<p><strong>প্রশ্ন :</strong> মোহামেডানে খেলার আগে আপনি পূর্ব পাকিস্তান দলে খেলেছেন, এটা তো একটু ব্যতিক্রম?</p> <p><strong>জহিরুল হক :</strong> হ্যাঁ, ব্যতিক্রমই বলতে পারো। মোহামেডানে সুযোগ পাওয়াটা সেই সময়ও বিশাল ব্যাপার ছিল। ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যাওয়া বা বড় একটা কিছু পাওয়া<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এমন মনে করা হতো। আমার ব্যাপারটা একটু আলাদা ছিল, এই কারণে যে তখন আমি খেলাধুলা করতাম পাশাপাশি চাকরিও। ম্যাট্রিক পাস করেই আমি ডিএলআর অফিসে চাকরি পেয়ে যাই। সেসব অনেক ইতিহাস। বলতে হলে তো একেবারে শুরু থেকেই শুরু করতে হবে।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> তা-ই শুরু করেন, এত অল্প বয়সে চাকরিতে কেন?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> ভালো ছাত্র ছিলাম। এ ছাড়া আমার উপায়ও ছিল না। মা বলে দিয়েছিলেন, বাবা তুই যদি ফুল ফ্রি স্টুডেন্টশিপ না পাস, তো পড়াশোনা আমরা আর করাতে পারব না। তাই আমাকে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে প্রথম জীবনেই। ম্যাট্রিক পাস করার ডিএলআরের পরীক্ষাটা যখন হলো, তখন আমার রেজাল্টও বেরোয়নি। তবে জানতাম ভালো করব। চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়েছি আমি হাফপ্যান্ট পরে, ভাবা যায়! ওই বয়সে সত্যিকার অর্থে চাকরির গুরুত্বটা সেভাবে আমি বুঝিওনি। অনেকটা হুজুগে পরীক্ষা দিয়ে দিয়েছি<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>কে যেন বলল, আমিও গিয়ে পরীক্ষার হলে বসলাম। ওই যে বললাম ভালো ছাত্র ছিলাম, টেস্ট পেপার থেকে বারবার করেছি, এমন চারটা অঙ্কই এলো পরীক্ষায়। বড়জোর আমার ১৫ মিনিট লাগল, অন্য আরেকটা সার্ভের অঙ্ক ছিল, ওটা আমি ধরলামই না। চাকরি হয়ে গেল, বয়সটা অবশ্য পরে একটু সমন্বয় করতে হয়েছে। তো ওই ডিএলআর অফিসে চাকরি করা অবস্থায়ই আমি বি ডিভিশনে খেললাম সেন্ট্রাল প্রেসের হয়ে। সেন্ট্রাল প্রেস সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়। আমি চলে যাই তেজগাঁও ফ্রেন্ডসে<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>প্রথম বিভাগে আমার অভিষেক, তার পরের বছরই সুযোগ হয়ে যায় আমার পূর্ব পাকিস্তান দলে।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> মোহামেডান থেকে নিশ্চয় তখনই প্রস্তাব পেয়েছিলেন?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> হ্যাঁ, কিন্তু আমার যাওয়ার উপায় ছিল না। আর প্রথম বিভাগ হলে কী হবে, সে সময় খেলোয়াড়দের তো কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। মোহামেডানে খেলে, বড় ফুটবলার<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এই নাম ছিল কিন্তু টাকা-পয়সা সেভাবে ছিল না। আসা-যাওয়ার ভাড়া, হাত খরচটা হয়তো পাওয়া যেত, সেটা মোহামেডানের মতো ক্লাবেই। তেজগাঁও ফ্রেন্ডসে সেসবও নেই। তেজগাঁও স্কুলে আমাদের স্যার ছিলেন দীনেশ চন্দ্র সেন। তিনিই দলটা চালাতেন। মাঝেমধ্যে শিল্প এলাকায় হানা দেন, তাঁর ছাত্ররাই<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>তো সব ভালো ভালো পোস্টে। স্যারকে খুব সম্মান করতেন সবাই। তাঁদের কাছ থেকে চেয়েটেয়েই হয়তো আমাদের একটু নাশতাপানির ব্যবস্থা করতেন।</p> <p><strong>প্রশ্ন : </strong>পূর্ব পাকিস্তান দলে সুযোগ পাওয়াটাও তো বড় ঘটনা ছিল। আপনার মনে আছে তখনকার অনুভূতি?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> একটা গর্বের ব্যাপার ছিল সেটা। তেজগাঁও ফ্রেন্ডস থেকে একমাত্র আমিই সুযোগ পেয়েছি। ক্লাবেও এটা নিয়ে সবাই গর্ব করল। এর আগে আমাদের দলের হয়ে খেলা ইউজিন গোমেজ খেলেছেন পূর্ব পাকিস্তান দলে। দেখেছি, তাঁকে সবাই কত সম্মান করে। আমারও প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন ইউজিন। তো আমিও সেই সম্মানটা পেলাম, এলাকায় বন্ধুমহলেও আমার খুব খাতির হয়ে গেল। তখন আমরা থাকি মনিপুরিপাড়ায়। মনিপুরিদের তখন মাটির ঘর, ফার্মগেটের এদিকটায় ঘন জঙ্গল, ওদিকটায় সরকারি ফার্ম<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>একেবারেই অন্য রকম ছিল সেই সময়টা। আমরা খেলতে যেতাম হেঁটে, গাড়ি ছিল নাকি! পুরো ঢাকায়ই তখন তিনটা গাড়ি<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>একটা গভর্নরের, একটা চিফ জাস্টিসের, অন্যটা চিফ সেক্রেটারির। ১৯৫৭ সালের কথা বলছি, যে বছর পূর্ব পাকিস্তান দলে সুযোগ পেলাম। পাকিস্তান দলে খেলেছি এর দুই বছর।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> কিন্তু ক্যারিয়ারে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন তো পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়েই, এর আগেও বিভিন্ন সময় বলেছেন সাক্ষাৎকারে।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> হ্যাঁ, তখন আমি পাকিস্তান দলেও সুযোগ পেয়ে গেছি। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে গেছি করাচিতে, ১৯৬০ সালে। সেই দলের আমি অধিনায়ক। করাচিতে তাদের হারিয়েই আমরা চ্যাম্পিয়ন ১৩ বছর পর। পাকিস্তানের মাটিতে এই অর্জন ভোলার নয়। এর পরই তো ওরা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ বাদ করে দিল, বলল খেলা হবে বিভাগীয়। ১৯৬১ থেকে ৯টা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়নশিপ খেললাম চট্টগ্রামের হয়ে, সব কয়টাতেই আমি অধিনায়ক ছিলাম। কুমিল্লায় ফাইনাল খেললাম একবার আমরা পেশোয়ারের বিপক্ষে, ওদের হারিয়ে আমরা চ্যাম্পিয়ন।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> মোহামেডানে যোগ দিলেন ১৯৬০-এ।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> হ্যাঁ, ১৯৬০ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত। চার-পাঁচ বছরও অধিনায়কও ছিলাম, অনেকগুলো শিরোপা জিতেছি। আর আমি কোনো দলের হয়ে খেলিনি। তেজগাঁও ফ্রেন্ডস থেকে সেন্ট্রাল প্রেসের হয়ে খেলেছিলাম মাঝখানে এক বছর। এ সময়ই মোহামেডানের প্রতিষ্ঠাতা শাহজাহান ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আমাদের বোঝালেন, আমাদের বলতে তখন আমি, নবী চৌধুরী, কবির একসঙ্গে পুলিশে<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>শাহজাহান ভাই বললেন, সার্জেন্টের চাকরিতে থাকলে আর ফুটবলে কিছু করা হবে না আমাদের। নিজেরাও সেটা বুঝছিলাম, সার্জেন্টের কাজ হলো অপরাধীদের নিয়ে, যে ছোটাছুটি আর ব্যস্ততা<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>ফুটবল ক্যারিয়ারের সঙ্গে তা একেবারেই জানি না। এর পরই নাম লেখাই মোহামেডানে, কিন্তু লেখাপড়া শিখেছি<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এত দিন চাকরিতেও ছিলাম তাই নতুন করে আবার যোগ দিই স্টেট ব্যাংকে, এখন যেটা বাংলাদেশ ব্যাংক। আমি ও ধারাভাষ্যকার হামিদ একসঙ্গেই যোগ দিই ব্যাংকে। আমি খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, পাশাপাশি চাকরি, এর মধ্যে ব্যবসাও। কিভাবে যেন তিনটাই খুব ভালোভাবে আমি চালিয়ে এসেছি। আল্লাহর রহমতও হয়তো বা।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> মোহামেডানের কবির, মারি, আশরাফ<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>ত্রয়ীকে নিয়ে অনেক গল্পগাথা তাঁদের আপনি কেমন দেখেছেন?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> খুব বেশি দিন ওরা সাফল্যের চূড়ায় থাকতে পারেনি। অনেক অনিয়ম করে ফেলছিল। তারকাখ্যাতি পেয়ে গেলে যা হয়, এটা-ওটার নেশা পেয়ে বসে। এই যে তোমাকে বললাম, চাকরি ব্যবসা, খেলা<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>তিনটাই আমি কিভাবে চালিয়েছি আজ পর্যন্ত একটা সিগারেট আমি ঠোঁটে ছোঁয়াইনি, গ্লাস তো দূরের কথা। মোহামেডান ক্লাবে এখনো কোটি টাকার জুয়া চলে প্রতি রাতে। একটা তাস কখনো আমি ধরে দেখিনি... এত বছর ধরে সেখানে আমাদের যাওয়া-আসা। হয়তো শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও এসবে কাজ করে। খ্যাতি-টাকায় অনেকে নষ্ট হয়ে যায়। ওরা তিনজনও শেষ পর্যন্ত ঠিক শৃঙ্খলার মধ্যে থাকেনি, আসক্ত হয়ে পড়েছিল।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> তাঁদের খেলা নিয়ে বলুন, তেজগাঁও ফ্রেন্ডস বা সেন্ট্রাল প্রেসের হয়ে তো তাঁদের বিপক্ষে খেলেছেন, মোহামেডানে আবার তাঁদের সঙ্গেও<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>ঠিক কী বিশেষত্ব ছিল?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> বোঝাপড়াটা ছিল অসাধারণ। ওরা সারাক্ষণ একসঙ্গে থাকত, সব কাজ একসঙ্গে করত<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>মাঠে নেমেও এই বোঝাপড়াটা তাদের মধ্যে ছিল দারুণ। চোখের ইশারায়ই একজন আরেকজনকে পড়ে ফেলত। ‘আশরাফ ল...’ বলেই কবির বা মারি বলটা শুধু ঠেলে দিত। আর আশরাফ ছিল অসাধারণ গোলমেকার। শ্যুটিং ছিল নিখুঁত। কবির রাইট ইন, মারি লেফট ইন আর আশরাফ সেন্ট্রার ফরোয়ার্ড<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এই হলো ওদের ত্রিভুজ। যত দিন সেরা ফর্মে ছিল রীতিমতো মুগ্ধ করে রেখেছিল তারা সবাইকে।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> সেই সময়ের ফরম্যাশনগুলো কেমন ছিল, মোহামেডানের কথাই বলুন।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> মোহামেডানে শুরুর দিকে দুই ব্যাক, তিন হাফ এরপর পাঁচ ফরোয়ার্ড। কবির, মারি রাইট ইন, লেফট ইনে, আউট খেলত আমান ও শাহ আলম আর সামনে আশরাফ। ব্যাকে আমার সঙ্গে ছিলেন গজনী ভাই, তাঁকে অবশ্য খুব বেশি দিন পাইনি। ইনজুরিতে পড়ে খেলা ছাড়তে হলো। জাতীয় দলেও তাঁর খেলা হয়। এই ফরম্যাশনের কথা বলছি, তখন কিন্তু মোহামেডানে আমি গেস্ট প্লেয়ার হিসেবে খেলি। যেমন পুলিশে থাকাকালীনই ওদের সঙ্গে আইএফআই শিল্ড খেলতে গেছি। এরপর আমি যখন জয়েন করি, ষাটের পর থেকে খেলা শুরু হয় ৪-২-৪-এ। দুই রাইট আউট, লেফট আউটের সঙ্গে দুই ফরোয়ার্ড। কবির, মারির খেলাটা তখনই আসলে কঠিন হয়ে যায়, ওদের জায়গাটা নষ্ট হয়। ব্যাকে তখন থেকেই প্যারালালে চারজন।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> কোচ তো তখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> না, একেবারেই না। মোহামেডানই কিছুটা ছকটক মাথায় রেখে খেলত, তাও আলাদা অঙ্ক কষে কিছু না। কেউ একজন হয়তো বলে দিত ওদের ব্যাকে এ জায়গাটায় সমস্যা আছে। এদিক দিয়ে ঢুকতে হবে, এদিক দিয়ে ও এভাবে আসে<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>ওকে কে আটকাবে... আচ্ছা আমি দায়িত্ব নিলাম এ রকম আর কি। ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়াও তখন বড় দল, কিন্তু ওদের এখানেও তখন এসবের বালাই নেই। অন্য দলগুলোতে প্রশ্নই ওঠে না। নিজেদের মেধা কাজে লাগিয়েই খেলতে হতো। ফিটনেসটা ছিল বড় ব্যাপার, শ্যুটিং অনুশীলন হতো। তা ছাড়া খেলার আগে দলের গুরুত্বপূর্ণ কেউ অথবা কর্মকর্তাদের একজন হয়তো কিছু ব্রিফিং করে দিত<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এটুকুই।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> পূর্ব পাকিস্তান বা পাকিস্তান জাতীয় দলে...</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> করাচিতে আমরা যখন চ্যাম্পিয়ন হই, তখন সাহেব আলী ছিলেন আমাদের কোচ। বলা যায়, উনিই প্রথম কোচিংয়ের শুরু করেন, খেলাটা যতটুকু বুঝতেন তার চেয়ে ভালো জানতেন কিভাবে আদায় করে নিতে হয়। কথার জোর ছিল। তো উনি ছিলেন ফায়ার সার্ভিসে, এর আগে ওই দলে খেলেছেন তখনো সম্পৃক্ত আছেন একরকম নিজের আগ্রহেই তিনি কোচিংয়ের কাজটা শুরু করেন, একটা কোর্স করেছিলেন। আর প্রথম অ্যাসাইনমেন্টেই তাঁর আমাদের সঙ্গে করাচি সফর।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> পাকিস্তান দলে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> ১৯৬১ সালে সফরে আসা বার্মার বিপক্ষে তিনটি টেস্ট ম্যাচ খেলি আমরা ঢাকা, চট্টগ্রামে। সেই দলে পূর্ব পাকিস্তানের থেকে একমাত্র আমিই ছিলাম। তখন অনুপাতটাই তাই ছিল। ১০ ভাগের এক ভাগও সুযোগ ছিল না আমাদের। জাতীয় দলের হয়ে স্মরণীয় সফর আমার এর পরের বছর, মারদেকা কাপ খেলতে যাই আমরা মালয়েশিয়ায়। ফাইনালে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ১ গোলে হেরে রানার্স আপ। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতোই দল ছিল। ওমরের মতো গ্রেট প্লেয়ার, যেকোনো পজিশনে ওর মতো স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে খেলতে দেখিনি আমি কাউকে। গোলকিপার ছিল সিদ্দিক, পূর্ব পাকিস্তান দলেও কিন্তু ও-ই গোলকিপার ছিল। মোহামেডানে খেলত, সেখান থেকেই কিভাবে সুযোগ পেয়ে যায়। অথচ ওর বাড়ি ছিল বেলুুচিস্তান। আমার দেখা সেরা গোলরক্ষকও বলব<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এই সিদ্দিক।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> ষাটের দশকে মোহামেডান তো নিয়মিতই জিতেছে লিগ শিরোপা। আর কী চ্যালেঞ্জ ছিল আপনাদের?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> আগা খান গোল্ড কাপ নিয়ে সব সময়ই একটা প্রস্তুতি থাকত। মোহামেডান ছয়বার ফাইনাল খেলেছে এই টুর্নামেন্টে, ৩ শিরোপা জিতেছে, ৬০-এ আমি যোগ দেওয়ার পরও চ্যাম্পিয়ন হলাম। আর ৫৯-এ আইএফএ শিল্ড খেললাম এবং ভালোই খেললাম, সেমিফাইনালেই বোধ হয় কলকাতা মোহামেডানের কাছে হেরে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া দেশে অন্য টুর্নামেন্টগুলো তো ছিলই, পাকিস্তানে গিয়েও আমরা বেশি টুর্নামেন্ট খেলেছি এবং চ্যাম্পিয়নও হয়েছি।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> তখনকার ফুটবল দর্শকপ্রিয়কতার ব্যাপারে কী বলবেন। স্বাধীনতার পর আবাহনী-মোহামেডান লড়াইয়ে তো অন্য একটা মাত্রা যোগ হলো।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে ঢাকায় মানুষই বা ছিল কত। তার পরও বেশ দর্শক হতো। এখনকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামটা ছিল ডিএসএ গ্রাউন্ড, টিন দিয়ে ঘেরা ছিল, ভেতরে কাঠের গ্যালারি। খেলা হলে গ্যালারি ভরে যেত। মোহামেডান মাঠ, ওয়ারী মাঠে নিয়মিত খেলা হয়েছে। লিগগুলো মূলত এ তিনটি মাঠেই হয়েছে। ক্লাব টেন্টগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই দিকটায় গেলোতো আরও পরে, তখন ডিআইটি বিল্ডিংয়ের একেবারে সামনেই মোহামেডানের পাশে ওয়ারী, ওয়ান্ডারার্স। স্টেডিয়ামের এখন যে মূল এলাকা সেটাই তখন ক্লাবপাড়া। ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া, মোহামেডান ওদিকে আজাদ স্পোর্টিং। আজাদ স্পোর্টিংয়ে তখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্ররাই বেশি খেলত। সব মিলিয়ে খেলাধুলার একটা জমজমাট পরিবেশই ছিল।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> এখন যেমন সবাই ইউরোপের ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করে, তখন আপনাদের আলোচনার বিষয় ছিল কোনটা?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> কলকাতার ফুটবল। এই অঞ্চলের ফুটবলের তীর্থই ছিল সেটা। ব্রিটিশরা যখন ভারতবর্ষ শাসন করছে, তখন থেকেই কলকাতার ফুটবল রমরমা। কলকাতা লিগে খেলতে পারাটাই ছিল বিশাল ব্যাপার। কলকাতা মোহামেডান, মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, জুম্মা খাঁ, ওসমান, পাখি সেনদের কথা তখন মুখে মুখে। মোহামেডানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ শাহজাহান কলকাতা লিগের খেলোয়াড়, ঢাকায়ও তাঁর ছিল বিরাট সমাদর। কলকাতার ছোঁয়ায় আমাদের উত্তরবঙ্গেও দারুণ জনপ্রিয় ছিল ফুটবল। দেশভাগের আগে ওখানকার ভালো ভালো খেলোয়াড় সবাই তো কলকতায়ই চলে যেত, দেশভাগেই না তাঁরা ঢাকামুখী হয়। এর আগে দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহের হিন্দু জমিদাররাই মূলত পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এখানকার ফুটবলের।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> আর আন্তর্জাতিক ফুটবল যেমন ব্রাজিল...</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> হ্যাঁ, তখন তো ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলে দারুণ জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বসেরা। পেলে বিশ্বসেরা। পরে টিভিতেও ওর খেলার যে রেকর্ড দেখেছি তাতেই সবাই এককথায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। আর ক্লাব ফুটবলেও বিভিন্ন নাম শুনেছি, যেমন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড... সব এখন মনেও নেই।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> মাঠে গিয়ে এখন তো খেলা দেখতে পারেন না, টিভিতে কি দেখেন ইউরোপের খেলাগুলো?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> হ্যাঁ, প্রায়ই দেখি। খুব বেশিক্ষণ অবশ্য দেখতে পারি না। মাথায় চাপ পড়ে টিভির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে। তবে এখনকার খেলা তো একেবারেই বদলে গেছে, কী মেকানিজম, কী টেকনিক ভাবাই যায় না। অনেক আপগ্রেড ফুটবল হয় এখন। নতুন একটা খেলোয়াড় এসেছে, কী যেন নাম... নেইমার তারপর মেসি... কী ওদের পায়ের কাজ, কী স্কিল! এখন একেবারে নিখুঁত ফুটবলটাই খেলার চেষ্টা হচ্ছে। তাই বলে যান্ত্রিকও হয়ে যায়নি, খেলায় প্রাণ আছে, স্কিল আছে<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>এককথায় অসাধারণ।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> দেশের ফুটবল তো বেশ দুঃসময় পার করছে।</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> জানি খেলায় দর্শক আসে না। তেমন স্কিলফুল প্লেয়ারও নেই। ভালো খেলোয়াড়, খেলা না হলে দর্শক আসবে কেন? সব কিছুই আসলে ঢেলে সাজানো উচিত। একটা খাবারে যদি তোমার অরুচি তাহলে কী করতে হবে। একেবারেই অন্যভাবে জিনিসটা তোমাকে পরিবেশন করতে হবে, তা না হলে হবে না।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> ঢেলে সাজানোর এই প্রক্রিয়াটা তাহলে কী হতে পারে?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> কেন, এটা তো সবাই জানে<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>তৃণমূলে জোর দিতে হবে। আগে স্কুল ফুটবল, কলেজ ফুটবল নিয়ে যে ফাটাফাটি হয়েছে এখন কি সেটা হয়েছে। ইন্টার স্কুল ফুটবলের সেই উন্মাদনা কোথায় এখন! ছোট থেকে শুরু না করলে তো হবে না। ১৬ বছরের একটা ছেলেকে একবারেই তো ম্যাট্রিক পাস করিয়ে দেওয়া যাবে না। তাকে থ্রি ফোর ফাইভ পড়ে আসতে হবে, কিন্তু এখন সবার মনোভাব যেন এমন, ঢাকার এই লিগটিগ খেলেই বোধ হয় সব খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে। তা তো নয়, আগে খেলার আনন্দটা পেতে হবে, আর সেটা হয় একমাত্র স্কুলে থাকতেই।</p> <p><strong>প্রশ্ন :</strong> আপনার নিজের প্রসঙ্গেই শেষ করছি। এমন বর্ণাঢ্য একটা ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে নিশ্চয় সুখীই ভাবেন?</p> <p><strong>জহিরুল :</strong> যেটুকু চেয়েছি, আল্লাহ তায়ালা তার চেয়েও অনেক বেশি দিয়েছেন আমাকে। সুন্দর স্বাস্থ্য দিয়েছেন। আমিও নিয়মের মধ্যেই থেকেছি, পরিমিত খেয়েছি সব সময়<span lang="DA" style="font-size:12.0pt"><span style="font-family:"Times New Roman","serif"">―</span></span>যখনই যে সুযোগ পেয়েছি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। ছেলেমেয়েরাও এখন প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে আমেরিকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে, ছোট ছেলে এমবিএ করেছে কার্ডিফে। দুই মেয়েরও ভালো বিয়ে হয়েছে। আমরা এখন বুড়ো-বুড়ি এই বড় বাড়িটাতে একা থাকি, নামাজ কালাম পড়ি আর পুরনো স্মৃতি রোমন্থনেই দিন কেটে যায়।</p>