kalerkantho


কাশফুলের আমন্ত্রণে

ফরহাদ হোসেন   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৭:১৬



কাশফুলের আমন্ত্রণে

বাংলা ঋতু পরিক্রমায় আবার এসেছে শরৎ। এসেছে সাদা শুভ্রতার দিন।

শরৎ দিনের শুরুর সকালটাই সিগ্ধ আলোয় ভরা। আর পরন্ত বিকালের আবেশ ছড়ানো রোদ সত্যিই মনকাড়া। শরতের সকালে দূর্বা ঘাসে জমে থাকা শিশির যেন এক একটা মুক্তার টুকরো। আহা সকালের সোনালী রোদ যখন শিশিরের গায়ে পড়ে তখন দূর থেকে দেখে মনে হয় 'এ যেন আসিয়াছি হায় মুক্তার দেশে, আসিয়াছি আমি হায় এই বঙ্গকে ভালবেসে। এমন জীবন কোনকালে দেখিয়াছে কে কবে, শ্যামল ধরনী শরত্ প্রভাতে এসে। ' 

শরৎ ঋতুর কথা মনে এলেই আমাদের চোখের কোণে ভেসে উঠে ফুটন্ত সাদা কাশফুল, পাল তোলা নৌকার সারি, দূর আকাশের কোণে জমে থাকা দূসর সাদা মেঘের ভেলার কথা। কখনো মিষ্টি রোদে আলোর খেলা আবার কখনো হঠাৎ বৃষ্টির হানা। মাঝে সাজেই দেখা যায় রৌদ্র মেঘের লোকুচুরি খেলা। অনুভুতির মাত্রাটা একটু গভীরে নিলে মনে হয় যেন আকাশের সব নীলে একাকার হয়ে জলের স্বচ্ছ বহমান ধারা ছুটে চলছে মোহনার টানে।

সেই অবিরত কল কল ধ্বনির এক টানা শব্দ বেজেই চলে পুরো শরৎ জুড়েই। এমন চলতে চলতেই ফুরায় এক সময় বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের ধারা। তার দুপারে বেড়ে উঠা কাশ গুচ্ছ গুলোও ততদিনে যৌবনে পা রাখে। ঝিরি ঝিরি বাতাসে দুলতে থাকে তার সারা অঙ্গ। এমন অঙ্গের নাচন কার না ভাল লাগে। বিশেষ করে তরুণ মনের মানুষদের কাছে শরৎ সব থেকে সুন্দর ঋতু।  

রবী ঠাকুর তার শরৎ কবিতায় লিখেছিলেন 'আজি কি তোমার মধুর মূরতি, হেরিনু শারদ প্রভাতে!  হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ ঝলিছে অমল শোভাতে।  পারে না বহিতে নদী জলধার, মাঠে মাঠে ধান ধরে নাকো আর-- ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল তোমার কাননসভাতে! মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী, শরত্কালের প্রভাতে। ' এমন কবিতার পংক্তিমালায় কার মন ছুয়ে না যায়? দিশেহারা হয়ে ছুটে যায় মন কোথায় আছে এমন ধবল সাদা কাশবন? কোথায় আছে ক্ষেত ভরা সবুজ ফসল? কোথায় গান গায় এত দোয়েল কোয়েল? কোথায়ই বা জননী দাঁড়িয়ে থাকে কোন প্রভাতে! প্রেমিক মন, ভালোবাসার মন এসবের খুঁজে ছুটে যায় কোন এক নদীতীরে, গ্রাম্য মেঠো পথ ধরে। এমন চলতে চলতে কোন এক নদীর ধারে পেয়ে যায় কাশফুলের নরম কোমল বিছানা। যেখানে অবগাহন করে জুড়ায় মন প্রাণ দেহ।

আমাদের ইট সুড়কির এই নগরী থেকে কেন জানি প্রকৃতির গন্ধ-রূপ-শোভা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা অভ্যন্ত হয়ে পড়ছি ভার্চুয়াল জগতের সাথে। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয় থাকার পরও ক্ষণে ক্ষণে কিছু একটার অভার মনের অজান্তেই অনুভব করি। আমরা বাঙালি। চিরায়ত বহমান কৃষ্টি-কালচার-সংস্কৃতি আমাদের ধমনীতে বিরাজমান। বিশেষ বিশেষ সময় আসলেই ধমনীতেই এক এক করে জাগ্রত হতে থাকে সব। এমনই এক সুধা সুন্দর আমাদের শরত্ ঋতুর কাশবন। যা শরৎ এলেই পরতে পরতে ফুটতে থাকে। তার রূপ বিলিয়ে দিতেই আহবান করে আমাদের। নগরীর পরিধি ক্রমেই বাড়তে থাকার ফলে এরা অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও শরেতর এই সময়ে বিশেষ করে নদীর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে দেখা মেলে বিস্তৃর্ণ অঞ্চল জুড়ে কাশফুলের সমারোহ। যেখানে ছুটে চলছে পরিবার পরিজনসহ হাজারো প্রেমিক ও ভাবুক মন।  

ঢাকার চার পাশ ঘিরে আছে বেশ কয়েকটি নদী। এসব নদীর কোন না কোন শাখা প্রশাখা যুক্ত এ শহরের সাথেই। নগরের পরিধি বাড়ার পরও রয়েছে অনেক নীচু এলাকা। বর্ষার শেষভাগে এসব এলাকার পানি সরে গেলেই বাড়তে থাকে কাশগুচ্ছ গুলো। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিনত হয় তার সৌন্দর্য্য বিলাতে। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতেই ছুটে চলি আমরা তাদের কাছে। কাশফুলের নরম কোমল বিছানায় পরন্ত বিকালটা ঘুরে কাটাতে চাইলে চলে যেতে পারেন উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের পরের এলাকায় দিয়াবাড়ীতে। যার পরিধি উত্তরার থার্ড ফেজ প্রকল্প পর্যন্ত। এখানে যেমন ঘুরে বেড়ানোর সকল নাগরিক সুবিধা পাবেন তেমনী পাবেন গ্রাম্য প্রকৃতির ছোয়াঁও। নদীর ধারে বসে প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে আয়েশ করেই কাটিয়ে দিতে পারবেন পরন্ত বিকেলটা।  

রামপুরা সংলগ্ন আফতাবনগর ইস্টার্ন হাউজিং এর শেষ প্রান্তে দেখা মিলবে বির্স্তৃণ এলাকা জুড়ে ফুটে থাকা কাশফুলের। সৌন্দর্য্য সুধা নিতে ছুটির দিনসহ প্রতিদিন ভীড় করে হাজারো মানুষ। অভিজাত এলাকা বসুন্ধরায় ও রয়েছে কাশফুলের সমারোহ। এখানে আসলে পাওয়া যাবে ইট-কাঠ-পাথরের সমারোহের সাথে কাশের বাহার। তিনশ ফিট রাস্তা ধরে এগুলো থাকলেও ক্ষণে ক্ষণে পাওয়া যাবে কাশবন।  

আমেরিকান এম্বেসির সামনে নতুন বাজার থেকে শুরু হওয়া একশ ফিট মাদানি এভিনিউ ধরে যতই গ্রামের দিকে যাওয়া যাবে ততই পাওয়া যাবে ঘণ কাশবন। অন্যদিকে সাভার যাওয়ার মহাসড়কের দুপাশে নানা স্থানেও দেখা যায় সাদা কাশফুলের সমারোহ। পোস্তগোলার চীন মৈত্রী সেতু এবং বাবু বাজার ব্রিজ পার হয়ে বেশ খানিকটা এগুলোই পাওয়া যাবে কাশবনের সন্ধান। বিভাগীয় শহর, জেলা সদর বা উপজেলা সদরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর অপর পারে ফুটে থাকে কাশফুল। তাছাড়া প্রতিটি নদীর দুপাশ দিয়ে ফুটে থাকে অসংখ্য কাশফুল। বিশেষ করে শহরের কাছাকাছি চরাঞ্চলে। সেখানের গ্রাম্য সৌন্দর্য্য কম কিসে? যেন আপনাকে আমন্ত্রন জানাবে তার সৌন্দর্য্য অবলোকনের জন্য।

ঢাকার আশপাশের কাশবনে বিকাল কাটাতে চাইলে চলে যান কাছাকাছি কোন একটায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ী, বাস বা রিকশাযোগে যেতে পারেন এসব স্পটে। সঙ্গী নিয়ে গেলে গোধুলী বেলার সময়টা বেশ উপভোগ করতে পারবেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসব স্পটে সময় কাটানোর মজাই আলাদা।


মন্তব্য