• ই-পেপার

অর্থ পাচারেও চ্যাম্পিয়ন ইউনূস সরকার!

বাজেট ও ব্যাংক খাত : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

ড. এ কে এম সাহিদ রেজা

অনলাইন ডেস্ক
বাজেট ও ব্যাংক খাত : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

বাজেট একটি রাষ্ট্রের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার তার আয়-ব্যয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করে আসছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর নিয়মিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়, যা একটি ইতিবাচক দিক। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনো বাজেটবিহীন অবস্থায় পরিচালিত হয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আশাবাদী বাজেট বলে মনে করি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ ও সংকটের পর সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় এবারের বাজেটের আকারে। যেখানে একসময় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে বিশাল বলে মনে করা হতো, সেখানে বর্তমানে বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি দেশের অর্থনীতির বিস্তার ও সরকারের ব্যয় পরিকল্পনার ব্যাপকতাকেই নির্দেশ করে। তবে এই বাজেট একটি ঘাটতি বাজেট। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার এত অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে কি না। কিন্তু বাজেট মূলত একটি পরিকল্পনা; সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব করেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। মনে হয় দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই খাত নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৮৩ সালে বেসরকারি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যাংক খাত নানা আলোচনা, সমালোচনা ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শুরু থেকেই অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স ও সুশাসনের ঘাটতি ছিল, যার প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষ করে গত দেড় বছরে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো আরও বেশি প্রকাশ্যে এসেছে। অনেকেই বলেন, এতদিন কার্পেটের নিচে চাপা থাকা সমস্যাগুলো এখন দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিংব্যবস্থায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার এবারের বাজেটে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রেখেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে এটি কি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যয় হবে, নাকি সম্ভাব্য একীভূতকরণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হবে।

ধরা যাক, যেসব ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সরকার এককভাবে এই বিপুল অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। তাই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ আমানতকারী সাধারণ মানুষ বা খুচরা গ্রাহক। তাঁদের সঞ্চয়ের পেছনে থাকে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তা। তাই ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানতকারীদের অর্থ কমিয়ে ফেরত দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবে গ্রহণ করা কঠিন।

এ কারণেই ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য সরকারের বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং ব্যাংকিংব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টাও বটে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা অর্জনের জন্য সুশাসন, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। আমাদের বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিচালক গণঋণ মঞ্জুর প্রক্রিয়ার অংশ নিয়ে থাকেন। এটা নিষিদ্ধ করা উচিত। ব্যাংক খাতের চলতি সংকট থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য পরিচালকদের ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত নয়। ঋণ দেওয়া যেকোনো ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজের অন্যতম। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা দেখভাল করবে পরিচালনা পর্ষদ এবং সুশাসন, আমানতকারীর স্বার্থ সেবা ও শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে। পরিচালকরা এই ভূমিকার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে পুনর্গঠন ও সংস্কারের যে বার্তা বাজেটে দেওয়া হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

লেখক : সাবেক পরিচালক এফবিসিসিআই

মহিলা এমপি কি কেবলই সংখ্যার কোটা, নাকি গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার

ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন মুসা

অনলাইন ডেস্ক
মহিলা এমপি কি কেবলই সংখ্যার কোটা, নাকি গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার

সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি দেশের উন্নত নীতিনির্ধারণ, দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি সুশাসন নিশ্চিতকরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও সংস্কার নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়াও এই সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশে সংসদে নারীর প্রকৃত উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত কম, যা শুধু লিঙ্গসমতার প্রশ্ন নয়; বরং সুশাসন ও নীতিনির্ধারণের মানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রয়োগ উপযোগী গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নীতির মান উন্নত হয়, দুর্নীতি কমে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও হ্রাস পায়। মূলত নারীরা যখন সংসদে আসেন তখন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। Tracking analysis অনুযায়ী, নারী সংসদ সদস্যরা সাধারণত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি এবং শিশু ও মাতৃকল্যাণের মতো মৌলিক সামাজিক খাতগুলোতে বাজেট ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে বেশি জোর দেন। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নসংক্রান্ত প্রগতিশীল ও জেন্ডার-সংবেদনশীল আইন পাসে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চাহিদাগুলো নীতিনির্ধারণী টেবিলে সহজে স্থান পায়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা (যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ডেটা) প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি হ্রাসের একটি সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। সংসদীয় কমিটিতে নারীর উপস্থিতি বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সাহায্য করে। নতুন নারী নেতৃত্বের আগমনে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ও অনানুষ্ঠানিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্কগুলো বাধাগ্রস্ত হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কমিয়ে আনে। তা ছাড়া সাধারণত নারীরা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কম ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন, যা রাজনৈতিক দুর্নীতি কমিয়ে আনে। তবে শুধু নারী হওয়ার কারণেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতিমুক্ত হবেন-এমন সরলীকরণ বাস্তবসম্মত নয়; দুর্নীতি মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আইনের প্রয়োগের ওপর।

গবেষকদের মতে, নারীরা দীর্ঘকাল ক্ষমতার মূল বলয় থেকে দূরে থাকায় তাদের সম্পৃক্ততা কম দেখা গেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকলে ক্ষমতার নিজস্ব চরিত্র অনুযায়ী তাদের মধ্যেও বিচ্যুতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখতেও নারী নেতৃত্বের ভূমিকা অনন্য। নারীরা সাধারণত চরমপন্থা বা সংঘাতের চেয়ে আলোচনা, সমঝোতা এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বেশি পারদর্শী। যে রাষ্ট্রগুলোয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নাগরিক অস্থিরতার হার তুলনামূলক কম। নারী সংসদ সদস্যরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় যেখানে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি মূলত সামরিক, অবকাঠামো ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে নারী অংশীদারত্বমূলক রাজনীতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে এগিয়ে নেয়।

তাত্ত্বিকভাবে এই ধারণার মূল ভিত্তি আরও গভীরে প্রোথিত। কার্ল মার্কস এবং তার দর্শনের অনুসারীরা বহু আগেই দেখিয়েছেন যে মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাসকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।

তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয় যুগের ইতিহাসে ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতির কারণে পৃথিবীতে সংঘাত ও যুদ্ধের প্রবণতা অনেক কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমাজে যখন পুরুষতান্ত্রিকতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিবৈষম্য এবং বৈশ্বিক সংঘাতের মাত্রা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে আধুনিক সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমসাময়িক কোনো সংস্কার নয়, বরং এটি সমাজকে সেই আদিম সংঘাতহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস।

তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘সংখ্যার উপস্থিতি’ (Descriptive Representation) ও ‘অর্থবহ প্রভাব’ (Substantive Representation)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ রুয়ান্ডায় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের হার বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে (প্রায় ৬১ শতাংশ) হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা কিছুটা কর্তৃত্ববাদী হওয়ায় নীতিনির্ধারণে নারীদের স্বাধীন প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে উচ্চ নারী প্রতিনিধিত্ব এক অনন্য নাগরিকমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সংসদে কেবল নারীর সংখ্যা বাড়ালেই লক্ষ্য অর্জন হয় না, যদি না তাঁদের অর্থ বা প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফোরামে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা বা বিরোধীদলীয় নেতা পর্যায়ে নারীর নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্পিকারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে নারী অধিকার রক্ষা ও পলিটিক্যাল ইকোনমিকের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে, যা দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র চর্চার পথ সুগম করছে। তবে দেশীয় থিংক-ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি এবং প্রখ্যাত গবেষকদের সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু কাঠামোগত বাধাও উঠে এসেছে।

আমাদের সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও এটি এখনো মূলত সংরক্ষিত আসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যেখানে সাধারণ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার হার ৫ শতাংশের নিচে। সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের অনেক সময় ‘দ্বিতীয় শ্রেণির সংসদ সদস্য’ হিসেবে দেখার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রাজনীতিতে রয়ে গেছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্বের আইনি লক্ষ্যমাত্রা (৩৩ শতাংশ) অর্জনে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২.৩৩ শতাংশ।

এই কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু জটিলতা নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলের বিগত নির্বাচনগুলোতে সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হওয়ায়, রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে নারীর গুণগত ও প্রকৃত অংশগ্রহণের আসল চিত্রটি আড়ালেই রয়ে গেছে। যখন একটি নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোটাধিকার এবং অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ মার খায়, তখন সেখানে নারী প্রার্থীদের প্রকৃত জনসমর্থন বা স্বাধীন কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব উঠে আসার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তা এই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনি সংস্কৃতির কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা) নারীদের প্রকৃত, প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সামগ্রিক সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ স্থানীয় সরকারই হলো রাজনীতির মূল ভিত্তি; সেখানে যদি নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনের কোটা বা পুরুষ জনপ্রতিনিধিদের ছায়াতলে প্রতীকী নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করেন, তবে জাতীয় পর্যায়ে এর ইতিবাচক রূপান্তর আশা করা অবাস্তব। সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শ্রেণিগত বৈষম্য (যেখানে রাজনীতিতে আসা নারীদের বড় অংশই উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য)  এবং নির্বাচনি প্রচারণায় নারীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সাইবার বুলিং ও হয়রানি রোধের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনি পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে সরাসরি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য হারে যোগ্য নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া, রাজনীতিতে আগ্রহী নারীদের সুরক্ষায় অনলাইন হেনস্তা কঠোর হস্তে দমন এবং নারী প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণার জন্য দলীয় তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়ার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনীতিকে কালোটাকা ও সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে এবং নারীদের মতো যোগ্য প্রার্থীদের অর্থনৈতিক সমতা দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন’ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।  তাই বলা যায়, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার।  বাংলাদেশ যদি সংরক্ষিত আসনের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অর্থবহ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ প্রকৃত অর্থেই বাড়াতে পারে, তবে দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল ও সংঘাতমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের সম্ভাবনা আরও দ্রুত গতিতে বাস্তবে রূপ নেবে। এর জন্য কেবল প্রতীকী অন্তর্ভুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নারী সংসদ সদস্যরা দলের অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সমঅধিকারসম্পন্ন প্রয়োজনে (১০০:১০০ হারে) অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।

লেখক : ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, অধ্যাপক (অব.) রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক

জননিরাপত্তা নিশ্চিতে দরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

আহসান হাবিব বরুন
জননিরাপত্তা নিশ্চিতে দরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী হামলা, অপহরণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের যে উদ্বেগজনক বিস্তার দেখা যাচ্ছে, তা জনমনে গভীর উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, গুলি করে টাকা ছিনতাই, ব্যবসায়ীর ওপর হামলা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনা। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।

রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই, আদাবরে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লুট, মোহাম্মদপুরে দুই বোনের ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া কিংবা সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ছিনতাইকারীর হামলায় এক নারীর মৃত্যুর ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব অপরাধের অনেকগুলো ঘটছে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায়, দিনের আলোতে এবং সিসিটিভির উপস্থিতিতে।

অপরাধীরা এখন আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এখন অপরাধীদের হামলার শিকার হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা রাজধানী ঢাকায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানে র্যাব ও পুলিশের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, কিছু অপরাধী গোষ্ঠী আইনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো দুঃসাহস অর্জন করেছে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কি হতে পারে?

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে সারা দেশে অপরাধবিরোধী অভিযানে বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু মে মাসেই ৫১ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে। এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তার প্রমাণ দিলেও একই সঙ্গে এটাও নির্দেশ করে যে অপরাধের বিস্তার কতটা গভীর ও ব্যাপক।

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিসংখ্যান আরো উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। মাত্র দুই মাসে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং দুই হাজারেরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার ঘটনা সমাজের নৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকটকেও স্পষ্ট করে। প্রশ্ন হলো, কেন বাড়ছে এসব অপরাধ?

অপরাধ বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করছেন। প্রথমত, অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার ঘটেছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে। চতুর্থত, কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি এবং মাদকের বিস্তার নতুন প্রজন্মের একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পুলিশে গ্রুপিং, নৈতিক মনোবল ও পেশাদারিত্বের সংকট।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করলেই অপরাধ নির্মূল হয় না। অপরাধের অর্থায়ন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অস্ত্র সরবরাহ চক্র এবং গডফাদারদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে অপরাধ বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর কিংবা জাপান—সব দেশেই সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেটওয়ার্কভিত্তিক গোয়েন্দা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশেও এখন সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করার সময় এসেছে। মাঠের কর্মী বা ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু যারা তাদের পরিচালনা করছে, অর্থ জোগাচ্ছে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে রক্ষা করছে, তাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক যথার্থই বলেছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলে হবে না; তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও সমান কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই বক্তব্য বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বাহিনীকে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ পরিসংখ্যান ও কথার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় নিজের অভিজ্ঞতাকে। একজন নাগরিক যখন রাতের বেলা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন না, একজন ব্যবসায়ী যখন নগদ অর্থ নিয়ে চলতে ভয় পান, একজন নারী যখন প্রকাশ্যে ছিনতাইকারীর হামলায় প্রাণ হারান, তখন জনগণের কাছে নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়ন ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়।

তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। প্রথমত, রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। সিসিটিভি নেটওয়ার্ক, স্মার্ট মনিটরিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অপরাধ বিশ্লেষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

দ্বিতীয়ত, কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ সামাজিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

তৃতীয়ত, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস বন্ধ করতে হবে। অপরাধের অর্থনীতি ধ্বংস করতে না পারলে অপরাধও টিকে থাকবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

চতুর্থত, বিচার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। অপরাধী যদি জানে যে অপরাধের দ্রুত বিচার ও নিশ্চিত শাস্তি হবে, তাহলে অপরাধের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক প্রভাব নির্বিশেষে সবার জন্য সমান আইন নিশ্চিত করতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান—এই বার্তাটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হলে অপরাধীরা কখনোই ভয় পাবে না।

অর্থনীতি, অবকাঠামো, ডিজিটাল অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এসব অর্জনের সুফল জনগণের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাবে না। বিনিয়োগ, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর ভিত্তি হলো নিরাপত্তা।

পরিশেষে বলতে চাই, রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই জননিরাপত্তাকে কোনোভাবেই একটি সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি। সুতরাং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

কারণ একটি নিরাপদ বাংলাদেশই হতে পারে একটি সমৃদ্ধ, বিনিয়োগবান্ধব, মানবিক এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভিত্তি। জননিরাপত্তা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বেল্ট অ্যান্ড রোড থেকে ভূ-রাজনীতি : প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বহুমাত্রিক তাৎপর্য

সরদার এম জাহাঙ্গীর হোসেন
বেল্ট অ্যান্ড রোড থেকে ভূ-রাজনীতি : প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বহুমাত্রিক তাৎপর্য

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফর শুরু হয়েছে ২১ জুন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে তিনি চীনের উদ্দেশে রওনা হয়ে ২২ জুন রাতে চায়নার দালিয়ান ঝৌশুইজি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। এই সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট, যখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে তিনি এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তার সঙ্গে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর বিভিন্ন সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় ছিল। এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান সফর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘চায়নিজ পলিটিক্যাল ইকোনমি’ একটি বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী মডেল। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এই মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে নিয়ন্ত্রণ রাখলেও বেসরকারি খাতকে সমানভাবে উত্সাহিত করে। অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ব্যাংকিং খাতে এই সমন্বিত নীতি দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুত বর্ধনশীল উন্নয়নশীল দেশের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বহুমাত্রিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ‘চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামরিক, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সড়ক, রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম তারেক রহমানের এ সফরের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির অভাব ও অবকাঠামো ঘাটতি। চীনের সহযোগিতায় বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন সড়ক, সেতু, বিদ্যুেকন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ বিনিময়ের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অংশীদার। তৈরি পোশাক, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানির বিপরীতে বাংলাদেশ যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি করছে, যা শিল্পায়নকে গতিশীল করছে।

তবে এই সম্পর্কের কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ, বিশেষ করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য বিবেচ্য বিষয়। তাই একদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিছু কৌশল নিতে পারেন। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, কিন্তু একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রথমত, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না করে বহুমাত্রিক অংশীদারি গড়ে তোলা। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ থেকে অবকাঠামোগত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তি এবং ভারতের আঞ্চলিক সংযোগকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা জরুরি। চীনের বিনিয়োগকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে তা রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে শুধু ঋণনির্ভর প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সমপ্রসারণ এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ট্রানজিট ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়িয়ে একটি ‘উভয় পক্ষের লাভজনক’ পরিবেশ তৈরি হবে। তৃতীয়ত, কৌশলগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্প, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা প্রযুক্তিগত অংশীদারির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সন্দেহ কমিয়ে আস্থা বাড়াতে হবে। এতে করে ‘ভূ-রাজনৈতিক সন্দেহ’ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। চতুর্থত, বহুমুখী জোট কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও রপ্তানি এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংযোগ-এই তিনটি স্তম্ভে সমন্বিত কূটনীতি গড়ে তোলা উচিত হবে। এতে করে বাংলাদেশ কোনো পক্ষের বিরাগভাজন না হয়ে বরং সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

সর্বশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য মূল পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে নিতে পারেন বাংলাদেশকে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র না বানিয়ে অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা। বাস্তববাদী নীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

সর্বোপরি বলা যায়, চায়নার পলিটিক্যাল ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনি কৌশলগত চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল থাকলে এই সম্পর্ক থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন সম্ভব। তারেক রহমানের এই চায়না সফর তাই শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার এক সময়োপযোগী কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক (চায়না)