপ্রেমে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক বিজিবিকে দেখেছে দেশের মানুষ। গত মে মাস থেকে সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বিএসএফের অব্যাহতভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর বা পুশ ইন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একবারের জন্যও বিজিবি পিঠ দেখায়নি, বুক দেখাচ্ছে। জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার নতুন টোনে কথা বলছে, বিএসএফকে মোকাবেলা করেছে।পুশ ইন নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার দিল্লিতে চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনে বসেছিল বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের। মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি। বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারকে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফ ডিজিকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও তিনি বলেছেন। সম্মেলনে উভয় পক্ষের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের সারসংক্ষেপ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
কিন্তু এরপরও সম্মেলনে বিজিবির অবস্থান নিয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী বাহিনীটিকে নিয়ে গোলমাল পাকানোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে জেনে-শুনে অসত্য, মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানকে ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ বা ‘বিকল্প তথ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার পরিবর্তে একটি মিথ্যাকে গ্রহণযোগ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার কসরত বিরাজমান। সত্যাসত্য বিচার-বিশ্লেষণ না করে অনেকেই আবার গুজবের ঢোল বাজাচ্ছেন। বর্তমান বাস্তবতায় মাথা নত না করে সাহসের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়টিতে এমন ভয়াবহ প্রবণতা সচেতনদেরও নিমজ্জিত করছে চরম বিষাদে।
বিজিবির প্রেস উইং জানিয়েছে, মহাপরিচালক পর্যায়ের এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩১টি এবং ভারতের পক্ষ থেকে ২১টি এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব এজেন্ডাসমূহের ওপর অনুষ্ঠিত আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের প্রামাণিক দলিল ‘জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস’ (জেআরডি) বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক স্বাক্ষর করেছেন। তবুও দেখা গেলো, সীমান্ত হত্যাকে বিজিবি ডিজি সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু বলে উল্লেখ করেছেন এমন কথায় বিষ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল যা জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস (জেআরডি) নামে পরিচিত সেখানে কিন্তু ‘বর্ডার কিলিং’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে বিজিবি নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
পুশইন, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ টু দ্য পয়েন্টে আলোচিত হয়েছে, জেআরডিতেও নথিবদ্ধ রয়েছে। এসব বিষয়বস্তুর সত্যতা সোমবার (১৫ জুন) প্রথম দফায় বিজিবির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ও পরবর্তীতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুনরায় দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে বিজিবি বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের মাধ্যমে যেখানে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুসংহত করছে ঠিক তখন অবান্তর-অবাস্তব বিষয়কে মূল উপজীব্য করে বাহিনীর নেতৃত্বকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় নতুন করে হাইপ উঠানো হচ্ছে।
আলোচিত-সমালোচনা হচ্ছে ‘পজিশন পেপার’ বিনিময় নিয়েও। সত্য-মিথ্যা মাপার থার্মোমিটারেও যেন গলদ ধরা পড়েছে। কারও কারও হয়তো জানা নেই, মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচ্য বিষয় ও এজেন্ডা পয়েন্টের শুধুমাত্র শিরোনাম বিনিময় নতুন নয়। এটি পুরোনো, প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে ‘গোপন তথ্য ফাঁস’ বা ‘নিরাপত্তা ব্যত্যয়’ এর বিষয়টি সংগতিপূর্ণ নয় মোটেও।
বিজিবির মতো বিএসএফও গত ১৪ মে অর্থাৎ বৈঠকের প্রায় একমাস পূর্বে তাদের এজেন্ডা পয়েন্টসমূহ বিজিবি সদর দপ্তরে প্রেরণের পর তাঁরা সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এখন কোনো উদ্দেশে বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয় মন্তব্যে বিষয়টিকে ফোকাস করা হচ্ছে সে নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাধারণত দেশটিতে সফররত বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাতের রীতি বা প্রথা দীর্ঘদিনের। বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে সবসময়ই এই প্রথা বা রেওয়াজ চালু রয়েছে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি অনুসরণ করেই বিজিবি মহাপরিচালক দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
গত বছর বিজিবি যখন ঢাকায় ৫৬তম সম্মেলনের আয়োজক ছিল তখন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। তখন এ নিয়ে কোনো হৈচৈ হয়নি। কূটনৈতিক রীতি মেনেই এ ধরনের সাক্ষাতের বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত হয়। সরকারের অনুমতির পরই আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অতিথি দেশের বাহিনীপ্রধান সাক্ষাৎ করেন। যেখানে বিজিবি ও বিএসএফের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র সঙ্গে বিজিবির প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতেও বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। ঠিক যেন জানান দিয়েছেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অখণ্ড, এই মাটি কারো দয়ার বিষয় নয়।
সীমান্তে দিন-রাত অতন্দ্র পাহারায় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিচল বিজিবি। সুগভীর দেশপ্রেম, সততা, বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, আনুগত্য, তেজ ও উদ্দীপনাই এই বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মাপকাঠি। সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, এখন বিভাজনের সময় নয়। অপতথ্যে বিজিবি সদস্যদের মনোবল নষ্ট করার পরিবর্তে উৎসাহ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালে দেশের জন্য মঙ্গল হবে। ধৈর্য ও বিচক্ষণতা এই সময়ে যেমন কাম্য তেমনি সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতীয় স্বার্থেই সময়ের সুতীব্র প্রয়োজন।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।




