রাষ্ট্রকে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা যেন চিরকাল অধরা। জটিল নয়, সরলীকরণ করেও যদি বলা হয়, নিতান্তই ব্রাত্য দেশের স্বাস্থ্য খাত। যুগের পর যুগ নিজেই আক্রান্ত জটিল ও দুরারোগ্য রোগে। কখনো পরিকল্পিতভাবে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হয়নি। বৈষম্য ও বঞ্চনার চিত্র পদে পদে। শহুরে ও গ্রাম্য স্বাস্থ্য কাঠামোর মধ্যে বৈষম্য দূর হয়নি আজও। স্বাস্থ্যের নাজুক দশা কাটাতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের চোখে ‘স্বাস্থ্য কোনো সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার’। এই নীতিকে রাজনৈতিক বয়ানে নয়, বাস্তবে রূপ দিয়ে একটি উন্নত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ নীতি গ্রহণ করেছেন।
শহরের চেয়ে গ্রামে জনসংখ্যার হার বেশি। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের বসবাস করে ৩১ দশমিক ৬৬ শতাংশ মানুষ আর গ্রামে ৬৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সংখ্যার দিক দিয়ে গ্রামে বসবাস করে ১১ কোটি ৬১ লাখ মানুষ। আর শহরে ৫ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬২ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও দেশের মোট চিকিৎসক-নার্সের তিন-চতুর্থাংশই শহর এলাকায় সেবা দেন। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা কর্মী থাকায় তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নিদারুণভাবে।
গ্রাম ও শহরের এই স্বাস্থ্য বৈষম্য দূর করতে সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও। যেখানে স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। অভিজাত শ্রেণি আর প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারিভাবে সমান স্বাস্থ্যসেবা পাবে। ফিরবে সেবার সমতা। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানায় সরকার।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বেশ মনোযোগী সরকারপ্রধান তারেক রহমান গত মাসে সিলেটে এক সুধী সমাবেশে বলেন, ‘দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এই মানুষগুলোর দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা চালাবে।’
দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করতে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় রকমের মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায় সরকার। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন ফিরিয়ে এনে তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর সেবাপ্রাপ্তি সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে বড় রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে সরকার এ ক্ষেত্রে সমস্যার গোড়ায় নজর দিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো নিজেই নানা সংকটে ভারাক্রান্ত। শয্যা সংকটে গাদাগাদি করে চলছে চিকিৎসাসেবা। জনবল ও সরঞ্জাম সংকটেও সুফল পাচ্ছে না রোগীরা। সব রকমের ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ধার-কর্য করে টাকার বিনিময়ে উপজেলা পর্যায়েও দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পেতে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন রোগীরা।
কোন কোন ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছে না মোটেও। যাদের সাধ্য নেই তাঁরাই বাধ্য হয়েই কোনোমতে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এসব হাসপাতালের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই। জনস্বার্থে এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে সরকার একটি বিস্তৃত, সুচিন্তিত এবং সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সর বিদ্যমান অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে গ্রাম শহরের স্বাস্থ্য বৈষম্য নিরসন করতে এরই মধ্যে ৫০ শয্যার ৪৯২টি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দিয়েছেন। এরইমধ্যে আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এতে করে গ্রামীণ পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ৫টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করার কাজ ছয় মাসের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে নারীদের জন্য ১ হাজার শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পরিপূর্ণ মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্যসেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করতে ছক কষে এগোচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমানও বলেছেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এখন থেকে সব মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবেন তাদের প্রয়োজন অনুসারে, আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নয়। এমন স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা হবে যেন কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত না হতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর বক্তব্য থেকেও পরিস্কার সরকার শহুরে সুবিধা গ্রামেও পৌঁছে দেওয়ার বাস্তব চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে চাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর জীবনসঙ্গী জানেন শহরে চিকিৎসক, হাসপাতাল আর অ্যাম্বুলেন্স মেলে হাতের নাগালেই। কিন্তু গ্রামের ক্ষেত্রে এটি সহজ নয় মোটেও। সেখানে দূরত্ব ও ব্যয়ের বিবেচনায় ঘরেই সন্তান জন্ম দেন গ্রামীণ নারী। জরুরি অবস্থায় দ্রুত সেবা তাদের জন্য 'গরিবের ঘোড়ারোগ'। তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলভিত্তি ও স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে জোর দিয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।'
সরকার যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) মডেল অনুসরণ করে একটি সমন্বিত ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটা জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে সবার জন্য যাতে ডাক্তার থাকে, সে ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বড় রকমের পরিবর্তন করা হবে। এমনভাবে পরিবর্তন করা হবে একদিকে যেমন শয্যার পরিমাণ বাড়ানো হবে, তার চেয়ে সেবা বড় হবে যাতে করে শিশুদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, নারীদের ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে, ফিজিওথেরাপির ব্যাপারে চিকিৎসক থাকে। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোও ঢেলে সাজানো হবে। যেহেতু ডিজিজ বার্ডেন চেঞ্জ হয়েছে, অর্থাৎ আগে ছিল সংক্রামক রোগ, এখন লাইফস্টাইল ডিজিজ হচ্ছে, সে কারণে প্রতিটি জেলায় করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো এ বিষয়গুলোর দিকে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা নেবে।’
স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের অচলায়তন ভাঙার মধ্যে দিয়ে একটি সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন শহর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও সহায়তা ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে বেশ কিছু বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। প্রথমত, উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে অর্থ বরাদ্দ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ ফোকাস দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসকদের গ্রামে অবস্থান করতে উৎসাহিত করতে হবে। নানা প্রতিকূলতায় সীমিত সাধ্যের মধ্যেও যারা চিকিৎসা ব্যবস্থা সচল রেখেছেন তাদের সাধুবাদ জানাতে হবে। তাদের জন্য ভালো বাসস্থান, নিরাপত্তা ও সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার বন্দোবস্তসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার পরিধি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, তাদের পেশাগত উন্নতির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এসব অভাব বা দুর্বলতা দূর করতে পারলে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও বলেছেন, উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ল্যাব প্রায় সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিক হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। যদিও কাজটি এক মাস বা এক বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবু সরকার ধাপে ধাপে এটি অর্জনের পথে রয়েছে।’
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।
[email protected]









