• ই-পেপার

ইসলামে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক

ইসলামী অর্থনীতির স্বরুপ ও সুফল

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামী অর্থনীতির স্বরুপ ও সুফল
সংগৃহীত ছবি

মানুষ যখন প্রথম নদীতীরবর্তী জনপদে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন থেকেই তার জীবন জড়িয়ে যায় উৎপাদন, বিনিময় এবং জীবিকার সঙ্গে। মাঠে বীজ বপন, ফসল সংগ্রহ, পশুপালন, কারিগরি দক্ষতা কিংবা দূরপথের বাণিজ্য—এসবের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তি। ইতিহাসের গতিধারায় সেই ভিত্তি ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে; কাফেলার পথ রূপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, স্বর্ণ ও রৌপ্যের মুদ্রা জায়গা করে দিয়েছে কাগুজে নোটকে, আর আজকের পৃথিবীতে অর্থের লেনদেন মুহূর্তের মধ্যে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু সভ্যতার এই দীর্ঘ অভিযাত্রায় একটি বিষয় কখনো পরিবর্তিত হয়নি—সম্পদকে ঘিরে মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্ব।


অর্থনীতির ইতিহাস মূলত সম্পদের ইতিহাস নয়; বরং সম্পদকে কেন্দ্র করে মানুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও ন্যায়বোধের ইতিহাস। তাই অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—অর্থনীতির উদ্দেশ্য কী? শুধু সম্পদ সৃষ্টি, নাকি মানবকল্যাণও?

অষ্টাদশ শতাব্দীর স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতে, মানুষের স্বাভাবিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। আধুনিক বাজার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি নির্মিত হয়েছে এই ধারণার ওপর।
কিন্তু শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী ইউরোপে যখন উৎপাদন ও সম্পদের বিস্তার ঘটছিল, তখন একই সঙ্গে বাড়ছিল বৈষম্যও। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাঁদের যৌথ গ্রন্থ ‘The Communist Manifesto’ (1848)-এ লিখেছিলেন,  ‘The history of all hitherto existing society is the history of class struggles.’ মার্ক্সের দৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু সম্পদ উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং তা ক্ষমতা, আধিপত্য এবং বৈষম্যেরও উৎস।

মানবসভ্যতার এই দীর্ঘ বৌদ্ধিক অভিযাত্রায় ইসলামী অর্থনীতি একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ধারণ করে। এটি সম্পদ সৃষ্টির গুরুত্ব অস্বীকার করে না, বৈষম্যের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে না এবং মানবকল্যাণের আলোচনাকেও এড়িয়ে যায় না; বরং এসব আলোচনার সঙ্গে আরো একটি মৌলিক বিষয় যুক্ত করে নৈতিক জবাবদিহি।

ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি এমন এক বিশ্বদৃষ্টির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সম্পদকে শুধু অর্থনৈতিক উপাদান হিসেবে দেখা হয় না; বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষ সম্পদের চূড়ান্ত মালিক নয়; বরং তার তত্ত্বাবধায়ক। মুসলিম ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ ইবনে খালদুন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমাহ’য় লিখেছেন, ‘জেনে রাখো, উপার্জন মূলত মানুষের শ্রমের মূল্য।’

শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে উচ্চারিত এই বক্তব্যে শ্রম, উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীর উপলব্ধি ফুটে ওঠে। একই গ্রন্থে তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেন, ‘জুলুম সভ্যতার ধ্বংসের পূর্বঘোষণা।’ ইবনে খালদুনের এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং সভ্যতার ইতিহাসের এক গভীর সত্যকে ধারণ করে। যখন অন্যায় বৃদ্ধি পায়, সম্পদের সুষম প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তখন শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।

ইসলামী অর্থনীতির আলোচনায় এই ন্যায়বোধ কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে আছে। কোরআন মাজিদ সম্পদ অর্জনকে বৈধতা দিয়েছে, ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করেছে এবং মানুষের অর্থনৈতিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সম্পদের সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা হাশরে ঘোষণা করেন, ‘যাতে সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’

এই আয়াত ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ইসলাম সম্পদের বিরোধিতা করে না; বরং সম্পদের একচেটিয়া আধিপত্যের বিরোধিতা করে। ব্যক্তি উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু সেই উদ্যোগ যেন সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, সে বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করে। এ কারণেই ইসলামে জাকাত শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি সম্পদের পুনর্বণ্টনের একটি সামাজিক ব্যবস্থা। সদকা শুধু ব্যক্তিগত উদারতা নয়, এটি সামাজিক সংহতির মাধ্যম। উত্তরাধিকার আইন শুধু পারিবারিক বিধান নয়, এটি সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন রোধের একটি কার্যকর নীতি।

ইসলামী অর্থনীতি কোনো ব্যাংকিং পদ্ধতির নাম নয়, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প কাঠামোর নামও নয়। এটি সম্পদ, শ্রম, উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি। এর লক্ষ্য এমন একটি সমাজ নির্মাণ, যেখানে সমৃদ্ধি থাকবে কিন্তু শোষণ থাকবে না; প্রবৃদ্ধি থাকবে কিন্তু বৈষম্য নয়; সম্পদ থাকবে; কিন্তু মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে নয়।

মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মুফতি দিদার হোসাইন
মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। তবে শর্ত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে শতভাগ সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। যেসব সূক্ষ্ম কারণে ব্যবসার হালাল মুনাফা হারাম হয়ে যেতে পারে, তন্মধ্যে একটি হলো মাপে কম দেওয়া। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’ (সুরা : আল-মুতাফি্ফফিন, আয়াত : ১-৩)

মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে কোরআনে বর্ণিত আরবি ‘ওয়াইল’ শব্দটি কঠিন শাস্তি, ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ওজনে কম দেওয়া কোনো সাধারণ পাপ নয়; বরং এটি মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। মুমিন বান্দাদের এই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’ (সুরা : আন‘আম, আয়াত : ১৫২)

তিনি আরো বলেন, ‘যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কিছু মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিয়ো আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উত্কৃষ্ট।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৫)

মানুষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মাপে কম দেওয়াও এক ধরনের জুলুম, বলা যায় পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহর নবী শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পরিমাণ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়াবে না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)

কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করায় ভয়াবহ আজাবে ধ্বংস হয়েছিল। (সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪-৯৫)

এই আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায়, ওজনে কম দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। যখন একটি সমাজে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কারচুপি এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে বরকত উঠিয়ে নেন। ফলে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো জাতি যখন মাপ ও ওজনে কম দিতে শুরু করে, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

অন্যদিকে সততা ও আমানতদারি ব্যবসার প্রাণ। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত থাকে, সে শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করে না; বরং আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভের সুসংবাদ পায়। (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

আধুনিক যুগের তাতফিফ
প্রকৃতপক্ষে ‘তাতফিফ’ শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যেকোনো ব্যাপারে যেকোনো উপায়ে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেওয়াও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, গণনার মাধ্যমে কম দেওয়া, কর্মচারীর দায়িত্বে অবহেলা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের পণ্যকে নিজের পণ্য বলে প্রচার করা, অন্যের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে গাফিলতি করা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা সেবা প্রদান না করা, অনলাইনে পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে ইচ্ছাকৃত অমিল রাখা, সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বে থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করা—এগুলোও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। (মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) কৃত, ৮/৬৯৪)

অনেকের মনে হতে পারে, আজকাল যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত আছে, তারাই তো ভালো আছে। তাদের সম্পদ দিন দিন বাড়ছে। এর উত্তর হলো বাহ্যিক চোখে যেটাকে সাফল্য মনে হচ্ছে, আদতে সেটা মোটেও সাফল্য নয়। দুনিয়ার এই যিকঞ্চিৎ লাভ (!) তো আখিরাতের বিপুল প্রাপ্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সঙ্গে এটা দুনিয়াতেও বরবাদির এক বড় কারণ হচ্ছে।

এই পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারবেও না। মৃত্যুর পর দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওজনে অণু পরিমাণ কম দিলেও তার হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রতারণা, জুলুম, মানুষের হক নষ্ট করা এবং ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২০ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ২০ জুন ২০২৬

আজ শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, ৪ মহররম, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৩ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪০ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৮ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৭ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী
সংগৃহীত ছবি

মানুষ এই পৃথিবীতে নানা সম্পর্ক, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কেউ পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে, কেউ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, আবার কেউ সম্মান ও মর্যাদার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু জীবনের এক চরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো—মৃত্যু। যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মানুষ, রাজা-বাদশাহ, ধনী-গরিব কিংবা শক্তিশালী ব্যক্তি রক্ষা পাবে না।

মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সব দুনিয়াবি সম্পর্ক ও অর্জনের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ এত ব্যস্ত ছিল, তার অধিকাংশই মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না। এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছেন মহানবী (সা.)। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পিছু পিছু (কবর পর্যন্ত) যায়—তার পরিবার-পরিজন, তার ধন-সম্পত্তি এবং তার কৃতকর্ম। তারপর দুইটি বস্তু ফিরে আসে—তার পরিবার-পরিজন এবং তার ধন-সম্পত্তি; আর একটি বস্তু তার সঙ্গেই থেকে যায়, আর তা হলো তার কৃতকর্ম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬০)

ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতা
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য মানুষ কত ত্যাগই না করে! কিন্তু মৃত্যুর পর এই প্রিয়জনদের ভালোবাসারও একটি সীমা আছে। তারা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাবে, জানাজা পড়বে এবং কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পর সবাই ফিরে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তখন কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সন্তান পাশে থাকবে না। মানুষ একাই তার রবের মুখোমুখি হবে।

ধন-সম্পদের অসারতা
পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য জীবন ব্যয় করে। কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের কোনো অংশই তার সঙ্গে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না; বরং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সফল হবে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৭)

কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। মানুষ তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক-ব্যালান্সের কিছুই সঙ্গে নিতে পারে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তার সম্পদ বলতে সে যা খেয়েছে ও শেষ করেছে, যা পরেছে ও পুরোনো করেছে, অথবা যা দান করেছে এবং তা নিজের জন্য সংরক্ষণ করেছে—এগুলোই তার প্রকৃত সম্পদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৮)

একমাত্র চিরস্থায়ী সঙ্গী—আমল
কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর আদালতে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হবে তার আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)

যদি মানুষের আমল হয় নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, মানুষের উপকার, সততা ও তাকওয়া—তবে সেই আমল কবরকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে। অন্যদিকে জুলুম, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন, গিবত, অপবাদ ও অন্যায় কাজ যদি জীবনের সঙ্গী হয়, তবে সেই আমলই কবর ও আখিরাতের শাস্তির কারণ হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)

কোরআনের আলোকে পরকালের প্রস্তুতি
মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের প্রতিটি কাজই আগামী জীবনের জন্য পুঁজি।

মৃত্যু এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে একদিন কড়া নাড়বে। সেই দিন আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা ধন-সম্পদ কেউই আমাদের সঙ্গে থাকবে না। কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে একমাত্র সঙ্গী হবে আমাদের আমল। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে ডুবে না গিয়ে এমন আমল করা, যা মৃত্যুর পরও তার জন্য নূর, শান্তি এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের মাধ্যমে কবর ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।