‘আমি কিবায় ঘর লইয়াম। আমার তো সবই শেষ। তা অইলে আমার বাইচ্যা থাইক্যা লাভ নাই। আমার ইয়াসিনরে তোমরা আইন্যা দেও’ এভাবেই আহাজারি করতে করতে মুর্চা যান মা ফিরোজা খাতুন।
ফের বলে উঠেন,‘বাবারে কই গিয়া তুমি মরলা, সাত সমুদ্র ১৩ নদী পাড় অইয়া আমি কিবায় যাইয়াম, আর কিবায় তোমারে আমি পাইয়ম?
এভাবেই কান্না করছিলেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে নিহত ইয়াসিন মিয়া শেখের (২২) মা ফিরোজা খাতুন। গত দুই দিন ধরে ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে প্রায় পাগল তিনি। যারাই তাদের বাড়িতে যাচ্ছেন তাদের ছেলের লাশটা ফেরত আনার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেন।
ইয়াসিন মিয়ার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামে।
তিনি ওই গ্রামের মৃত আবদুস সাত্তার শেখের ছেলে। গত ২৭ মার্চ ইয়াসিন নিহত হলেও স্বজনেরা জানতে পারেন ঈদের পরদিন মঙ্গলবার। রাশিয়ায় থাকা ইয়াসিনের বন্ধু মেহেদী হাসান মুঠোফোনে ইয়াসিনের বড় ভাই রুহুল আমিনকে মৃত্যুর খবর দেন। ইয়াসিনের মৃত্যুর খরব পাওয়ার পর থেকে পরিবারে মাতম চলছে।
জানা যায়, ছোট বেলা থেকেই ইয়াসিনের স্বপ্ন ছিল ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি করার। কিন্তু বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় জেদ কাজ করে তার। পরে ১৫ লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় একটি কম্পানিতে চাকরি নেন তিনি। কয়েক মাস পর চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও নিয়মিত নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করতেন। কিন্তু ঈদের পরদিন গত মঙ্গলবার তার মৃত্যুর খবর পেয়েছে পরিবার। যুদ্ধ চলাকালে মিসাইল হামলায় তিনি প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন রাশিয়ায় থাকা পরিচিতজনেরা।
দ্বিতীয়বারের মতো আজ শুক্রবার সকালে ইয়াসিনের বাড়িতে গেলে দেখা যায় নম্রভদ্র ও সুপরিচিত ইয়াসিনের মৃত্যুর খবর শুনে আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও দুর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসছেন। ভেতরে প্রবেশ করেই কান্নার আওয়াজ পেয়ে অনেকেই স্তব্ধ হয়ে যান। ঘরের ভেতর সারাক্ষণ থেমে থেমে কান্না করছেন মা ফিরোজা ও পরিবারের লোকজন। কোনো সান্ত্বনাই কাজে আসছে না।
ইয়াসিনের স্বজনেরা জানায়, ২০১৬ সালে ইয়াসিনের বাবা মারা গেছেন। তার বড় ভাই পড়াশোনা ও বিদেশযাত্রার খরচ দিয়েছেন। ৪০ শতক জমি বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দিয়ে গত বছরের ২২ আগস্ট রাশিয়ায় যান ইয়াসিন। সেখানে রাশিয়ার একটি কম্পানিতে চাকরি করতে যান। পরে অনলাইনে আবেদন করে গত ২২ ডিসেম্বর চুক্তিভিত্তিক যোদ্ধা হিসেবে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রশক্ষণের পর ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেন।
সেখান থেকে ছবি ও ভিডিও নিয়মিত নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করতে থাকেন। গত ১ মার্চ ফেসবুকে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি ভিডিও আপলোড করেন ইয়াসিন। ভিডিওতে তার অনেক আক্ষেপ, অভিযোগ ছাড়াও নিজের চ্যালেঞ্জে রাশিয়ায় যাওয়া, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া ও তার স্বপ্নপূরণ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
ইয়াসিনের প্রতিবেশী ও বন্ধু আরিফ বলেন, রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে রাশিয়ার ভাষা শেখেন ইয়াসিন। পরে সেখানে এক বন্ধুর সহায়তায় রাশিয়ায় একটি কম্পানিতে ভালো চাকরি পান। সবই ঠিকঠাক চলছিল। পরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে সব উলটপালট হয়ে যায়।
তিনি বলেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সময় ইয়াসিনের মা ও বড় ভাইকে ঢাকায় নিয়ে অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর নেয় রাশিয়া পাঠানো এজেন্সির লোকজন।
জানা যায়, গত ২৬ মার্চ মা ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয় ইয়াসিনের। এখন ছেলের ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন তিনি। ফিরোজা খাতুন বলেন,‘অনেক টেহা দিয়া পাডাইছি। তার অর্ধেক ঋন। বাজান (ছেলে) খালি কইতো এই তো পাডাইতিাছি। কম দিনের মধ্যেই সব টেহা পরিশোধ কইর্যা দিবো। অহন আমার টেহার দরহার নাই, খালি আমার বুকের ধনরে আইন্যা দেও।’
এদিকে ইয়াসিনের মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসেন গৌরীপুর উপজেলা বিএনপির নেতা ও ময়মনসিংহ (উত্তর) বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি হাফেজ আজিজুল হকসহ দলীয় নেতাকর্মীরা। এ সময় তিনি নিহত পরিবারের প্রতি সহনুভুতি প্রকাশ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যার তারেক রহমানের পক্ষে নিহত ইয়সিনের মায়ের হাতে নগদ অর্থ তুলে দেন।