মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।
ওই বাস্তবতায় সেই যাত্রায় ব্যর্থ হয়ে এখন তা হাইপ তোলার অপচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ঘাড়ে চড়ে। ‘বাংলাদেশ নতুন করে গড়ে উঠছে, ইসলামী কট্টরপন্থীরা সুযোগ খুঁজছে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে পুঁজি করে আবার একটা নাড়া দেওয়ার আয়োজন যে কারোই বোধগম্য। বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয়’ মন্তব্যশ্রায়ী তথ্য দিয়ে হাইপ তোলার এ প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগ। প্রতিবেদনটি প্রকারান্তরে একটি প্রবন্ধ। যার বর্ণনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে অতিসরলীকৃতভাবে দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে অস্বীকার করা হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে। বাছাই করা কিছু ঘটনা তুলে ধরে সাজানো প্রবন্ধটিতে রক্ষণশীল আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি, সেখানে নারীদের দেখানো হয়েছে অনগ্রসর করে। এবারের ‘যুব উৎসব ২০২৫ এখানে উদাহরণ হিসেবে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে অংশ নিয়েছে। তিন হাজার খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে নারীরা। এই বিশাল ইভেন্টে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী তরুণী ও বিভিন্ন স্তরের নারীদের যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণবন্ততা প্রমাণ করে। একটি মাত্র ফুটবল খেলা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া মানে এই নয় যে, বাকি দুই হাজার ৯৯৯টি সফল আয়োজনের মূল্য নেই। টাইমস তা-ই বোঝানোর চেষ্টা করেছে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে এনে গোটা অগ্রগতিকে খাটো করে দেখানো মোটেই সাংবাদিকতা নয়। এটি চাতুরীর রাজনীতি।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে। টাইমসের প্রতিবেদনে এর সামান্যতম উল্লেখ নেই। বেশ গুছিয়ে আরেকটি ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেননি ‘মন্তব্যে’র মধ্য দিয়ে। যা কেবল অসত্য-বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং এটি তার দীর্ঘদিনের নারী ক্ষমতায়নের কাজকে অস্বীকার করা। ড. ইউনূসের নারীর ক্ষমতায়নের অন্তপ্রাণ চেষ্টা বিশ্বব্যাপী একটি রোল মডেল। গ্রামীণ ব্যাংক ও তার ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার স্বীকৃতি তাকে নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশের নারীরা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের লিঙ্গ সমতা সূচকে ৭৩তম অবস্থানে বাংলাদেশ। নারী ফুটবল ও ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪০% কর্মকর্তা নারী। পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে হাজারো নারী কাজ করছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একজন নারী মেজর জেনারেল নিয়োগ দিয়েছে। অথচ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে নারীদের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টাও চালানো হয়েছে। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা মূলত রাজনৈতিক এবং এর অনেকগুলো ঘটনাকে ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনসমর্থন পেতে ধর্মকে ব্যবহার করে, যা সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন বলে চালানোর মওকা খোঁজা হয়। টাইমসেও তা করা হয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর দিন তিনেক বাংলাদেশ ছিল পুলিশহীন, কার্যত সরকারহীন। এ সময়টাতে সাম্প্রদায়িক গোলমালসহ সামাজিক গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা চলে।
অবাক-বিস্ময়করভাবে ছাত্র-জনতা, আলেম-ওলামারা তখন নিজ থেকেই এগিয়ে আসে ঐক্যের আলোকবর্তিকা হয়ে। তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় দাঁড়িয়ে গেছে কারো নির্দেশ ছাড়াই। পাহারা দিয়েছে মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। দায়বদ্ধতা ও ঐক্যের ওই বাতাবরণ অটুট থাকলে এখন ঐক্য ঐক্য করে মাথা পানি করতে হয় না। ৮ আগস্ট ক্ষমতা নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষাকে টপ প্রায়োরিটি হিসেবে নিয়েছে। এই লক্ষ্যে সেনা-জনতা এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। যা বাংলাদেশে চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটি লাল সংকেত। এর পরও দেশে চরমপন্থার উত্থানের গল্প সাংবাদিকতার অপমান।
কারো বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তি। বিগত কয়েক মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা বাজার হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও বেশ আলোচিত। বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চোখ-চশমায় ঘুরছে। কেবল গত সপ্তাহে ড. ইউনূসের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ২.১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।
‘ইনভেস্টরস কনফারেন্সে ৫০টি দেশের দুই হাজার ৩০০ প্রতিনিধিসহ মেটা, উবার, স্যামসাং-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। পরিবর্তন ও অগ্রগতির এমন এক সন্ধিক্ষণে নিউইয়র্ক টাইমস অবিচার করেছে বাংলাদেশের ওপর। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, তাদের ঘরবাড়ি দখল, জ্বালাও-পোড়াও, মাজারে আক্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা, নারীদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি কিংবা পোশাকের কারণে নারীদের হেনস্থা করার মতো কিছু ঘটনাকে রঙিন মোড়কে সামনে এনে বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থানের কাহিনি প্রচারের এজেন্ডা নতুন আয়োজনে আরো জোরদার করা হয়েছে। উগ্রবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। এর জেরে গণতন্ত্র একটি নতুন চ্যালেঞ্জে।
বাংলাদেশ আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মাধ্যমে তা মোকাবেলায় আগেভাগেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেখানে বিচ্ছিন্ন কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বক্তব্য ও কার্যকলাপকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে পরিচায়ক করা দুরভিসন্ধিমূলক। বাংলাদেশে মৌলবাদীরা নারী ফুটবল বন্ধ করে দিয়েছে মর্মে পুরনো রেকর্ডটি নতুন করে বাজিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়, জয়পুর হাটে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়াজক কমিটি বিনা টিকেটে ফুটবল আয়াজনের অনুমতি নিলেও শর্ত ভঙ্গ করে টিনের বেড়া দিয়ে টিকেটের ব্যবস্থা করে। এতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এছাড়া মাঠের পাশে অশ্লীল নৃত্যের কারণে স্থানীয় কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে ভুল-বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে। তবে মূলত টিকিট ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে সেখানে বিশৃঙ্খলা ঘটে যা নিয়ে মিডিয়ায় ভুলভাবে তথ্য ছড়ানো হয়৷ সেদিনের ম্যাচটি পরিত্যক্ত হলেও ৭ দিন পরে ম্যাচটি কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ করা হয়েছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রী হয়রানির শিকার হন। তবে এটি একটি ব্যক্তিগত অপরাধ, ধর্মীয় কোনো বিষয় নয়। আর পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আরো দাবি করা হয়েছে, ইসলাম অবমাননার শাস্তি না দিলে মৌলবাদীরা নিজেরাই বিচার করবে। ২০১৩ সালে একটি ইসলামি দল হাইকোর্টে ধর্ম অবমাননার শাস্তি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে রিট করেছিল, যা আদালত খারিজ করে দেয়। বর্তমানে সরকার এই ধরনের কোনো দাবি গ্রহণ করেনি।
দাবি করা হয়েছে যে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ বেড়েছে। সরকার হিজবুত তাহরিরের মতো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। গত এক বছরে ২০০ জনের বেশি উগ্রপন্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর যে মিছিলের কথা বলা হচ্ছে, তা বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকার ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র এর একটি অপচেষ্টা, যা বর্তমান সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি মুসলিম উগ্রপন্থীরা ছিল না, বরং হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন ইসকনই সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে প্রবল আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত ধৈর্যশীলতা দেখিয়েছে। দাবি করা হয়েছে নতুন সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে বহুত্ববাদ আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে বহুত্ববাদ আনার দাবির বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং বহুত্ববাদ নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
বহুত্ববাদ একটি সামাজিক ধারণা, যা বিভিন্ন ধর্ম, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করে, কিন্তু এটি ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীত নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রীয় নীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। অতএব, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে-এমন তথ্য অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক। বাংলাদেশ আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মতো উগ্রবাদী হচ্ছে তথ্যও একটি রটনা। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, মডারেট মুসলিম কান্ট্রি। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিশীল দেশগুলোর একটি।
এরপরও একের পর এক অভিযোগের তীর যখন ছোঁড়া হচ্ছে, সেইক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার আবশ্যকতা রয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলা ভিশন