দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার কারণে সুদ আদায় স্থগিত থাকায় দেশের ব্যাংকিং খাতের মূল আয়ের উৎস নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে এসেছে। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন ছিল ১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সুদ আয় ৮ দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে আমানতের সুদসহ সুদ-সংক্রান্ত ব্যয় বেড়েছে ২৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোর আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, যা খাতটির মুনাফা ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যাংকাররা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘দুই ধারবিশিষ্ট তলোয়ারের’ সঙ্গে তুলনা করছেন। একদিকে অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে ঋণ বিতরণ ও সুদ আয় কমছে, অন্যদিকে আমানতকারীদের নির্ধারিত সুদ পরিশোধ অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। ফলে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশের তহবিল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও মন্থর হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি সংকটে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার আওতায় দুই বছর পর্যন্ত সুদ আদায় স্থগিত রাখার সুবিধাও ব্যাংকগুলোর সুদ আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, খেলাপি ঋণের কারণে আমানতের একটি বড় অংশ আটকে থাকলেও ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এটি। তিনি জানান, ২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য লাভজনকতার সূচকেও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এ সময়ে খাতটির রিটার্ন অন অ্যাসেটস নেমে হয়েছে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং রিটার্ন অন ইকুইটি কমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ।
তার ভাষ্য, সম্পদের গুণগত মানের অবনতি, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের দুর্বল প্রয়োগের কারণে ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতের ৩২ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে কোনো আয় পাচ্ছে না, অথচ আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হয়ে গেছে। এটি ব্যাংকগুলোর জন্য ভালো লক্ষণ নয়। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকিং ব্যবসার টেকসইতা এখন ঝুঁকির মুখে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণও বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণের পরিবর্তে বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। পাশাপাশি কিছু আয় নিশ্চিত করতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মতো ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগে ঝুঁকছে।
মাহবুবর রহমানের ভাষায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার কারণে বিদ্যমান সংকটাপন্ন ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে দুই বছর সুদ আদায় স্থগিত রাখতে হচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর মূল আয়ের উৎস নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকগুলোর সুদভিত্তিক আয় বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ব্যাংকিং খাতের মুনাফা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন