• ই-পেপার

বাজেট ও ব্যাংক খাত : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

  • ড. এ কে এম সাহিদ রেজা

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন

ড. মো. মিজানুর রহমান
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন
সংগৃহীত ছবি

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ ঘাটতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বা সৌজন্যমূলক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে সফরটি প্রত্যাশা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর। স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ এবং সম্ভাবনাময় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে বাণিজ্য, শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়।

বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে মালয়েশিয়ার দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়। বাংলাদেশ এই শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক কেবল শ্রমবাজারনির্ভর না থেকে শিক্ষা ও জ্ঞান বিনিময়েও বিস্তৃত হয়। বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়।

একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন মডেল এবং অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অতীতের সহযোগিতার ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সময়কালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। তার সময়ে উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও বিকশিত হতে শুরু করে, যদিও তখন তা সীমিত পরিসরে ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান লাভ করে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়।

তবে এই পর্যায়ের সম্পর্ক মূলত শ্রমশক্তি রপ্তানিকেন্দ্রিক ছিল এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবুও এই সময়কালে গড়ে ওঠা মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সংযোগ পরবর্তী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বেশির ভাগ ভারত কেন্দ্রিক ফলে মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে দেশের অর্থনৈতিক সংযোগে তেমন বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের সময় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।

তবে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত মাত্রায় মালয়েশীয় বিনিয়োগও দেশে প্রবাহিত হয়নি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সম্ভাবনা থাকলেও তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক গভীরতা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাই সাম্প্রতিক সফরকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে শ্রমবাজার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নির্বাচন কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে এই সফরকে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন অংশীদার খোঁজার যে বৈশ্বিক প্রবণতা রয়েছে, বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে। সফরকালে মালয়েশিয়ার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। 

বৈঠক ও আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে উভয় দেশই সম্পর্ককে আরো গভীর ও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। অতীতে শ্রমবাজার, অভিবাসন নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যে কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, এই সফর তা প্রশমিত করে নতুন করে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।

মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতির লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ চেয়েছে যে মালয়েশিয়ার বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো দেশটিকে একটি উৎপাদন ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করুক। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্প উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, যেখানে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায়, কারণ বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো এখনো ভারসাম্যহীন।

শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রত্যাশা ছিল। কারিগরি প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানবসম্পদকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল।

এই প্রত্যাশার বিপরীতে দুই দেশ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার মনোভাব বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের চেয়ে ভবিষ্যৎ সুযোগের দিকেই বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কাঠামো তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে।

এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো তাৎক্ষণিক চুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় এই আস্থাই পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক চুক্তির পথ তৈরি করে। এই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা; নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে শ্রমশক্তির সরবরাহ এবং পাশাপাশি মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন এবং হালাল শিল্পে সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এসব আশ্বাসের বাস্তব মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে, ঘোষণার মাধ্যমে নয়।

বর্তমান সফরে বাংলাদেশ নিজেদেরকে শুধু শ্রমশক্তির উৎস নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং যৌথ শিল্প উদ্যোগের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দেশটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক শ্রমবাজারনির্ভর কাঠামো থেকে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হতে পারে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও এর স্থায়িত্ব ও গভীরতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, যেখানে অতীতে মধ্যস্বত্বভোগী, উচ্চ খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকা—যেমন ভূমি ব্যবস্থাপনা জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—মালয়েশিয়ার মতো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, কারণ বাংলাদেশ আমদানি বেশি করলেও রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবও সম্পর্কের স্থিতিশীল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলাফলভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে আসা প্রয়োজন। একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতকে একক কাঠামোয় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন করে অবকাঠামো, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা যেতে পারে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন—যেমন সরাসরি বিমান ও সমুদ্রপথ সংযোগ—ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ভর করে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার ওপর।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক এখন একটি নতুন অর্থনৈতিক পর্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাৎক্ষণিক বড় অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি হওয়া, যার ওপর ভবিষ্যৎ সহযোগিতা দাঁড়াতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। সঠিকভাবে এগোতে পারলে এই অংশীদারিত্ব শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

কান্নায় মোড়ানো অতীত

আবু তাহের

অনলাইন ডেস্ক
কান্নায় মোড়ানো অতীত

পেছন ফিরে তাকানো মানে অতীতপানে দেখা এবং না-দেখার বড়াই করা কারো কারো অভ্যাস। উভয় প্রকৃতির মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। একজনের সঙ্গে তো বছর চারেক মেসজীবনও কাটিয়েছি। সজ্জন ছিলেন সেই নূরুল ইসলাম। যার ঘরোয়া নাম নূরু। আজ, বহু বছর পর পিছন ফিরে দেখতে পাই : ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তীক্ষ্ণ যৌবনপুষ্ট চার বন্ধু পেয়ারু, হেলাল, বাদল ও আমি বাসস্থান খুঁজছি। সন্ধানও পাচ্ছি। কিন্তু বাড়িওয়ালা যে-ই না জেনে গেলেন যে হবু ভাড়াটেরা ব্যাচেলর অমনি বেঁকে বসলেন, ‘মাফ চাই বাবাজীবনরা! ফ্যামিলি নাই, ম্যারিজ করে নাই এরকুম কাউরে বাড়ি দিবার পারুম না।’ বিস্তর সাধ্যসাধনার পর নরমদিল বাড়িওয়ালা একজন পাওয়া গেল বটে, তবে তার দর শুনে উঠল গায়ে কম্পজ্বর।

প্রতি কামরায় কোনো রকমে দুই ব্যক্তির শয়নব্যবস্থা করা যায়, দুই কামরা আর বারান্দায় টেবিল পেতে আহার গ্রহণ সম্ভব। এ ধরনের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া সাড়ে তিনশ’ টাকা। পঞ্চাশ টাকা কম দেওয়ার প্রস্তাব দিই আমরা। বলি, চাচা আমরা অল্প বেতনের চাকুরে। একটু মেহেরবানি করেন। বাড়িওয়ালা জানান, তার পক্ষে মেহেরবান হওয়া অসম্ভব। তার সংসার বিরাট। ঘরজামাই পুষছেন, নাতিনাতনি আছে তিনটা, আছে গ্র্যাজুয়েট দুই খাটাস (অর্থাৎ তার ছেলে), যাদের নীতি ‘বাবার হোটেলে খাই/কোনো চিন্তা নাই।’ এরা পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ায়। সন্ত্রাসের মামলায় আসামি হয়। পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দেয়। প্রতি তিন মাস অন্তর এরকম অবস্থা দাঁড়ায়। তখন তারা পিত্রালয়ের বাইরে আত্মগোপনে থাকে। ওদের আত্মগোপনের সময়কালেই কেবল তার কলিজায় একটু ঠান্ডা বাতাস লাগে।

আমরা মরছি যন্ত্রণায় আর বাড়িওয়ালা শোনাচ্ছেন অপদার্থ দুই পুত্রপ্রাপ্তিজনিত বেদনার কাব্য। পেয়ারু বলে, বাড়ি জোগাড়ের জন্য মনে হচ্ছে আমাদেরও মাস্তানিতে নামতে হবে চাচা। তিনশ’ টাকায় কোথায় বাড়ি পাই যদি খোঁজ দিতেন...। বাড়িওয়ালা বলেন, ‘তা তো পারব না বাবা। তবে তোমরারে একটা বুদ্ধি দিবার পারি। আরো একজন পার্টনার নাও। পাঁচজনে মিলা বাড়ি নিলে মাথাপিছু ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা।’ আমরা রাজি। অগ্রিম ভাড়া বাবদ দেড়শ’ টাকা দেওয়া হলো। স্বস্তিতে যেন জ্বর নেমে গেল। মগবাজার রেলক্রসিং লাগোয়া ঘুমটি ঘরের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম আমরা। কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে চা বানাচ্ছেন দোকানি। পেয়ারু হঠাৎ বলে ‘ইউরেকা’!

দোকানের টিনের দেয়ালে সাঁটানো ৭ ইঞ্চি আকৃতির সাদা কাগজে মোটা হরফে লেখা-‘সঙ্গী হিসেবে থাকার জন্য মেস খুঁজছি। সন্ধানপ্রার্থী : নূরুল ইসলাম, ফোন নং...।’ হেলাল বলে, কী বুঝলি? দুর্ভাগ্য কখনো একা আসে না। এক্কেরে হাঁচা কথা। এখন বোঝা গেল, সৌভাগ্যও দোকলা হইয়া আসে। ঘর পাইছি। ঘরবসতের সাঙাতও পাইলাম! বাদল বলে, ‘এখনই নাচিস না। নূরুলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। দেরি করলে অন্য জায়গায় ফিটিং দিয়ে ফেলতে পারে।’ এক ঘণ্টার মধ্যে ফোনে কথা হলো। নূরুল ইসলাম এজিবির উচ্চমান সহকারী। সে জানায়, এটা সৌভাগ্য যে আমাদের মতো ভদ্রজনদের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ রাব্বুল আলামিন তাকে দিলেন।

২. দিন সাতেকের মধ্যেই আমরা নূরুল ইসলামের গুণমুগ্ধ হতে শুরু করি। ফলত, বাদল তাকে ‘নূরু ভাই’ বলে সম্বোধন করে। নূরুও বলে ‘বাদলদা’। নিজগুণে মেসের ম্যানেজার পদে উন্নীত হয় সে। বলে, ওয়াইফের খুব দুঃখ কেরানিগিরি করছি। এবার তাকে চিঠি লিখে জানাব, ‘সখী, ম্যানেজার হয়েছি মেসে/ফুর্তিতে গাও গীত ঝেড়ে গলা কেশে।’ ম্যানেজার নূরুর ফর্মুলা মেনে আমরা সপ্তাহে দুই দিন গরুর গোশত, দুই দিন খাসির গোশত, দুই দিন মাছ, দুই দিন মুরগি আর এক দিন নিরামিষ তরকারি খাই।

তখন উৎকৃষ্ট গরুর গোশতের সের (কেজির প্রচলনের আগে) সাড়ে তিন টাকা। সাধারণ গরুর গোশত পাওয়া যেত প্রতি সের তিন টাকায়। একবার গভীর রাতে নূরুর কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। পৃথক বিছানায় নূরু আর আমি থাকতাম একই কামরায়। ‘কাঁদছো কেন?’ জানতে চাইলে সে বলে, ‘স্বপ্নের ভিতর কাঁদছিলামরে।’ মাস কয়েকের মধ্যেই লক্ষ্য করি, যেদিনই নিরামিষ খেতাম আমরা, সেদিন গভীর রাতে নূরু কাঁদে। তবে কি সপ্তাহের বিশেষ দিনেই স্বপ্নের ভিতর কেঁদে ওঠা নূরুর জন্য নিয়ম করে দিলেন বিধাতা?

বিষয়টি আমাদের খুব ভাবায়। আমরা স্থির সিদ্ধান্তে এলাম : ওর এই কান্না ঘুমের ভিতরকার কান্না নয়। এক রাতে খাবার খাওয়ার পর মেসের সব বাসিন্দা বাড়ির সামনের মাঠে গল্প করছিলাম। এ সময় পেয়ারু বলে, আচ্ছা নূরু, তুমি নিরামিষের রাতে কেন কান্না কর? নূরু বলে, পেছন ফিরে তাকালে অনেকে আনন্দে ভাসে। ফেলে আসা দিনগুলোর সুখদায়ক স্মৃতি নাড়াচাড়া করে মানুষ প্রফুল্ল হয়। তখন মনে মনে তো হাসেই, সশব্দেও হেসে ওঠে। আবার পরাগ ছড়ানো স্বপ্ন ভরানো দিন আর আসবে না, এই বোধ তাকে কাঁদায়ও খুব। আমি কাঁদি দুঃখদিনের ঘটনাগুলোর দিকে তাকিয়ে, স্মৃতির ধাক্কায়।

কান্নায় মোড়ানো অতীতবলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে নূরুল ইসলাম। হেলাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই কান্নার দমক প্রবল হয়ে ওঠে। পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে আবার ওর কান্নার প্রসঙ্গ আসে। নূরু জানায়, নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুকালে নূরুর বয়স ৯ বছর। দাদা-দাদি তাকে লালন করেন। দাদা ছিলেন পেশায় ঘরামি। আয় ছিল সামান্য। তবে স্বপ্নটা ছিল বড়। নাতির পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতেন। আর্থিক কষ্ট এতটাই তীব্র ছিল যে বছরের প্রায় সব দিনই দুই বেলা নিরামিষ তরকারি দিয়ে ভাত খেতে হয়েছে। দাদি এজন্য খুব আফসোস করতেন। বলতেন, হায়রে আল্লাহ! নাতিটার পরীক্ষার কয়টা দিনও তুমি একটু আমিষ খাওয়ানোর কপাল আমাগোরে দিলা না!

ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার আগে এক রাতে ঘুম ভেঙে যায় নূরুর। রাত তখন দেড়টা। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় নূরু দেখতে পায়, মেঝেতে পাতা জায়নামাজে সেজদায় দাদি বলছেন, ইয়া রাহমানুর রহিম, নাতিটারে তুমি রক্ষা কর। দাদা-দাদি না থাকলেও ওর লেখাপড়া চালাইয়া যাওনের তৌফিক তুমি দিও। এখন তো তুমি ওরে নিরামিষ খাওয়াইয়া রাখছ। বড় হইলে যখন আয়রোজগারি হবে তখন তারে পরান ভইরা গোশ্তের সালুন খাওনের ক্ষমতা দিও পরওয়ারদিগার।

দাদা-দাদি তাকে বলেছিলেন, ভাই গো, গরিবের গলায় পাও দিয়া রোজগারপাতি বাড়ানোর চেষ্টা কখনো করবা না। উপরওয়ালা সইব না। মাইনষের ক্ষতি করবা না। পারলে তাগো উপকার করবা। সুদিনের দেখা পাইয়া দুর্দিনের মধ্যে থাকা মাইনষেরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার চিন্তারে কখনো পাত্তা দিবা না।

আমরা দেখেছি, নূরু অবিরাম পরোপকারে এগিয়ে যায়। গরিবের কল্যাণে যথাসাধ্য করে। কালক্রমে সে সরকারি উচ্চপদে চাকরি করেছে। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ে নেমেছে। বিত্ত হয়েছে অনেক। সে এখন সুখী পিতা। সুখী দাদা। সুখী নানা। তিন-চার বছর পর আমাদের সঙ্গে ওর হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। দামি গাড়ি থেকে নেমে সে হাতে ধরে আমাদেরও পেছনের দিনগুলোয় নিয়ে যায়। ফুটপাতের পাশে টেবিলে সাজানো দোকানে চা-বিস্কুট খাওয়ায়। এভাবে খেয়ে এবং খাইয়ে তার তৃপ্তি। মজা করে বলে : নিরামিষখেকো বন্ধুটারে এখনো তোমরা মনে রাখ, এই ফিলিং বুকের ছাতিটার প্রস্থ পঞ্চাশ ইঞ্চি বানাইয়া ফেলেছে রাইট নাউ।

৩. অবশ্যই আমরা নূরুকে মনে রেখেছি। ওকে মনে রাখতেই হয়। যারা অকপট, ন্যায়ানুরাগী ও সত্যাশ্রয়ী তাদের ভুলে থাকা যায়? পেয়ারু (সহিদ উদ্দিন মাহমুদ), হেলাল (বদরুল ইসলাম) আর বাদল (অরুনবরণ নাগ) যতদিন বেঁচেছিল বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট মৌসুমে নূরুর প্রিয় ফুটবল টিমকে কেন্দ্র করে বিনোদনদীপ্ত গল্প করেছে। আমিও ওই বিনোদনের ভাগ নিয়েছি।

মনে পড়ে আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল ম্যাচের দিনে সকাল থেকে নূরুল ইসলামের উত্তেজনা। তার প্রিয় টিম মোহামেডান যেদিন হারত সেদিন নূরুর চেহারা দেখে পেয়ারু বলত, ‘চেহারাখান এরকম কালো হইছে কেন বন্ধু। তোমার ফাদার-ইন-ল-পটল তুললেন নাকি?’ নূরুর জবাব : আবাহনীর চামচাদের চিন্তাভাবনার কালার দেখি আলকাতরায় চুবানো গামছার মতো!

ফুটবলবিষয়ক চিন্তা-উদ্দীপক তথ্য সংগ্রহ করার বাতিক নূরু এখনো বজায় রেখেছে। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলে সে কেপ ভার্দে দলের সমর্থক। বলে, গরিবের পক্ষে ছিলাম, আছি, দম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত থাকব ইনশাআল্লাহ।

নূরু থেকে সর্বসাম্প্রতিক পাওয়া চারটি তথ্য নিবেদন করছি- (ক) ইংল্যান্ড দলের স্ট্রাইকার ছিলেন গ্যারি লিনেকার। তিনি বলতেন, ‘ফুটবল একটি সহজ খেলা। বাইশটা লোক একটি বলের পেছনে ৯০ মিনিট দৌড়ায়। কিন্তু শেষতক সব সময় জিতে যায় জার্মানি।’

(খ) ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের রাইট উইংগার ছিলেন জর্জ বেস্ট (৫৯ বছর বয়সে ২০০৫ সালে মৃত্যু)। বেস্ট বলেন, ‘মদ খাওয়া, পাখি পোষণ ও দ্রুতগতির গাড়ি কেনার পেছনে আমি প্রচুর টাকা উড়িয়েছি। বাদবাকি খাতে যা খরচ করেছি তা ছিল অপব্যয় মাত্র।’

(গ) ডেভিড বেকহাম (ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার) সম্পর্কে জর্জ বেস্ট দারুণ বলে গেছেন। বেস্ট বলেন : বেকহাম বাম পায়ে কিক করতে পারে না। হেড করতে জানে না। ট্যাকলও করতে পারে না। গোলও তেমন দিতে পারে না সে। শুধু এগুলোই ওর গলদ, তার অন্য সব কাজ ঠিক।

(ঘ) ব্রিটিশ ফুটবলার পিটার ক্রাউচ ছিলেন চৌকশ স্ট্রাইকার। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলে ২২টি গোল করেন। দুইটি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে খেলেছেন তিনি। প্রশ্নের জবাবে চটকদার কথা বলা তাঁর স্বভাব। সাংবাদিকরা একবার প্রশ্ন করেন, ‘যদি ফুটবলার না হতেন, তাহলে আপনি কী হতে চাইতেন?’ পিটার ক্রাউচ বলেন, ‘কুমারী।’

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

সীমান্তে ভারতের পুশ ইনের অপচেষ্টা, প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান

মোস্তফা কামাল
সীমান্তে ভারতের পুশ ইনের অপচেষ্টা, প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান
সংগৃহীত ছবি

ঈদ-চাঁদ শেষে কর্মস্থল জমেছে। গণমাধ্যমজুড়ে ছিল মানুষের ঘরে ফেরা সংক্রান্ত খবর। কর্মস্থলে ফেরার পর এখন খবরের জগৎ বাজেট নিয়ে। গত মাস খানেকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিশাল সীমান্তজুড়ে কী পরিস্থিতি যাচ্ছে, তা কিভাবে মোকাবেলা করে চলছে আমাদের সীমান্ত সার্দুল বিজিবি সদস্যরা—সেই খবরাদির সামান্য অংশই আসছে গণমাধ্যমে। সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ভারতের পরিকল্পিত ও আরোপিত পুশ ব্যাকের অপচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিহত করছে তারা। দিন-রাত মিলিয়ে অহর্নিশ বিভিন্ন সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে বিজিবি। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে টহল, মাইকিংসহ বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিয়ে কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। এরইমধ্যে পুশ ইনের বেশ কয়েকটি চেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের সঙ্গে। ভারতীয় বাহিনীর একটি অপচেষ্টাও সফল হতে দেয়নি বিজিবি।

এরপরও বিএসএফসহ ভারতীয় সীমান্ত সম্পৃক্ত শক্তি দমছে না। দৃশ্যত একটু আধটু দম নেয়। পুশ ইনের উদ্দেশ্যে আজ এখানে কাল সেখানে সীমান্তের নানা পয়েন্টে কথিত বাংলাদেশিকে জড়ো করে। বিজিবি আগাম তথ্যদৃষ্টে যথা প্রস্তুতিতে তা রুখে দিচ্ছে।  আক্ষরিক অর্থে ‘সার্দুল’ বা ‘শার্দুল’ শব্দের অর্থ হলো সিংহ বা বাঘ। আর কিছুদিন ধরে সীমান্ত প্রশ্নে বাস্তব অর্থে ‘সীমান্ত সার্দুল’ বলতে আমাদের নির্ভীক বিজিবি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের অবৈধ পুশ ইন বা অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা রুখে দেওয়ার এক কঠিন ও উত্তেজনাপূর্ণ সময় পার করছে তারা। বেনাপোল, সাতক্ষীরা এবং হিলিসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবির গত কিছু দিনের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, সীমান্তবাসীর উদ্বেগ স্মরণকালের ঘটনা। 

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ব্যাপক পুশ ইন যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ভারত থেকে বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষকে অবৈধ অভিবাসী, রোহিঙ্গাসহ নানা আখ্যা দিয়ে বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার এ পুশ ইন চেষ্টা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আক্রমণাত্মক। তা সীমান্তে সংকটই তৈরি করছে না। সীমান্তে মানবিক বিপর্যয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি এবং দুই দেশের মধ্যে চরম কূটনৈতিক অস্বস্তিও ডাকছে। ভারত তার বিভিন্ন রাজ্য থেকে দলবদ্ধভাবে মানুষকে যে ভাবে পুশ ইনের আয়োজন করছে তা সাধারণ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং ভারতের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কৌশলগত চাপের অংশ। বিএসএফ যখন কাঁটাতার ঘেঁষে বা নো-ম্যান্স ল্যান্ডে লোকজনকে জড়ো করে ঠেলে দেওয়ার আয়োজন করে তখন বিজিবিকে বাধ্য হয়ে ‘পুশ ব্যাক’ বা প্রতিরোধ করতে হয়। সমস্যাটি ভারতের নিজস্ব বা তৈরি করা। পুশ ইন প্রক্রিয়ার শিকার ব্যক্তিরা তীব্র পরিচয়ের সংকটে আক্রান্ত। তাদের অনেকেরই বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্ব বা কাগজপত্র থাকার পরও সন্দেহবশত বিতাড়িত করার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বিজিবি এ অন্যায় অনুপ্রবেশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বারবার কূটনৈতিক পত্র (ডিপ্লোমেটিক নোট) পাঠাচ্ছে। ভারত গা মাখাচ্ছে না। তারা সমস্যাটি জিইয়ে রাখছে বা সমস্যাকে আরো পাকাচ্ছে একেবারেই নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। এ এক চরম ট্র্যাজেডি। রাজনীতি ভারতের, আর ভুগছে বাংলাদেশকে। গলদঘর্ম হতে হচ্ছে বিজিবিকে। 

এমনিতেই দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান দমনে দিন-রাত হাই ভলিউম কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় বিজিবিকে। সীমান্তে অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ তাদের নিয়মিত কাজ। সেখানে এখন যোগ হয়েছে বাড়তি কাজ পুশ ইন রোখা বা ভারতের অভ্যন্তরীণ নোংরা রাজনীতির ঠেলা সামলানো। গঠনগতভাবে বিজিবি কেবল সীমান্ত সুরক্ষাই দেয় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। শিক্ষা-চিকিৎসায়ও ভূমিকা রাখে। আবার জাতীয় প্রয়োজনে সময়ে সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতি সামলানোর কাজেও আসতে হয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বরাবরই ভারতের আচরণ আক্রমণাত্মক। মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশের মানুষকে গুলি করে বা নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো বা ‘পুশ ইন’ করা। 

ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য রাজ্যে গত কয়েক বছরে ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ অভিযান জোরদার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ভাষা, ধর্ম কিংবা আর্থসামাজিক অবস্থানই সন্দেহের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মানুষদের নাগরিকত্ব প্রমাণে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন কিংবা দারিদ্র্যের কারণে বহু পরিবারের পুরোনো নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ায় নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) প্রক্রিয়ার সময়ও নথিপত্রগত অসংগতির কারণে বহু মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।

এক দেশের কোনো নাগরিক আরেক দেশে অনুপ্রবেশ করলে তাঁকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। কিন্তু ভারত যেভাবে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া মনগড়া প্রক্রিয়ায় কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করে তা সম্পূর্ণ বেআইনি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী। এভাবে পুশ ইনের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক পত্র দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এখনো সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে পুশ ইনের জন্য মানুষ জড়ো করা হচ্ছে।  নিকট অতীতে ভারত কর্তৃক এভাবে বড় ধরনের পুশ ইনের ঘটনা ঘটেনি। তবে এর আগে ২০০২-০৩ সালের দিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত থেকে প্রায়ই পুশ ইনের ঘটনা ঘটত। এরপর দুই দেশেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পুশ ইনের ঘটনা অনেক দিন ঘটেনি। অনেক দিন পর সম্প্রতি আবারও সেই ধারাপাত। একে বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক পরিচয়, মানবাধিকার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি আরো আলোচনায় আসে। 

অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবেলাই যদি ভারতের উদ্দেশ্য হতো, তাহলে নারী-শিশুসহ এই মানুষগুলোকে চোখ বেঁধে নির্যাতন করে না খাইয়ে সীমান্তের জনমানবহীন স্থানে পুশ ইন করার প্রয়োজন পড়ত না। সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রটোকল রয়েছে। এ রকম দুটি প্রটোকল হলো জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (সিবিএমপি), ২০১১। এসব প্রটোকলের আওতায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মানব পাচার থেকে শুরু করে সব ধরনের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে ঢুকে থাকে, স্বভাবতই তাদের যে আইন আছে সে অনুসারে তাদের বিচার হবে। অথবা বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে জানাবে। এটা না করে পুশ ইন করাটা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য একটা অপরাধ। ভারত ওইসব নিয়মের ধারেকাছেও যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি অনুসারেও এভাবে এক দেশ থেকে মানুষকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া অবৈধ। ইন্টারন্যাশনাল কোভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) বা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির আর্টিকেল ১৩ অনুসারে, কোনো দেশে বৈধভাবে থাকা ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সেই দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। এ আর্টিকেলটি শুধু বৈধ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য হলেও আর্টিকেল ১২(৪) অনুসারে, কোনো মানুষকেই তাঁর নিজ দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির মতে, এই বিধান বৈধ নাগরিকদের পাশাপাশি যাঁদের বৈধ নাগরিকত্বের কাগজপত্র নেই কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো দেশে বসবাস করছেন, তাঁদের জন্যও প্রযোজ্য। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করেছে। ফলে ভারত তার নিজ দেশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাংলাভাষী নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে সরাসরি এই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে। অন্যদিকে কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অব দ্য রাইটস অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বারস অব দেয়ার ফ্যামিলি বা অভিবাসী শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অধিকারের সুরক্ষাবিধি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২২ ধারা অনুসারে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো অভিবাসী শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কোনো দেশ থেকে বহিষ্কার করা যাবে না। কাজেই ভারত যে গায়ে পড়ে গণ্ডগোল পাকাতে চায় বিষয়টি একদম পরিষ্কার।  কোনো না কোনো ছুঁতায় কোনো না কোনো বর্ডারে একটা সংঘর্ষ লাগাতে চায় তারা। পুশ ইনের ঘটনার আগে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে এসে অনেকগুলো জায়গা তাদের বলে দখল করেছিল। বাংলাদেশের জনগণ বিজিবির সঙ্গে মিলে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই বিজিবি ভারতের কাছে ভীষণ না’পছন্দের এবং অসহ্যের। তাই ভারতের দিক থেকে পুশ ইন এবং বিজিবিকে কর্মভারে নাজেহাল রাখা একটি ‘সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ’। 

বলা যায়, ভারতের দিক থেকে এটা বেশ ডিজাইন করা। তারা ‘পুশ ইন’ কিন্তু একটা জায়গা থেকে করার চেষ্টা করছে না। সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা থেকে হচ্ছে। তার মানে এটা বেশ সমন্বিত ও পরিকল্পিত।  পুশ ইনের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের দুর্ভোগ। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তের জিরো লাইন, অস্থায়ী ক্যাম্প, সরকারি গেস্ট হাউস, এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আটক ব্যক্তিদের রাখার খবর পাওয়া গেছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অনেকে দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাচ্ছেন। তারা কোথায় যাবেন, কোন দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন কিংবা শেষ পর্যন্ত তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে— এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দরকার। 

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

মহিলা এমপি কি কেবলই সংখ্যার কোটা, নাকি গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার

ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন মুসা

অনলাইন ডেস্ক
মহিলা এমপি কি কেবলই সংখ্যার কোটা, নাকি গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার

সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি দেশের উন্নত নীতিনির্ধারণ, দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা গেছে, নীতিনির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি সুশাসন নিশ্চিতকরণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও সংস্কার নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে আন্তর্জাতিক গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়াও এই সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে উল্লেখ করেছেন যে বাংলাদেশে সংসদে নারীর প্রকৃত উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত কম, যা শুধু লিঙ্গসমতার প্রশ্ন নয়; বরং সুশাসন ও নীতিনির্ধারণের মানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রয়োগ উপযোগী গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়লে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নীতির মান উন্নত হয়, দুর্নীতি কমে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও হ্রাস পায়। মূলত নারীরা যখন সংসদে আসেন তখন আইন ও নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। Tracking analysis অনুযায়ী, নারী সংসদ সদস্যরা সাধারণত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি এবং শিশু ও মাতৃকল্যাণের মতো মৌলিক সামাজিক খাতগুলোতে বাজেট ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে বেশি জোর দেন। এর পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নসংক্রান্ত প্রগতিশীল ও জেন্ডার-সংবেদনশীল আইন পাসে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁদের মাধ্যমেই সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চাহিদাগুলো নীতিনির্ধারণী টেবিলে সহজে স্থান পায়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা (যেমন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ডেটা) প্রমাণ করে যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি হ্রাসের একটি সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। সংসদীয় কমিটিতে নারীর উপস্থিতি বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে সাহায্য করে। নতুন নারী নেতৃত্বের আগমনে প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ও অনানুষ্ঠানিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট বা নেটওয়ার্কগুলো বাধাগ্রস্ত হয়, যা প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কমিয়ে আনে। তা ছাড়া সাধারণত নারীরা অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় কম ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন, যা রাজনৈতিক দুর্নীতি কমিয়ে আনে। তবে শুধু নারী হওয়ার কারণেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্নীতিমুক্ত হবেন-এমন সরলীকরণ বাস্তবসম্মত নয়; দুর্নীতি মূলত নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং আইনের প্রয়োগের ওপর।

গবেষকদের মতে, নারীরা দীর্ঘকাল ক্ষমতার মূল বলয় থেকে দূরে থাকায় তাদের সম্পৃক্ততা কম দেখা গেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি না থাকলে ক্ষমতার নিজস্ব চরিত্র অনুযায়ী তাদের মধ্যেও বিচ্যুতির প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সহনশীলতা বজায় রাখতেও নারী নেতৃত্বের ভূমিকা অনন্য। নারীরা সাধারণত চরমপন্থা বা সংঘাতের চেয়ে আলোচনা, সমঝোতা এবং মধ্যস্থতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে বেশি পারদর্শী। যে রাষ্ট্রগুলোয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নাগরিক অস্থিরতার হার তুলনামূলক কম। নারী সংসদ সদস্যরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন। বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় যেখানে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি মূলত সামরিক, অবকাঠামো ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে নারী অংশীদারত্বমূলক রাজনীতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে এগিয়ে নেয়।

তাত্ত্বিকভাবে এই ধারণার মূল ভিত্তি আরও গভীরে প্রোথিত। কার্ল মার্কস এবং তার দর্শনের অনুসারীরা বহু আগেই দেখিয়েছেন যে মানবজাতির সামগ্রিক ইতিহাসকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।

তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আদিম মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয় যুগের ইতিহাসে ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপস্থিতির কারণে পৃথিবীতে সংঘাত ও যুদ্ধের প্রবণতা অনেক কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সমাজে যখন পুরুষতান্ত্রিকতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিবৈষম্য এবং বৈশ্বিক সংঘাতের মাত্রা বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে আধুনিক সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কেবল সমসাময়িক কোনো সংস্কার নয়, বরং এটি সমাজকে সেই আদিম সংঘাতহীন ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতির দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস।

তবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘সংখ্যার উপস্থিতি’ (Descriptive Representation) ও ‘অর্থবহ প্রভাব’ (Substantive Representation)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ রুয়ান্ডায় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের হার বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে (প্রায় ৬১ শতাংশ) হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা কিছুটা কর্তৃত্ববাদী হওয়ায় নীতিনির্ধারণে নারীদের স্বাধীন প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে উচ্চ নারী প্রতিনিধিত্ব এক অনন্য নাগরিকমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সংসদে কেবল নারীর সংখ্যা বাড়ালেই লক্ষ্য অর্জন হয় না, যদি না তাঁদের অর্থ বা প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফোরামে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া হয়।

এই বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা বা বিরোধীদলীয় নেতা পর্যায়ে নারীর নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে। বাংলাদেশে জাতিসংঘের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্পিকারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন যে নারী অধিকার রক্ষা ও পলিটিক্যাল ইকোনমিকের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে, যা দেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র চর্চার পথ সুগম করছে। তবে দেশীয় থিংক-ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি এবং প্রখ্যাত গবেষকদের সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু কাঠামোগত বাধাও উঠে এসেছে।

আমাদের সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও এটি এখনো মূলত সংরক্ষিত আসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, যেখানে সাধারণ আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার হার ৫ শতাংশের নিচে। সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের অনেক সময় ‘দ্বিতীয় শ্রেণির সংসদ সদস্য’ হিসেবে দেখার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা রাজনীতিতে রয়ে গেছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কমিটিতে নারীদের প্রতিনিধিত্বের আইনি লক্ষ্যমাত্রা (৩৩ শতাংশ) অর্জনে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২.৩৩ শতাংশ।

এই কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু জটিলতা নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে আরও ধোঁয়াশাপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলের বিগত নির্বাচনগুলোতে সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হওয়ায়, রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে নারীর গুণগত ও প্রকৃত অংশগ্রহণের আসল চিত্রটি আড়ালেই রয়ে গেছে। যখন একটি নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোটাধিকার এবং অবাধ প্রতিযোগিতার পরিবেশ মার খায়, তখন সেখানে নারী প্রার্থীদের প্রকৃত জনসমর্থন বা স্বাধীন কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্তিশালী নারী নেতৃত্ব উঠে আসার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তা এই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনি সংস্কৃতির কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয় সংসদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা) নারীদের প্রকৃত, প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে এই সামগ্রিক সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ স্থানীয় সরকারই হলো রাজনীতির মূল ভিত্তি; সেখানে যদি নারীরা কেবল সংরক্ষিত আসনের কোটা বা পুরুষ জনপ্রতিনিধিদের ছায়াতলে প্রতীকী নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করেন, তবে জাতীয় পর্যায়ে এর ইতিবাচক রূপান্তর আশা করা অবাস্তব। সুতরাং পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শ্রেণিগত বৈষম্য (যেখানে রাজনীতিতে আসা নারীদের বড় অংশই উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য)  এবং নির্বাচনি প্রচারণায় নারীদের প্রতি ক্রমবর্ধমান সাইবার বুলিং ও হয়রানি রোধের পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনি পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় উভয় পর্যায়ে সরাসরি নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য হারে যোগ্য নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া, রাজনীতিতে আগ্রহী নারীদের সুরক্ষায় অনলাইন হেনস্তা কঠোর হস্তে দমন এবং নারী প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণার জন্য দলীয় তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গবেষক ফার্নান্দো বের্তোয়ার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজনীতিকে কালোটাকা ও সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে এবং নারীদের মতো যোগ্য প্রার্থীদের অর্থনৈতিক সমতা দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থায়ন’ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।  তাই বলা যায়, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের হাতিয়ার।  বাংলাদেশ যদি সংরক্ষিত আসনের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অর্থবহ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ প্রকৃত অর্থেই বাড়াতে পারে, তবে দুর্নীতি হ্রাস এবং একটি সহনশীল ও সংঘাতমুক্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণের সম্ভাবনা আরও দ্রুত গতিতে বাস্তবে রূপ নেবে। এর জন্য কেবল প্রতীকী অন্তর্ভুক্তির ঊর্ধ্বে উঠে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে নারী সংসদ সদস্যরা দলের অন্ধ আনুগত্যের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সমঅধিকারসম্পন্ন প্রয়োজনে (১০০:১০০ হারে) অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।

লেখক : ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, অধ্যাপক (অব.) রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক