• ই-পেপার

রিজার্ভে ডলার নয়, সোনা হোক অগ্রাধিকার...

  • অজেয় রোহিতাশ্ব আল্-কাযী

পশ্চিমবঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

নির্মল চক্রবর্তী

পশ্চিমবঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জের সামনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু

শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন যে মমতার দক্ষিণ হস্ত, সেই মমতাজির সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের সর্বেসর্বা। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের শাসনে এখন বিজেপির সরকার। আর সেই সরকারের তিনি মুখ্যমন্ত্রী। নবগঠিত এই বিজেপি সরকারের সামনে বর্তমানে একাধিক রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে শুভেন্দুকেই। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে এখন একজন তেজস্বী রাজনীতিবিদ থেকে প্রশাসকে

রূপান্তরিত হওয়ার চাপের মুখোমুখি হতে হবে। এটিই বলছেন বিশ্লেষকরা।

তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং এমন একটি রাজ্য শাসন করা, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত গভীর। পুরো কর্মজীবনে শুভেন্দু অধিকারী এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যিনি তাঁর আক্রমণাত্মক প্রচারশৈলীর জন্য সমর্থকদের কাছে প্রশংসিত, কিন্তু বিরোধীরা তাঁর সেই সব ভাষণকে রাজনৈতিক উসকানি বলে অভিযোগ করে থাকেন। সমালোচকরা বলে থাকেন শুভেন্দুর ভাষণগুলো রাজ্যে ধর্মীয় বিভাজন আরো গভীর করেছে। মমতার তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনমনে তিনি যে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছেন, শাসক হওয়ায় সেই উত্তাপ এখন তাঁকেই প্রশমন করতে হবে। এরই মধ্যে তিনি এর মুখোমুখি হতেও শুরু করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছেন শুভেন্দু। সাধারণ মানুষের সমস্যা সরাসরি শুনতে সল্ট লেকে দলের কার্যালয়ে জনতার দরবার বসালেন তিনি। সকাল থেকেই কার্যালয়ের সামনে ভিড় জমায় হাজার হাজার মানুষ। নিজেদের অভাব-অভিযোগ, দাবি ও সমস্যার কথা জানাতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেখানে আসে সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ছিলেন চাকরিপ্রার্থীরাও।

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সমীকরণে তৃণমূলের কাছে মুসলিম ভোট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই মমতার তৃণমূলকে হারাতে অনুপ্রবেশকারী নামে এসআইআরের (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) খড়্গ চালানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ৬০ লাখেরও বেশি নাম ভোটারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে সামান্য কিছু ভোটার ফেরানো সম্ভব হয়। আবার অনুপ্রবেশকারী নাম দিয়ে ধরপাকড় ও সীমান্তে পুশ ব্যাক কাণ্ডও চালানো হয়। তৃণমূলের এই হারানো ভোটারের অনেক স্বজনই এতে শুভেন্দু সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছেন। তাই শুভেন্দুকে তাঁদের রোষানলকে মোকাবেলা করেই চলতে হবে। অবশ্য এরই মধ্যে নবান্ন থেকে ধৃত অনুপ্রবেশকারীদের রাখার জন্য প্রতিটি জেলায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সল্ট লেকের জনতার দরবারে দুর্নীতি রুখতে শিক্ষক নিয়োগ পলিসিতে স্বচ্ছতা আনার এবং তিন মাসের মধ্যে নিয়োগের আশ্বাসও দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, জনতার দরবারে হাজির হন পুলিশের চাকরিপ্রার্থীরাও। বিশেষ করে মহিলা প্রার্থীরা নিয়োগে উচ্চতার নির্ধারিত মাপকাঠি নিয়ে আপত্তি জানান। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমানে যে উচ্চতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গের বহু মেয়ের নাগালের বাইরে। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে উচ্চতার নিয়মে পরিবর্তন আনা হোক, যাতে আরো বেশিসংখ্যক মহিলা পুলিশে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের বক্তব্য মন দিয়ে শোনেন। এতে তাঁরা আশাবাদী, এই জনতার দরবারে তাঁদের সমস্যার সমাধান হবে।  বলা যায়, এভাবে শুভেন্দু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছেন। কোরবানির ঈদে তাঁর সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে কোরবানির বিধি-নিষেধ ও ধর্মীয় বিতর্ক। রাজ্যে গবাদি পশু জবাইয়ের ওপর নতুন বিধি-নিষেধ জারির পর ঈদুল আজহা উদযাপন নিয়ে বড় ধরনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বিধি-নিষেধ অমান্য করার ঘোষণায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা নিয়ে তাঁকে বড় পরীক্ষায় পড়তে হয়। হকার উচ্ছেদেও তৈরি হয় জনরোষ। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন ও ব্যস্ত এলাকায় হকারদের পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদ বাস্তবায়নে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে তীব্র বিরোধিতা ও জনরোষের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

এক দিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা এবং অন্যদিকে ভোটে তাঁরা হারেননি, হারানো হয়েছেএমন দাবিতে সরব রয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। নিজের ভাবনীপুর কেন্দ্রেও জোর করে হারানোর অভিযোগ ফের তুলেছেন মমতা। এক ভিডিও বার্তায় মমতা আবার বললেন, হারের জায়গায় জেতা, জেতার জায়গায় হারাএই পাশাটাই উল্টেছে প্রায় ১৫০ আসনে। তা না হলে আমরা ২২০ থেকে ২৩০ আসন পেতাম। ভবানীপুরে তাঁর হার প্রসঙ্গে মমতার বক্তব্য, আপনারা এজেন্টদের পরিচয়পত্র কেড়েছেন। আমি ১৩ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলাম। এই সূত্রেই ভবানীপুরের বিধায়ক তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর উদ্দেশে মমতা বলেন, যিনি এখন গদিতে বসেছেন, তাঁর নাম করতে আমার ভালো লাগে না। তাঁকে আমরা অনেক দিন থেকে চিনি। তিনি নিজে বসে লুট করছিলেন। আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিতে দিতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলনেত্রীর অভিযোগ, যিনি এখন চেয়ারে বসেছেন, তাঁর তো ওই চেয়ারে বসারই কথা নয়। ভোট লুট করে রাজশাসনে বসেছেন। তিনি কী করে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বুঝবেন? এঁরা বাংলার লোক নন, বহিরাগত। ক্ষমতায় এসে বুলডোজার চালিয়ে মানুষের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছেন! পুলিশকে সামনে রেখেই সন্ত্রাস চলছে। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর নানা অভিযোগে একের পর এক তৃণমূল নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনা সামনে এসেছে।

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করায় ২০১২ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র। তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালু রয়েছে এখনো। অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্র যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যঃসাবেক অধ্যাপক এবং হক কথা সোচ্চারে বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রের রোষানলে। তাঁর প্রতিবাদী মনন ও অদম্য সাহস। তিনি আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভালোবাসেন। এ কারণে তিনি তৃণমূল সরকারের চোখের বালি হন। কিন্তু শত লাঞ্ছনা ও শাস্তির মুখে দাঁড়িয়ে আজও তিনি কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারেরই সমালোচনায় মুখর। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সামনে চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে অম্বিকেশ মহাপাত্র তাঁর দেওয়া পোস্টে ১৭টি জিজ্ঞাসা তুলে ধরেন১. পিসি-ভাইপোর জেলযাত্রা হয় কি না; ২. অভয়ার বিচার মেলে কি না; ৩. সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারির বিচার হয় কি না; ৪. নারদ স্টিং অপারেশনে অভিযুক্তদের কোনো শাস্তি হয় কি না; ৫. চাকরি বিক্রয়কারীরা শাস্তি পায় কি না; ৬. সুপ্রিম নির্দেশে বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দেওয়া হয় কি না; ৭. সব সরকারি শূন্যপদে স্বচ্ছতার মাধ্যমে নিয়োগ হয় কি না; ৮. কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাওয়া যায় কি না; ৯. বন্ধ স্কুলগুলো আবার খোলে কি না; ১০. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসে কি না; ১১. কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় কি না; ১২. সংবিধানসম্মত আইনের শাসন ফিরে আসে কি না; ১৩. স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকে কি না; ১৪. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা হয় কি না; ১৫. বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি সুরক্ষিত থাকে কি না; ১৬. রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-রবি-নজরুল-স্বামীজি-নেতাজি...নির্দেশিত পথে বাংলা থাকে কি না; ১৭. বিশ্ববন্দিত খ্যাতনামা মনীষীদের শ্রদ্ধার আসন বজায় থাকে কি না।

অম্বিকেশ মহাপাত্রর পোস্টে প্রদত্ত জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে যা জানা যায়পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতিতে পিসি-ভাইপো বলতে মূলত তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোঝানো হয়। কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার অভয়া (তিলোত্তমা)-এর বিচারের বিষয়টি এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। মামলার শ্লথগতি ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁর পরিবার ও চিকিৎসকসমাজ। সারদা গোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখোপাধ্যায় প্রায় ১৪ বছর ধরে জেলে আছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বহু মামলা বিচারাধীন। নারদ স্টিং অপারেশনে অভিযুক্ত কোনো নেতাই এখনো আদালতের দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তি পাননি।

২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই স্টিং অপারেশনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। ভিডিওতে একাধিক মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাকে ঘুষ নিতে দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই এবং ইডি মামলাটির তদন্ত শুরম্ন করে। ২০২১ সালের মে মাসে সিবিআই ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র ও শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতাদের গ্রেপ্তার করে। তবে নিম্ন আদালত ও কলকাতা হাইকোর্ট থেকে তাঁরা সবাই জামিন পেয়ে যান। 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভূমিধস জয়ের পর রাজ্য রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের ফল শুধু সরকারবদলের ঘটনা নয়, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন থাকায় ব্যাপক হারে অবকাঠামোর উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। তবে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সেই কারণে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তন বাস্তবে কতটা উন্নয়ন এনে দিতে পারবে। তবে নতুন সরকারকে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। বিজেপির এই বিপুল জয় প্রমাণ করেছে যে রাজ্যের বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দলটির সামনে এখন একের পর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে।

এই নির্বাচনের ফল দেখিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চায়। তাই এখন মূল বিষয় হলো কর্মক্ষমতা। সরকার কত দ্রুত কাজ করতে পারে, কতটা স্বচ্ছভাবে প্রশাসন চালাতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতি নির্ধারণ করবে। বিজেপির জন্য এখন আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জয়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা। জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন তারা উন্নয়ন, শান্তি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের বাস্তব ফল দেখতে চায়।

ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দেন অনেকেই, তা পূরণ করাটাই সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ৯ মে ব্রিগেডে শপথ গ্রহণ করার পর থেকেই দফায় দফায় বৈঠক করছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নজর দিয়েছেন প্রায় সব দপ্তরে। মাস কয়েক আগেও যিনি বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসতেন, তিনিই আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সাবেকের পাড়ায় গিয়ে বিজয় মিছিলও করে এসেছেন তিনি। রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের সামনে থাকা এতসব চ্যালেঞ্জ কী করে মোকাবেলা করেন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী, সেটিই এখন দেখার।

লেখক : কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদ

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদ

এই সেদিন পয়লা জুন বাংলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। যুগে যুগে অনেক নায়ক আসে, কিন্তু মহানায়ক নয়। শত শত বছর পর বঙ্গবন্ধু বা তোফায়েল আহমেদ আবির্ভাব হন। জানি না, জুন মাসটি আমার জন্য, আমার সোনার বাংলার জন্য কেমন। ছেষট্টির ৭ জুন তেজগাঁওয়ে শ্রমিক মনু মিয়া শাহাদাতবরণ করেন, যাঁর লাশ নূরে আলম সিদ্দিকী কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ৭ জুন আমার একেবারে সাদামাটা স্ত্রীর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২৫ সালের ৭ জুন আমাদের অসহায় ফেলে সে মৃত্যুবরণ করেছে। আবার আমার জন্মও ১৪ জুন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকতে অসময়ে বিয়ে হয়েছিল, সেও ১৯৮৪ সালের ২৫ জুন। জুন আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। গত সংখ্যায় লেখা পাঠিয়ে তোফায়েল ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলাম। বড় তাড়াহুড়া করে জানাজা হয়েছে। ছিলাম টাঙ্গাইলে। তাই যেতে পারিনি। সে জন্য মনে বড় দুঃখ এবং আফসোস রয়ে গেল। কতজনের জানাজায় কত দূর ছুটে গেছি, কিন্তু একেবারেই আপনজন, ঘরের মানুষের জানাজা আদায় করতে পারলাম না। তবু মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তাঁর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে বেহেশতবাসী করেন।

পুরুষোত্তম তোফায়েল আহমেদসবাই যে তোফায়েল আহমেদকে চেনেন, আমরা সেই তোফায়েল আহমেদকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম। সেদিন বলেছিলাম, ১৯৬২ সাল থেকে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়। সেদিন বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক সাক্ষাৎকারে বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের স্কাউট জাম্বুরিতে তাঁর সঙ্গে দেখা। ১৯৬২ নয়, ওটা ১৯৫৮ সালই হবে। সেই স্কাউট জাম্বুরির পর তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে লতিফ ভাইয়ের শত শত চিঠি আদান-প্রদান হয়েছে। তখন সবারই চিঠি লেখার অভ্যাস ছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে নির্বাসনে থাকা অবস্থায় প্রায় ৬০ হাজার চিঠি পেয়েছি। আমিও তার উত্তর দিয়েছি। হয়তো দু-এক হাজারের উত্তর না-ও দেওয়া হতে পারে। আগের দিনে চিঠি ছিল ভাব আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম। এখন মোবাইলের জামানায় কে চিঠি লেখে? দরকারি চিঠিও লেখা হয় না। সবাই ফোনে ফোনে। উনসত্তরের ছাত্র গণ-আন্দোলনে প্রথম যেদিন হঠাৎই তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বের কথা শুনে হৃদয় ময়ূরের মতো নেচে উঠেছিল। বড় ভালো লাগে, ভীষণ উৎসাহ পাই। একের পর এক আন্দোলনকারী ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ আহত-নিহত হতে থাকে। পুরান ঢাকায় মতিউর রহমান শহীদ হন। আন্দোলন আরো বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আসাদের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল হয়। আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের অঞ্চলও উত্তাল হয়ে ওঠে। লতিফ ভাই ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। আমরা আন্দোলন করছি তো করছিই। এর মধ্যে উনসত্তরের পয়লা ফেব্রুয়ারি হঠাৎই আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আবু আহমেদ আনোয়ার বক্স, শামীম আল মামুন ও আমাকে গ্রেপ্তার করে ময়মনসিংহ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। টাঙ্গাইলে যে ছোট্ট কারাগার, তাতে রাজবন্দিদের তেমন রাখা হতো না। দু-তিন দিন পর সাদত কলেজের ভিপি খন্দকার আব্দুল বাতেনকে আমাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। খন্দকার বাতেন যাওয়ার আগে যে চার-পাঁচ দিন ছিলাম, বেশ আনন্দেই ছিলাম। কিন্তু খন্দকার বাতেন ময়মনসিংহ জেলে যাওয়ার পর জেলখানার পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরপরই খন্দকার বাতেন কাঁদতেন, মাকে দেখতে ইচ্ছা করে। আরো কত কিছু। একেবারে কেমন যেন একটা অশান্ত পরিবেশ হয়ে যায়। চুপচাপ কাঁদলেও হয়তো হতো। কিন্তু না, চুপচাপের কোনো বালাই নেই। অনেক সময় গ্রামের মেয়েদের মতো সুর তুলে কাঁদতেন। বড় খারাপ লাগত। সেই অবস্থায়ই যায় প্রায় দুই সপ্তাহ। তারপর হঠাৎই আমাদের মুক্তি। তখনকার সে বিচিত্র অবস্থা ভাবতেও অবাক লাগে। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তখন নিয়মিত মাসিক ভাষণ দিতেন। পয়লা ফেব্রুয়ারিও দিয়েছিলেন। তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না। তাই আন্দোলনকারীদের থামতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সে অনুরোধে কাজ হয়নি। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা মামলার সব অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর ময়মনসিংহ কারাগারের প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজবন্দিরা রাতের আঁধারে কারাগার থেকে বেরোতে আপত্তি করেন। এর জন্য তাঁদের ২৩ ফেব্রুয়ারি সকালে মুক্তি দেওয়া হয়। আমরা টাঙ্গাইল থেকে গিয়ে লতিফ ভাইকে নিয়ে আসি। সেই সময় ময়মনসিংহ কারাগারে ছিলেন অষ্টগ্রামের ন্যাপ নেতা আব্দুল বারী, কিশোরগঞ্জের নগেন সরকার, মুক্তাগাছার শহীদুল্লাহ মালেক, ছাত্রলীগের আনোয়ারসহ আরো অনেকে। প্রায় আড়াই বছর পর আমাদের নেতা লতিফ ভাইকে পেয়ে আমরা ভীষণ উজ্জীবিত হয়ে উঠি। আমরা ছাত্ররা সভা ডাকলে যেখানে দু-তিন হাজার লোক হতো, সেখানে সদ্যোকারামুক্ত লতিফ সিদ্দিকী গেলে ২০ থেকে ৩০ হাজার লোকের সমাগম হতো, যাতে আমাদের মধ্যে এক মহা আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু হিসেবে ঘোষণা করলে পুরো জাতি আরো উদ্বেল হয়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সামনে জাতির পক্ষ থেকে উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ টুঙ্গিপাড়ার শেখ লুৎফর রহমানের ছেলে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। আন্দোলন আরো বেগবান হয়। এর মধ্যেই আইয়ুব খান ২৪ মার্চ পদত্যাগ করে ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ইয়াহিয়া এসেই ঘোষণা করেন, আমার রাজনীতির কোনো ইচ্ছে নেই। দুই বছরের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে আমরা ব্যারাকে ফিরে যাব। সেই বছরের জন্য প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেন। পয়লা জানুয়ারি ১৯৭০ থেকে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল মেনে নেয়। বাইরে রাজনীতি বন্ধ থাকলেও ঘরোয়া রাজনীতি, হলের মধ্যে সভা-সমাবেশে তেমন কোনো বাধা দেওয়া হয় না। চলতে থাকে সংগ্রাম আর সংগ্রাম। তখন আমাদের কাছে মিটিং-মিছিল ছাড়া আর কোনো কিছুই ছিল না। রাতদিন তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। তুমি কে আমি কেবাঙালি বাঙালি, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। পূর্ব বাংলার কুখ্যাত গভর্নর ময়মনসিংহের মোনেম খানকে সরিয়ে জেনারেল আহসানকে তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করা হয়। এরপর আসে ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। সেখানে বাংলার তরুণ তুর্কিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রচারে। মনে হয়, ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধী যেমন শ্রেষ্ঠতম কর্মীদের পেয়েছিলেন, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের শ্রেষ্ঠতম সংগঠকদের পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মণি, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, সিরাজুল আলম খান, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, লতিফ সিদ্দিকী, আল মুজাহিদী, ফজলুল করিম মিঠু, ফজলুর রহমান ফারুক, শাজাহান সিরাজ, নীলফামারীর রউফ, নোয়াখালীর মোহাম্মদ আলীএ রকম আরো অনেকেই। এখন যেমন হাজার হাজার মানুষ জেমসের গান শোনে, ঠিক তেমনি আমাদের নেতাদের বক্তব্য শুনতেন, আমরা উদ্বেলিত হতাম। এর ফলে ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের ১৬৭টিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিজয় হয়। মাত্র ২৭ বছর বয়সে মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ ভোলা থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ভোটের রায় মানেনি। ছলাকলা করে ভোটের রায়কে অন্যদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে বাংলার বুকে সামরিক শাসন জারি করে। বাঙালিরা পাকিস্তানের এই অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পাকিস্তানি হানাদাররা রাস্তাঘাটে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করতে থাকে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হয়, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়, মা-বোনের ইজ্জত-সম্মান-সম্ভ্রম ধ্বংস করা হয়। তার পরও হানাদাররা বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। ওই সময় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত তাদের নিজস্ব দুরবস্থার মধ্যেও সেই এক কোটি মানুষের বোঝা হাসিমুখে বহন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়, অস্ত্র দেয়সর্বোপরি ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তির বেদনায় শরিক হয়ে আমাদের মুক্তির স্বাদে অবগাহন করে।

১০০ কয়েক দিন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। অনেকেই অনেক প্রশ্ন করে, কিন্তু এটি ধ্রুব সত্য, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের চেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে সরকার অনেক ভালো। একেবারে পতনের শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়া একটি সরকার এযাবৎ যা করেছে, খুব একটা খারাপ করেনি অন্তত সব দিক থেকে ব্যর্থ ইউনূস সরকারের চেয়ে। অধ্যাপক ইউনূস সুদ-ঘুষ বোঝেন, কিন্তু জনগণের কল্যাণ বোঝেন না। তা যদি বুঝতেন, তাহলে হামে আক্রান্ত হয়ে ছয় শর বেশি ফুলের কুঁড়ির মতো মানবসন্তান হারিয়ে যেত না। এর জন্য ড. ইউনূসের ৬০০ বার ফাঁসি হলেও কম হবে। তিনি তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের কী এক মহিলাকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন, যাঁর স্বাস্থ্যের স্ব সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল কি না, জানি না। আমার মনে হচ্ছিল, এত টানাপোড়েনের মধ্যেও তারেক রহমান ভালো চালাচ্ছেন। আমার মনে হচ্ছিল, তিনি বিএনপি নেতা হিসেবে নয়, দেশের নেতা হিসেবে জাতীয় নেতার ভূমিকা পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবার প্রতি তাঁর দায়িত্ব। সে দায়িত্ব তাঁর পালন করতে হবে খুশিতে হোক আর অখুশিতে হোক। সেই কাজটি আমার তো মনে হয়েছে, এত দিন ভালোভাবেই করছিলেন। এই সেদিন জাতীয় নেতা তোফায়েল আহমেদের জানাজা নিয়ে বর্তমান সরকার ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। ৯ বার নির্বাচিত একজন জাতীয় নেতার শুধু আওয়ামী লীগের দোসর বলে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা হয়নি, শহীদ মিনারে হয়নি, ভোলায় তাঁর জানাজায় বাধা দেওয়া হয়েছে, এটি কোন রুচির পরিচয়? দলীয় নেতা দেশে বহু আছেন। কিন্তু জাতীয় নেতা খুব বেশি নেই। একজন জাতীয় নেতার নাম যদি উল্লেখ করতে হয়, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে তোফায়েল আহমেদ। তাই আমি আশা করেছিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের জানাজায় যথাযথ মর্যাদা দেবেন। তিনি এরই মধ্যে অনেক প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তাঁর কাজগুলো খুবই কঠিন, কিন্তু তার পরও তিনি করেছেন। তোফায়েল আহমেদকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হলে আমি আমার অন্তরের সবকিছু উজাড় করে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে সমর্থন করতাম। দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তো এখন শুধু বিএনপির নেতা নন, তিনি সবার নেতা। সবার প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ব-কর্তব্য অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে মাননীয় স্পিকার বীরবিক্রম হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরেকটু চেষ্টা করলে, আন্তরিক হলে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। তিনি যেটুকু করেছেন, ভালো করেছেন। কিন্তু আরো করতে পারলে সেটি আরো ভালো হতো, কল্যাণকর হতো। আবার বলব, তোফায়েল আহমেদ বারবার আসেন না। তাঁকে সম্মান করা, মর্যাদা দেওয়া শুধু তোফায়েল আহমেদকেই সম্মান দেখানো নয়, দেশকে, স্বাধীনতাকেসর্বোপরি মনুষ্যত্বকে সম্মান জানানো। আশা করব, অনতিবিলম্বে তারেক রহমানের নেতৃত্বের সরকার একজন জাতীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে সর্বদলীয়ভাবে জাতীয় সম্মান জানানোর ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোফায়েল আহমেদের আত্মার শান্তি দান করুন। আমিন।

 লেখক : রাজনীতিক

এক মায়ের করুণ মৃত্যু, আইন এবং মানবিকতা

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

এক মায়ের করুণ মৃত্যু, আইন এবং মানবিকতা

পুলিশ সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরের এক বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম নামের এক নারী তথা এক মায়ের মরদেহ উদ্ধার করে। সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায়, ওই নারীর ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর। এককথায়, বাসাটি বসবাসের অনুপযোগী। ফুটেজে দেখা যায়, নূরজাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই নারীর মৃত্যু হয়তো আরো কয়েক দিন আগেই হয়েছে এবং মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমসূত্রে বলা হয়, ওই নারীর সন্তানদের মধ্যে এক ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব, এক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং এক মেয়ে স্থানীয় এক স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী তথা তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মা যেভাবে মারা গেলেন, তা কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে? নিশ্চয় না। আর এ ধরনের মৃত্যু কি করুণ এবং অমানবিক মৃত্যু নয়? মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হলেই যে কেউ প্রকৃত মানুষ হতে পারে নামিরপুরের এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সমাজকে দেখিয়ে দিল, বুঝিয়ে দিল। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষিত হয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া আর মানুষ হওয়া আলাদা বিষয়। পাশাপাশি এই ঘটনার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, আজকাল অনেক মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে নিজের গর্ভধারিণী মায়ের ভরণ-পোষণ দিতে চায় না, এমনকি খোঁজখবর পর্যন্ত রাখতে চায় না। এর চেয়ে অমানবিক ও দুঃখজনক বিষয় একজন মায়ের জন্য আর কী হতে পারে?

মিরপুরের এই বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে গণমাধ্যমে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক মাধ্যমে অনেককেই ওই নারীর সন্তানদের ছবি ও প্রোফাইল প্রকাশপূর্বক তাঁদের প্রতি তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, মৃত ওই মায়ের সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁদের বৃদ্ধা মায়ের যথাযথ দেখাশোনা করেননি। আবার অনেকেই ওই মায়ের সন্তানদের চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন। এদিকে নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে এরই মধ্যে আদালতে রিট হয়েছে। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মো. শরীফ সরকার এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিটটি করেন। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র (১৯৪৮) অনুযায়ী, নূরজাহান বেগমের মৌলিক অধিকার কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশনাও চাওয়া হয়েছে ওই রিটে। আর এই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে এ ঘটনায় নূরজাহান বেগমের যে ছেলে সচিব, তাঁকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।  

নূরজাহান বেগম নামের ওই মায়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারসংক্রান্ত বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এখন আলোচনায় এসেছে মা-বাবার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত আইনটি, যা পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ নামে পরিচিত, যদিও এই আইনের ব্যবহার আমাদের দেশে খুবই কম দেখা যায়। আইনটির ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং একাধিক সন্তান থাকলে প্রত্যেককে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ওই আইনে বলা হয়েছে, কোনো সন্তান তাঁর মা-বাবাকে অথবা উভয়কে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদাভাবে বাস করতে বাধ্য করতে পারবেন না। সন্তানরা তাঁদের মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন। তা ছাড়া মা-বাবাকে নিয়মিত সঙ্গ প্রদান করার কথাও বলা হয়েছে ওই আইনে। এই আইনে বলা হয়, কোনো সন্তানের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে তাঁরাও একই অপরাধে অপরাধী হবেন, তাঁদেরও এই আইনের অধীন শাস্তির আওতায় আনা যাবে। আইনটির ৩(৭) ধারায় বলা হয়, কোনো মা বা বাবা কিংবা উভয়ে সন্তানদের সঙ্গে বসবাস না করে আলাদাভাবে বসবাস করলে ওই মা বা বাবার প্রত্যেক সন্তান তাঁর প্রতিদিনের আয়-রোজগার, মাসিক আয় বা বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসংগত পরিমাণ অর্থ মা বা বাবা বা ক্ষেত্রমতে দুজনকেই নিয়মিত প্রদান করনেব। কোনো ব্যক্তি মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন অমান্য করলে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে বিচার করা যাবে মা বা বাবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে। আইনটির ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রবীণ তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ আনেন এবং সেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁরা এক লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর যদি কোন মা-বাবার সন্তান বেঁচে না থাকেন বা ভরণ-পোষণের মতো কেউ না থাকেন, সে ক্ষেত্রে মা-বাবা ভরণ-পোষণ কমিটি (সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত) তাঁদের বিধিমালা অনুযায়ী সরকারি বা বেসরকারি পরিচালিত পরিচর্যাকেন্দ্রে রেখে পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে পারে।

মিরপুরের ওই মা নিশ্চয়ই অন্যান্য মায়ের মতোই অনেক কষ্ট করে, অনেক যত্ন নিয়ে তাঁর সন্তানদের বড় করেছিলেন। সেই সন্তানরা আজ উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। অথচ তাঁরা মায়ের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি, যা দুঃখজনক। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্বে অনেকেই একতরফা সন্তানকে দায়ী করেন। দায় যে তাঁদের নেই, সেটি নয়। তবে পরিস্থিতি অনেক সময় সবার অনুকূলে না-ও থাকতে পারে। বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি মানসিক নানা ধরনেরও সমস্যা দেখা দেয় এবং তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মতো আচরণ করেন। অনেকেই মা-বাবাকে যতটা সম্ভব দূরে রাখতে চান, আবার অনেকেই মা-বাবাকে কাছে রাখতে চেয়েও তাঁদের নিজের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা গণ্ডি ছাড়তে চান না, যেখানে সন্তানদেরও কিছু করার থাকে না। তবে এ কথা ধ্রুব সত্য যে পৃথিবীর প্রত্যেক মা-ই নিজে অনেক কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে সন্তান লালন-পালন করে বড় করেন, শিক্ষিত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের অনেকেই মানুষের মতো মানুষ হতে পারেন না। বলা বাহুল্য, মা-বাবা বার্ধক্যে পৌঁছলে তাঁদের সেবা-যত্ন ও ভালোভাবে দেখভাল করা প্রত্যেক সন্তানেরই নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয় অনেক সময়। আর এটি আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র যে বৃদ্ধ বয়সে অনেক মা-বাবাই অনেক কষ্টে জীবন যাপন করেন। এ ধরনের অমানবিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে শুধু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে তোলাসহ মা-বাবার ভরণ-পোষণ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং এই অবস্থার সার্বিক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ধর্মীয়, নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষার প্রসার এবং মানবিকতার বিকাশ ঘটানো; প্রয়োজন আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করা, মা-বাবার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসা বজায় থাকা ও বজায় রাখাসহ তাঁদের দেখাশোনা করার মতো সত্যিকারের মনমানসিকতা বিদ্যমান থাকা অত্যাবশ্যক। সর্বোপরি মা-বাবার দেখভাল ও ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানের উচিত নিজের বিবেক ও নৈতিকবোধকে জাগ্রত করা, মানবিকতার প্রকাশ করা। অন্যথায় মিরপুরের ওই ঘটনার মতো ভবিষ্যতেও যে আরো অনেক ঘটনাই সমাজে ঘটতে থাকবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক : অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

নিরঞ্জন রায়

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে একটি সার্কুলার জারি করেছে, যা মেনে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের শেয়ার মালিকদের জন্য লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। সার্কুলারের শর্ত অনুযায়ী যেসব ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি, শুধু সেসব ব্যাংকই লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। একই সার্কুলারে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে শর্ত দেওয়া আছে এবং সে অনুযায়ী যেসব ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতা আছে, তারাও সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে। অর্থাৎ বাকি ৫০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড হিসেবে প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে সময় ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলারটি জারি করছে, তখন দেশের ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার, বিশেষ করে স্টক মার্কেট যারপরনাই খারাপ অবস্থায় আছে। তবে এই সার্কুলার জারির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য কি দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করা, নাকি স্টক মার্কেটে গতি আনা, তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

লভ্যাংশ ঘোষণা ব্যাংকের একটি নিজস্ব কার্যক্রম, যা আর্টিকলস অব অ্যাসোসিয়েশনের বিধান অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের নিজস্ব এখতিয়ার। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু করার থাকে না। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলধন-ভিত্তি বাড়ানোর জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে বাংলাদেশ ব্যাংককে কেন বাণিজ্যিক ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে সার্কুলার ইস্যু করতে হলো? উত্তর একটিই, তা হচ্ছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের করপোরেট দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। আমাদের দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা তাদের করার কথা নয়। একইভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট অনেক পদক্ষেপ নিতে পারে না, যা তাদের একান্তভাবে করার কথা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি নিজে থেকে তাদের মূলধন-ভিত্তি বৃদ্ধি করত এবং ব্যাংককে একটি শক্ত অবস্থানের ওপর দাঁড় করাতে পারত, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংককে আজ এ রকম সার্কুলার জারি করতে হতো না।

ব্যাংকের লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজনবাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার উভয় খাতের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করেই লভ্যাংশ প্রদান সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করেছে। কিন্তু সার্কুলারে বর্ণিত শর্তগুলো কিভাবে কাজ করবে, তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। কেননা লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের দুই হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু মূলধন একটি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরে না। মূলধন হচ্ছে কয়েকটি উপাদানের একটি, যার মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। যেমনমূলধন-সঞ্চয় অনুপাত, মোট সম্পদের পরিমাণ, সম্পদের গুণগত মান, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং ঋণ-আমানত অনুপাত। এসব উপাদান এবং পরিশোধিত মূলধন বিবেচনায় নিয়েই একটি ব্যাংক ভালো, না মন্দসেটি নির্ণয় করা হয়। সার্কুলারে লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত হিসেবে পরিশোধিত মূলধনের যে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাবে যে অনেক ভালো ব্যাংকও লভ্যাংশ প্রদান করতে পারছে না, আবার অনেক খারাপ ব্যাংকও লভ্যাংশ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বিষয়টি একটু জটিল মনে হতে পারে। তাই একটি কাল্পনিক উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

ধরা যাক, আলফা ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা। পক্ষান্তরে বেটা ব্যাংকের মোট আমানতের পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি টাকা, মোট ঋণের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। উদাহরণে ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী আলফা ব্যাংকের অবস্থা বেশ খারাপ। কেননা তাদের মূলধন-আমানতের অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশ, ঋণ-আমানতের অনুপাত ৮৪ শতাংশ। পক্ষান্তরে বেটা ব্যাংক যথেষ্ট ভালো অবস্থানে আছে। কেননা তাদের মূলধন-আমানতের অনুপাত ১২ শতাংশ, খেলাপি ঋণ ৪ শতাংশ এবং ঋণ-আমানতের অনুপাত ৮০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের শর্ত অনুযায়ী আলফা ব্যাংক খারাপ অবস্থায় থেকে লভ্যাংশ প্রদান করতে পারলেও বেটা ব্যাংক যথেষ্ট ভালো অবস্থায় থেকে লভ্যাংশ প্রদান করতে পারবে না। তা ছাড়া ব্যাসেল-তিন অনুযায়ী একটি ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় সেই ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে। সে কারণে ঢালাওভাবে দুই হাজার কোটি টাকার মূলধন সংরক্ষণের শর্ত ব্যাসেল-তিন পরিপালনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

একইভাবে ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের যে শর্ত, তা-ও কতটা কার্যকর হবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদানের শর্ত থাকায় ব্যাংকের তারল্য সংরক্ষণের ওপর চাপ কমবে এবং সেই সঙ্গে দেশে বিনিয়োগকারীদের কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যংকের লভ্যাংশ প্রদানের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারী। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা খুব সামান্য সুবিধাই পেয়ে থাকেন। শেয়ার মালিকানা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ব্যাংকের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শেয়ার মালিকানা থাকে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের দখলে। মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে। ফলে ব্যাংক যদি এক হাজার কোটি টাকার নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে, তার মধ্যে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চলে যায় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের কাছে এবং মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা যায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কাছে। অথচ এই লভ্যাংশ প্রদানের কারণে ব্যাংকের মূলধন ও রিজার্ভের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা হ্রাস পায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারটি এমন এক সময় জারি করেছে, যখন দেশের ব্যাংকিং খাত নানা রকম সমস্যায় জর্জরিত। অনেক ব্যাংক অস্তিত্বের সংকটে আছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের চাহিদা মোতাবেক অর্থ ফেরত দিতে পারছে না, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। অনেক ব্যাংক ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদান করা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি অনুমোদন করা ঋণও বিতরণ করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক সমস্যার মধ্যে আছেন। প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি অনেক ব্যাংকের লাগাতার সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর উপযুক্ত বিকল্প চিন্তা না করে জোরপূর্বক কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করার ফলে কাজের কাজ তো কিছুই হয়নি, উল্টো সমস্যা আরো জটিল হয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে আছে, যেখান থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নেওয়া অপরিহার্য। আর এই উদ্যোগের অন্যতম পন্থা হচ্ছে ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকভাবে ব্যাংকের মূলধন-ভিত্তি যদি শক্ত থাকে, তাহলে ব্যাংক যেকোনো প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যাংকের সমস্যা হলে প্রথমেই মূলধন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে আমেরিকার সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারির কারণে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এবং কয়েক বছর আগে ক্রেডিট সুইস ও সিলিকন ভ্যালি ব্যাংক বন্ধ হওয়ার কারণে ব্যাংকিং খাতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, সেখানেও ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যাসেল-তিনে যে ব্যাংকের মূলধন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো যেন প্রতিকূলতা কাটিয়ে টিকে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সার্কুলার ইস্যু করেছে, তা দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন-ভিত্তি আরো দুর্বল করবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সার্কুলারটি পুনর্বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যাতে ব্যাংকের মূলধন, রিজার্ভ ও প্রভিশন বৃদ্ধি পায়।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা