কোন পথে দেশের রাজনীতি?

বাংলাদেশ প্রতিদিন
বাংলাদেশ প্রতিদিন
শেয়ার
কোন পথে দেশের রাজনীতি?
ড. মঞ্জুরে খোদা

২০২৪ সালের শেষ সময়গুলো বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ঘটনাবহুল ছিল। ২০২৫ সালেও কি তেমন কিছু হবে, এই প্রশ্ন নতুন বছরকে ঘিরে নাগরিকদের মনে আসতেই পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আলোচনা আরও প্রবল হয়েছে। কেননা জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, দ্রব্যমূল্য কমবে, জনজীবনে সংকট দূর হয়ে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা তৈরি হবে কিন্তু সেটা হয়নি।

যে কারণে নতুন বছরকে ঘিরে মানুষের আশা ও আশঙ্কার দুই-ই আছে।

গত ১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ড. ইউনূসের ভাষণের পর মনে হয়েছে নতুন বছর বুঝি আমাদের জন্য খুব একটা স্বস্তিকর হবে না। তিনি তাঁর ভাষণে জাতীয় নির্বাচনের একটা সম্ভাব্য ভাবনা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষে অথবা ২০২৬-এর মাঝামাঝিতে নির্বাচন হতে পারে।

কেন তিনি নির্বাচনের একটি পরিষ্কার সময় দিতে পারছেন না, তার একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি অল্প কিছু সংস্কার করে ভোটার তালিকা নির্ভুলভাবে তৈরি করার ভিত্তিতে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়, তাহলে ২০২৫ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়তো সম্ভব হবে। আর যদি এর সঙ্গে নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত মাত্রার সংস্কার যোগ করি তাহলে আরও অন্তত ছয় মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।’

নির্বাচন নিয়ে তাঁর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।

বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নির্বাচন নিয়ে একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের বক্তব্য সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলো যদি তিন মাসের প্রস্তুতিতে নির্বাচন করতে পারে এই সরকার কেন অতিরিক্ত সময় নেবে? তারা বলেছে, তিন থেকে ছয় মাসের প্রস্তুতিতেই প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচন সম্ভব। সেটা না হওয়াতে তারা নানা দুরভিসন্ধির ইঙ্গিত করেছে। ২০২৫ সালের শুরুতেই নির্বাচন হতে কোনো সমস্যা নেই বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করে ও বিশ্লেষণ করে বের করেছি, এ ক্ষেত্রে সংস্কারে চার থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়।

নির্বাচন নিয়ে এমন ভাবনা শুধু বিএনপির নয় অন্য রাজনৈতিক দলও অভিন্ন মত পোষণ করে। যদিও জামায়াতে ইসলামী সরকারকে সংস্কারের জন্য আরও সময় দিতে চায়। তাদের এই সময় দিতে চাওয়ার কারণ হিসেবে যে কৌশলের কথা জানা যায়, তারা দল গুছিয়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। একটি জাতীয় দৈনিকের এক প্রশ্নে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘কিছু বিলম্ব জাতি মেনে নেবে, যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়।’

২৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির এক জনসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য আবার সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন...।’ তাঁর এই বক্তব্য এসেছে ড. ইউনূসের নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য ধারণা দেওয়ার এক সপ্তাহ পরে। তাঁরা দ্রুত নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করছেন। বিএনপি যদি দ্রুত নির্বাচনের জন্য আন্দোলনে নামে তাহলে প্রশ্ন তারা মিত্র হিসেবে কাদের পাবে? আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অন্য দলগুলোর মধ্যে আছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, মধ্য-বামদলগুলো। কিন্তু এই দলগুলো কি নির্বাচনের ইস্যুতে তাদের সমর্থন করবে?

আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা প্রধান মামলাগুলো থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হলেও তিনি কেন দেশে আসছেন না বা আসতে পারছেন না, জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি তাহলে ‘মাইনাস টু ফর্মুলার’ অংশ। এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া না গেলেও, অনুমান করা কঠিন নয়। প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির ওপর দিয়ে অনেক বিপর্যয় গেছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতার বাইরে যত দিন থাকবে তাদের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে এই দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, ক্ষমতাবাজির অভিযোগ উঠছে। এ ক্ষেত্রে মূল নেতৃত্বের ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় পর্যায়ে তা সামান্যই অনুসরণ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের ছত্রছায়ায় একটি নতুন রাজনৈতিক দল (কিংস পার্টি) গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। যতটুকু জানা যায়, সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার এই সময়ের মধ্যে তারা দলকে নির্বাচনের প্রস্তুতিতে তৈরি করে ভবিষ্যৎ সরকার গঠন করতে চায়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘রাজনৈতিক উদ্যোগ’ বলে ঘোষিত জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের এবং ফ্যাসিবাদীর যারা দোসর রয়েছে, তাদের বিচারের আগে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হবে না (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর)।’

আওয়ামী লীগ এখন সারা দেশে ছাত্র-জনতার ক্রোধ ও প্রতিহিংসার কবলে। তারা কীভাবে রাজনীতিতে সংগঠিত হবেন, ঘুরে দাঁড়াবেন তার হয়তো সে কৌশল ভাবছেন। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা অনলাইনে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত তার দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখছেন। সুতরাং এ মুহূর্তে তাদের মাথায় নির্বাচন কীভাবে আছে সেটা প্রশ্ন। তাদের কাছে হয়তো প্রধান ইস্যু হামলা, মামলা-মোকাবিলা করা ও কারাবন্দিদের মুক্ত করা। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ইস্যু তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। বিএনপি যদি নির্বাচনের ইস্যুতে নিঃসঙ্গ হয় সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গী হতে পারে। অনিশ্চিত নির্বাচনের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দলকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

বিএনপির আকাঙ্ক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান যদি অনড় থাকে তাহলে পরিস্থিতি জটিল ও অরাজক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের প্রতি সেনাবাহিনী সমর্থন কোন পর্যায়ে থাকবে, সে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি শক্ত অবস্থান নেয় সে ক্ষেত্রে বিরোধীদেরও শক্তির পরিধি বাড়াতে হবে। জামায়াত যদি এই প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়, তার সঙ্গে কিংস পার্টি যুক্ত হয় তাহলে রাজনীতিতে একটি ভিন্ন মেরুকরণ ও শত্রুমিত্রের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগও কোনো এক সমীকরণে মাঠে চলে আসতে পারে। বলা হয়, রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রুমিত্র ও শেষ কথা বলে কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে তারা যদি বিএনপির সঙ্গে কোনো বোঝাপড়ায় আসে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগ বাড়িয়ে তা বলাও হয়েছে। সে রকম বাস্তবতা তৈরি হলে নতুন বছরে রাজনৈতিক সংগ্রামে দুটি প্রধান ধারা দৃশ্যমান হবে। সে ক্ষেত্রে আন্দোলন ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সমীকরণ কী হতে পারে?

(১) ক্ষমতার প্রধান দাবিদার বিএনপি কি নির্বাচনে এককভাবে করবে না জোটগত? ইতোমধ্যে তাদের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকারের একটা ঘোষণা আছে। কিন্তু তার অংশীদার কারা, কীভাবে হবে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। কেননা এই মুহূর্তে তাদের কোনো জোট নেই। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেটা হলে কারা থাকবে, তা বিএনপিকে কী সুবিধা দেবে সেটা প্রশ্ন।

(২) জামায়াত ও ইসলামি দলগুলো কি আলাদা জোট করে নির্বাচন করবে? তাদের সঙ্গে প্রক্রিয়াধীন নতুন পার্টির কি কোনো বোঝাপড়া হবে? সেটা হলে তা বিএনপির জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ হবে তার ওপর ভিত্তি করে হয়তো তারা কৌশল নির্ধারণ করবে।

(৩) আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নয় যদিও প্রকাশ্যে তাদের কাজকর্ম নেই। বিএনপি ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের প্রশ্নে তাদের মতামত স্পষ্ট করেছে, নির্বাচন নিয়েও তাদের আপত্তি নেই। আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে তারা উল্লেখিত এই দুই ধারায় কাদের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে তার ওপর নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল।

(৪) এই বাইরে ছোট-মাঝারি অনেক দল আছে নির্বাচনের হিসেবে তারা প্রভাবক না হলেও তাদের সামাজিক অবস্থান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তারা সবাই মিলে যদি এক বৃহত্তর যুক্তফ্রন্টের মতো কিছু একটা করে ভালো প্রার্থী দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, সেটাও দৃশ্যমান একটি ধারা তৈরি হতে পারে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বছরের শেষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রশ্ন ও শঙ্কা তৈরি করেছে, তা নতুন বছরকে প্রভাবিত করবে। সেটা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের ইস্যুতে আন্দোলন শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ সরকারের এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও নানা ইস্যুতে তারা ইমেজ সংকটে ভুগছে। তাই কথার মারপ্যাঁচে ধূম্রজাল সৃষ্টি না করে সংস্কার ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ হাজির করা জরুরি। সেটাই হবে সম্ভাব্য আসন্ন রাজনৈতিক জটিলতা এড়ানোর পথ। সেটা না করতে পারলে একজন বিশ্বনন্দিত ব্যক্তি নিন্দিত হবেন সেটা কারও কাম্য নয়।

লেখক : ড. মঞ্জুরে খোদা, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য

তুলসীর পর টাইমসে ভর : বাংলাদেশকে  কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় নতুন হাইপ

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল
শেয়ার
তুলসীর পর টাইমসে ভর : বাংলাদেশকে 
কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় নতুন হাইপ

ঐতিহ্যগতভাবেই বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বর্গভূমি। বিশ্বব্যাপী এর স্বীকৃতি মডারেট মুসলিম দেশ হিসেবে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষ নিয়ে এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে তাদের বসবাস।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ ও সৌন্দর্যও। বাংলাদেশের সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা ও অন্যান্য শিল্প মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির বেশ প্রভাব ও ছোঁয়া। এর বিপরীতে দেশটিতে গণ্ডগোল পাকাতেও সময়ে সময়ে ইস্যু করা হয় সাম্প্রদায়িকতাকে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা রাজনৈতিক।

আবার ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলে অঘটন ঘটিয়ে রাজনৈতিক মোড়ক দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। কখনো কখনো বড় রকমের ইস্যু আড়াল করতে সাম্প্রদায়িক গোলমাল বাধানোর কাণ্ডকীর্তি এ অঞ্চলে বেশ কয়বার হয়েছে। সেনা, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতায় সেই অপচেষ্টা মারও খেয়েছে। এর পরও থেমে নেই অপচেষ্টাটি।
সামান্য সুযোগ পেলেই খাবলে ধরার মতো লয়ে পড়ে মহলবিশেষ।
  
কিছুদিন আগে একটি মিশন চালানো হয়েছিল ভারত সফরে আসা মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের ওপর ভর করে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ‘গভীর উদ্বিগ্ন’ বলে তার দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ মহলটি বেশ আশাবাদী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের  অবস্থান বদলে গেছে—এ মর্মে তাদের প্রচারণা তুঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা বুমেরাং হয়ে যায় অল্প ক’দিনেই। ট্রাম্পের সেন্ট্রাল প্রশাসন থেকে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছে।

ওই বাস্তবতায় সেই যাত্রায় ব্যর্থ হয়ে এখন তা হাইপ তোলার অপচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ঘাড়ে চড়ে। ‘বাংলাদেশ নতুন করে গড়ে উঠছে, ইসলামী কট্টরপন্থীরা সুযোগ খুঁজছে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে পুঁজি করে আবার একটা নাড়া দেওয়ার আয়োজন যে কারোই বোধগম্য। বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয়’ মন্তব্যশ্রায়ী তথ্য দিয়ে হাইপ তোলার এ প্রকল্পে বিশাল বিনিয়োগ। প্রতিবেদনটি প্রকারান্তরে একটি প্রবন্ধ। যার বর্ণনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে অতিসরলীকৃতভাবে দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে অস্বীকার করা হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে। বাছাই করা কিছু ঘটনা তুলে ধরে সাজানো প্রবন্ধটিতে রক্ষণশীল আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের নারী উন্নয়নে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি, সেখানে নারীদের দেখানো হয়েছে অনগ্রসর করে। এবারের ‘যুব উৎসব ২০২৫ এখানে উদাহরণ হিসেবে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে অংশ নিয়েছে। তিন হাজার খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে নারীরা। এই বিশাল ইভেন্টে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, আদিবাসী তরুণী ও বিভিন্ন স্তরের নারীদের যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণবন্ততা প্রমাণ করে। একটি মাত্র ফুটবল খেলা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া মানে এই নয় যে, বাকি দুই হাজার ৯৯৯টি সফল আয়োজনের মূল্য নেই। টাইমস তা-ই বোঝানোর চেষ্টা করেছে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামনে এনে গোটা অগ্রগতিকে খাটো করে দেখানো মোটেই সাংবাদিকতা নয়। এটি চাতুরীর রাজনীতি।
 
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে। টাইমসের প্রতিবেদনে এর সামান্যতম উল্লেখ নেই। বেশ গুছিয়ে আরেকটি ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস চরমপন্থী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেননি ‘মন্তব্যে’র মধ্য দিয়ে। যা কেবল অসত্য-বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং এটি তার দীর্ঘদিনের নারী ক্ষমতায়নের কাজকে অস্বীকার করা। ড. ইউনূসের নারীর ক্ষমতায়নের অন্তপ্রাণ চেষ্টা বিশ্বব্যাপী একটি রোল মডেল। গ্রামীণ ব্যাংক ও তার ক্যারিয়ারজুড়ে তিনি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার স্বীকৃতি তাকে নোবেল পুরস্কার এনে দিয়েছে। 

বাংলাদেশের নারীরা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের লিঙ্গ সমতা সূচকে ৭৩তম অবস্থানে বাংলাদেশ। নারী ফুটবল ও ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ৪০% কর্মকর্তা নারী। পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে হাজারো নারী কাজ করছেন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একজন নারী মেজর জেনারেল নিয়োগ দিয়েছে। অথচ নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশে নারীদের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টাও চালানো হয়েছে। শেখ হাসিনার বিদায়ের পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা মূলত রাজনৈতিক এবং এর অনেকগুলো ঘটনাকে ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনসমর্থন পেতে ধর্মকে ব্যবহার করে, যা সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তোলে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে ধর্মীয় নিপীড়ন বলে চালানোর মওকা খোঁজা হয়। টাইমসেও তা করা হয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর দিন তিনেক বাংলাদেশ ছিল পুলিশহীন, কার্যত সরকারহীন। এ সময়টাতে সাম্প্রদায়িক গোলমালসহ সামাজিক গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা চলে।

অবাক-বিস্ময়করভাবে ছাত্র-জনতা, আলেম-ওলামারা তখন নিজ থেকেই এগিয়ে আসে ঐক্যের আলোকবর্তিকা হয়ে। তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় দাঁড়িয়ে গেছে কারো নির্দেশ ছাড়াই। পাহারা দিয়েছে মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। দায়বদ্ধতা ও ঐক্যের ওই বাতাবরণ অটুট থাকলে এখন ঐক্য ঐক্য করে মাথা পানি করতে হয় না। ৮ আগস্ট ক্ষমতা নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সুরক্ষাকে টপ প্রায়োরিটি হিসেবে নিয়েছে। এই লক্ষ্যে সেনা-জনতা এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। যা বাংলাদেশে চরমপন্থার বিরুদ্ধে একটি লাল সংকেত। এর পরও দেশে চরমপন্থার উত্থানের গল্প সাংবাদিকতার অপমান।

কারো বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক শক্তি। বিগত কয়েক মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা বাজার হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও বেশ আলোচিত। বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের চোখ-চশমায় ঘুরছে। কেবল গত সপ্তাহে ড. ইউনূসের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ ২.১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে।

‘ইনভেস্টরস কনফারেন্সে ৫০টি দেশের দুই হাজার ৩০০ প্রতিনিধিসহ মেটা, উবার, স্যামসাং-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। পরিবর্তন ও অগ্রগতির এমন এক সন্ধিক্ষণে নিউইয়র্ক টাইমস অবিচার করেছে বাংলাদেশের ওপর। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, তাদের ঘরবাড়ি দখল, জ্বালাও-পোড়াও, মাজারে আক্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা, নারীদের পোশাক নিয়ে কটূক্তি কিংবা পোশাকের কারণে নারীদের হেনস্থা করার মতো কিছু ঘটনাকে রঙিন মোড়কে সামনে এনে বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থানের কাহিনি প্রচারের এজেন্ডা নতুন আয়োজনে আরো জোরদার করা হয়েছে। উগ্রবাদ এখন বৈশ্বিক সমস্যা। এর জেরে গণতন্ত্র একটি নতুন চ্যালেঞ্জে।

বাংলাদেশ আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমের মাধ্যমে তা মোকাবেলায় আগেভাগেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেখানে বিচ্ছিন্ন  কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বক্তব্য ও কার্যকলাপকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে পরিচায়ক করা দুরভিসন্ধিমূলক। বাংলাদেশে মৌলবাদীরা নারী ফুটবল বন্ধ করে দিয়েছে মর্মে পুরনো রেকর্ডটি নতুন করে বাজিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। প্রসঙ্গক্রমে বলতেই হয়, জয়পুর হাটে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়াজক কমিটি বিনা টিকেটে ফুটবল আয়াজনের অনুমতি নিলেও শর্ত ভঙ্গ করে টিনের বেড়া দিয়ে টিকেটের ব্যবস্থা করে। এতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এছাড়া মাঠের পাশে অশ্লীল নৃত্যের কারণে স্থানীয় কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষের সাথে ভুল-বোঝাবুঝির ঘটনা ঘটে। তবে মূলত টিকিট ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে সেখানে বিশৃঙ্খলা ঘটে যা নিয়ে মিডিয়ায় ভুলভাবে তথ্য ছড়ানো হয়৷ সেদিনের ম্যাচটি পরিত্যক্ত হলেও ৭  দিন পরে ম্যাচটি কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ করা হয়েছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রী হয়রানির শিকার হন। তবে এটি একটি ব্যক্তিগত অপরাধ, ধর্মীয় কোনো বিষয় নয়। আর পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আরো দাবি করা হয়েছে, ইসলাম অবমাননার শাস্তি না দিলে মৌলবাদীরা নিজেরাই বিচার করবে। ২০১৩ সালে একটি ইসলামি দল হাইকোর্টে ধর্ম অবমাননার শাস্তি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে রিট করেছিল, যা আদালত খারিজ করে দেয়। বর্তমানে সরকার এই ধরনের কোনো দাবি গ্রহণ করেনি। 

দাবি করা হয়েছে যে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ বেড়েছে। সরকার হিজবুত তাহরিরের মতো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। গত এক বছরে ২০০ জনের বেশি উগ্রপন্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর যে মিছিলের কথা বলা হচ্ছে, তা বিগত ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী সরকার ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র এর একটি অপচেষ্টা, যা বর্তমান সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এটি মুসলিম উগ্রপন্থীরা ছিল না, বরং হিন্দু উগ্রপন্থী সংগঠন ইসকনই সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে প্রবল আন্দোলন পরিচালনা করেছিল। সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত ধৈর্যশীলতা দেখিয়েছে। দাবি করা হয়েছে নতুন সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে বহুত্ববাদ আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে বহুত্ববাদ আনার দাবির বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, গণতন্ত্র এবং বহুত্ববাদ নিয়ে আলোচনা করেছে, তবে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

বহুত্ববাদ একটি সামাজিক ধারণা, যা বিভিন্ন ধর্ম, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করে, কিন্তু এটি ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীত নয়। বরং ধর্মনিরপেক্ষতার পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রীয় নীতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। অতএব, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা সরিয়ে ফেলা হচ্ছে-এমন তথ্য অসত্য ও বিভ্রান্তিমূলক। বাংলাদেশ আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মতো উগ্রবাদী হচ্ছে তথ্যও একটি রটনা। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় দেশগুলো বলছে, মডারেট মুসলিম কান্ট্রি। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিশীল দেশগুলোর একটি।
এরপরও একের পর এক অভিযোগের তীর যখন ছোঁড়া হচ্ছে, সেইক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতার আবশ্যকতা রয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলা ভিশন

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে

মন্‌জুরুল ইসলাম
মন্‌জুরুল ইসলাম
শেয়ার
যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে
সংগৃহীত ছবি

‘যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে’- এটি একটি শ্রোতাপ্রিয় গানের কলি। শামসুল হক চিশতী (চিশতী বাউল) গানটি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তার গায়কিতে গানটি আরও বেশি করে শ্রোতা-দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। নসিব বা ভাগ্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসেও বিস্তর বর্ণনা আছে।

সুরা হাদিদের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করার আগেই তা লিপিবদ্ধ থাকে। আল্লাহর পক্ষে এটা খুবই সহজ।’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, সামাজিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করলে এটাই বলতে হয়, ভাগ্যে থাকলে কেউ তা খণ্ডন করতে পারে না। যার ভাগ্যে যা আছে, তা অন্যরা ষড়যন্ত্র করেও বরবাদ করতে পারে না।

আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞা, মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। তবে সে পরিবর্তনটাও ভাগ্যের ব্যাপার অর্থাৎ ভাগ্যে না থাকলে পরিশ্রম করেও ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব না। যারা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, তারা ভিন্নমত পোষণ করলেও শেষ পর্যন্ত নিজের ভালোমন্দের বিচারে মনে মনে ভাগ্যকেই মেনে নিতে বাধ্য হন।

শেখ হাসিনা যদি আর মাস দু-এক ক্ষমতায় থাকতে পারতেন, তাহলে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়তো জেলখানায় থাকতে হতো।

সেই ড. ইউনূস আজ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। আর যে হাসিনা তাকে জেলখানায় পাঠানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন, তাকেই প্রাণে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। যে ছাত্ররা চাকরিতে কোটা বৈষম্য দূর করার দাবিতে রাজপথে ছিলেন, তারা এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। চাকরি চাইতে গিয়ে হয়ে গেলেন মন্ত্রী। অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত নেতা।
রাজনীতি শুদ্ধ করার আন্দোলন করতে গিয়ে হয়ে গেলেন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ। আট মাস আগেও যারা ছিলেন নেহাত গুরুত্বহীন, তাদের সঙ্গেই বিশেষ বৈঠক করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।

যে খালেদা জিয়াকে দিনের পর দিন বন্দি রাখা হয় জেলখানায়, চিকিৎসার জন্য বিদেশ পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয়নি। যার মৃত্যু কামনা করে সরকারপ্রধান কটূক্তি করেছিলেন, সেই খালেদা জিয়া সরকারপ্রধানসুস্থ হয়ে পরিবারের সঙ্গে এবার ঈদ উদ্‌যাপন করেছেন। এখন মুক্ত এবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল ওয়ান-ইলেভেন সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার নির্দেশে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়। অনেক মামলায় তাকে শাস্তিও দেওয়া হয়। লন্ডন থেকে তারেক রহমানকে ধরে এনে বিচার করা হবে বলে হুংকারও দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। সেই তারেক রহমান এখন সব মিথ্যা মামলা থেকে মুক্ত। তিনি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা। গত ১৭টি বছর তিনি লন্ডনে বসে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিকে রক্ষা করেছেন।

বেগম খালেদা জিয়া টানা ৪০ বছর ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাড়িতে বসবাস করেছেন। ওই বাড়িটি স্বাধীনতার ঘোষকের বাড়ি। একজন সেক্টর কমান্ডারের বাড়ি। একজন প্রেসিডেন্টের বাড়ি। তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি। ওটা ছিল একটা ঐতিহাসিক বাড়ি। সে বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে অপমান-অপদস্থ করে বের করে দেওয়া হয়। বুলডোজার দিয়ে সে বাড়িটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে। ওই বাড়ি ভাঙা নিয়ে শেখ হাসিনা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বলেছিলেন, ‘প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ক্যান্টনমেন্টের ওই বাড়িতে তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) বসবাস করতে দেব না। যেদিন সময় আসবে ওই বাড়ি থেকে বের করে দেব। বের করে দিয়েছি।’ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে একজনকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার বিপরীতে প্রকৃতির প্রতিশোধ হলো তার পিতার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িটি জনতার রোষে পড়ে ধুলায় মিশে গেল। ওই বাড়ির ধ্বংসস্তূপের ওপর বিক্ষুব্ধ জনতাকে প্রস্রাব করতেও দেখা গেছে।

যে আদালতে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল, সে আদালতেই এখন শেখ হাসিনার বিচার চলছে। যে আইনে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল, সে আইনেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া হয়তো চলবে। গত আট মাসে মোটা দাগে যে বিষয়গুলো দেশবাসী প্রত্যক্ষ করল, এ সবই হলো ভাগ্য বা নসিবের লিখন। মহান আল্লাহতায়ালা যার নসিবে যা লিখেছেন, তিনি তা-ই পেয়েছেন।

যারা কর্মে বিশ্বাসী মানুষ, তারাও গত আট মাসের হিসাব মিলিয়ে দেখবেন। কর্মের ফলেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস আজ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হয়েছেন। আর কর্মের ফলেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ভাগ্যে বা নসিবে বিশ্বাসী বা কর্মে বিশ্বাসী সবার জন্যই একই শিক্ষা। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে যার নসিবে যা আছে, তিনি তা-ই পাবেন। শুধু শুধু নানা ষড়যন্ত্র করে কোনো লাভ নেই। ষড়যন্ত্র করলে শত্রুতা বাড়বে, নিজেদের মধ্যে হানাহানি বাড়বে, ভাগ্য বা নসিব পরিবর্তন হবে না।

অনেক বছর পর এবার দেশবাসী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদের আনন্দ উপভোগ করলেন। কর্তৃত্ববাদী শাসন নেই, গুম-খুনের ভয় নেই। যারা দীর্ঘদিন বাড়িঘর ছাড়া ছিলেন তারা নিজের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছেন। নয় দিনের দীর্ঘ ছুটিতে মানুষ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে পেরেছেন। বেপরোয়া যান চলাচল অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হয়েছে। সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে ছিল স্বস্তির যাত্রা। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। সেখানে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়তে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আহত হয়ে যারা স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছেন, তাদের জন্য দোয়া করব। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় ঐক্য গড়তে হবে। আমরা যেন স্থায়ী একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে সামনে এগিয়ে যেতে পারি সেজন্য কাজ করতে হবে। যারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে আত্মাহুতি দিয়েছেন, আমরা অবশ্যই তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। যত বাধাই আসুক, ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’ ঈদের জামাতে দাঁড়িয়ে প্রধান উপদেষ্টার এমন ইস্পাতকঠিন উচ্চারণ জাতিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে। জাতি হিসেবে আমরা বীরের জাতি, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। জাতি তার বীরত্ব বারবার প্রদর্শন করেছে। সর্বশেষ বীরত্ব প্রদর্শিত হয়েছে ৫ আগস্ট। জাতির ওপর চেপে বসা জগদ্দল পাথর সরানো সম্ভব হয়েছে। তবে এও সত্য, গিরিঙ্গিবাজি বা বেইমানিও রয়েছে জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সে কারণেই নানা ষড়যন্ত্রে এ জাতির মধ্যে নানা অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে। শিশুতোষ পাঠ্যবইয়ে প্রায় সবাই পড়েছি ‘একতাই বল’। অথচ কর্মজীবনে আমাদের মধ্যে শিশু বয়সের সেই মৌলিক শিক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটছে না। বরং পদে পদে একতার বিপরীত কর্মকাণ্ডই বেশি হচ্ছে। সে কারণেই হয়তো প্রধান উপদেষ্টা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, সংস্কার, নির্বাচন যা-ই হোক না কেন, সবার আগে দরকার ঐক্যবদ্ধতা। জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে ঐক্য না থাকলে সুন্দর একটি সাম্য-সম্প্রীতির দেশ হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সাময়িক ঐক্য হলে হবে না। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ হবে। আর এ বিপ্লব ব্যর্থ হলে জনরোষ থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। সে জনরোষ রূপ নিতে পারে আরও একটি নতুন বিপ্লবে।

মেশকাত শরিফে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত, ‘একজন মানুষ সব সময়ই তার সঙ্গীসাথি দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করার আগে তার বিশ্বাস ও জীবনাচার সম্পর্কে খোঁজখবর নাও।’ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্র-জনতার দ্বারা মনোনীত। এ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টামণ্ডলী ও সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অন্যরা অতীতে কখনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেননি। সে কারণে গত আট মাসে তাদের কাজের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সেই সঙ্গে দায়িত্বশীল প্রত্যেকের চারপাশে নতুন নতুন ধান্দাবাজ আগাছা সঙ্গীসাথিও গজিয়ে উঠেছে। এসব ধান্দাবাজ আগাছা সরকারের ভিতরে নানাভাবে ঢুকে পড়ছে। প্রধান উপদেষ্টা যে জাতীয় ঐক্য ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন, তারা এ শুভ উদ্যোগে অন্তরায় সৃষ্টি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো অগণিত বিশেষজ্ঞ সরকারকে নানাভাবে প্রতিনিয়ত উপদেশ-নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এসব উপদেশ-নির্দেশ শুনলে যে কারওই মাথা গরম হওয়ার কথা। সরকারের নানা দুর্বলতার কারণেই এসব উপদেশ-নির্দেশদাতা গোষ্ঠীর জন্ম হচ্ছে। ধান্দাবাজ আগাছা উপদেশদাতাদের উদ্দেশ্য হলো দেশে যাতে স্থায়ী ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হয় সেজন্য যা যা প্রয়োজন তা করা। সে কারণে যত বাধাই আসুক না কেন, স্থায়ী জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে নতুন বাংলাদেশ অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য যেমন দরকার স্থায়ী জাতীয় ঐক্য, তেমন দরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জাতীয় ঐক্য ও নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তত বেশি সময়ক্ষেপণ হবে। সেই সঙ্গে ইমেজ নষ্ট হবে বিশ্বব্যাপী সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। মনে রাখতে হবে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুধু আমাদের নেতা নন, তিনি হলেন বিশ্বনেতা। তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে, তিনি ব্যর্থ প্রমাণিত হলে তা হবে জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আর তাতে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের সুযোগটা হাতছাড়া হবে চিরতরে।

লেখক :  নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন 

manju209@yahoo.com

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য
দৃষ্টিপাত

বিষাদের ঈদ—আনন্দের জায়গায় শোকের ছায়া

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

আনিসুর বুলবুল

শেয়ার
বিষাদের ঈদ—আনন্দের জায়গায় শোকের ছায়া
ছবি : কালের কণ্ঠ

ঈদের সকালে শিশু জুমা যখন তার বাবার কবরের পাশে বসে, তখন চারপাশের উৎসবের আওয়াজ তার কানে পৌঁছায় না। সে শুধু মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই কণ্ঠস্বর খোঁজে, যে তাকে 'সোনামণি' বলে ডাকত। কবরের পাশের ঘাসে হাত বুলিয়ে সে যেন বাবার গালের স্পর্শ খুঁজে বেড়ায়। জুমার মতোই আরও অনেক শিশু, অনেক পরিবারের ঈদ কাটে এমনই এক শূন্যতার মাঝে! তাদের জন্য ঈদের নতুন জামা মানে শোকের কালো কাপড়, মিষ্টির স্বাদ মানে অশ্রুর লবণাক্ততা।

নাসিমা বেগমের ঘরে আজ কোনো রান্নার ঘ্রাণ নেই। গত বছর এই ঈদের আগে তার ছেলে জুবাইদ দোকান বন্ধ করে মিছিলের দিকে ছুটে গিয়েছিল—ফিরে আসেনি। এখন তার দোকানের শেলফে জমে থাকে ধুলা, আর নাসিমার চোখে জমে থাকে সেই শেষ দৃশ্য—একটি সাদা শার্টে লাল হয়ে ফোটা রক্ত। পাশের বাড়িতে কেউ মিষ্টি বিতরণ করছে, কিন্তু নাসিমার হাত এখনো সেই মিষ্টি স্পর্শ করেনি, যে মিষ্টি জুবাইদ একদিন তার জন্য কিনে এনেছিল।

রুবেলের স্ত্রী হ্যাপী আক্তার আজ ঈদের সালামিও পেলেন না। স্বামীর নামে এখন শুধু একটি স্মৃতি, একটি ফটো, আর আদালতের কাগজে লেখা একটি মামলা। তিনি বলেন, ঈদ তো তাদের জন্য, যাদের পরিবার সম্পূর্ণ। আমার তো সবই অর্ধেক।

তার কথায় লুকিয়ে থাকে সেই বেদনা, যা শব্দে ধরা দেয় না, শুধু চোখের কোণে ভেসে ওঠে।

উত্তরার সেই চারতলা বাড়ির বারান্দায় আজ কেউ দাঁড়ায় না। গত বছর এই ঈদের আগে নাঈমা সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল—একটি গুলি তাকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছে। তার মা এখন বাড়িটাকে ‘কবরস্থান’ বলেন। ঘরের দেয়ালে ঝোলানো নাঈমার স্কুল ড্রেস, তার আঁকা ছবি, আর খেলার মাঠ থেকে আনা শেষ মুহূর্তের ছবি—এগুলোই এখন ঈদের সাজ।

কুমিল্লার রুবেল, জয়পুরহাটের বিশাল, ময়মনসিংহের জুবাইদ, বরিশালের রাকিব—এদের নাম এখন শুধু সংবাদপত্রের পাতায় নয়, তাদের পরিবারের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে। বিশালের বাবা মজিদুল আজও তার পাওয়ার টিলার মেরামত করেন, কিন্তু হাত কাঁপে। ছেলের পড়াশোনার নোটবুকগুলো আজও তার ব্যাগে থাকে। মা বুলবুলি রান্না করতে গিয়েও থমকে যান—বিশাল যে ডালটা পছন্দ করত, তা আজ আর বাড়িতে রান্না হয় না।

ঈদের চাঁদ উঠেছে ঠিকই, কিন্তু এই পরিবারগুলোর আকাশে চাঁদ যেন অস্তগামী। তারা ঈদের নামাজ পড়ে, নতুন জামা পরে, কিন্তু তাদের চোখে সেই প্রশ্ন—কেন? কেন এই ঈদে তাদের খাবার ভাগ করে নেওয়ার মানুষটি নেই? শহীদদের রক্ত শুকিয়েছে, কিন্তু তাদের পরিবারের অশ্রু আজও ভেজা। এই ঈদে তাদের একটাই প্রার্থনা—যেন কেউ আর এমন বিষাদের ঈদ না কাটায়।

বিস্তারিত পড়ুন কালের কণ্ঠের স্পেশাল সেগমেন্টে— 'বিষাদের ঈদ'

মন্তব্য

সেনাবাহিনী বা প্রধান নিয়ে অপরিণামদর্শী স্মার্টনেস কাম্য নয়

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল
শেয়ার
সেনাবাহিনী বা প্রধান নিয়ে অপরিণামদর্শী স্মার্টনেস কাম্য নয়
মোস্তফা কামাল

মাত্র মাস আটেক আগে কী দশা-দুর্গতিতে ছিলাম, কার উছিলায় কিভাবে এখন মুক্ত বাতাসে দম –নিঃশ্বাস নিচ্ছি; দিব্যি ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। সন্তুষ্টির বদলে যার –তার সমালোচনা। বুকে বুক, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুঃসাধ্য বিজয় অর্জনের ঘটনাগুলো এতো দ্রুত তলিয়ে যাওয়া সবার জন্যেই দুর্ভাগ্যের। বিশেষ করে আন্দোলনের স্ট্যাকহোল্ডারদের কারো কারো মন্তব্য খোদার আরশ কাঁপানোর মতো।

পরস্পরের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝাঁঝ নেমক হারামির নামান্তর। তবে, ৫ আগস্টের স্পন্দন সাধারণ মানুষের মনোজগতে একটা পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। প্রকারান্তরে এটিও একটি সংস্কার। বিশেষ করে নিজ দেশের সেনাবাহিনী সম্পর্কে হালকা-তাচ্ছিল্যপনায় স্মার্টনেস দেখানো তাদের কাছে অসহ্য।
সশস্ত্রবাহিনী কেবল স্বার্বভৌমত্বের প্রতীকই নয়, একটি দেশের স্থিতিশীলতায়ও কতো বলীয়ান তা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে বাস্তব করেছে সেনাবাহিনী। বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকা এ বাহিনীর সদস্যরা কোথাও শো আপ করছে না। যাচ্ছে না বলপ্রয়োগে। সহায়কের মতো কাজ করছে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সাথে।
সেনা সদস্যদের মাঠ থেকে সরালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কী দশা হবে, কারো কারো ধারনায় না থাকলেও সাধারণ বুঝজ্ঞানের মানুষ তা যথাযথ উপলব্ধি করে।   

যে কোনো দেশের সশস্ত্রবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে হালকা কথা বললে তাদের মনোবলে টোকা পড়ে। বহি:শত্রুদের মাঝে এতে তৃপ্তির ঢেঁকুর আসে। তারা সুযোগ নেয়ার সাহস পায়। এতে অনিবার্যভাবে দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দেয়।

যা দেশটির জন্য ভীষন আত্মঘাতী। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা সেই অপেক্ষাই করছে। সচেতন নাগরিকরা গত দিনের আলামতে তাই উদ্বিগ্ন। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত পেশাদার, দক্ষ, প্রত্যয়ী। উচু মনোবলে কেবল নিজেরা নয়, জনতাকে নিয়েও ঐক্যবদ্ধ। বাহিনী প্রধানের ক্যারিশমা-বিচক্ষণা-পেশাদারীত্বে মুগ্ধ। অফিসার, সৈনিক, এমনকি সেনাপ্রধানের একসূত্রে গাঁথার এ নজিরের মাঝে যে কোনো একজনের প্রতি কেউ অসম্মান করলে তার আঁচর সবার গায়ে লাগে। তাদের কাছে এটি  পুরো বাহিনীর প্রতি অসম্মান বলে মনে হয়।

রাজনীতিতে উড়িয়ে দেয়া, গুড়িয়ে দেয়া, টুস করে চুবিয়ে দেয়া, ধপ করে ফাটিয়ে দেয়া ধরনের কথায় ক্রেজ তৈরি বা হাইপ তোলার রেওয়াজ এ দেশে আছে। তাই বলে ক্যান্টনমেন্ট, সেনাপ্রধানকে হুমকি-ধমকি! এতে ভাইরাল হওয়া যায়, কিন্তু নিজের ওজনও থাকে? এসএসএফের গান পয়েন্টে দাঁড়িয়ে বন্দুকের নল ঘুরিয়ে দিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ভারি অপরাধ করে ফেলেছেন? তাকে এখন প্রতিদান দিতে হবে? সেদিন ওই ভূমিকার জন্য তার জীবন যেতে পারতো। আর সেই ভূমিকা তিনি নিয়েছেন বলে্‌ই আজকের বাতাস এতো মুক্ত। কথা বলার এতো স্বাধীনতা। নির্বাচন দাবি করা, আগে সংস্কার পরে নির্বাচন, পাবলিক-রিপাবলিক, নতুন দলসহ কতো আলাপ। এতোসব কার উছিলায়?  বর্তমানের সেনাবাহিনী এবং তার প্রধান যথেষ্ঠ ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। সইছেন নানা খোঁচা ও উস্কানি। এর আগে, রাওয়া ক্লাবের অনুষ্ঠানে যদ্দূর সম্ভব সবাইকে সতর্ক করেছেন। বলেছেন, পরে যেন কেউ তাকে দোষারোপ করতে না পারেন। চাইলে তো সেই সতর্কতা না দিলেও পারতেন। বসে বসে মজা দেখতেন। কিছুদিনের ব্যবধানে আবারো সতর্কবার্তার সঙ্গে পরামর্শও রাখলেন সেনাপ্রধান। ঢাকা সেনানিবাসের সেনাপ্রাঙ্গণে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অফিসার্স অ্যাড্রেস বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নানা অপপ্রচার, উসকানিমূলক বক্তব্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন সেনাপ্রধান। পরামর্শ হিসেবে বলেছেন,  গুজব–ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। তার বিশ্বাস বর্তমান পরিস্থিতিতে যে দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে সেনাবাহিনী কাজ করছে, সেটি দেশ ও জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে। ঢাকার বাইরের সেনা কর্মকর্তারা অনলাইন মাধ্যমে এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, এমন কিছু করা যাবে না, যাতে উসকানিদাতাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়। একজন সেনাপ্রধানের পক্ষে আর কতোটুকু বলা সম্ভব?

সাম্প্রতিক অপতথ্যের ফের বা মতলব কে না বোঝে? পোস্টদাতারা অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ড কিংবা ফেক আইডি থেকে গুজব ছড়ায়। তার ওপর আছে আশোভন মন্তব্য, খিস্তিখেউড়, ট্রল। আবার অনেকেরটা নাম দেখেই বোঝা যায় এগুলো সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষের পক্ষে হজম অযোগ্য। দেশে এখন একটা বিশেষ পরিস্থিতি। নির্বাচন নিয়ে কথা হচ্ছে। কোনো কোনো দল তো নির্বাচনের জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কথা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, সংস্কার করবে নির্বাচিত সরকার। পরীক্ষিত সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের তাগিদ রয়েছে কারো কারো। এগুলোর সবই প্রস্তাবনা। কোনোটিউ চূড়ান্ত নয়। সমস্যা দেখা দিচ্ছে প্রকাশের ভাষা-ভঙ্গি নিয়ে। মনোজগতে কারো কারো উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমালোচনা-নিন্দা-গীবৎ করা। তা সেনা প্রধানের নামাজের ইমামতি নিয়েও। নামাজে ইমামতি করার যোগ্যতা-সৌভাগ্য সবার হয় না। আবার নিয়মিত নামাজ একজন মানুষকে ধৈর্য্য ও সহনশীল করে গড়ে তোলে, তা বুঝতে হাদিস-কোরআন জানতে হয় না। জেনারেল ওয়াকারের ওই গুণ-যোগ্যতার খবর জানেন তার পরিবারের সদস্যের বাইরে ক্লাসমেট এবঙ কোর্সম্যাটরা। এখানে তার কোর্সম্যাট একসময়ের সহকর্মী সাবেক সেনা কর্মকর্তা, পরে সাংবাদিকতার কঠির তারে জড়িয়ে যাওয়া আবু রুশদ মো. শহিদুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টটি বড় প্রাসঙ্গিক। লেখার প্রয়োজনে এর কয়েক লাইন উল্লেখ না করলেই নয়। ।

আবু রুশদ লিখেছেন, ওয়াকার যৌবনের ধারালো সময়েও ইমামতি করতেন। স্বাধীনতা দিবসে বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাগরিবের নামাজে ইমামতি করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তার নামাজ পড়ানোর ছবি প্রকাশ হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার পাশাপাশি ব্যঙ্গ করার কিছু লোকের ক্রিয়াকর্মও দেখতে হলো। নিজের ফেসবুক পেজে রুশদ মিলিটারি একাডেমিতে একসঙ্গে কোর্স করার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। এতে তিনি লিখেন, ‘আমার বন্ধু জেনারেল ওয়াকারের ইমামতি প্রসঙ্গে: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার নামাজে ইমামতি করছেন এমন একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। সেনাপ্রধান ইমামতি করেন? উনি কি সেনাপ্রধান হওয়ার পর এটা শুরু করেছেন? প্রশ্ন অনেকের। আবার অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও তির্যক মন্তব্য করছেন অনেকে! জেনারেল ওয়াকার বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আমার কোর্সমেটই শুধু ছিলেন না, তিনি আমার রুমমেটও ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর কোম্পানিতে আমরা একই প্লাটুনে প্রশিক্ষণের দুই বছর কাটিয়েছি ১৯৮৪-৮৫ সালে। আবার তৃতীয় টার্মে দুইজন একই প্লাটুন কমান্ড করেছি। মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ কেমন তা নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনো ধারণা নেই। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মে বাপ-দাদার নাম ভুলে যাওয়ার অবস্থা হয়। একটু ঘুমানোর সময় বের করা এরমধ্যে স্বর্গীয় সুখের মতো অনুভূতি তৈরি করে। আমরা সবাই কোনোভাবে ঘুমাতে পারলে বাঁচি। শীতের রাতে পানি, কাদায় মাখামাখি হয়ে যখন রুমে আসতাম তখন গোসলটা করে সোজা বিছানায়। এর মধ্যেও তদানীন্তন (ক্রমান্বয়ে) জেন্টলম্যান ক্যাডেট-ল্যান্স করপোরাল-কোম্পানি কোয়ার্টার মাস্টার সার্জেন্ট ওয়াকার গোসল করে ওজু করে নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে যেত। কাজা নামাজসহ সব আদায় করে ঘুমাতে যেত। আমিসহ আমাদের কোর্সের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ক্যাডেট ওইভাবে নামাজ আদায় করতে পারিনি।

পোস্টের আরেক জায়গায় আবু রুশদ লিখেছেন, আমাকে কত যে হেদায়েতের চেষ্টা জে. ওয়াকার করেছেন! আই প্রেফারড স্লিপ!!! হি প্রেফারড প্রেয়ার! আরেকজন এমন ছিল কর্নেল নুরুল। উনিও ফাইনাল টার্মে আমার রুমমেট ছিলেন যখন দুইজনই আমরা আন্ডার অফিসার ছিলাম। ওই তরুণ-যুবক বয়সে জেনারেল ওয়াকারকে কাছে থেকে যতোটুকু দেখেছি তাতে তিনি ছিলেন অতি নরম মনের একজন মানুষ। এ নিয়ে আমরা উনাকে খেপাতাম। জুনিয়রদের যেখানে আমি কঠোর, কঠিন, মিলিটারি বুলশিট করতাম উঠতে বসতে যাতে অবধারিতভাবে স্ল্যাং থাকতো সেখানে জেনারেল ওয়াকার একটা স্ল্যাং ইউজ করতো না!’ তিনি লিখেন, ‘নবী, রাসুল ছাড়া সব মানুষের মধ্যে পাপ, দোষত্রুটি আছে। জেনারেল ওয়াকার তার ব্যতিক্রম নন। তাকে নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা আছে, থাকবে। এ নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু ব্যক্তি ওয়াকারের ইমামতি দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই! উনি যৌবনের ধারালো সময়েও ইমামতি করতেন! আমি কোর্সমেট, রুমমেট হিসেবে অন্তত উনার এই দিকটা নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি। খুব কষ্ট লাগে তার এই ইমামতি দেখেও কিছু অতি হাইপার অতি নিম্নমানের কথাবার্তা বলছেন দেখে!

সমালোচনা ভালো। সমালোচনার অধিকার সবার আছে। কখনো কখনো সমালোচনায় উপকারও হয়। শুদ্ধি আসে। তাই বলে সেনাবাহিনী বা বাহিনীটির প্রধানকেও সমালোচনার জন্য সমালোচনা করা কাম্য নয়। তা মোটেই স্বাধীনতা নয়, স্মার্টনেসও নয়। গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষনীয় এবারের পটপরিবর্তনে সেনাবাহিনীর জনসম্পৃক্ততার অনন্য নজিরকে বানচাল করতে মহলবিশেষ নানা ফাঁদ পাতছে। কেউ দেশে কেউ ভিনদেশে বসে এ টোকায় শরীক হচ্ছে। স্যোশালমিডিয়ার কথা ভিন্ন। কারণ তাদের কোনো সম্পাদকীয় কর্তৃপক্ষ নেই। দায়বদ্ধতা নেই। হিট বা ভাইরাল হতে গিয়ে নিজের সম্পর্কে অশ্রাব্য শব্দ-বাক্য ব্যবহারও তাদের কাছে বিষয় নয়। নিজেকে নিজে দিগম্বর করতেও লজ্জা পাবে না তাদের। কিন্তু দেশে একান্নবর্তী পরিবারের মতো রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতিতে সম্পৃক্তরাও বুঝে, অবুঝে বা অতিবুঝে, ফাঁসে-বেফাঁসে সেনাবাহিনীর ইমেজে আঘাত করে বসা বড় অপরিনামদর্শী। জুলাই আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনার হাসনাত আবদুল্লাহ বয়স দোষে তা করে দেরিতে হলেও বুঝেছেন। বয়সী-বুঝবান রাজনীতিকদের কেউ কেউও মাঝেমধ্যে এ পথ মাড়াচ্ছেন অবিবেচকের মতো।


লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলা ভিশন

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ