<p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের এক নারী শিক্ষার্থী পার্টটাইম চাকরি করেন যমুনা ফিউচার পার্কে। কাজের সূত্রে নিয়মিত জুরাইন-উত্তরা রুটের বাস রাইদা পরিবহনে যাতায়াত করেন তিনি। প্রায়ই যাতায়াতে বিরূপ অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয় তাঁকে।</p> <p>কালের কণ্ঠকে এই নারী বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে আমি নিয়মিত রাইদা বাসে যাতায়াত করি, মাঝেমধ্যে তুরাগ বাসেও যাওয়া হয়। যৌন হয়রানি থেকে মৌখিক হয়রানি—সব ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছি আমি। মাঝেমধ্যে পাশের সিটে পুরুষ যাত্রী বসলে নানা অজুহাতে শরীরে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেন।’</p> <p>বিরূপ অভিজ্ঞতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একদিন অফিস থেকে বাসায় ফিরছি। পাশের সিটে বসা মাঝবয়সী পুরুষের কোলে একটা ব্যাগ। হঠাৎ খেয়াল করি তিনি ব্যাগের নিচ দিয়ে আমার শরীরে হাত দিচ্ছেন। আমি তাকাতেই তিনি সরে গেলেন। একদম বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার তখন নামারও সময় হয়ে গিয়েছিল, তাই কিছু বলিনি।’</p> <p>‘স্টুডেন্ট ভাড়া’ নিয়েও হয়রানির শিকার হন জানিয়ে তিনি বলেন, “বাসের ড্রাইভার-হেল্পাররা প্রায় প্রতিদিনই ঝামেলা করেন। স্টুডেন্ট ভাড়া দিতে গেলেই ‘আপনি কিসের স্টুডেন্ট? আপনাকে দেখলে স্টুডেন্ট মনে হয় না?’ এ ধরনের কথা প্রায়ই শুনতে হয়। এ ছাড়া তাঁরা ভাড়ার চার্ট রাখেন না। যার কারণে যদি স্টুডেন্ট ভাড়া দিতে চাই তখন ভাড়া বেশি বলে পাঁচ-দশ টাকা বেশি নেন। প্রতিবাদ করলেই ব্যবহার খারাপ করেন।”</p> <p>একই বাসে যাতায়াত করেন আমেনা নামের এক যাত্রী। যাত্রাবাড়ী নিজের বাসা থেকে বাড্ডায় মেয়ের বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বাসে মহিলাদের জন্য আলাদা সিট বরাদ্দ থাকে। অথচ বেশির ভাগ সময় সেগুলোয় পুরুষরা বসে থাকেন। মহিলারা তাঁদের উঠতে বললে তাঁরাও খারাপ ব্যবহার করেন। অথচ এতগুলো পুরুষের মধ্যে কয়েকজন নারীর দাঁড়িয়ে যাওয়াটা যে কত কষ্টের সেটা তাঁরা বোঝেন না। ’</p> <p>২০২২ সালের জুনে আঁচল ফাউন্ডেশন ‘ঢাকা শহরে গণপরিবহনে হয়রানি : কিশোরী এবং তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব’ শিরোনামে এক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, গণপরিবহনে ওই বছর ৬৩.৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৬.৫ শতাংশকে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ১৫.৩ শতাংশ বুলিং; ১৫.২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য; ১৪.৯ শতাংশ লিঙ্গবৈষম্য এবং ৮.২ শতাংশ বডি শেমিংয়ের মতো হয়রানির মধ্য দিয়ে গেছেন। এতে দেখা যায়, যৌন নিপীড়নের ৭৫ শতাংশই ঘটেছে যাত্রীদের মাধ্যমে, ২০.৪ শতাংশ ঘটেছে গাড়ির হেল্পার কর্তৃক। এ ছাড়া ৩ শতাংশ হকারের মাধ্যমে এবং ১.৬ শতাংশ ড্রাইভারের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে।</p> <p>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মালেকা পারভীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রমাটাইজ হয়ে গেলে ওই নারীর ব্যক্তিজীবন, শিক্ষাজীবন বা কর্মজীবন সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। ঘুমের সমস্যা, হতাশা, অবসাদ ইত্যাদি সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের মানসিক সমস্যা পরবর্তী বড় আকারও ধারণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও অন্যদের যেমন কাজ করতে হবে, একই সঙ্গে নারীদেরও প্রতিবাদ করতে হবে। তাদের প্রতিবাদ তাদেরকে আরো মানসিকভাবে শক্ত রাখতে কাজে দেবে।’</p> <p>রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীর গণপরিবহনগুলো নারী নির্যাতনের একেকটি বাহন। নারীদের জন্য যেসব সংরক্ষিত সিট রাখা হয় সেগুলো ইঞ্জিনের পাশে কেন থাকবে? এটা তো অবৈধ। ওইসব সিটে বসে নারীরা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর এই যে নারীদের জন্য আলাদা বাস দেওয়া হবে বলা হয় এটি একটি অপকৌশল। নারীদের আলাদা করে কেন দেখতে হবে? তাদের সাধারণের মাঝে নিরাপত্তা দিতে হবে। এ বিষয়ে নারী সংগঠনগুলোকে সোচ্চার থাকতে হবে, নারী নেত্রীদের এটা নিয়ে সংসদে আওয়াজ তুলতে হবে।’</p> <p> </p>