বাজেট একটি রাষ্ট্রের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার তার আয়-ব্যয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করে আসছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর নিয়মিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়, যা একটি ইতিবাচক দিক। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনো বাজেটবিহীন অবস্থায় পরিচালিত হয়নি।
প্রস্তাবিত বাজেটকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আশাবাদী বাজেট বলে মনে করি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ ও সংকটের পর সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় এবারের বাজেটের আকারে। যেখানে একসময় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে বিশাল বলে মনে করা হতো, সেখানে বর্তমানে বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি দেশের অর্থনীতির বিস্তার ও সরকারের ব্যয় পরিকল্পনার ব্যাপকতাকেই নির্দেশ করে। তবে এই বাজেট একটি ঘাটতি বাজেট। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার এত অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে কি না। কিন্তু বাজেট মূলত একটি পরিকল্পনা; সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব করেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। মনে হয় দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই খাত নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৮৩ সালে বেসরকারি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যাংক খাত নানা আলোচনা, সমালোচনা ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শুরু থেকেই অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স ও সুশাসনের ঘাটতি ছিল, যার প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশেষ করে গত দেড় বছরে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো আরও বেশি প্রকাশ্যে এসেছে। অনেকেই বলেন, এতদিন কার্পেটের নিচে চাপা থাকা সমস্যাগুলো এখন দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিংব্যবস্থায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার এবারের বাজেটে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রেখেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে এটি কি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যয় হবে, নাকি সম্ভাব্য একীভূতকরণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হবে।
ধরা যাক, যেসব ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সরকার এককভাবে এই বিপুল অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। তাই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ আমানতকারী সাধারণ মানুষ বা খুচরা গ্রাহক। তাঁদের সঞ্চয়ের পেছনে থাকে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তা। তাই ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানতকারীদের অর্থ কমিয়ে ফেরত দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবে গ্রহণ করা কঠিন।
এ কারণেই ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য সরকারের বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং ব্যাংকিংব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টাও বটে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা অর্জনের জন্য সুশাসন, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। আমাদের বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিচালক গণঋণ মঞ্জুর প্রক্রিয়ার অংশ নিয়ে থাকেন। এটা নিষিদ্ধ করা উচিত। ব্যাংক খাতের চলতি সংকট থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য পরিচালকদের ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত নয়। ঋণ দেওয়া যেকোনো ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজের অন্যতম। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা দেখভাল করবে পরিচালনা পর্ষদ এবং সুশাসন, আমানতকারীর স্বার্থ সেবা ও শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে। পরিচালকরা এই ভূমিকার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে পুনর্গঠন ও সংস্কারের যে বার্তা বাজেটে দেওয়া হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
লেখক : সাবেক পরিচালক এফবিসিসিআই








