জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষের (বাবাকো) কাজের পরিধি বেড়ে তাদের কার্যক্রম আরো জোরদার হয়েছে। এখন থেকে তারা শুধু সরকারি দপ্তরগুলোতে বাংলা ভাষার প্রচলনবিষয়ক কার্যক্রম নিয়ে থাকবে না, চলতি বছর থেকে সরকারি দপ্তর সরেজমিন পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সরকারি এই সংস্থাটিকে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত জনবল, শূন্যপদ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা, আউটসোর্সিং লোকবলের তথ্য, কর্মপরিবেশ নারীবান্ধব কি না, প্রকল্পের গাড়ি আছে কি না, সেবাদান পদ্ধতিসহ দপ্তরের সার্বিক বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে বাবাকো। এতে জনপ্রশাসনের এই প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
৩৮ বছর আগে বাংলা ভাষা প্রচলনে আইন করার পর সরকারি দপ্তরগুলোতে প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। সরকারি নথিপত্র, চিঠি, প্রজ্ঞাপন ও অন্যান্য নথি এখন বাংলায় লেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলে প্রণিত পুরনো আইন নতুন করে বাংলায় লেখা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। নতুন আইন, বিধি, নীতিমালাসহ সব কিছুই হচ্ছে বাংলায়।
এসব প্রশাসনিক কাজে প্রমিত বাংলা বানান ও বাক্য গঠনে চূড়ান্ত সহায়তা দিচ্ছে বাবাকো।
বাবাকোর কার্যক্রম জোরদারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংস্কার ও গবেষণা অনুবিভাগ) ও বাবাকোপ্রধান ড. মো. মিজানুর রহমান। নিজ দপ্তরে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘বাবাকো এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হতে যাচ্ছে। এখন থেকে সব সরকারি দপ্তর সরেজমিন পরিদর্শন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে আমরা নির্দেশ পেয়েছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেজ’ অনুযায়ী যে ক্ষমতা রয়েছে, সেটাই এখন বাবাকো প্রয়োগ করবে। এতে আমাদের আরো জনবল প্রয়োজন হতে পারে।’
পরিদর্শনে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হবে—জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, ‘সচিবালয় নির্দেশমালা’ অনুযায়ী সরকারি দপ্তরগুলো চলছে কি না, এর পুরোটাই দেখা হবে। তাদের অনুমোদিত জনবল, কর্মরত কতজন, কতজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ আছে কি না, সেবাপ্রার্থী মানুষের দুর্ভোগ বা হয়রানিসহ সব ধরনের বিষয়ই দেখা হবে।
কর্মচারীদের উপস্থিতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা, সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সেবাসংক্রান্ত তথ্য টানানো আছে কি না—সবই পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে।’
জানা গেছে, ১৯৮১ সালে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাবাকো প্রতিষ্ঠা হয়। তবে এর কার্যক্রম চলেছে ঢিমেতেতালায়। এর পরও প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাবাকো এ পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রায় অর্ধশত আইন, বিধি ও অধ্যাদেশ প্রমিতিকরণ করেছে। এ ছাড়া অন্য সব মন্ত্রণালয়ের কয়েক শ আইন বা অধ্যাদেশ প্রমিতিকরণ করেছে।
বাবাকো থেকে এ পর্যন্ত প্রশাসনিক পরিভাষা, পদবি পরিভাষা, সরকারি কাজে ব্যাবহারিক বাংলা ও সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম এবং প্রসঙ্গ ব্যাবহারিক বাংলা নামে পাঁচটি পুস্তিকা বের হয়েছে। সচিবালয় নির্দেশিকা ২০২৪ প্রণয়নে বাবাকো সাচিবিক দায়িত্ব পালন করেছে।
চলতি বছর ‘প্রশাসনিক পরিভাষা-২০২৫’-এর পঞ্চম এবং ‘সরকারি কাজে ব্যাবহারিক বাংলা, ২০২৫’-এর তৃতীয় সংস্করণ বের করবে প্রতিষ্ঠানটি। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় আশানুরূপ গতিতে চলতে পারছে না। প্রতিষ্ঠার সময় কোষের মোট জনবল ছিল ২৩ জন। ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ এটা কমিয়ে ১২ জন করা হয়, পরে ফের আগের অবস্থানে এটি ফিরে আসে। বর্তমানে এই কোষে আটজন কর্মকর্তা ও ১০ জন কর্মচারী কাজ করছেন।
এ প্রসঙ্গে বাবাকোর অ্যাসাইনমেন্ট কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কাজ করে থাকি। সরকারি বিধি-বিধান ও আইনের প্রমিতিকরণ ছাড়াও সরকারি দপ্তর পরিদর্শনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে থাকি। এ ছাড়া সরকারি দপ্তরগুলোর কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, সে বিষয়েও কাজ করছে বাবাকো। প্রতিটি সরকারি প্রশিক্ষণে আমরা প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নিচ্ছি। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষাজ্ঞানের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
মোস্তফা জানান, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুদ্ধ বাংলা বানান জানাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে গ্রুপ তৈরি করেছে বাবাকো। শুদ্ধ বাংলা বানান এবং সঠিক বাংলা বাক্য গঠনে ফেসবুক ও টেলিফোনের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই ফেসবুক গ্রুপে যেকোনো সরকারি চাকরিজীবী যেকোনো বাংলা বানান সমস্যা, শুদ্ধ/অশুদ্ধ রূপ, বাক্য গঠন সম্পর্কে সরাসরি পোস্ট করে সমাধান পেয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত টেলিফোনের মাধ্যমেও বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষের বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র অনুবাদ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
জানা গেছে, দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষা চালুর লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ প্রণয়ন করা হয় ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’। এতে বলা হয়, এ আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে।
এ আইনে আরো বলা হয়, কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে সেটি বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। শুধু তাই নয়, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি এ আইন অমান্য করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আইন চালু হলেও এর বাস্তবায়নের কাজটি হয়েছে ঢিলেঢালাভাবে। এখনো সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা সম্ভব হয়নি।