ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতা পড়েননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। কবির কল্পনায় এক ছেলে তার মাকে নিয়ে অনেক দূরের বিদেশে ঘুরতে যায়। মা যায় পালকিতে। তার পাশে ছেলে যায় রাঙা ঘোড়ায় চড়ে। পথে ডাকাত পড়লে ছেলে লড়াই করে মাকে রক্ষা করে। কবির সেই বীরপুরুষের সন্ধান মিলেছে নিউইয়র্কে। কবির কল্পনার বীরপুরুষ ডাকাতদের লড়াই করে রক্তাক্ত হলেও বাস্তবের বীরপুরুষ মাকে বাঁচাতে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবন এক ভারতীয় কিশোর।
ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার নিইউয়র্কের বিখ্যাত সেন্ট্রাল পার্কে। সত্যিকারের এই বীরপুরুষের নাম রোমাঞ্চ মহাজন।
বীরপুরুষ কবিতার ‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে’র মতই মা, বাবা, ছোট ভাইয়ের সাথে প্রথমবারের মতো অনেক দূরের দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে গিয়েছিলেন রোমাঞ্চ। বুধবার বিকেলে পরিবারের সবার সাথে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ঘুরতে গিয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সী রোমাঞ্চ। কবিতার মতো নিজে একা রাঙা ঘোড়ায় নয়, সবাই মিলে চড়েছিলেন ঘোড়ার গাড়িতে। এক পর্যায়ে গাড়ির চালক ছবি তোলার জন্য গাড়ি ছেড়ে একটু দূরে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটি পাগলের মতো ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে ঘোড়াটি ফুটপাথে উঠে পড়ে। চালকও ছুটতে থাকেন গাড়ির পেছনে। এ সময় রোমাঞ্চের মা প্রিয়া মহাজন গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন। মাকে বাঁচাতে সাথে সাথে লাফ দেন রোমাঞ্চও। হয়তো রোমাঞ্চ সেই কবিতার মতো মাকে বলছিল, ‘আমি আছি, ভয় কেন মা কর’। মাকে বাঁচাতে পারলেও নিজে বাঁচতে পারেননি রোমাঞ্চ। তার মাথা সোজা রাস্তায় আঘাত পায়, ঘটনাস্থলেই সে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। বুধবার রাতে নিউইয়র্ক-প্রেসবিটেরিয়ান ওয়েইল কর্নেল মেডিক্যাল সেন্টারে রোমাঞ্চ মারা যায়।
রোমাঞ্চের বাবা দীপক মহাজন বলেন, ‘আমরা চিৎকার করে বলছিলাম—আমাদের বাঁচান, আমাদের বাঁচান! পরিবারের সবাই একে অপরকে মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে শুধু তার মাকে বাঁচানোর জন্যই নিচে পড়ে যায়। সে চিৎকার করে মা! বলে ডাকছিল।’
দুর্ঘটনায় রোমাঞ্চের বাবা, মা এবং রোমাঞ্চের ছোট ভাই—সামান্য আঘাত পেলেও নিরাপদে আছেন। তবে প্রিয়জনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে সবাই শোকে স্তব্ধ।
নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে শতাধিক ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। মূলত পর্যটক আকর্ষণের জন্যই ঘোড়ার গাড়িগুলো চালানো হয়। তবে বারবার দুর্ঘটনার কারণে ঘোড়ার গাড়ি চলাচল বন্ধের দাবি উঠেছে। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে সেন্ট্রাল পার্কের ভেতরে বা কাছাকাছি এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি সংক্রান্ত অন্তত ৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত মাসে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় একটি ঘোড়া অন্য একটি গাড়িকে ধাক্কা দিলে সেটি উল্টে যায়।
সিটি কাউন্সিলর ক্রিস্টোফার মার্তে বলেছেন, ‘আমরা এটিকে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারি না। এই ট্র্যাজেডি যে জরুরি পদক্ষেপের দাবি রাখে, কাউন্সিলকে অবশ্যই সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’
তিনি এরই মধ্যে একটা বিল এনেছেন, যাতে আগামী বছরের শেষের মধ্যে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে।
ঘোড়ার গাড়ির চালকদের ইউনিয়নও এই দুর্ঘটনায় মর্মাহত। ট্রান্সপোর্ট ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার কেম্প এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মনে হচ্ছে চালক তার ঘোড়া থেকে অন্তত এক হাত দূরে ছিলেন। এটি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো চালকেরই ছবি তোলার জন্য গাড়ি ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়, কখনোই না। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তকে সমর্থন করি।’
এরই মধ্যে গাড়ির চালককে অনির্দিষ্টকালের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে চালকের নাম প্রকাশ করা হয়নি।




