বাণিজ্যিকীকরণের হাওয়ায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়েছে শিক্ষা

  • মাহবুব উল্লাহ
শেয়ার
বাণিজ্যিকীকরণের হাওয়ায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়েছে শিক্ষা

আমার এক মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সম্প্রতি সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজে অর্থনীতির অনার্সের মৌখিক পরীক্ষা নিতে গিয়েছিল। তার জানা ছিল, একটু কঠিন কোনো প্রশ্ন করলে এই পরীক্ষার্থীরা উত্তর দিতে পারবে না। কারণ সাধারণভাবে কলেজগুলোর শিক্ষার মান মোটেও সন্তোষজনক নয়।

সুতরাং সে খুবই সাধারণ প্রশ্ন করার সিদ্ধান্ত নিল। অর্থনীতিশাস্ত্রের এই পরীক্ষার্থীদের সে প্রশ্ন করেছিল, চাহিদা বলতে কী বোঝায়। সে আরো প্রশ্ন করেছিল, উপযোগ বলতে কী বোঝায়। কোনো পরীক্ষার্থী অর্থনীতিশাস্ত্রের অতি প্রাথমিক জ্ঞানের এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে পারেনি।
কঠিন প্রশ্নের জবাব দিতে পারা তো অনেক দূরের কথা। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, অনেক সময় আমরা অনেক মামুলি প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না। কারণ সেগুলোর ওপর আমরা তেমন গুরুত্ব দিই না। তা বুঝলাম।
কিন্তু তুলনামূলকভাবে একটু সিরিয়াস প্রশ্নেরও জবাব দিতে পারছে না এসব পরীক্ষার্থী।

মৌখিক পরীক্ষার এই প্রক্রিয়ায় কলেজের অভ্যন্তরীণ শিক্ষকরাও সংশ্লিষ্ট থাকেন। প্রতিটি ছাত্রের মৌখিক পরীক্ষা শেষে পরীক্ষা গ্রহণকারীরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন, নির্দিষ্ট ছাত্র বা ছাত্রীটিকে কত নম্বর দেওয়া যায়। সিদ্ধান্ত হলো, পাঁচ নম্বর দিতে হবে। ওটাই পাসের নম্বর।

কাউকে ফেল করানো যাবে না। মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করলে লিখিত পরীক্ষায়ও ফেল বলে বিবেচিত হয়। প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলেও ন্যূনতম পাসের নম্বর দেওয়ার এই রেওয়াজ না নৈতিক, না যৌক্তিক। এ থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠে, তা হলো আমাদের উচ্চশিক্ষার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। পরীক্ষা পাসের সার্টিফিকেট নিয়ে এরা দেশের কোন কাজে লাগবে? একদিকে তারা তাদের সার্টিফিকেটের মান অনুযায়ী চাকরি পেলে সে চাকরির কাজ ও দায়িত্ব তারা যে পালন করতে সক্ষম হবে না সে কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। অন্যদিকে এসব ছেলেপুলেকে মাস্টার ডিগ্রির বৈতরণি পার করে দেওয়ার জন্য তাদের অভিভাবক এবং রাষ্ট্র যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে তা আসলে পানিতে যায়। বাংলাদেশের মতো গরিব দেশে সম্পদের এমন অপচয় কিছুতেই ঘটতে দেওয়া উচিত নয়। তবু এই দেশে নানাভাবে সম্পদ ও অর্থের অপচয় অব্যাহত আছে। মিটিং সেমিনার করতে গিয়ে খানাপিনার পেছনে অথবা সাজসজ্জার পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়, কোনো যুক্তিতেই তা জায়েজ করা যায় না। আমাদের মতো দেশে যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্র মেনে চলা উচিত, সেখানে অপচয়ের বন্যা বয়ে যায়। এটি একটি কারণ। যার ফলে আমরা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সঞ্চয় করতে পারি না। অপচয়ের অর্থই হলো সঞ্চয় না করা। সঞ্চয় করতে না পারলে বিনিয়োগ করাও সম্ভব হয় না। বিনিয়োগ করতে না পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি করাও সম্ভব হয় না। ফলে জাতীয় আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি করা সম্ভব হয় না।

বাণিজ্যিকীকরণের হাওয়ায় নীতি-নৈতিকতা হারিয়েছে শিক্ষাবাংলাদেশে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নয়, শিক্ষার প্রতিটি পর্যায় যথা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চতর পর্যায়ে শিক্ষার মানে বিশাল অবনতি ঘটেছে। তার একটি বড় কারণ, যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব। শিক্ষকতা এমন একটি পেশা, যেটি নিছক আয়-রোজগারের উৎস নয়, এটি একটি মিশনও বটে। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষকতাকে মিশন হিসেবে গ্রহণ না করেন, তাহলে তাঁর পক্ষে ভালো শিক্ষক হওয়া কখনো সম্ভব হয় না। একজন ভালো শিক্ষক যে বেতন-ভাতাই পান না কেন, তার উপরি পাওনা হচ্ছে, শিক্ষার্থীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। এই ভালোবাসা ভালোবাসা দিয়েই পেতে হয়। একজন আদর্শ শিক্ষক তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসেন বলেই তাদের চমৎকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চান। এর জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যান। জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, দিনে দিনে দেশটি আদর্শ শিক্ষকশূন্য হয়ে পড়ছে।

অনেকেই বলেন, শিক্ষকরা যে বেতন পান, তা দিয়ে তাঁদের পক্ষে সংসার চালানো কঠিন, অন্যদিকে তাঁদের পক্ষে ছাত্র-ছাত্রীদের জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধি করে তোলার জন্য মনোনিবেশ করাও সম্ভব হয় না। সব কিছু মিলিয়ে ফল দাঁড়ায়, শিক্ষার মানে চরম অবনতি। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহীদের বলেছিলেন, ধন চাহো তো তাহা হইলে এই পথে আসিও না। মান চাহো তো তাহা হইলে এই পথে আসিও। তিন্তিড়ি বৃক্ষের পত্র ভক্ষণ করত জীবন ধারণ করিতে চাহো, তাহা হইলে এই পথে আসিও। তিন্তিড়ি বৃক্ষের অর্থ হলো তেঁতুলগাছ। দার্শনিক ডায়োজেনিস বলেছিলেন, প্লেইন লিভিংহাই থিংকিংয়ের কথা। এ রকম প্রতিজ্ঞা যদি না থাকে, তাহলে শিক্ষকতা পেশায় না আসাই শ্রেয়। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হলো, শত-সহস্র শিক্ষিত বেকার কোনো রকমে একটা চাকরি খোঁজে। সেই চাকরির জন্য তার কোনো আগ্রহ আছে কি না সেটা বিবেচ্য নয়। ফলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন সব লোকের শিক্ষক হিসেবে ঠাঁই হয়েছে, যাদের এই পেশায় নিয়োগ দেওয়া আদৌ কাম্য নয়।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ বেশুমার হয়ে পড়েছে। অথচ এসব কলেজে অধীত বিষয়ে (অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে) পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক আছেন কি না তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। কখনো কখনো দেখা যায়, একজন শিক্ষককে উচ্চ মাধ্যমিক পাস ও অনার্স কোর্সে পাঠদান করতে হয়। তাঁকে দিনে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচটি পর্যন্ত ক্লাস নিতে হয়। এই শিক্ষক নিবেদিতপ্রাণ হলেও ছাত্রদের কতটুকু দিতে পারবেন, তা বলাই বাহুল্য। কলেজগুলোতে ভালো লাইব্রেরি নেই, নেই ল্যাবরেটরি। লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি ছাড়া উচ্চশিক্ষা কী করে সম্ভব বুঝে ওঠা মুশকিল। কলেজগুলোর কথা কী বলব! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটি পাকিস্তান আমলে যেই ক্যাপাসিটি নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, পরবর্তীকালে সেই ক্যাপাসিটি বাড়ানোর কোনো চেষ্টা হয়নি। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় অন্য সব অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে কিংবা সম্প্রসারিত হচ্ছে। লাইব্রেরি হলো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হৃৎপিণ্ড। লাইব্রেরি শুধু গ্রন্থের আধার নয়, গ্রন্থাগারে প্রবেশের পর এর বিশাল গ্রন্থরাজি দর্শনে মনের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়, তা জ্ঞান বৃদ্ধির সাধনায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য বিপুল প্রেরণার উৎস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার তৈরি করার রেওয়াজ ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু প্রথিতযশা শিক্ষক ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের উন্নতমানের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল। ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের সঙ্গে সাধারণ গ্রন্থাগারের পার্থক্য হলো, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে গ্রন্থ সংগ্রহকারীর পছন্দ ও রুচি মোতাবেক গ্রন্থরাজি সংগৃহীত থাকে। এই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার একজন শিক্ষককে নির্দিষ্ট বিষয়ে বা জ্ঞানের নির্দিষ্ট শাখায় ব্যুৎপত্তিপন্ন হয়ে উঠায় সহায়তা করে।

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক ছিলেন, তাঁর বিষয় ছিল ইসলামিক স্টাডিজ। তিনি ছিলেন ড. মহম্মদ শহীদুল্লাহর জামাতা। তিনি এক সেমিনারে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, নাপিতের দোকানে যে কয় রকমের ক্ষুর পাওয়া যায়, সে কয়টা বই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বাসায় পাওয়া যায় না। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে!

বাংলাদেশে নানা ধরনের শত-সহস্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইদানীংকালে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোড়দৌড় শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের এই গতির সঙ্গে তাল রেখে না গড়ে উঠছে অবকাঠামো, না সম্ভব হচ্ছে যোগ্য শিক্ষকের সমাবেশ ঘটানো, না সম্ভব হচ্ছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরি স্থাপন। আমরা শিক্ষার সংখ্যাগত সম্প্রসারণে যেভাবে মনোযোগ দিই, তার শতভাগের এক ভাগও আমরা চেষ্টা করি না শিক্ষার গুণগত মান সম্প্রসারণে। নানা কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে সাধনার দিকটি অবহেলিত হচ্ছে। অথচ সাধনা ছাড়া কোনো মানসম্পন্ন শিক্ষা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলাও নিষ্করুণ। জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হয় না। অথচ শিক্ষার জন্য ব্যয় হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ। শিক্ষা এমন একটি সম্পদ, উৎপাদনশীলতায় যার অবদান অপরিমেয়। শিক্ষা উৎপাদনে, মননে, চিন্তায় ও জীবনের উত্কর্ষ বিধানে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে অধিকতর অবদান রাখতে সক্ষম। অথচ সেই শিক্ষাই এ দেশে চরমভাবে অবহেলিত। কবি আশরাফ সিদ্দিকী তালসোনাপুরের তালেব মাস্টারের কবিতায় লিখেছিলেন, তালেব মাস্টার দীনহীন জীবনযাপন করতেন। তবু তিনি তাঁর ছাত্রদের যথার্থ শিক্ষা দিতে কসুর করতেন না। সেই তালেব মাস্টাররাও নেই, জ্ঞান বিতরণের প্রতি শিক্ষকদের বিরাট অংশের নিষ্ঠা ও একাগ্রতাও নেই। বাণিজ্যিকীকরণের ঘূর্ণি হাওয়ায় শিক্ষার সব নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে গেছে। এ দেশে শিক্ষার সুদিন আনতে হলে পাড়ি দিতে হবে বিশাল পথ।

 

লেখক : অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

এআইয়ের যুগে গণিত বিসিএস থেকে বাদ নয়

    ড. মো. শফিকুল ইসলাম
শেয়ার
এআইয়ের যুগে গণিত বিসিএস থেকে বাদ নয়

গণিত হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভিত্তি। গণিতের জ্ঞান এআই সিস্টেমগুলোকে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, শিখতে এবং অভিযোজন করতে সাহায্য করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে রূপান্তরকারী প্রযুক্তির মধ্যে একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা, অর্থ, পরিবহন ও বিনোদনের মতো বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্রগুলোতে ব্যাপক বিপ্লব এনেছে। এআই গণনামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াগুলো; যেমনশেখা, লেখা, যুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিলিপি বা বৃদ্ধি করা যায়।

তবে এই কাজের জটিলতার জন্য একটি কঠোর ও কাঠামোগত পদ্ধতির প্রয়োজন, যা গণিত প্রদান করে। আর আমাদের দেশে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার সিলেবাস পরিবর্তন করে ছয়টি আবশ্যিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে পরীক্ষার নম্বর পুনর্বণ্টন করে গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা বিষয় সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এটি কতটুকু যৌক্তিক?

গণিত কিভাবে এআইকে সাহায্য করে? রৈখিক বীজগণিত ডেটা উপস্থাপন ও পরিচালনা করতে সাহায্য করে, যা চিত্র স্বীকৃতি, প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ এবং সুপারিশ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালকুলাস মডেলগুলোকে অপ্টিমাইজ করতে সাহায্য করে, যা মেশিন লার্নিংয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

পরিসংখ্যান সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনিশ্চয়তা ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে, যা কম্পিউটার দৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজন। পরিসংখ্যান গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গেম তত্ত্ব এআই মডেলগুলোকে আরো স্বচ্ছ ও ব্যাখ্যাযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে। তথ্য ও গ্রাফ তত্ত্ব মানুষের ভাষার জটিলতর বিষয়গুলোকে মডেল করতে ব্যবহার করা হয়।
তারা অপ্টিমাইজেশন তত্ত্বে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা এআই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ ও পরিমার্জনের ভিত্তি। তারা সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন আবিষ্কার করেছে, যা এআই অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস ও রিগ্রেশন কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাফল্য গাণিতিক নীতির ওপর নিহিত। এই নীতিগুলো এআই অ্যালগরিদমের ভিত্তি তৈরি করে, যা মেশিনগুলোকে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গণিতের বিভিন্ন শাখা এআই সিস্টেমের বিকাশ ও বাস্তবায়নে অবদান রাখে, যার মধ্যে রৈখিক বীজগণিত, ক্যালকুলাস, সম্ভাব্যতা, পরিসংখ্যান ও অপ্টিমাইজেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিভাগগুলো এআইতে তাদের ভূমিকা তুলে ধরে।

এআইয়ের যুগে গণিত বিসিএস থেকে বাদ নয়বর্তমানে বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়, যার মধ্যে লিখিত পরীক্ষার সিলেবাস অনুসারে সাধারণ ক্যাডার, কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারের প্রার্থীদের জন্য গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতায় ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ছয়টি আবশ্যিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে নম্বর পুনর্বণ্টনের সুপারিশ করে। কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলা, ইংরেজি রচনা, ইংরেজি কম্পোজিশন ও প্রিসিস, বাংলাদেশের সংবিধান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক ও চলতি বিষয়, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজ ও পরিবেশ, ভূগোল প্রতি বিষয়ে ১০০ নম্বর করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতায় যে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হতো, তা এখন না রাখার সুপারিশ করছে কমিশন, যা আসলে ঠিক হয়নি বলে মনে হচ্ছে। আজকে বিশ্বজুড়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা কিন্তু গণিত, পরিসংখ্যান ও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অবদান। তাই ভবিষ্যতে যারা নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চাই, তাদের অবশ্যই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চায়, তাহলে আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে এর জন্য আলাদা প্রজেক্ট গ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে, যারা এ বিষয়ে কাজ করতে চায়। তাই কমিশনের সুপারিশে গণিত বাদ দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না। বিসিএসসহ যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় গণিত অবশ্যই রাখতে হবে। গণিতের গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষাব্যবস্থা এবং নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে ভূমিকা রাখবে।

দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ চার বা পাঁচ দশক আগেও অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাপকাঠিতে প্রায় আমাদের সমসাময়িক ছিল। কিন্তু এখন ওই সব দেশ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। কারণ তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। আর গণিত যেহেতু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দক্ষতা অর্জন করতে কাজ করে, তাই গণিতের বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখা যাবে না। গণিতের গুরুতের কথা তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে এবং কোর্স কারিকুলামের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গণিতের বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।

গণমাধ্যমে দেখতে পাই, অনেক স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যায় গণিত বা বিজ্ঞানের ভালো বা দক্ষ শিক্ষক নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। তাই খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে, যা গণিত বা বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে কাজে আসবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে উচ্চশিক্ষায় উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিতে গেলে গণিতের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হবে। অদম্য বাংলাদেশের অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের গণিত শিক্ষাসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার কার্যকর পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় গণিতের মডেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চিন্তা বা ইচ্ছাকে আরো ভালোভাবে প্রকাশ করা বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে গণিত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গণিতশাস্ত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ; যেমনবন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ইত্যাদির ঝুঁকি অনুধাবন এবং আগাম বার্তা দিতে সহায়তা করে, যা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস করতে ব্যাপক কাজ করে। তাই গণিতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে এবং বিসিএসের মতো পরীক্ষায় গণিত রাখতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

 

মন্তব্য

প্রত্যাশা সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি

    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
শেয়ার
প্রত্যাশা সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ ঘটনাবহুল। ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব দেখেছি, স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি। তার পরে পাকিস্তান হলো, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হলো। যুক্তফ্রন্টের বিজয় এবং সামরিক শাসন দেখলাম।

পরে শুরু হলো মানুষের বিক্ষোভ। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান হলো, নির্বাচন হলো। একাত্তরের যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো। রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে সমাজে পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব হলো না।
কিন্তু মানুষের জন্য সামাজিক পরিবর্তন ছিল আবশ্যক। অথচ সামাজিক পরিবর্তনের বিরুদ্ধে থেকেছে ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্র, পাকিস্তান রাষ্ট্র। এমনকি একাত্তরের স্বাধীনতার পরও যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই রাষ্ট্রও সামাজিক পরিবর্তন তথা সমাজ বিপ্লবের পক্ষে কাজ করল না। এই রাষ্ট্র ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের মতোই একটি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হয়ে রইল।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক আদর্শে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের জন্য জনগণের কাছে গেলেও তারা জনগণের ওপর নির্ভর করে না। ক্ষমতা, অস্ত্র, কালো টাকা ও সন্ত্রাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ক্ষমতায় থাকার জন্য তারা সাম্রাজ্যবাদের ওপর নির্ভর করে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে সরকারি ও বিরোধী দল সাম্রাজ্যবাদের কৃপালাভে সচেষ্ট।
এই সব বুর্জোয়া দলের বিপরীতে কোনো ভালো বিকল্প না পেয়ে জনগণ বুর্জোয়া দলকে পর্যায়ক্রমে ভোট দিয়ে এসেছে। কিন্তু জনগণের ভাগ্য তথৈবচ। বর্তমানে সেটিও কার্যকর নয়।

জনমত উপেক্ষা করেই এই দুই দল জামায়াত ও হেফাজত নামের দুই সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এতে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। অতীতের ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং সাম্প্রতিক ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আমাদের দেশে সর্বজনীন হয়নি। বামপন্থী ও মৌলবাদীরা গণহত্যা এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তবু দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিবাদ করেছে; বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এতেই বোঝা যায় তারা কত বেশি সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপস ও তোষামোদ করে ক্ষমতায় থাকে এ দেশের শাসকদল। স্বাধীন এই রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণ দরকার কেবল নয়, ছিল অতি আবশ্যিক। ক্ষমতা শুধু সচিবালয়ে কেন্দ্রীভূত না রেখে স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। নৈতিকতার উপাদানকে কাজে লাগাতে হবে, শক্তিশালী করতে হবে। এমন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাম্রাজ্যবাদের প্রতি আপস থাকবে না, সন্ত্রাসের লালন হবে না এবং সংখ্যালঘুর ওপর নিপীড়ন ও অনিরাপত্তা থাকবে না।

প্রত্যাশা সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তিপ্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন একটি বিকল্প ধারা ছিল, অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্তেও সেটি পূরণ হলো না। অধরাই রয়ে গেল, যার সামনে লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে। যে গণতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের উপাদান আছে, যে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি হলো ইহজাগতিকতা এবং যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদমুক্ত অঙ্গীকার আছে; সেই ধরনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের জন্য গণভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করা প্রয়োজন। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাম দলগুলো সেই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে দশকের পর দশক ব্যর্থ হয়েছে। বাম দলগুলো বড় দলের জোটভুক্ত হয়ে কিছুই করতে পারবে না। এসব দল ব্যর্থ হলেও তাদের প্রয়োজন আছে গণচেতনার সংগ্রামের জন্য। তবে তাদের অবশ্যই ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তির মোহ ত্যাগ করতে হবে। তাদের প্রধান কাজই হবে জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল প্রধান দলগুলোর ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে। যারা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে না, তারা দেশ চালাবে কী করে? রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শবাদিতা নিম্নস্তরে নেমে গেছে, স্বার্থবাদিতা প্রবল হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিকে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আগে ছাত্ররা রাজনীতি করত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এখন করে ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক মুনাফা ও লুণ্ঠনের অভিপ্রায়ে।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে তিন জোটের রূপরেখাকে উপেক্ষা করে। একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু এতে জনগণের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বিপরীতে দলীয় রাজনীতির অনুকম্পায় অবাধ লুণ্ঠন-নৈরাজ্য চলে।

মানুষের জীবন-জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং নিপীড়ন প্রবল হয়েছে। দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়েছে, বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধী দল দেশে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। দেশ দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে, জনগণের গচ্ছিত টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট হয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার বেসুমার পাচারের ফলে রিজার্ভ ঘাটতিতে দেশের অর্থনীতি নাকাল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক এলসি বন্ধ রেখেছে। ফলে আমদানিনির্ভর দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য অকল্পনীয় বৃদ্ধি পেয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে দেশ এখন অতীতের সব আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি ম্লান হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের সমাজ মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য, তা নরকে পরিণত হয়েছে। এ দেশের বুর্জোয়া তথাকথিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল দেশবিরোধী, গণবিরোধী। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের জন্য তারা কিছুই করেনি। মৌলবাদের অন্ধকার থেকে, সাম্প্রদায়িকতার ছোবল থেকে, লুটেরা পুঁজির দুঃশাসন থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের। ক্ষমতা লাভে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের সর্বক্ষেত্রে লুণ্ঠনের সুযোগ ঘটে আর ক্ষতি হয় দুর্বল শ্রেণির। ক্ষমতাসীনরা একচেটিয়া লুণ্ঠন করে। গণমাধ্যমকেও একচেটিয়াভাবে ভোগ করে চলে। ক্ষমতসীনরা ক্ষমতা ব্যবহার করে দখল, লুণ্ঠন ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। দেশি-বিদেশি সুযোগ তারা কুক্ষিগত করে, জনগণকে বঞ্চিত করে।

বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্র নয়, মুসলিম রাষ্ট্রও নয়। এখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে বড়াই করে, অথচ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কোনো স্বীকৃতি দিতে চায় না। সচেতন আদর্শবাদী মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব জাতিসত্তার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। ঘরে-বাইরে নৃশংসতা ও ভোগবাদিতা প্রবল হচ্ছে। সমাজ রূপান্তরের জন্য সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্থানীয় ও জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্র ও রাজনীতির মাধ্যমেই সমাজ বদলাতে হবে। রাজনীতিকদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে, সামরিক আমলারা ক্ষমতা গ্রহণ করেন। অথচ আর্মি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, আমলারাও কোনো রাজনৈতিক দল নন। জাতীয় উন্নয়নে রাষ্ট্রকেই উপায় বের করতে হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করা দরকার, অথচ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো তা করে না। স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস দমন, দুর্বল ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা বৃদ্ধি, যুব উন্নয়নে পাঠাগার স্থাপন, প্রশিক্ষণ দান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, দুর্যোগে-বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেই, শ্রমিকের কর্মসংস্থান নেই, বরং চালু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নাকাল অসহায় মানুষ। মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, নিপীড়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে মব ভায়োলেন্স। জনগণের অর্থ ব্যাংক থেকে লোপাট হলেও কারো যেন কিছু করার নেই। আবারও গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছে। মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। এসব বিষয় এবং দুর্নীতিসহ প্রভৃতি জাতীয় পর্যায়ের প্রধান ইস্যু এখন। এসব জাতীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই।

আন্দোলনের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। সব পর্যায়ে আন্দোলন প্রয়োজন। গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতিকর্মী ও ছাত্ররা কাজ করবেন। এ ব্যাপারে আবৃত্তি, নাটক, গান, পাঠচক্র, আলোচনাসভা করা প্রয়োজন। নেতৃত্ব ওপর থেকে আসবে না, স্থানীয় পর্যায়ে থেকে তা গঠন করতে হবে। ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীকে আমরা গুরুত্ব দেব, শ্রেণিচ্যুতরা গরিবদের পাশে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু আদর্শচ্যুতরা তা পারবে না। স্থানীয়, জাতীয় পর্যায়ে পেশাগতদের আন্দোলনে দরকার। স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু করা দরকার স্থানীয় সরকারকে। সিভিল সোসাইটিকে আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। তারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা দেয়, কিন্তু কাজটি করে রাজনৈতিক। সিভিল সোসাইটি নতুন ধারণা, এটি আগে ছিল না। তারা দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে, অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব দারিদ্র্য বিমোচন করা, শিক্ষা বিস্তার করা। শিক্ষা দিয়ে কী হবে, যদি শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান করা না যায়? এনজিও বিস্তৃত হচ্ছে সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে। দাতারা সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো দিয়ে কাজ করায়। সরকারের কাছ থেকে ভালো কাজ না পেয়ে দাতারা এনজিওগুলোকে টাকা দেয়, নানামুখী তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। সরকারের সমান্তরাল এনজিওর প্রতিনিধিদের বিদেশভ্রমণ করানো, তাদের প্রশংসা করা, পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের মতো এনজিওর এত তৎপরতা নেই। সেখানে আছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। এনজিওর কর্মকর্তাদের জীবনের সঙ্গে গরিবদের জীবনের কোনো মিল নেই। সরকারি আমলার সমান্তরালে তাই এনজিও প্রতিনিধিদের দাঁড় করানো হয়েছে। সিভিল সোসাইটির লোকেরা এনজিওর প্রতিনিধি, তাঁরা রাজনীতিক নন।

এত দিন চালু ছিল আধুনিকতা মানে পাশ্চাত্যকরণ। আধুনিকতা মানেই আমেরিকানায়ন, ইউরোপীয় ভাবধারায় চালিত হওয়া। এই ধারণায় অতি দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে, মোহ ভেঙে গেছে। এখন আধুনিকতা বলতে আমেরিকান আধুনিকতাকে বোঝায় না। কারণ আমেরিকান আধুনিকতার মধ্যে যে একটি বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা আছে, সেটি লক্ষণীয়। আধুনিকতার প্রয়োজনে এখন দরকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, মাতৃভাষার চর্চা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিকশিত করা। আরেকটি দার্শনিক মতবাদ হলো উত্তরাধুনিকতাবাদ। এটির মোহ এ দেশের তরুণসমাজ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। উত্তরাধুনিকতার প্রবণতা হলো খণ্ডবিখণ্ডতা, বিচ্ছিন্নতা। এটি পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, নারী-পুরুষ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রভৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিচ্ছিন্নতার ধারণা ও তৎপরতাকে উসকে দিয়েছে। উত্তরাধুনিকতাবাদ বিশ্বায়ন ও সাম্রাজ্যবাদের দর্শন। বিশ্বায়ন মানেই আধিপত্য; সে আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধী। আন্তর্জাতিকতাবাদে বহুজাতি ও বহুভাষার অস্তিত্ব আছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নানা ভাষার অনুমোদন আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে যে বিশ্বায়ন সৃষ্টি হয়েছে, তার আধিপত্যবাদী হাতিয়ার হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। সব রকমের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ভাষার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব বেড়েছে। আমরা গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ও আধিপত্যবাদী বিশ্ব চাই না। আমরা এমন গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই, যেখানে সম-অধিকার ও সহমর্মিতা হবে সম্পর্কের ভিত্তি। রাষ্ট্রের অধীনে নাগরিকদের অধিকার সংহত থাকবে।

সাম্রাজ্যবাদ আকাশে থাকে না। তাদের প্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করেন। সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্য বিস্তার করছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রভু হয়ে। সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত বিশ্বায়নের রূপ নিয়ে সমস্ত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে দিয়ে পদানত করতে চায় সারা বিশ্বকে। পৃথিবী এখন সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশে যাঁরা উদারনীতির চর্চা করেছেন এবং যাঁরা ভেবেছেন উদারনীতির মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আসবে, আজ তাঁরাও বুঝতে পেরেছেন সাম্রাজ্যবাদ কত নৃশংস ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। আমাদের মাটির নিচে যে সামান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, যে তেল ও গ্যাস আছে, সাম্রাজ্যবাদের চোখ পড়েছে সেখানেও। তারা তা দখল করে নিতে পারে যেকোনো সময়ে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। এই উপলব্ধিটি সর্বজনীন হয়েছে। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর-ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। তারা মার্কিনদের সব হামলা-আগ্রাসনের বৈধতা দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের দাঁড়াতে হবে বড় শক্তি সেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হবে, ক্ষুদ্র আন্দোলন করতে হবে মুক্তির জন্য। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় আন্দোলন প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গণমুক্তির লক্ষ্যে এই উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। নয়তো আমাদের সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি নিশ্চিত হবে না।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য

ট্রাম্পের নীতি ও বিশ্বব্যবস্থার নতুন দ্বন্দ্ব

    ড. সুজিত কুমার দত্ত
শেয়ার
ট্রাম্পের নীতি ও বিশ্বব্যবস্থার নতুন দ্বন্দ্ব

কংগ্রেসের যৌথ কক্ষে সম্প্রতি এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে আমেরিকা পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা হয়ে উঠবে। ট্রাম্পের এই দাবিটি বিশাল এবং প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে, যা আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ, শূন্য-সমষ্টি চিন্তা-ভাবনা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্রমবর্ধমান ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় নিমজ্জিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি একক, প্রধান প্রতিপক্ষ চীন। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁর ২০২০ সালের বই আমেরিকান ক্রুসেড-এ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, যেখানে চীন কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক প্রতিপক্ষ

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি চীনকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে স্থান দিয়েছে। একইভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের সংগ্রামে চীনকে ধারাবাহিকভাবে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক বিলি গ্রাহামের পুত্র এবং ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক ফ্র্যাংকলিন গ্রাহাম চীনের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের MAGA আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব স্টিভ ব্যানন, কিছু ইভানজেলিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রতিধ্বনিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার গতিশীলতা এবং চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের বিষয়ে।

ব্যানন MAGA আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য কল্পনা করেন এবং বলেন যে এটি যদি কার্যকরভাবে তার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তবে পরবর্তী ৫০ বছর ধরে শাসন করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন এবং চীনের বিরুদ্ধে একটি সিদ্ধান্তমূলক। এখন যে বাস্তবতা, তাতে আর আশা করা যায় না ভারত, ব্রাজিল, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো মাঝারি শক্তিধর দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে ধরে রাখবে। এই নতুন বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে তারা সবাই নিজেদের শক্তিধর দেশ হিসেবেই দেখে।
তারা নিজেদের প্রান্তিক অংশ হিসেবে নয়, বরং একেকটি আলাদা কেন্দ্র হিসেবে দেখতে ভালোবাসে।

ট্রাম্পকে নিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর দুশ্চিন্তাও রয়েছে। কারণ এত দিন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও প্রভাবকে ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো বহুমুখী চরিত্রের সংকট। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা তথা বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যেক সংকটে ফেলে দিয়েছেন।

তাঁর সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে রাশিয়াকে সমর্থন দিয়েছেন এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ভোটে তাঁর প্রশাসন রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কসংক্রান্ত হুমকি দীর্ঘদিনের মৈত্রীর সম্পর্ক ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যেকও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সহযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র যদি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও আত্মকেন্দ্রিক নীতিতে চলে যায়, তাহলে বিশ্বশৃঙ্খলায় গুরুতর প্রভাব পড়বে। চীন ও রাশিয়া এই সুযোগ নিয়ে ইউরোপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এমনকি তারা ইউরোপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আধিপত্য কায়েম করতে পারে।

ট্রাম্পের চীন ও রাশিয়ার প্রতি মনোভাবও উদ্বেগজনক। তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, কিন্তু একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিও তাঁর সহানুভূতি দেখা যায়। এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসে এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়, তবে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট শূন্যতা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো পূরণ করতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও সংঘাত বাড়তে পারে। ট্রাম্পের নীতি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধ এবং সংরক্ষণবাদী নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনতে পারে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় এই দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীন তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে তারা এই দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউরোপে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন সংকট ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। রাশিয়া ইউক্রেন সংকট ও অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে তার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি বিশ্বশৃঙ্খলায় গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সহযোগিতা অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো ইস্যুগুলো কোনো একক দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি এই সমস্যাগুলোর সমাধানে বাধা সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। ট্রাম্পের নীতির কারণে কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই সংকট তৈরি হয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গভীর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর অভিবাসনবিরোধী মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বর্ণবাদ এবং বিভাজনকে উসকে দিয়েছে। অতএব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সম্মিলিতভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ফিরে আসা। অন্যথায় বিশ্বব্যবস্থা আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।

 

 লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

datta.ir@cu.ac.bd

মন্তব্য

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ়তর করবে

    এ কে এম আতিকুর রহমান
শেয়ার
প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ়তর করবে

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আমন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৬ মার্চ ২০২৫ চার দিনের এক সরকারি সফরে চীন যান। সফরকালে তিনি ২৮ মার্চ প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। তিনি চীনের হাইনান প্রদেশে আয়োজিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে যোগ দেওয়া ছাড়াও চীনের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। গত বছরের আগস্ট মাসে সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।

এ সময় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক একটি চুক্তি ও আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২৯ মার্চ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে এবং সেদিনই তিনি দেশে ফিরে আসেন।

দুই.

প্রধান উপদেষ্টা ২৭ মার্চ দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশের বোয়াওয়ে অনুষ্ঠিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং বক্তব্য দেন। তিনি বলেন যে এশিয়ার দেশগুলোর গন্তব্য হচ্ছে পরস্পরগ্রন্থিত।

যৌথভাবে সবার সমৃদ্ধি এবং অংশীদারি ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশিকা প্রণয়ন করতে কতগুলো ক্ষেত্রে; যেমনঅর্থ, বাণিজ্য, কৃষি এবং মেধা বিনিময়, সহযোগিতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের বিষয়ে আলোকপাত করে সংস্কার প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ যেসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করছে, সেসবের উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে এশিয়ার নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
তিনি সম্মেলনের ফাঁকে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী দিং শুয়েশিয়াং, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এবং অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে কথাবার্তা বলেন। 

তিন.

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৭ মার্চ রাতে বোয়াও থেকে রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেন। ২৮ মার্চ সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর প্রতিনিধিদলসহ হলে প্রবেশ করলে প্রেসিডেন্ট শি তাঁদের স্বাগত জানান। অত্যন্ত আন্তরিক এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে মূলত দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়েই আলোচনা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা গত বছর বাংলাদেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনা চীনা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার সময় তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি পারস্পরিক স্বার্থেই দ্বিপক্ষীয়, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি চীনের কাছে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্নপূরণে সহায়তা চেয়ে একটি চীন সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানান। তিনি চীনা প্রকল্প ঋণের সুদের হার কমানো এবং প্রতিশ্রুত অর্থের জন্য আরোপিত প্রতিশ্রুতি ফি মওকুফের অনুরোধ করেন। ড. ইউনূস বলেন, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তিনি চীনের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন। এ ছাড়া তিনি শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেন।

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ়তর করবেপ্রেসিডেন্ট শি প্রধান উপদেষ্টার প্রতি চীনের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশকে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের দেওয়া শূন্য শুল্ক সুবিধা ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বহাল রাখার কথা জানান। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের পথকে সুগম করার জন্য তিনি বাংলাদেশ-চীন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিনিয়োগ চুক্তির জন্য আলোচনার প্রস্তাব দেন। প্রধান উপদেষ্টার অনুরোধে চীনা প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্র স্থানান্তরের বিষয়ে উৎসাহিত করবেন বলে অবহিত করেন। তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষ চীনা শিল্পাঞ্চল ও শিল্প পার্ক নির্মাণে চীনের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট শি বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানো, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে বাংলাদেশকে উন্নতমানের সহযোগিতা প্রদান এবং ডিজিটাল ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের চীনের ইউনান ও অন্য প্রদেশগুলোতে চিকিৎসার জন্য স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেন। তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তাঁর দেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যে পাঁচটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তা হলোবিনিয়োগ আলোচনা শুরু, বাংলাদেশে চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে একটি রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং চীনা অনুদান হিসেবে বাংলাদেশকে একটি হৃদরোগ সার্জারি যানবাহন প্রদান।

তথ্য মতে, মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে চীন। এ ছাড়া চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে অনুদান ও অন্যান্য ঋণ সহায়তা।

প্রধান উপদেষ্টা চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোইয়িংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং এ বিষয়ে চীনের কাছ থেকে ৫০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

চার.

দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষ হওয়ার পর সেদিনই তিনি বেইজিংয়ের দ্য প্রেসিডেনশিয়ালে অনুষ্ঠিত চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নেন। মূলত প্রধান উপদেষ্টার সফরকে কেন্দ্র করেই ওই সংলাপ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে চীনা বিনিয়োগকারীদের অবহিত করা। প্রধান উপদেষ্টা একই ভেন্যুতে তিনটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন, যার বিষয়বস্তু ছিল টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ : উৎপাদন ও বাজারের সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা ও থ্রি-জিরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ। ওই সব আলোচনা প্রধান উপদেষ্টাকে বিভিন্ন কম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সামাজিক ব্যবসা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও চীনের স্বনামধন্য কম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ এনে দেয়। 

ড. ইউনূস চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ উল্লেখ করে তিনি বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সমুদ্র যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি নেপাল ও ভুটান ছাড়াও ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্য স্থলবেষ্টিত উল্লেখ করে এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের মানবসম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ বাস করে, যাদের বেশির ভাগই যুবক, যারা উদ্যম, সৃজনশীলতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি এই তরুণ জনগোষ্ঠীর অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গত বছর ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের রূপান্তর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে দেশে নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, যা ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

চীন সরকার ও চীনা কম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২১০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। দেশটির প্রায় ৩০টি কম্পানি বাংলাদেশের বিশেষ চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

পাঁচ.

২৯ মার্চ সকালে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ড. ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এই উপলক্ষে সেখানে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, বিশ্বকে বদলে দিতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি স্বপ্ন দেখারও জায়গা। আপনি যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে তা ঘটবেই। আপনি যদি স্বপ্ন না দেখেন, তবে তা কখনো ঘটবে না। এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে, কেউ না কেউ আগে তা কল্পনা করেছিল।

প্রধান উপদেষ্টা তাঁর তিন শূন্য তত্ত্ব’—শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য দারিদ্র্য এবং শূন্য বেকারত্বের ওপরও আলোকপাত করেন। তিনি তাঁর সামাজিক ব্যবসা তত্ত্বটিও তুলে ধরে বলেন যে এটি এমন একটি ব্যবসা, যা সামাজিক সমস্যার সমাধান করে। শিক্ষার্থীদের কার্বন নির্গমনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবার উচিত নিজেদের তিন শূন্য ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।

ছয়.

চীন সফরটি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরাজমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিন দিন দৃঢ়তর ও গভীর হচ্ছে। এই সফর বিদ্যমান সম্পর্কে আরো নতুন শক্তি জোগাবে বলেই বিশ্বাস। আমরা এর প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, যখন প্রধান উপদেষ্টা ও চীনা প্রেসিডেন্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে উভয় পক্ষ ঐকমত্য পোষণ করে।

চীন যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব বাস্তবায়ন করা গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো সচল এবং গতিময় করবে। দেশে যখন বিনিয়োগপ্রবাহ নেতিবাচক ধারার দিকে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে চীনের নতুন বিনিয়োগ দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবেশ, বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

যেকোনো দেশের জন্যই চীন একটি বড় বাজার, কিন্তু বাংলাদেশ সেই বাজারটি ধরতে পারেনি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে রপ্তানির চেয়ে আমদানি প্রতিবছরই বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চীন থেকে দুই হাজার ১১২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। অথচ একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৮ কোটি ডলারের পণ্য। রপ্তানি বাড়াতে হলে চীনের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এ ছাড়া যেসব পণ্য চীনের চেয়ে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ কম হবে, সেসব উৎপাদনের জন্য চীনা বিনিয়োগকারীদের এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ওই সব পণ্য চীন ছাড়াও অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা যাবে।   

বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী প্রতিবেশী ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে গিয়ে থাকে। বাংলাদেশের কাছাকাছি চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাসেবার জন্য চারটি হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধির আভাসও দেওয়া হয়েছে। যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় যদি তুলনামূলকভাবে কম হয় এবং চিকিৎসার মান উন্নত হয়, তাহলে এই প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয় হবে। এ ছাড়া নতুন করে যেসব চুক্তি বা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো, তা বাস্তবায়িত হলে সেসবের মাঝে এই সফরের সাফল্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।  

রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীন সব সময়ই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে। আমাদের বিশ্বাস, চীন মায়ানমারকে চাপ দিলে প্রত্যাবাসন সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু চীন যে ভূমিকা নিলে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে, তা নেবে কি না সেই প্রশ্নটি রয়েই যায়।

আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে যে সমীকরণ রক্ষা করে চলছে, সেভাবেই চলবে বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কারণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে আছে। 

যা হোক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ