বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ভারতীয় রুপির দরপতন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চাকরির অনিশ্চয়তা, কঠোর ভিসানীতি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেক শিক্ষার্থী এখন বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নতুন করে বিবেচনা করছেন।
বহু বছরের প্রস্তুতির পর ভারতের ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সী কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রগতি প্রিয়া চলতি বছর ইতালির রোমে গ্লোবাল ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তিনি উদ্বেগে রয়েছেন। ইউরোসহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে ভারতীয় রুপির মূল্য কমে যাওয়ায় তার শিক্ষাঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রিয়া বলেন, শিক্ষাঋণের বোঝা ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে পারবেন কি না, সেই দুশ্চিন্তা তাকে প্রায়ই ভাবিয়ে তোলে। যদিও পরিবারের সহযোগিতার আশ্বাসে তিনি শেষ পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
২০২৫ সালে বিদেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১২ লাখের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দেশ। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বিদেশে পড়াশোনার আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এডওয়াইজ ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সুশীল সুখওয়ানি জানান, গত দুই বছরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ভবিষ্যতে এ হার আরো ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমতে পারে।
কঠোর ভিসানীতিও এ প্রবণতার অন্যতম কারণ। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে অবস্থানরত অনেক শিক্ষার্থীও আর্থিক চাপে রয়েছেন। রুপির মূল্যহ্রাসের কারণে তাদের অনেককে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বা নতুন অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ২০১৯ সালের পর থেকে প্রধান শিক্ষাগন্তব্য দেশগুলোর মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় রুপির মূল্য ৩৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে গেছে।
অন্যদিকে বিদেশে পড়াশোনা শেষে দক্ষ পেশায় চাকরি পাওয়াও আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার চাহিদা পুরোপুরি কমে যায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরিবর্তে জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তুলনামূলক কম খরচ, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং ভালো কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা শিক্ষার্থীদের এসব গন্তব্যের দিকে আকৃষ্ট করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের এই পরিবর্তিত প্রবণতা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারত থেকে আসছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপ, ভিসা জটিলতা ও চাকরির অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সতর্ক।
সূত্র : বিবিসি







