• ই-পেপার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হোক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন আশার আলো

  • হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা

মেজর (অব.) এ কে এম শাকিল নেওয়াজ

শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজন মানসম্পন্ন গবেষণা

সাম্প্রতিক সময়ে একজন রাজনৈতিক নেতা (মন্ত্রী) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের মধ্যে যে বক্তব্য ও পাল্টাবক্তব্য জনসমক্ষে এসেছে, তা আমাদের সবাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিষয়টি শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতপার্থক্যের নয়, বরং এটি আমাদের সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মান, মূল্যবোধ ও পেশাগত সংস্কৃতি নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে, যেখান থেকে ভবিষ্যতের আমলা, গবেষক, শিক্ষক, নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয়। ব্যক্তিগত মন্তব্য বা কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোনটির চেয়ে শ্রেষ্ঠএই বিতর্কে সময় ব্যয় না করে আমাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন করা উচিতগবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থান কোথায়?

খোলামেলা একটি পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতে চাই। বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনব্যবস্থা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি, যা দেশের বড় বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই অর্থনীতি, পরিবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা খাতে গবেষণাভিত্তিক সমাধানের তুলনামূলক স্বল্প উপস্থিতিতে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেগবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? গবেষণা শুধু একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন, প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধি, পদোন্নতি লাভ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উন্নত করার জন্য হওয়া উচিত নয়। গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা বাস্তব সমস্যার সমাধান দেয় এবং জাতীয় উন্নয়নে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অবদান রাখে।

একটি কার্যকর গবেষণা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে, দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে, জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে এবং শিক্ষার মান উন্নত করতে পারে। আমরা কি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে আমাদের দেশে পরিচালিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা জাতীয় পর্যায়ে এসব খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনে দিয়েছে? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করা নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবার দায়িত্ব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নে কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী করেছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্র করে তারা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু রয়েছে।

সুতরাং মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত নয় কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোনটির চেয়ে ভালো। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলোকিভাবে আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, যা একই সঙ্গে দেশের বাস্তব প্রয়োজন ও জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রতি সংবেদনশীল থাকবে। প্রতিটি গবেষণা প্রকল্পকে শুধু একাডেমিক মানদণ্ডে নয়, বরং সমাজ ও দেশের উন্নয়নে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদানের ভিত্তিতেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

আজ যখন বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি, রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীলতা, বায়োটেকনোলজি এবং মহাকাশসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও উদ্ভাবনের অগ্রভাগে অবস্থান নিতে হবে।

গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে ভবিষ্যতের জাতীয় চাহিদা এবং উদীয়মান বৈশ্বিক প্রযুক্তির আলোকে। একই সঙ্গে স্থানীয় সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করাও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থী, দক্ষ শিক্ষক, প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক এবং বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনার কোনো অভাব নেই। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ, যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক অংশীদারি, মেধাভিত্তিক গবেষণা প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গবেষণা ভিশন।

সব শেষে আমাদের উচিত কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরাএই বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে কিভাবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মূল্যায়ন তার ঐতিহ্য বা খ্যাতির মাধ্যমে নয়, বরং তার গবেষণা, উদ্ভাবন এবং গ্র্যাজুয়েটরা দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কতটুকু অবদান রাখছে, তার মাধ্যমে হওয়া উচিত। যেদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন গবেষণা সৃষ্টি করবে, যা জাতীয় সমস্যার সমাধান করবে, নতুন শিল্প গড়ে তুলবে, নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে, পরিবেশ রক্ষা করবে, শিক্ষার মান উন্নত করবে এবং মানুষের জীবনকে আরো সমৃদ্ধ করবেসেদিন কোন বিশ্ববিদ্যালয় বড় বা ছোট, সেই বিতর্ক নিজে থেকেই গুরুত্ব হারাবে। কারণ তখন যুক্তি নয়, ফলাফলই সবচেয়ে জোরালো ভাষায় কথা বলবে।

লেখক : অ্যাজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিইউপি

জাপান : সমৃদ্ধির আড়ালে কি এক নীরব শূন্যতা

সোহেল আহমেদ

জাপান : সমৃদ্ধির আড়ালে কি এক নীরব শূন্যতা

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জাপান সফরের আগে আমি দেশটি সম্পর্কে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বই পড়েছি, ইউটিউব ডকুমেন্টারি দেখেছি, ওয়েবসাইট ঘেঁটেছি এবং জাপানফেরত বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছি। ফলে জাপানে পৌঁছানোর আগে আমার মনে একটি বিশেষ চিত্র তৈরি হয়েছিলউন্নত প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষার হার, সুশৃঙ্খল নাগরিক জীবন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অনন্য দেশ।

বাস্তবে গিয়ে আমি এসবের প্রায় সবই দেখেছি। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সময়ানুবর্তী ট্রেন, কর্মনিষ্ঠ মানুষ, উন্নত অবকাঠামো এবং সামাজিক শৃঙ্খলা সত্যি প্রশংসনীয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এমন একটি অনুভূতি আমাকে তাড়া করেছে, যা হয়তো অনেক পর্যটকের চোখ এড়িয়ে যায়। আমার মনে হয়েছে, জাপানের বহু মানুষের মধ্যে যেন এক ধরনের নীরব ক্লান্তি, চাপা একাকিত্ব এবং অদৃশ্য শূন্যতা কাজ করছে।

টোকিওর ট্রেনে আমি দেখেছি অফিসগামী নারী-পুরুষ। অনেকে ট্রেনে বসেই সাজগোজ করছেন, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। তাঁদের মুখে হাসি কম, কথাবার্তা কম। একজন বাংলাদেশি হিসেবে, যেখানে মানুষ সহজে কথা বলে, হাসে এবং সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেখানে এই দৃশ্য আমার কাছে কিছুটা যান্ত্রিক মনে হয়েছে।

এক রবিবার টোকিওর একটি উন্মুক্ত বাজারে গিয়ে আমি আরো অবাক হয়েছি। শহরের শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকরা ছোট ছোট স্টল বসিয়ে নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেনকেউ কাঠের তৈরি চশমা, কেউ হাতে বানানো স্টিকার, কেউ নিজস্ব রেসিপির খাবার, কেউ শিল্পকর্ম। প্রথমে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিলএটি কি অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন, নাকি জীবনের অর্থ খোঁজার একটি প্রচেষ্টা? তবে বিষয়টি একপক্ষীয় নয়। জাপান বিশ্বের অন্যতম উচ্চ সাক্ষরতার দেশ। তাদের সাহিত্যচর্চার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। হাইকু কবিতা, উপন্যাস, নাটক, শিল্পকলা এবং সংগীত আজও জাপানি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাপান থেকে নোবেলজয়ী সাহিত্যিকও এসেছে। স্কুলে সাহিত্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বই পড়ার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান।

তাহলে আমি যে অনুভূতি পেয়েছি, সেটি কী? আমার মনে হয়, সেটি অর্থনৈতিক দারিদ্র্য নয়, বরং আধুনিক নগরজীবনের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রতিযোগিতা, কম জন্মহার, একাকী জীবন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা অনেক মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পারে, কিন্তু সব সময় মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না।

আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রকৌশলী, স্থপতি, চিকিৎসক বা প্রশাসকযে-ই হোন না কেন, তাঁর সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় থাকা জরুরি। প্রযুক্তি মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু সাহিত্য মানুষকে মানুষ করে। গণিত মস্তিষ্ককে শাণিত করে, কিন্তু কবিতা হৃদয়কে জাগ্রত করে। উন্নত সমাজ গঠনের জন্য উভয়েরই প্রয়োজন।

তাই জাপান সফর শেষে আমার উপলব্ধি হলো, শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, মানুষের অন্তর্জগতের বিকাশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি তার মানুষের মনও সমৃদ্ধ হয়। তবে ন্যায়সংগতভাবে বলতে হয়, একজন বিদেশি পর্যটকের কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো জাপানি সমাজকে বিচার করা যায় না। আমি যা দেখেছি, তা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। অন্য কেউ হয়তো একই জাপানে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন। কিন্তু ভ্রমণের সৌন্দর্য এখানেইএটি শুধু নতুন দেশ দেখায় না, আমাদের নিজেদের সমাজ ও মূল্যবোধকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়।

লেখক : আলোকচিত্রী ও গণমাধ্যমকর্মী

ফ্যামিলি কার্ড থেকে খাল খনন রাষ্ট্র গড়ার প্রথম ১০০ দিন

ড. মোহা. হাছানাত আলী

ফ্যামিলি কার্ড থেকে খাল খনন রাষ্ট্র গড়ার প্রথম ১০০ দিন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম ১০০ দিন একটি প্রতীকী সময়। এই সময়কে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা থাকে আকাশছোঁয়া, সমালোচকদের দৃষ্টি থাকে তীক্ষ, আর রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নেমে আসে পরীক্ষার চাপ। একটি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম যে কাজটি করে, সেটি শুধু প্রশাসনিক নয়, তা মূলত রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয়। সরকার কোন মানুষকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কোন সংকটকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কোন স্বপ্নকে সামনে রাখছেতার ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে এই প্রথম ১০০ দিনে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে তাই শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমের তালিকা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। বরং দেখতে হবে, এই সময়ের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র কোন দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমিক, শিক্ষিত বেকার, মধ্যবিত্ত পরিবার, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন মা কিংবা বন্যা-খরায় বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের মানুষতাদের জীবনে কোনো আশার আলো জ্বলেছে কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন। এই ১০০ দিনে সরকার সবচেয়ে বেশি যে শব্দগুলো উচ্চারণ করেছে, তার মধ্যে ছিল—‘মানুষ, পুনর্বাসন, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষাগ্রামভিত্তিক অর্থনীতি। ফলে রাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে খাল খননের মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগসবকিছু যেন এক সুতায় বাঁধা একটি রাজনৈতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। এই রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনদর্শনের কথাও। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু সময় এসেছে, যখন উন্নয়নের বড় বড় সেতু, উড়ালসড়কের আড়ালে সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু অবকাঠামো নয়, রাষ্ট্রের শক্তি তার মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা।

ফ্যামিলি কার্ড থেকে খাল খনন রাষ্ট্র গড়ার প্রথম ১০০ দিনফ্যামিলি কার্ড : বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে যখন চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি কিংবা আটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে দিনমজুর, রিকশাচালক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র দোকানি ও স্বল্প আয়ের পরিবার। এই বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সরকার শুধু একটি ভর্তুকি প্রকল্প হিসেবে দেখেনি, বরং এটি ছিল সামাজিক নিরাপত্তার এক মানবিক কাঠামো। রাষ্ট্র যেন দরিদ্র মানুষের ঘরে গিয়ে বলছে, তুমি একা নও, রাষ্ট্র তোমার পাশে আছে। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেল ও প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য বিতরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। বিশেষ করে শহরের বস্তিবাসী ও গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার এক নীরব আশ্রয়।

কৃষক কার্ড : ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি সরকারের আরেকটি আলোচিত উদ্যোগ ছিল কৃষক কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন। বাংলাদেশের কৃষক যুগের পর যুগ এ দেশের অর্থনীতির ভিত গড়ে তুললেও অনেক সময় রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছেনি প্রকৃত চাষির হাতে। কৃষক কার্ড সেই বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙার একটি প্রয়াস। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ভর্তুকি, সার ও বীজ সরবরাহ এবং কৃষি সহায়তা কার্যক্রমকে আরো স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একজন কৃষক যেন ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় দিনের পর দিন ঘুরে না বেড়ান, বরং রাষ্ট্র নিজেই তার দুয়ারে পৌঁছে যায়এই দর্শনই যেন কর্মসূচিটির মূলভিত্তি। বাংলার কৃষক আসলে শুধু একজন উৎপাদক নন, তিনি এই ভূখণ্ডের জীবনরস। তাই কৃষক কার্ড শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচয়পত্র নয়, এটি মাটির মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের প্রতীক।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : প্রথম ১০০ দিনে সরকার যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল, তা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। কারণ জনগণের কাছে উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে বাজারে স্বস্তি। সরকার বাজার তদারকি জোরদার করে, আমদানিপ্রক্রিয়া সহজ করে, মজুদদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালায় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়, যদিও শতভাগ সাফল্য আসেনি, তবু বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্থিতি ফিরে আসে। মানুষ অন্তত বুঝতে পারে, সরকার বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদাসীন নয়। অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায় এটি স্বস্তির চেষ্টা

খাল খনন : বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এ দেশের অসংখ্য খাল, বিল, জলাশয় বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও অব্যবস্থাপনায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। একসময় যে খাল ছিল কৃষকের প্রাণ, আজ সেখানে জন্মেছে আগাছা কিংবা দখলদারের দেয়াল। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ ছিল খাল খনন ও জলাধার পুনরুদ্ধার কর্মসূচি। অনেকেই এটিকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে দেখলেও এর গভীরতা আরো বিস্তৃত। এটি মূলত কৃষি, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করার উদ্যোগ। খাল খননের ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল পুনঃখননের ফলে কৃষকের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়। কারণ কৃষক জানেনপানি মানেই জীবন। খাল বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে গ্রাম বাঁচবে।

কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন : বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো কৃষি ও গ্রাম। অথচ দীর্ঘদিন উন্নয়নের আলো অনেক ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছিল। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতির দিকে নতুন করে নজর দেওয়া হয়। সার ও বীজ সরবরাহ সহজ করা, কৃষিঋণ প্রাপ্তি বৃদ্ধি, সেচ সহায়তা এবং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ কৃষকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে। গ্রামের মানুষ উন্নয়নকে বড় বক্তৃতায় নয়, রাস্তার ধুলা কমা, সেচের পানি পাওয়া কিংবা বাজারে ধানের দাম ঠিকঠাক থাকার মধ্য দিয়েই অনুভব করে। সেই বাস্তব উন্নয়নের দিকে সরকার নজর দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

কর্মসংস্থান : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই তরুণরাই যখন বেকারত্বের যন্ত্রণায় হতাশ হয়ে পড়ে, তখন সেটি রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে ওঠে। প্রথম ১০০ দিনে সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা, স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে শ্রমনির্ভর কর্মসূচি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে খাল খনন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার ফলে কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, তবু হতাশ তরুণদের জন্য এটি ছিল আশার একটি ক্ষুদ্র জানালা।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : যে রাষ্ট্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয় না, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। প্রথম ১০০ দিনে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সক্রিয়করণ এবং স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধ সরবরাহ বাড়ানোর মতো কিছু উদ্যোগ নেয়। গ্রামীণ হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর আলোচনা শুরু হয়। যদিও বাস্তবায়নে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু জনগণ অন্তত একটি নীতিগত অঙ্গীকার দেখতে পায়।

দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানপ্রত্যাশা ও বাস্তবতা : বাংলাদেশের মানুষ দুর্নীতিতে ক্লান্ত। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লুটপাট, টেন্ডারবাজি, দখলদারিএসব বহুদিন ধরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কারণ। প্রথম ১০০ দিনে সরকার প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে অভিযানও পরিচালিত হয়।

পররাষ্ট্রনীতি : বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত জরুরি। প্রথম ১০০ দিনে সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, প্রবাস আয়ের প্রবাহ বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকে গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা যেকোনো সরকারের মতো বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। বিরোধীরা বলছে, অনেক ঘোষণার বাস্তবায়ন এখনো দৃশ্যমান নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধীরগতি, বাজার নিয়ন্ত্রণে সীমিত সফলতা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার অভিযোগও উঠেছে।

১০০ দিনের রাজনীতি : প্রথম ১০০ দিন কখনোই একটি সরকারের পূর্ণ মূল্যায়নের সময় নয়। কিন্তু এটি একটি দিকনির্দেশনা দেয়। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সেই দিকনির্দেশনা স্পষ্টগ্রামীণ অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্য সহায়তা, কৃষি, পানি ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব। ফ্যামিলি কার্ড থেকে খাল খননএই দুই প্রতীক আসলে বাংলাদেশের দুই বাস্তবতাকে সামনে আনে। একদিকে দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, অন্যদিকে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম। একটি মানুষের পেটের সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যটি মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে।

উন্নয়নের মানে শুধু কংক্রিট নয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞা খুঁজছে। বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আলোচনায় তাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন। ফ্যামিলি কার্ডের খাদ্য সহায়তা, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে মাটির মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, খাল খননের জলসভ্যতা পুনরুদ্ধার, কৃষির পুনর্জাগরণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থানএসব উদ্যোগের ভেতরে একটি মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়। এই রাষ্ট্রচিন্তার পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনাচারের প্রসঙ্গও অনেকের আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে বড় করে দেখার যে বার্তা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, তা গ্রামবাংলার মানুষের কল্পনায় এক ধরনের আবেগ তৈরি করেছে। তবে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শুধু ঘোষণাকে মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে বাস্তব পরিবর্তনকে। তাই এই ১০০ দিনের সাফল্য বা সম্ভাবনা টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের ধারাবাহিকতা, সততা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন তখনই ঘটে, যখন সাধারণ মানুষ মনে করে এই দেশটি আমারও।

লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রা

হাসান আলী

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রা

মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের জন্য আমরা কমবেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করি। শিশুর জন্মের আগে পরিবার প্রস্তুতি নেয়, শিক্ষাজীবনের জন্য পরিকল্পনা করা হয়, কর্মজীবনের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়, এমনকি অবসরজীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও অনেকে সঞ্চয় করেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অধ্যায়—বার্ধক্যের জন্য আমাদের প্রস্তুতি খুবই সীমিত। ফলে অনেকের কাছে বার্ধক্য যেন অন্ধকারে যাত্রার শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ বার্ধক্যকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদ থাকলেই বার্ধক্যের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। আবার কেউ সন্তানদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে থাকেন। বাস্তবতা হলো, অর্থ কিংবা পারিবারিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো বার্ধক্যের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নিশ্চয়তা নয়। সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মানসিকতা।

সক্রিয় বার্ধক্যের অন্যতম শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। আমরা শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে যতটা আগ্রহী, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ততটাই উদাসীন। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব, অবসাদ, উদ্বেগ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট অনেক প্রবীণের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতির অভাব তাঁদের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি শিশুকে আমরা ছোটবেলা থেকেই নানা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করি। তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ একযোগে কাজ করে। কিন্তু একজন মানুষ যখন বার্ধক্যে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর জন্য কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং বা প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি প্রায় নেই বললেই চলে। কিভাবে বয়সজনিত পরিবর্তন মেনে নিতে হবে, কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে, কিভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে কিংবা কিভাবে একাকিত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে—এসব বিষয়ে খুব কম মানুষই কোনো দিকনির্দেশনা পান।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য একটি ব্যক্তিগত যাত্রা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু বার্ধক্যের অনেক বাস্তবতা একজন মানুষকে নিজেকেই মোকাবেলা করতে হয়। তাই বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য দায়িত্ব।

সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং শাস্তির দাবি জানিয়েছে। প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ বিদ্যমান। আইন অনুযায়ী কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিচার হওয়া উচিত। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সব পক্ষের বক্তব্য শোনার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়। যদি প্রতিটি পারিবারিক সংকটকে আমরা শুধু সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে তার প্রভাব সমাজের ওপরও পড়ে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষ পরিবারে বসবাস করেন। অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রম ও প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী প্রবীণের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজে পরিবার এখনো প্রবীণদের প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পারিবারিক সম্পর্ককে সার্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পরিবারকে আরো সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

সময়ের দাবি হলো বার্ধক্যকে শুধু বয়সের বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনব্যাপী প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আর্থিক সঞ্চয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতনতা, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং পারিবারিক সম্পর্কের যত্ন। আজকের প্রস্তুতিই আগামী দিনের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের ভিত্তি। কারণ প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য সত্যি অন্ধকারে যাত্রার শামিল।

 

লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও সংগঠক