যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বড় দরপতন হয়েছে সোনার। ইরান ও মার্কিন সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদের হার চড়া রাখতে পারে—এমন গুঞ্জনে মঙ্গলবার (২৬ মে) আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ান্দা ও রয়টার্সের তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড বা প্রতি আউন্স (১ ভরি সমান ০.২৬৬ আউন্স) সোনার দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৫২১ দশমিক ৮০ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। তবে জুন মাসে সরবরাহের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সের দাম অপরিবর্তিত থেকে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৫২২ দশমিক ৫০ ডলারে স্থিতি পেয়েছে।
অ্যাক্টিভট্রেডসের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক রিকার্দো ইভাঞ্জেলিস্টা বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক এই অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দাম বেড়ে গেছে। এটি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির ভয়কে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর অবস্থান থেকে সরে এসে তা আরো বাড়াতে পারে, এমন ধারণাই এখন বাজারে প্রবল। আর সুদের হার বাড়লে সোনা সঞ্চয় করার আগ্রহ কমে যায়, কারণ সোনা থেকে সরাসরি কোনো সুদ বা লভ্যাংশ আসে না।’
তিনি আরো বলেন, সোনার দামের প্রবণতা এখন নিচের দিকেই নামার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখছেন। পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পিইসি (পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার) মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন তারা।
সম্প্রতি ইরানের ভেতরে মার্কিন সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালানোর পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এই হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকট দ্রুত সমাধানের যে আশা দেখা দিয়েছিল, তা অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া রাখে। সোনাকে সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ বা ‘হেজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, চড়া সুদের হারের কারণে বিনিয়োগকারীরা সোনার চেয়ে বন্ড বা ডলারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন।
বন্ডের উচ্চ মুনাফা (ইল্ড) এবং শক্তিশালী ডলারের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএস বছরের শেষ নাগাদ সোনার দামের লক্ষ্যমাত্রা আউন্সপ্রতি ৪০০ ডলার কমিয়ে ৫ হাজার ৫০০ ডলারে নামিয়ে এনেছে।
তবে ইউবিএস তাদের পূর্বাভাসে আরো জানিয়েছে, ‘বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল রাজস্ব ঘাটতি এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ডলারের বিকল্প হিসেবে রিজার্ভ বহুমুখীকরণের প্রবণতার কারণে দীর্ঘমেয়াদে সোনার মতো বাস্তব বা কঠিন সম্পদের (হার্ড অ্যাসেট) কৌশলগত গুরুত্ব বজায় থাকবে। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে তেলের দাম কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে সোনার বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’
সোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। রুপার (স্পট সিলভার) দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৬ দশমিক ০৩ ডলারে নেমেছে। এছাড়া প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১ হাজার ৯৪৫ দশমিক ৮৫ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ১ হাজার ৩৭৪ দশমিক ০৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।