যে আমলে পুরো বছর রোজা রাখার সওয়াব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামী জীবন ডেস্ক
শেয়ার
যে আমলে পুরো বছর রোজা রাখার সওয়াব

পবিত্র রমজান মাস ছিল মুমিনের আমলের মৌসুম। এ মাসের আমলগুলো যেন পুরো বছর অব্যাহত থাকে সেটাই এ মাসের প্রধান শিক্ষা। এর মাধ্যমে রোজার সামর্থ্যের জন্য মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়। কোরআনে রোজা রাখার নির্দেশের পরই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা এসেছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘যেন তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কোরো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কোরো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম দিক হলো, আমল করা অব্যাহত রাখা। এর মধ্যে রমজানের পর শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা গুরুত্বপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবাদের তা রাখার নির্দেশ দিতেন।

আবু আইউব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজানে রোজা রাখবে এবং পরবর্তী সময়ে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখবে সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৬৪)

ছয় দিনের রোজায় পুরো বছরের সওয়াব

রমজান মাসে রোজা রাখার পর শাওয়াল মাসে আরো ছয়টি রোজা রাখলে পুরো বছর রোজার সওয়াব পাওয়া যায়। সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, মহান আল্লাহ সব ভালো কাজের প্রতিদান ১০ গুণ করে দেন। তাই রমজান মাস ১০ মাসের সমতুল্য এবং পরবর্তী (শাওয়াল মাসের) ছয় রোজার মাধ্যমে এক বছর পূর্ণতা লাভ করে।

’ (নাসায়ি : ২/১৬২)

পুরো বছর সওয়াব হয় যেভাবে

মূলত রমজান মাসের রোজার পর অতিরিক্ত ছয় রোজা মিলে সাধারণত ৩৬টি রোজা হয়। আর তা ১০ গুণ করলে মোট ৩৬০টি হয়। কারণ মুমিনের যেকোনো আমলের সওয়াব ১০ গুণ করে দেওয়া হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ কোনো ভালো কাজ করলে সে তার ১০ গুণ পাবে। আর কেউ কোনো খারাপ কাজ করলে তাকে শুধু তার প্রতিফলই দেওয়া হবে; তাদের ওপর কোনো জুলুম করা হবে না।

’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬০)

রমজানের রোজার পরিপূরক

নফল আমলের মাধ্যমে ফরজের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা হয়। তেমনি শাওয়ালের রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজার ত্রুটিগুলো পূর্ণ করা হবে। নামাজ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার ফরজ নামাজের হিসাব করা হবে। তা ঠিক থাকলে সে সফলকাম। আর তাতে সমস্যা হলে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর কোনো ফরজ আমলে অপূর্ণতা দেখা দিলে মহান রব বলবেন, তোমরা দেখো, আমার বান্দার কি কোনো নফল নামাজ রয়েছে? নফল থাকলে তা দিয়ে ফরজকে পরিপূর্ণ করা হবে। এভাবে সব ফরজ আমলের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৪১৩)

ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেছেন, শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা হওয়ার মধ্যে বিশেষ রহস্য রয়েছে। তা হলো এই ছয়টি রোজা রমজানের রোজার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। রোজার মধ্যে যেসব ভুল-ত্রুটি হয়েছে অতিরিক্ত রোজাগুলো তা দূর করে দেয়। বিষয়টি ফরজ নামাজের পর সুন্নত ও নফল নামাজের মতো এবং নামাজে ভুল হলে সিজদায়ে সাহু দেওয়ার মতো।

যেভাবে রাখতে হয়

শাওয়াল মাসের যেকোনো দিন এই ছয়টি রোজা রাখা যাবে। কেউ চাইলে মাসের শুরুতে রাখতে পারবে। কেউ চাইলে মাসের মধ্য ভাগে কিংবা শেষ অংশেও রাখতে পারবে। কেউ চাইলে তা অল্প অল্প করে পুরো মাসে রাখতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে নফল আমলের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকা উচিত। সেই হিসেবে মাসের শুরুতেই এই আমল করা উত্তম।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দিন।

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়

মুফতি আতাউর রহমান
মুফতি আতাউর রহমান
শেয়ার
আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়

আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা। প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহও তাঁর বান্দাকে ভালোবাসবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৪)

আল্লাহর ভালোবাসার গুরুত্ব

শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) এক ফাতাওয়ায় বলেছেন, ‘মুমিনের জন্য হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা ওয়াজিব।

যে ভালোবাসার সমকক্ষ আর কিছুই হবে না। সুতরাং আল্লাহই হবেন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে প্রিয়। আর আল্লাহর প্রতি সত্য ভালোবাসার দাবি হলো, তাঁর আনুগত্য করা, পাপ পরিহার করা, আল্লাহর রাসুল ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের ভালোবাসা। আল্লাহর শত্রুদের অপছন্দ করা এবং আল্লাহর জন্য তাদের ঘৃণা করা।

১. আল্লাহর ভালোবাসা ঈমানের দাবি : মুমিনের ঈমানের দাবি হলো আল্লাহকে ভালোবাসা। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা পেয়ে যায় : ১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সব কিছু অপেক্ষা বেশি প্রিয় হবে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৮৭)

২. আল্লাহর ভালোবাসা মুমিনের

বৈশিষ্ট্য : আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা লালন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা মুমিন তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)

৩. ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে লেখেন, ‘আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তরের শক্তি, আত্মার খোরাক ও চোখের প্রশান্তি। সেটা এমন জীবনীশক্তি, যা থেকে যে বঞ্চিত হয় সে যেন প্রকৃতার্থেই মৃত। আল্লাহর ভালোবাসাই ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা।’ (মাদারিজুস সালিকিন : ৩/৮)

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়

কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়গুলো বর্ণনা করা হলো—

১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য : মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো।

আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)

২. ভালো কাজ করা : মহান আল্লাহ সেসব মানুষকে ভালোবাসেন, যারা সৎকর্মপরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সৎ কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

৩. দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জন করা : যারা পূতঃপবিত্র থেকে ভালোবাসে এবং যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। দেহের পবিত্রতা হলো বাহ্যিক নাপাকি থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)

৪. আল্লাহভীতি অর্জন করা : যাপিত জীবনে আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৬)

৫. আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : আল্লাহর ওপর আস্থাশীল বান্দাদের আল্লাহ ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

৬. নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভে সাহায্য করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৩)

৭. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)

৮. ন্যায়বিচার করা : আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)

আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
 

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

শরিফ আহমাদ
শরিফ আহমাদ
শেয়ার
ঘরোয়া পরিবেশে মুমিনের আমল

ঘরবাড়ি প্রত্যেক মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র।‌ দিনশেষে ক্লান্তির শেষ ঠিকানা। ঘরে ইবাদতের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে পরিবারে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে। পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

সুন্দর মন-মানসিকতায় ঘরগুলো দুনিয়ায় জান্নাতের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তাই এ বিষয়ে সব নারী-পুরুষের সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ঈমান-আকিদা পরিশুদ্ধ করা

নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ঈমান-আকিদা বিশুদ্ধ রাখা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা ঈমান-আকিদা সঠিক না হলে কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না।

তবে নারীদের ঈমান-আকিদা শুদ্ধ রাখার গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ তারা পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের অন্যতম স্তম্ভ। বিশুদ্ধ ঈমান আমলের অধিকারীদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুমিন থাকা অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদেরকে তাদের উত্কৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব।
’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)

নামাজের স্থান নির্দিষ্ট করা

ইসলাম নারীদের জন্য বিশেষ সম্মান ও নিরাপত্তার বিধান দিয়েছে। নামাজের ক্ষেত্রে ঘরের অভ্যন্তরীণ স্থানকে সর্বোত্তম বলেছে। এটি তাদের ইজ্জত, পর্দা ও সম্মান রক্ষার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রা.)-এর স্ত্রী উম্মে হুমাইদ একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়তে আমার ভালো লাগে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তা আমি জানি।

তবে শোন, তোমার জন্য তোমার ঘরের অভ্যন্তরে নামাজ পড়া বারান্দার কামরায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।

আবার বারান্দার কামরায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। এবং তোমার ঘরের আঙিনায় নামাজ পড়া তোমার জন্য তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম, একইভাবে তোমার মহল্লার মসজিদে নামাজ পড়া তোমার জন্য আমার মসজিদে এসে আমার সঙ্গে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। হাদিসের বর্ণনাকারী বলেন, এ কথা শোনার পর তিনি পরিবারের লোকদের ঘরের ভেতরে নামাজের স্থান বানাতে বলেন। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তা নির্মাণ করা হলো। এরপর তিনি মৃত্যু পর্যন্ত এখানেই নামাজ পড়তে থাকেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ২২১৭)


দোয়া ও জিকিরের আমল

বেশির ভাগ সময় নারীরা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। প্রয়োজনীয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে দোয়া ও জিকির করা যায়। এতে তাঁদের আত্মিক প্রশান্তি ও ঈমানের দৃঢ়তা এনে দেয়। আল্লাহর ভালোবাসা ও রহমত লাভের পথ সুগম করে। প্রিয় নবীর প্রিয় পরিবারে সকাল-সন্ধ্যায় আমলের পরিবেশ ছিল। জুওয়াইরিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যুষে তাঁর নিকট থেকে বের হলেন। যখন তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন তখন তিনি নামাজের জায়গায় ছিলেন। এরপর তিনি চাশতের সময়ের পর ফিরে এলেন। তখনো তিনি বসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম তুমি সেই অবস্থায়ই আছ? তিনি বলেন, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি তোমার নিকট থেকে যাওয়ার পর চারটি কালেমা তিনবার পাঠ করেছি। আজকে তুমি এ পর্যন্ত যা বলেছ তার সঙ্গে ওজন করলে এই কালেমা চারটির ওজনই বেশি হবে। কালেমাগুলো এই—‘সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি আদাদা খলকিহি ওয়া রিদা নাফসিহি ওয়া ঝিনাতা আরশিহি ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬৫)

উন্নত আখলাক ও চরিত্র গঠন

ঘরবাড়িতে ইবাদতময় পরিবেশ তৈরিতে পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত আখলাক ও চরিত্র পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতির সবক শেখায়। এর উল্টো চিত্র হলে কখনোই ঘর কুসুম কাননের সৌরভে ভরা সম্ভব নয়। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো, অমুক মহিলা দিনে রোজা রাখে আর সারা রাত ইবাদত-বন্দেগি করে। কিন্তু সে কটু কথা বলে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো লাভ নেই—সে জাহান্নামে যাবে। আর এক মহিলা সম্পর্কে বলা হলো যে সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসে রোজা রাখে এবং যথাসাধ্য দান-সদকা করে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে জান্নাতে যাবে। (মুসতাদরাকে হাকেম, হাদিস : ৭৩০২)

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
ড. আবুু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
শেয়ার
রমজানের বাইরে যেসব সময়ে রোজা রাখা সুন্নত

রমজান মাস এবং ফরজ রোজা শেষ হলেও বছরজুড়ে বিভিন্ন রোজা রয়েছে। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সেসব রোজার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বছরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রোজার বিবরণ নিম্নরূপ—

১. এক দিন পর পর রোজা

এক দিন পর পর রোজা রাখাকে সাওমে দাউদ বলে। দাউদ (আ.) এভাবে রোজা রাখতেন।

নবী (সা.) এটিকে সর্বোত্তম রোজা বলেছেন এবং বেশি রোজা রাখতে আগ্রহীদের এভাবে রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। (বুখারি, হাদিস : ১৮৭৮; মুসলিম, হাদিস : ২৭৯৩)         

২. সপ্তাহের রোজা

সপ্তাহের প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা রাসুল (সা.) পছন্দ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার (বান্দার) আমল (আল্লাহর কাছে) উপস্থাপিত হয়। আমি পছন্দ করি যে রোজা অবস্থায় আমার আমল উপস্থাপন হোক।

(তিরমিজি, হাদিস : ৭৪৭)

৩. মাসের রোজা

প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের রোজাকে আইয়ামে বিজের রোজা বলে। নিয়মিতভাবে এই তিন দিনের রোজা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (বুখারি, হাদিস : ১৮৮০)

৪. আশুরার রোজা

মহররম মাসের ১০ তারিখ হলো আশুরা। রমজানের রোজা ফরজ হওয়া আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররম মাসের রোজা অর্থাৎ আশুরার রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ অর্থাৎ তাহাজ্জুদ নামাজ। (মুসলিম, হাদিস : ২৮১২)

৫. শাবান মাসের রোজা  

নবী (সা.) শাবান মাসে খুব বেশি পরিমাণে রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে কোনো মাসে বেশি রোজা পালন করেননি। তিনি প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা পালন করতেন।

(বুখারি, হাদিস : ১৮৬৯; মুসলিম, হাদিস : ২৭৭৯)

৬. শাওয়াল মাসের রোজা

রমজানের পর শাওয়াল মাস। অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে রমজানের রোজা রাখে, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন বছরজুড়ে রোজা রাখে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮১৫)

৭. জিলহজ মাসের রোজা

জিলহজ মাসের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত মোট ৯টি রোজার ব্যাপারে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর প্রত্যেক দিনের রোজা এক বছর রোজার সমতুল্য। (তিরমিজি, হাদিস : ৭৫৮)

জিলহজ মাসের নবম দিন হলো আরাফার দিন। এই দিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি আশা করি আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ব ও পরের এক বছরের পাপ মোচন করে দেবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮০৩)

৮. মানতের রোজা

রোজাসহ কোনো কিছুর মানত করলে তা পূরণ হলে মানতকারীর ওপর রোজা পালন করা অপরিহার্য। নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে নির্দিষ্ট দিনে আর অনির্দিষ্ট দিনে রোজা পালন করার মানত করলে যেকোনো দিনে রোজা পালন করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাদের উচিত মানতকে পুরা করা।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৯)

৯. কাজা রোজা

যৌক্তিক ও সংগত কারণে রমজানের রোজা আদায় করতে না পারলে পরে তার কাজা আদায় করতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে। আর কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পুরো করবে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)

১০. কাফফারার রোজা

স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাজাসহ কাফফারা হিসেবে লাগাতার ৬০টি রোজা রাখতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী (সা.) এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধ্বংস হয়ে গিয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কিসে তোমাকে ধ্বংস করেছে? সে বলল, রমজানে রোজা অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার দাস মুক্তির সামর্থ্য আছে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি দুই মাস লাগাতার রোজা রাখতে পারবে? সে বলল, না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি কি ৬০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে পারবে? সে বলল, না। (বুখারি, হা: ১৮৩৪; মুসলিম, হা: ২৬৫১)

এ হাদিস থেকে স্বেচ্ছায় রমজানের রোজা ভেঙে ফেললে কাফফারার বিধান প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কাজের কাফফারায় রোজা পালন করার বিধান রয়েছে।

মন্তব্য

রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
শেয়ার
রমজান মাসের পর মুমিনের করণীয়

চলে গেল বছরের সেরা মাস ‘রমজান’। রমজানের বিদায়ে মসজিদে মুসল্লির ভিড় দেখা যাচ্ছে না! রমজানের বিদায়ে কি নামাজও হলো বিদায়? রমজানের পর অনেকে নামাজ ছেড়ে দেন, এটা দুঃখজনক! বরং সারা বছর রমজানের অর্জনগুলো চর্চায় রাখতে হবে। যেমন—

১. ধর্মভীরুতা : রমজান মানুষের মধ্যে ‘তাকওয়া’ (ধর্মভীরুতা) সৃষ্টি করেছিল। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো, যেমন ভয় করা উচিত এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।

’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১০২)

আয়াতে বর্ণিত ‘আল্লাহকে যথাসম্ভব ভয় করো’ এবং ‘মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না’ বাণীদ্বয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লামা বায়যাভির (রহ.) মতে, তাকওয়ার সোপান তিনটি—(ক) শিরক থেকে বিরত থাকা (খ) সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা (গ) পাপের ভয়ে বৈধ কাজও পরিহার করা।

২. ধৈর্য : রমজান মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। শান্তিতে, সংগ্রামে, রোগ-যন্ত্রণায়, দুঃখ-শোক, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় তথা জীবনের সব প্রতিকূল ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনন্ত সংগ্রাম করাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের প্রতীক।

সুরা বাকারার  ১৫৫ ও ১৫৬ নম্বর আয়াতে ধৈর্যধারণের ক্ষেত্রের বর্ণনা আছে : (ক) ভয়, (খ) ক্ষুধা, (গ) সম্পদহানি, (ঘ) প্রাণহানি, (ঙ) শস্যহানি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা ধৈর্যশীল থাকে অভাব-অভিযোগে, রোগশোকে এবং রণক্ষেত্রে...’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৭৭)

মুফতি মুহাম্মদ শফির (রহ.) মতে, ধৈর্য বা সবর তিন প্রকার—

১.   নফসকে (প্রবৃত্তি) হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা।

২.   আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা।

৩.   যেকোনো বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা।

৩. সহানুভূতি : হাদিসের ভাষায় সহানুভূতির মাস রমজান। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা ধৈর্য-সহিষ্ণুতা অবলম্বন করো এবং সহিষ্ণুতায় পারস্পরিক প্রতিযোগিতা করো; সহিষ্ণুতার বন্ধনে নিজেদের আবদ্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারো।’ (সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ২০০)

মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও ধর্মভীরুতায় একে অন্যকে সহযোগিতা (প্রতিযোগিতা) করবে... আল্লাহকে ভয় করে চলো...’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

৪. পাপ পরিহার : রমজান মানুষের ষড়রিপুর বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় নবীর (স.) ভাষায় ‘রোজা ঢালস্বরূপ’। অথচ সিয়াম সাধনার দ্বারাও যারা মিথ্যা পরিহারের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন ‘তাদের পানাহার পরিত্যাগের কোনোই মূল্য নেই।

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘তোমরা মিথ্যার ব্যাপারে সাবধান হও। কেননা, মিথ্যা পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।’ (বুখারি)

৫. কথাবার্তায় সংযম : রোজা মানুষকে কথাবার্তায় সংযমী করে। আমরা যা কিছু বলি, যা কিছু করি মহান আল্লাহ সবই জানেন, দেখেন, বোঝেন এবং বলেন ‘মানুষ যে কথাই বলুক না কেন তার কাছে একজন দৃষ্টিপাতকারী প্রস্তুত থাকে।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ১৮)

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই-ঝগড়া করা কুফরি।’ (বুখারি)

এখন ভাবা উচিত রমজানের শিক্ষা আমাদের জীবনে কতটুকু?

৬. তাওবা : তাওবার মাস রমজান। তাওবার গুরুত্ব অপরিসীম। রমজানের শিক্ষা, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ না হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ। যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না...’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তান দোষ-ত্রুটিপূর্ণ ও অপরাধী, আর অপরাধীর মধ্যে ওই সব লোক উত্তম, যারা তাওবা করে।’ (তিরমিজি)

৭. দোয়া : দোয়া কবুলের মাস রমজান। আমাদের কর্তব্য, সারা বছর সমর্পিতচিত্তে দোয়া করা। দোয়া অর্থ ডাকা বা চাওয়া। মহান আল্লাহর বাণী ‘যখন কোনো প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৬)

পবিত্র কোরআন-হাদিসে ও বুজুর্গাণের বহুল চর্চিত-পরীক্ষিত আমলে দোয়ার শক্তির ধারণা মেলে। মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৬০)

৮. তিলাওয়াত : রমজানে আমরা নিয়মিত তিলাওয়াত করেছি। রমজানের পরও উচিত, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস বজায় রাখা। পবিত্র কোরআন ও রমজানের প্রাণোচ্ছাসে মুজাদ্দিদ আলফিসানির (রহ.) নিবেদন :

‘এ আবে হায়াত থেকে পিপাসা চাহি না মিটাতে কভু

এর মাঝে যেন হরদম মোর তৃষ্ণা বাড়ান প্রভু।’

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ