অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে আবারও বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ চাইছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, নির্মাণকাজের অগ্রগতি এবং সংশোধিত প্রকল্প ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) থেকে আরো পাঁচ হাজার ৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এই অর্থ যোগ হলে চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকায়। একই সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতেও রূপপুরের জন্য রাখা হচ্ছে আরো ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ। পরিকল্পনা কমিশন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একাধিক সরকারি নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ডলারভিত্তিক ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলেও টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পুরো ব্যয়ের হিসাব নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। এতে কাগজে-কলমে প্রকল্পের ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পের অনুকূলে আরএডিপিতে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার ৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। বর্তমানে প্রকল্পটির জন্য চলতি অর্থবছরের আরএডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ১০ হাজার ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এই বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকায়, যা বর্তমান বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত এই অর্থের পুরোটা বৈদেশিক ঋণ সহায়তার অংশ। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন বাড়ছে না, বাড়ছে রাশিয়ার ঋণের টাকার অঙ্ক। বর্তমানে প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণ অংশে বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হলে তা বেড়ে দাঁড়াবে ১৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকায়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এরই মধ্যে এই অর্থ পুনর্বিন্যাসে অনাপত্তি দিয়েছে। ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের থোক বরাদ্দ থেকেই এই অর্থ সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। শেষ সময়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়ার বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা সৈকত আহমেদেও সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গত নভেম্বরেই অতিরিক্ত টাকা প্রয়োজন হবে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিলাম। তখন প্রকল্প সংশোধন না হওয়ায় ১২২ টাকা ডলার রেটে বিল পরিশোধের সুযোগ ছিল না। তাই প্রকল্পটি সংশোধন হওয়ার পর অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ না পেলে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না।’ রূপপুর প্রকল্পটি শুরু থেকেই রাশিয়ার ঋণনির্ভর। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় ঋণচুক্তির আওতায় প্রায় ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা নেওয়া হয়। তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮০ টাকা। সেই হিসাবে বৈদেশিক ঋণের টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। কিন্তু এক দশকের ব্যবধানে ডলারের দাম বেড়ে এখন ১২২ টাকা ৪০ পয়সায় পৌঁছেছে। ফলে একই পরিমাণ ডলারের বিপরীতে এখন সরকারের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণেই টাকার হিসাবে ঋণের অঙ্ক বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। এই চাপ সরাসরি এসে পড়েছে পুরো প্রকল্প ব্যয়ের ওপরও। ২০১৬ সালে অনুমোদিত মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। কিন্তু সংশোধিত প্রস্তাবে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা, যা মূল ব্যয়ের তুলনায় ২৩ শতাংশের বেশি।