• ই-পেপার

সীমান্তে ভারতের পুশ ইনের অপচেষ্টা, প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান

ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা

ড. মো. মিজানুর রহমান
ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা
ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ বা শিল্প-কারখানার বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মূল ভিত্তি হলো মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদের গুণগত মান নির্ধারণ করে মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক জীবনমান। একজন সুস্থ নাগরিক যেমন ব্যক্তিগত জীবনে অধিক সক্ষম, তেমনি তিনি জাতীয় অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাই আধুনিক উন্নয়নচিন্তায় স্বাস্থ্য খাতকে আর কেবল একটি সামাজিক সেবা খাত হিসেবে দেখা হয় না; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তবে এই অর্জনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক কম সরকারি বিনিয়োগ, সীমিত অবকাঠামো এবং জনবল ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং অসংক্রামক রোগের বিস্তার স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার তুলনায় বিদ্যমান সক্ষমতার ব্যবধান ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায়। ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার এই বরাদ্দ শুধু আর্থিক সম্প্রসারণ নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতকে উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে জিডিপিতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের অংশ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি এখনো সীমিত, তবুও এটি দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতকে এখন আর প্রান্তিক খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই বাজেটের ইতিবাচকতা কেবল অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর কাঠামোগত দিকগুলোই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে একদিকে সেবার সম্প্রসারণ, অন্যদিকে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায়। নতুন জনবল নিয়োগের উদ্যোগ এই ঘাটতি কমাতে এবং সেবার পরিধি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার সম্প্রসারণও এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু চিকিৎসক নয়, দক্ষ নার্স ও মিডওয়াইফ অপরিহার্য। মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক সেবা এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক স্বাস্থ্য সূচক উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা, রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সেবার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় ওষুধ শিল্পকে সহায়তার উদ্যোগ স্বাস্থ্য খাতকে আরও টেকসই ও সক্ষম ভিত্তি প্রদান করবে।
তবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কেবল বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কাঠামোগত বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাতকে কার্যকরভাবে শক্তিশালী করতে হলে এটিকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একজন সুস্থ মানুষ কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; তিনি জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। সুস্থ নাগরিকরা যেমন বেশি কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল, তেমনি অসুস্থ জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ সরাসরি জাতীয় উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য একটি মৌলিক ভিত্তি। একটি শিশু যদি অপুষ্টিতে ভোগে বা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে সুস্থ ও পুষ্টিসম্পন্ন শিশু ভবিষ্যতে দক্ষ ও উৎপাদনশীল নাগরিকে পরিণত হয়। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতার ওপর বিনিয়োগ। বাংলাদেশ যখন উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই স্বাস্থ্য খাতকে সামাজিক ব্যয়ের পরিবর্তে কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা জরুরি।

তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখনো চাহিদার তুলনায় সীমিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ঘাটতি রয়েছে, যার ফলে সাধারণ রোগের ক্ষেত্রেও রোগীদের বড় শহরের ওপর নির্ভর করতে হয়। একই সঙ্গে রোগের ধরনে পরিবর্তন ঘটেছে—সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যান্সার ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর “ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ” তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং পরিবেশ দূষণও নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি এখনো একটি বড় সীমাবদ্ধতা, যা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থায়নের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ব্যক্তিগত ব্যয়ের উচ্চ নির্ভরতা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই জনগণকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বৈশ্বিকভাবে অন্যতম সর্বোচ্চ হার। এই উচ্চ Out-of-Pocket (OOP) ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর আর্থিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একটি সাধারণ অসুস্থতাও অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক সংকটে পরিণত হয়—সঞ্চয় ভাঙা, সম্পদ বিক্রি বা ঋণের বোঝা নেওয়া তাদের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে স্বাস্থ্য সমস্যা ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের একটি প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।

এই পরিস্থিতির সামাজিক প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় ব্যয়ের ভয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করে বা চিকিৎসা এড়িয়ে যায়, যার ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং পরবর্তী চিকিৎসা আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। নারী, শিশু এবং বয়স্করা এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই স্বাস্থ্য খাত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং জনগণের ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কতটা কমছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ছাড়া এই চাপ কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব নয়।

একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। বিশ্বজুড়ে যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ে উন্নত স্বাস্থ্যসূচক অর্জন করেছে, তারা এই স্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশেও কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূল কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই স্তরগুলো যত শক্তিশালী হবে, সাধারণ রোগ, মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান এবং পুষ্টি কার্যক্রম তত বেশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে এবং রোগীরা তুলনামূলক দ্রুত, সহজ ও কম খরচে সেবা পেতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের জন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রায়ই ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগকে কেবল ব্যয় হিসেবে না দেখে বরং সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এমন একটি কাঠামো, যেখানে কোনো ব্যক্তি আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয় না বা চিকিৎসা নিতে গিয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়ে না। বাংলাদেশ এই লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হলেও বাস্তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো মূলত ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা অনেক পরিবারকে উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। একটি গুরুতর অসুস্থতাই অনেক সময় একটি পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দিতে পারে।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রথমত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ধাপে ধাপে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে রোগের আর্থিক ঝুঁকি ব্যক্তি পর্যায় থেকে সমাজভিত্তিকভাবে ভাগাভাগি করা যায়। তৃতীয়ত, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে UHC কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনবল বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে UHC অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সুশাসনের ওপর। স্বাস্থ্য বাজেট যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, এর বাস্তব ফলাফল নির্ভর করে সঠিক ও সময়োপযোগী বাস্তবায়নের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক সময় বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয় বা কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না—যা স্বাস্থ্য খাতের একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সীমিত সক্ষমতা, জটিল ক্রয় প্রক্রিয়া এবং কোথাও কোথাও স্বচ্ছতার অভাব স্বাস্থ্য খাতের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা, যেখানে অনেক সময় বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট যে সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সুশাসন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং, ই-প্রকিউরমেন্ট, নিয়মিত অডিট এবং স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থার মতো সংস্কার ছাড়া কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি জনগণের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করতে পারে না। পাশাপাশি এই বিনিয়োগকে একটি এককালীন উদ্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নীতিগত অগ্রাধিকারে পরিণত করা জরুরি, যাতে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয় এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

অন্যদিকে, এই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন এবং গবেষণা-উদ্ভাবনে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে তারা প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় সেবা দিতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড, টেলিমেডিসিন এবং ডেটা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে পারে। সবশেষে বলা যায়, এই বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে, তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দক্ষ বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর—কারণ একটি জাতির অর্থনৈতিক অগ্রগতি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার জনগণের সুস্বাস্থ্যের ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন

ড. মো. মিজানুর রহমান
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন
সংগৃহীত ছবি

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ ঘাটতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বা সৌজন্যমূলক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে সফরটি প্রত্যাশা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর। স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ এবং সম্ভাবনাময় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে বাণিজ্য, শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়।

বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে মালয়েশিয়ার দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়। বাংলাদেশ এই শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক কেবল শ্রমবাজারনির্ভর না থেকে শিক্ষা ও জ্ঞান বিনিময়েও বিস্তৃত হয়। বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়।

একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন মডেল এবং অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অতীতের সহযোগিতার ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সময়কালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। তার সময়ে উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও বিকশিত হতে শুরু করে, যদিও তখন তা সীমিত পরিসরে ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান লাভ করে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়।

তবে এই পর্যায়ের সম্পর্ক মূলত শ্রমশক্তি রপ্তানিকেন্দ্রিক ছিল এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবুও এই সময়কালে গড়ে ওঠা মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সংযোগ পরবর্তী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বেশির ভাগ ভারত কেন্দ্রিক ফলে মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে দেশের অর্থনৈতিক সংযোগে তেমন বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের সময় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।

তবে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত মাত্রায় মালয়েশীয় বিনিয়োগও দেশে প্রবাহিত হয়নি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সম্ভাবনা থাকলেও তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক গভীরতা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাই সাম্প্রতিক সফরকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে শ্রমবাজার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নির্বাচন কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে এই সফরকে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন অংশীদার খোঁজার যে বৈশ্বিক প্রবণতা রয়েছে, বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে। সফরকালে মালয়েশিয়ার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। 

বৈঠক ও আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে উভয় দেশই সম্পর্ককে আরো গভীর ও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। অতীতে শ্রমবাজার, অভিবাসন নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যে কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, এই সফর তা প্রশমিত করে নতুন করে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।

মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতির লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ চেয়েছে যে মালয়েশিয়ার বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো দেশটিকে একটি উৎপাদন ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করুক। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্প উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, যেখানে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায়, কারণ বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো এখনো ভারসাম্যহীন।

শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রত্যাশা ছিল। কারিগরি প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানবসম্পদকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল।

এই প্রত্যাশার বিপরীতে দুই দেশ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার মনোভাব বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের চেয়ে ভবিষ্যৎ সুযোগের দিকেই বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কাঠামো তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে।

এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো তাৎক্ষণিক চুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় এই আস্থাই পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক চুক্তির পথ তৈরি করে। এই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা; নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে শ্রমশক্তির সরবরাহ এবং পাশাপাশি মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন এবং হালাল শিল্পে সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এসব আশ্বাসের বাস্তব মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে, ঘোষণার মাধ্যমে নয়।

বর্তমান সফরে বাংলাদেশ নিজেদেরকে শুধু শ্রমশক্তির উৎস নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং যৌথ শিল্প উদ্যোগের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দেশটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক শ্রমবাজারনির্ভর কাঠামো থেকে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হতে পারে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও এর স্থায়িত্ব ও গভীরতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, যেখানে অতীতে মধ্যস্বত্বভোগী, উচ্চ খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকা—যেমন ভূমি ব্যবস্থাপনা জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—মালয়েশিয়ার মতো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, কারণ বাংলাদেশ আমদানি বেশি করলেও রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবও সম্পর্কের স্থিতিশীল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলাফলভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে আসা প্রয়োজন। একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতকে একক কাঠামোয় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন করে অবকাঠামো, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা যেতে পারে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন—যেমন সরাসরি বিমান ও সমুদ্রপথ সংযোগ—ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ভর করে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার ওপর।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক এখন একটি নতুন অর্থনৈতিক পর্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাৎক্ষণিক বড় অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি হওয়া, যার ওপর ভবিষ্যৎ সহযোগিতা দাঁড়াতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। সঠিকভাবে এগোতে পারলে এই অংশীদারিত্ব শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

কান্নায় মোড়ানো অতীত

আবু তাহের

অনলাইন ডেস্ক
কান্নায় মোড়ানো অতীত

পেছন ফিরে তাকানো মানে অতীতপানে দেখা এবং না-দেখার বড়াই করা কারো কারো অভ্যাস। উভয় প্রকৃতির মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। একজনের সঙ্গে তো বছর চারেক মেসজীবনও কাটিয়েছি। সজ্জন ছিলেন সেই নূরুল ইসলাম। যার ঘরোয়া নাম নূরু। আজ, বহু বছর পর পিছন ফিরে দেখতে পাই : ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তীক্ষ্ণ যৌবনপুষ্ট চার বন্ধু পেয়ারু, হেলাল, বাদল ও আমি বাসস্থান খুঁজছি। সন্ধানও পাচ্ছি। কিন্তু বাড়িওয়ালা যে-ই না জেনে গেলেন যে হবু ভাড়াটেরা ব্যাচেলর অমনি বেঁকে বসলেন, ‘মাফ চাই বাবাজীবনরা! ফ্যামিলি নাই, ম্যারিজ করে নাই এরকুম কাউরে বাড়ি দিবার পারুম না।’ বিস্তর সাধ্যসাধনার পর নরমদিল বাড়িওয়ালা একজন পাওয়া গেল বটে, তবে তার দর শুনে উঠল গায়ে কম্পজ্বর।

প্রতি কামরায় কোনো রকমে দুই ব্যক্তির শয়নব্যবস্থা করা যায়, দুই কামরা আর বারান্দায় টেবিল পেতে আহার গ্রহণ সম্ভব। এ ধরনের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া সাড়ে তিনশ’ টাকা। পঞ্চাশ টাকা কম দেওয়ার প্রস্তাব দিই আমরা। বলি, চাচা আমরা অল্প বেতনের চাকুরে। একটু মেহেরবানি করেন। বাড়িওয়ালা জানান, তার পক্ষে মেহেরবান হওয়া অসম্ভব। তার সংসার বিরাট। ঘরজামাই পুষছেন, নাতিনাতনি আছে তিনটা, আছে গ্র্যাজুয়েট দুই খাটাস (অর্থাৎ তার ছেলে), যাদের নীতি ‘বাবার হোটেলে খাই/কোনো চিন্তা নাই।’ এরা পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ায়। সন্ত্রাসের মামলায় আসামি হয়। পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দেয়। প্রতি তিন মাস অন্তর এরকম অবস্থা দাঁড়ায়। তখন তারা পিত্রালয়ের বাইরে আত্মগোপনে থাকে। ওদের আত্মগোপনের সময়কালেই কেবল তার কলিজায় একটু ঠান্ডা বাতাস লাগে।

আমরা মরছি যন্ত্রণায় আর বাড়িওয়ালা শোনাচ্ছেন অপদার্থ দুই পুত্রপ্রাপ্তিজনিত বেদনার কাব্য। পেয়ারু বলে, বাড়ি জোগাড়ের জন্য মনে হচ্ছে আমাদেরও মাস্তানিতে নামতে হবে চাচা। তিনশ’ টাকায় কোথায় বাড়ি পাই যদি খোঁজ দিতেন...। বাড়িওয়ালা বলেন, ‘তা তো পারব না বাবা। তবে তোমরারে একটা বুদ্ধি দিবার পারি। আরো একজন পার্টনার নাও। পাঁচজনে মিলা বাড়ি নিলে মাথাপিছু ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা।’ আমরা রাজি। অগ্রিম ভাড়া বাবদ দেড়শ’ টাকা দেওয়া হলো। স্বস্তিতে যেন জ্বর নেমে গেল। মগবাজার রেলক্রসিং লাগোয়া ঘুমটি ঘরের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম আমরা। কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে চা বানাচ্ছেন দোকানি। পেয়ারু হঠাৎ বলে ‘ইউরেকা’!

দোকানের টিনের দেয়ালে সাঁটানো ৭ ইঞ্চি আকৃতির সাদা কাগজে মোটা হরফে লেখা-‘সঙ্গী হিসেবে থাকার জন্য মেস খুঁজছি। সন্ধানপ্রার্থী : নূরুল ইসলাম, ফোন নং...।’ হেলাল বলে, কী বুঝলি? দুর্ভাগ্য কখনো একা আসে না। এক্কেরে হাঁচা কথা। এখন বোঝা গেল, সৌভাগ্যও দোকলা হইয়া আসে। ঘর পাইছি। ঘরবসতের সাঙাতও পাইলাম! বাদল বলে, ‘এখনই নাচিস না। নূরুলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। দেরি করলে অন্য জায়গায় ফিটিং দিয়ে ফেলতে পারে।’ এক ঘণ্টার মধ্যে ফোনে কথা হলো। নূরুল ইসলাম এজিবির উচ্চমান সহকারী। সে জানায়, এটা সৌভাগ্য যে আমাদের মতো ভদ্রজনদের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ রাব্বুল আলামিন তাকে দিলেন।

২. দিন সাতেকের মধ্যেই আমরা নূরুল ইসলামের গুণমুগ্ধ হতে শুরু করি। ফলত, বাদল তাকে ‘নূরু ভাই’ বলে সম্বোধন করে। নূরুও বলে ‘বাদলদা’। নিজগুণে মেসের ম্যানেজার পদে উন্নীত হয় সে। বলে, ওয়াইফের খুব দুঃখ কেরানিগিরি করছি। এবার তাকে চিঠি লিখে জানাব, ‘সখী, ম্যানেজার হয়েছি মেসে/ফুর্তিতে গাও গীত ঝেড়ে গলা কেশে।’ ম্যানেজার নূরুর ফর্মুলা মেনে আমরা সপ্তাহে দুই দিন গরুর গোশত, দুই দিন খাসির গোশত, দুই দিন মাছ, দুই দিন মুরগি আর এক দিন নিরামিষ তরকারি খাই।

তখন উৎকৃষ্ট গরুর গোশতের সের (কেজির প্রচলনের আগে) সাড়ে তিন টাকা। সাধারণ গরুর গোশত পাওয়া যেত প্রতি সের তিন টাকায়। একবার গভীর রাতে নূরুর কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। পৃথক বিছানায় নূরু আর আমি থাকতাম একই কামরায়। ‘কাঁদছো কেন?’ জানতে চাইলে সে বলে, ‘স্বপ্নের ভিতর কাঁদছিলামরে।’ মাস কয়েকের মধ্যেই লক্ষ্য করি, যেদিনই নিরামিষ খেতাম আমরা, সেদিন গভীর রাতে নূরু কাঁদে। তবে কি সপ্তাহের বিশেষ দিনেই স্বপ্নের ভিতর কেঁদে ওঠা নূরুর জন্য নিয়ম করে দিলেন বিধাতা?

বিষয়টি আমাদের খুব ভাবায়। আমরা স্থির সিদ্ধান্তে এলাম : ওর এই কান্না ঘুমের ভিতরকার কান্না নয়। এক রাতে খাবার খাওয়ার পর মেসের সব বাসিন্দা বাড়ির সামনের মাঠে গল্প করছিলাম। এ সময় পেয়ারু বলে, আচ্ছা নূরু, তুমি নিরামিষের রাতে কেন কান্না কর? নূরু বলে, পেছন ফিরে তাকালে অনেকে আনন্দে ভাসে। ফেলে আসা দিনগুলোর সুখদায়ক স্মৃতি নাড়াচাড়া করে মানুষ প্রফুল্ল হয়। তখন মনে মনে তো হাসেই, সশব্দেও হেসে ওঠে। আবার পরাগ ছড়ানো স্বপ্ন ভরানো দিন আর আসবে না, এই বোধ তাকে কাঁদায়ও খুব। আমি কাঁদি দুঃখদিনের ঘটনাগুলোর দিকে তাকিয়ে, স্মৃতির ধাক্কায়।

কান্নায় মোড়ানো অতীতবলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে নূরুল ইসলাম। হেলাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই কান্নার দমক প্রবল হয়ে ওঠে। পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে আবার ওর কান্নার প্রসঙ্গ আসে। নূরু জানায়, নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুকালে নূরুর বয়স ৯ বছর। দাদা-দাদি তাকে লালন করেন। দাদা ছিলেন পেশায় ঘরামি। আয় ছিল সামান্য। তবে স্বপ্নটা ছিল বড়। নাতির পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতেন। আর্থিক কষ্ট এতটাই তীব্র ছিল যে বছরের প্রায় সব দিনই দুই বেলা নিরামিষ তরকারি দিয়ে ভাত খেতে হয়েছে। দাদি এজন্য খুব আফসোস করতেন। বলতেন, হায়রে আল্লাহ! নাতিটার পরীক্ষার কয়টা দিনও তুমি একটু আমিষ খাওয়ানোর কপাল আমাগোরে দিলা না!

ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার আগে এক রাতে ঘুম ভেঙে যায় নূরুর। রাত তখন দেড়টা। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় নূরু দেখতে পায়, মেঝেতে পাতা জায়নামাজে সেজদায় দাদি বলছেন, ইয়া রাহমানুর রহিম, নাতিটারে তুমি রক্ষা কর। দাদা-দাদি না থাকলেও ওর লেখাপড়া চালাইয়া যাওনের তৌফিক তুমি দিও। এখন তো তুমি ওরে নিরামিষ খাওয়াইয়া রাখছ। বড় হইলে যখন আয়রোজগারি হবে তখন তারে পরান ভইরা গোশ্তের সালুন খাওনের ক্ষমতা দিও পরওয়ারদিগার।

দাদা-দাদি তাকে বলেছিলেন, ভাই গো, গরিবের গলায় পাও দিয়া রোজগারপাতি বাড়ানোর চেষ্টা কখনো করবা না। উপরওয়ালা সইব না। মাইনষের ক্ষতি করবা না। পারলে তাগো উপকার করবা। সুদিনের দেখা পাইয়া দুর্দিনের মধ্যে থাকা মাইনষেরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার চিন্তারে কখনো পাত্তা দিবা না।

আমরা দেখেছি, নূরু অবিরাম পরোপকারে এগিয়ে যায়। গরিবের কল্যাণে যথাসাধ্য করে। কালক্রমে সে সরকারি উচ্চপদে চাকরি করেছে। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ে নেমেছে। বিত্ত হয়েছে অনেক। সে এখন সুখী পিতা। সুখী দাদা। সুখী নানা। তিন-চার বছর পর আমাদের সঙ্গে ওর হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। দামি গাড়ি থেকে নেমে সে হাতে ধরে আমাদেরও পেছনের দিনগুলোয় নিয়ে যায়। ফুটপাতের পাশে টেবিলে সাজানো দোকানে চা-বিস্কুট খাওয়ায়। এভাবে খেয়ে এবং খাইয়ে তার তৃপ্তি। মজা করে বলে : নিরামিষখেকো বন্ধুটারে এখনো তোমরা মনে রাখ, এই ফিলিং বুকের ছাতিটার প্রস্থ পঞ্চাশ ইঞ্চি বানাইয়া ফেলেছে রাইট নাউ।

৩. অবশ্যই আমরা নূরুকে মনে রেখেছি। ওকে মনে রাখতেই হয়। যারা অকপট, ন্যায়ানুরাগী ও সত্যাশ্রয়ী তাদের ভুলে থাকা যায়? পেয়ারু (সহিদ উদ্দিন মাহমুদ), হেলাল (বদরুল ইসলাম) আর বাদল (অরুনবরণ নাগ) যতদিন বেঁচেছিল বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট মৌসুমে নূরুর প্রিয় ফুটবল টিমকে কেন্দ্র করে বিনোদনদীপ্ত গল্প করেছে। আমিও ওই বিনোদনের ভাগ নিয়েছি।

মনে পড়ে আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল ম্যাচের দিনে সকাল থেকে নূরুল ইসলামের উত্তেজনা। তার প্রিয় টিম মোহামেডান যেদিন হারত সেদিন নূরুর চেহারা দেখে পেয়ারু বলত, ‘চেহারাখান এরকম কালো হইছে কেন বন্ধু। তোমার ফাদার-ইন-ল-পটল তুললেন নাকি?’ নূরুর জবাব : আবাহনীর চামচাদের চিন্তাভাবনার কালার দেখি আলকাতরায় চুবানো গামছার মতো!

ফুটবলবিষয়ক চিন্তা-উদ্দীপক তথ্য সংগ্রহ করার বাতিক নূরু এখনো বজায় রেখেছে। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলে সে কেপ ভার্দে দলের সমর্থক। বলে, গরিবের পক্ষে ছিলাম, আছি, দম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত থাকব ইনশাআল্লাহ।

নূরু থেকে সর্বসাম্প্রতিক পাওয়া চারটি তথ্য নিবেদন করছি- (ক) ইংল্যান্ড দলের স্ট্রাইকার ছিলেন গ্যারি লিনেকার। তিনি বলতেন, ‘ফুটবল একটি সহজ খেলা। বাইশটা লোক একটি বলের পেছনে ৯০ মিনিট দৌড়ায়। কিন্তু শেষতক সব সময় জিতে যায় জার্মানি।’

(খ) ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের রাইট উইংগার ছিলেন জর্জ বেস্ট (৫৯ বছর বয়সে ২০০৫ সালে মৃত্যু)। বেস্ট বলেন, ‘মদ খাওয়া, পাখি পোষণ ও দ্রুতগতির গাড়ি কেনার পেছনে আমি প্রচুর টাকা উড়িয়েছি। বাদবাকি খাতে যা খরচ করেছি তা ছিল অপব্যয় মাত্র।’

(গ) ডেভিড বেকহাম (ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার) সম্পর্কে জর্জ বেস্ট দারুণ বলে গেছেন। বেস্ট বলেন : বেকহাম বাম পায়ে কিক করতে পারে না। হেড করতে জানে না। ট্যাকলও করতে পারে না। গোলও তেমন দিতে পারে না সে। শুধু এগুলোই ওর গলদ, তার অন্য সব কাজ ঠিক।

(ঘ) ব্রিটিশ ফুটবলার পিটার ক্রাউচ ছিলেন চৌকশ স্ট্রাইকার। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলে ২২টি গোল করেন। দুইটি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে খেলেছেন তিনি। প্রশ্নের জবাবে চটকদার কথা বলা তাঁর স্বভাব। সাংবাদিকরা একবার প্রশ্ন করেন, ‘যদি ফুটবলার না হতেন, তাহলে আপনি কী হতে চাইতেন?’ পিটার ক্রাউচ বলেন, ‘কুমারী।’

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

বাজেট ও ব্যাংক খাত : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

ড. এ কে এম সাহিদ রেজা

অনলাইন ডেস্ক
বাজেট ও ব্যাংক খাত : বাস্তবতা ও প্রত্যাশা

বাজেট একটি রাষ্ট্রের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার তার আয়-ব্যয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করে আসছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর নিয়মিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়, যা একটি ইতিবাচক দিক। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনো বাজেটবিহীন অবস্থায় পরিচালিত হয়নি।

প্রস্তাবিত বাজেটকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আশাবাদী বাজেট বলে মনে করি। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ ও সংকটের পর সরকার অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তারই প্রতিফলন দেখা যায় এবারের বাজেটের আকারে। যেখানে একসময় ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে বিশাল বলে মনে করা হতো, সেখানে বর্তমানে বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি দেশের অর্থনীতির বিস্তার ও সরকারের ব্যয় পরিকল্পনার ব্যাপকতাকেই নির্দেশ করে। তবে এই বাজেট একটি ঘাটতি বাজেট। প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার এত অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে কি না। কিন্তু বাজেট মূলত একটি পরিকল্পনা; সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের হিসাব করেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। মনে হয় দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই খাত নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৮৩ সালে বেসরকারি ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্যাংক খাত নানা আলোচনা, সমালোচনা ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শুরু থেকেই অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স ও সুশাসনের ঘাটতি ছিল, যার প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

বিশেষ করে গত দেড় বছরে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাগুলো আরও বেশি প্রকাশ্যে এসেছে। অনেকেই বলেন, এতদিন কার্পেটের নিচে চাপা থাকা সমস্যাগুলো এখন দৃশ্যমান হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিংব্যবস্থায় প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৩০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে ব্যাংক খাত নিয়ে উদ্বেগ ও আলোচনা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার এবারের বাজেটে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রেখেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই অর্থ কীভাবে ব্যবহার হবে এটি কি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যয় হবে, নাকি সম্ভাব্য একীভূতকরণ বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হবে।

ধরা যাক, যেসব ব্যাংককে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, সেগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সরকার এককভাবে এই বিপুল অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। তাই একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ আমানতকারী সাধারণ মানুষ বা খুচরা গ্রাহক। তাঁদের সঞ্চয়ের পেছনে থাকে ব্যক্তিগত পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তা। তাই ব্যাংক ব্যর্থ হলে আমানতকারীদের অর্থ কমিয়ে ফেরত দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবে গ্রহণ করা কঠিন।

এ কারণেই ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য সরকারের বরাদ্দকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং ব্যাংকিংব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টাও বটে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা অর্জনের জন্য সুশাসন, জবাবদিহি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। আমাদের বর্তমান ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় পরিচালক গণঋণ মঞ্জুর প্রক্রিয়ার অংশ নিয়ে থাকেন। এটা নিষিদ্ধ করা উচিত। ব্যাংক খাতের চলতি সংকট থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য পরিচালকদের ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত নয়। ঋণ দেওয়া যেকোনো ব্যাংকের দৈনন্দিন কাজের অন্যতম। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা দেখভাল করবে পরিচালনা পর্ষদ এবং সুশাসন, আমানতকারীর স্বার্থ সেবা ও শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে। পরিচালকরা এই ভূমিকার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন। সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা রয়েছে। অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে পুনর্গঠন ও সংস্কারের যে বার্তা বাজেটে দেওয়া হয়েছে, সেটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

লেখক : সাবেক পরিচালক এফবিসিসিআই