• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৮ জুন ২০২৬

মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ

মুফতি দিদার হোসাইন
মাপে কম দেওয়া ভয়াবহ অপরাধ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। তবে শর্ত হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে শতভাগ সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। যেসব সূক্ষ্ম কারণে ব্যবসার হালাল মুনাফা হারাম হয়ে যেতে পারে, তন্মধ্যে একটি হলো মাপে কম দেওয়া। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা ওজনে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদেরকে মেপে বা ওজন করে দেয় তখন কম দেয়।’ (সুরা : আল-মুতাফি্ফফিন, আয়াত : ১-৩)

মাপে কম দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে কোরআনে বর্ণিত আরবি ‘ওয়াইল’ শব্দটি কঠিন শাস্তি, ধ্বংস অথবা জাহান্নামের একটি উপত্যকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ওজনে কম দেওয়া কোনো সাধারণ পাপ নয়; বরং এটি মারাত্মক একটি কবিরা গুনাহ। মুমিন বান্দাদের এই গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’ (সুরা : আন‘আম, আয়াত : ১৫২)

তিনি আরো বলেন, ‘যখন পরিমাপ পাত্র দ্বারা কাউকে কিছু মেপে দাও, তখন পরিপূর্ণ মাপে দিয়ো আর ওজন করার জন্য সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করো। এ পন্থাই সঠিক এবং এরই পরিণাম উত্কৃষ্ট।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩৫)

মানুষকে পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মাপে কম দেওয়াও এক ধরনের জুলুম, বলা যায় পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্যতম অপরাধ। এই অপরাধের ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহর নবী শুআইব (আ.) তাঁর জাতিকে বারবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা পরিমাণ ও ওজন ন্যায়সংগতভাবে পূর্ণ করবে। মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দেবে না এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে বেড়াবে না।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৮৫)

কিন্তু তারা সে নির্দেশ অমান্য করায় ভয়াবহ আজাবে ধ্বংস হয়েছিল। (সুরা : হুদ, আয়াত : ৯৪-৯৫)

এই আয়াতগুলো দ্বারা বোঝা যায়, ওজনে কম দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় মারাত্মক পর্যায়ের অপরাধ। যখন একটি সমাজে প্রতারণা, মাপে-ওজনে কারচুপি এবং মানুষের হক নষ্ট করার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে বরকত উঠিয়ে নেন। ফলে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো জাতি যখন মাপ ও ওজনে কম দিতে শুরু করে, তখন তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট এবং শাসকদের জুলুম চাপিয়ে দেওয়া হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

অন্যদিকে সততা ও আমানতদারি ব্যবসার প্রাণ। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত থাকে, সে শুধু মানুষের আস্থা অর্জন করে না; বরং আখিরাতে নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভের সুসংবাদ পায়। (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)

আধুনিক যুগের তাতফিফ
প্রকৃতপক্ষে ‘তাতফিফ’ শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং যেকোনো ব্যাপারে যেকোনো উপায়ে প্রাপককে প্রাপ্য থেকে কম দেওয়াও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, গণনার মাধ্যমে কম দেওয়া, কর্মচারীর দায়িত্বে অবহেলা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি না দেওয়া, ভেজাল পণ্য বিক্রি করা, নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে প্রচার করা, পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, অন্যের পণ্যকে নিজের পণ্য বলে প্রচার করা, অন্যের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে গাফিলতি করা, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা সেবা প্রদান না করা, অনলাইনে পণ্যের ছবি ও বাস্তব পণ্যের মধ্যে ইচ্ছাকৃত অমিল রাখা, সরকারি বা বেসরকারি দায়িত্বে থেকে জনগণের অধিকার খর্ব করা—এগুলোও তাতফিফের অন্তর্ভুক্ত। (মারেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) কৃত, ৮/৬৯৪)

অনেকের মনে হতে পারে, আজকাল যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত আছে, তারাই তো ভালো আছে। তাদের সম্পদ দিন দিন বাড়ছে। এর উত্তর হলো বাহ্যিক চোখে যেটাকে সাফল্য মনে হচ্ছে, আদতে সেটা মোটেও সাফল্য নয়। দুনিয়ার এই যিকঞ্চিৎ লাভ (!) তো আখিরাতের বিপুল প্রাপ্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সঙ্গে এটা দুনিয়াতেও বরবাদির এক বড় কারণ হচ্ছে।

এই পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকবে না, থাকতে পারবেও না। মৃত্যুর পর দাঁড়াতে হবে আল্লাহর সামনে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওজনে অণু পরিমাণ কম দিলেও তার হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের প্রতারণা, জুলুম, মানুষের হক নষ্ট করা এবং ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২০ জুন ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক
আজকের নামাজের সময়সূচি, ২০ জুন ২০২৬

আজ শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, ৪ মহররম, ১৪৪৮।
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু ১২টা ০৩ মিনিটে।

আসরের সময় শুরু ৪টা ৪০ মিনিটে।

মাগরিব ৬টা ৫২ মিনিটে।

এশার সময় শুরু ৮টা ১৮ মিনিটে।

আগামীকাল ফজর শুরু ৩টা ৪৬ মিনিটে 

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত ৬টা ৪৭ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় ৫টা ১১ মিনিটে।

সূত্র : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী

মুফতি ওমর বিন নাছির
মৃত্যু এমন নির্মম যাত্রা : আমলই যার একমাত্র সঙ্গী
সংগৃহীত ছবি

মানুষ এই পৃথিবীতে নানা সম্পর্ক, স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পদের মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কেউ পরিবার-পরিজনের সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে, কেউ সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, আবার কেউ সম্মান ও মর্যাদার পেছনে ছুটে চলে। কিন্তু জীবনের এক চরম ও অবশ্যম্ভাবী সত্য হলো—মৃত্যু। যে মৃত্যুর হাত থেকে কোনো মানুষ, রাজা-বাদশাহ, ধনী-গরিব কিংবা শক্তিশালী ব্যক্তি রক্ষা পাবে না।

মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষের সব দুনিয়াবি সম্পর্ক ও অর্জনের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ পায়। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই পৃথিবীতে যার জন্য মানুষ এত ব্যস্ত ছিল, তার অধিকাংশই মৃত্যুর পরে আর কোনো কাজে আসে না। এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছেন মহানবী (সা.)। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বস্তু মৃত ব্যক্তির পিছু পিছু (কবর পর্যন্ত) যায়—তার পরিবার-পরিজন, তার ধন-সম্পত্তি এবং তার কৃতকর্ম। তারপর দুইটি বস্তু ফিরে আসে—তার পরিবার-পরিজন এবং তার ধন-সম্পত্তি; আর একটি বস্তু তার সঙ্গেই থেকে যায়, আর তা হলো তার কৃতকর্ম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৬০)

ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কের নির্মম বাস্তবতা
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য মানুষ কত ত্যাগই না করে! কিন্তু মৃত্যুর পর এই প্রিয়জনদের ভালোবাসারও একটি সীমা আছে। তারা মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাবে, জানাজা পড়বে এবং কবর পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। কিন্তু কবরের মাটিতে শুইয়ে দেওয়ার পর সবাই ফিরে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে তখন কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা সন্তান পাশে থাকবে না। মানুষ একাই তার রবের মুখোমুখি হবে।

ধন-সম্পদের অসারতা
পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ সম্পদ অর্জনের জন্য জীবন ব্যয় করে। কখনো বৈধভাবে, কখনো অবৈধভাবে সম্পদ সঞ্চয় করে। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদের কোনো অংশই তার সঙ্গে যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের আমার নিকটবর্তী করতে পারবে না; বরং যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তারাই সফল হবে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩৭)

কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। মানুষ তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ, জমি, বাড়ি, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক-ব্যালান্সের কিছুই সঙ্গে নিতে পারে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো উত্তরাধিকারীদের হাতে চলে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ বলে, আমার সম্পদ, আমার সম্পদ। অথচ তার সম্পদ বলতে সে যা খেয়েছে ও শেষ করেছে, যা পরেছে ও পুরোনো করেছে, অথবা যা দান করেছে এবং তা নিজের জন্য সংরক্ষণ করেছে—এগুলোই তার প্রকৃত সম্পদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৯৫৮)

একমাত্র চিরস্থায়ী সঙ্গী—আমল
কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং আল্লাহর আদালতে মানুষের একমাত্র সঙ্গী হবে তার আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে, আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা-ও দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)

যদি মানুষের আমল হয় নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, মানুষের উপকার, সততা ও তাকওয়া—তবে সেই আমল কবরকে আলোকিত করবে এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হবে। অন্যদিকে জুলুম, মিথ্যা, সুদ, ঘুষ, হারাম উপার্জন, গিবত, অপবাদ ও অন্যায় কাজ যদি জীবনের সঙ্গী হয়, তবে সেই আমলই কবর ও আখিরাতের শাস্তির কারণ হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সে-ই, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৯)

কোরআনের আলোকে পরকালের প্রস্তুতি
মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন চিন্তা করে, সে আগামী দিনের জন্য কী প্রেরণ করেছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আজকের প্রতিটি কাজই আগামী জীবনের জন্য পুঁজি।

মৃত্যু এমন এক সত্য, যা প্রতিটি মানুষের দুয়ারে একদিন কড়া নাড়বে। সেই দিন আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা ধন-সম্পদ কেউই আমাদের সঙ্গে থাকবে না। কবরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে একমাত্র সঙ্গী হবে আমাদের আমল। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে ডুবে না গিয়ে এমন আমল করা, যা মৃত্যুর পরও তার জন্য নূর, শান্তি এবং জান্নাতের পথপ্রদর্শক হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমলের মাধ্যমে কবর ও আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
গ্রাফিক ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা এবং বিজ্ঞাপনের প্রসারের ফলে গ্রাফিকস ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় পেশায় পরিণত হয়েছে। অসংখ্য তরুণ-তরুণী এ পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। লোগো, ব্যানার, পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপনচিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে গ্রাফিকস ডিজাইনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

তবে একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শুধু আয়ের উৎস হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আয় হালাল কি না, কাজটি শরিয়তসম্মত কি না এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুকূল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি, মানুষের ছবি কিংবা নারীদের ছবি ব্যবহার করে ডিজাইন তৈরি ও বিক্রির বিধান সম্পর্কে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। তাই এর বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার কর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’(সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
এ দুটি আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুসলমানের উপার্জন যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি তার কাজও গুনাহ ও হারামের সহযোগী হওয়া যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৪)

এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিস প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। একদল আলেমের মতে, ডিজিটাল ছবি কাগজে আঁকা স্থায়ী চিত্রের মতো নয়; বরং এটি আলো ও পিক্সেলের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিচ্ছবি। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিজিটাল ছবি ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকদল আলেম মনে করেন, ডিজিটাল হোক বা অঙ্কিত হোক—সজীব প্রাণীর ছবি তৈরির মধ্যে চিত্র নির্মাণের অর্থ বিদ্যমান থাকে। তাই তারা এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পক্ষে মত দেন। তাই ফটোগ্রাফিকে নিরঙ্কুশ বৈধ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজনের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। (তাফসিরে আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)

গ্রাফিকস ডিজাইন পেশার বিধান
গ্রাফিকস ডিজাইন একটি মাধ্যম। এর বিধান নির্ভর করবে এর বিষয়বস্তু ও ব্যবহারের ওপর।

যেসব ডিজাইন বৈধ
১. ইসলামী পোস্টার ও দাওয়াহমূলক ডিজাইন
২. ক্যালিগ্রাফি ও আরবি নকশা
৩. প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, ফুল ইত্যাদির ডিজাইন
৪. ব্যাবসায়িক লোগো ও ব্যানার
৫. বইয়ের প্রচ্ছদ ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট
৬. অনুমোদিত ডিজিটাল আইকন ও গ্রাফিক উপাদান
এসব ক্ষেত্রে গ্রাফিকস ডিজাইন করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ বলে গণ্য হবে।

যেসব ডিজাইন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক

১. নারীদের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি
২. অশ্লীল বা অনৈতিক কনটেন্ট ডিজাইন
৩. হারাম পণ্য বা কার্যক্রমের প্রচারণা
৪. ধর্মবিরোধী বা শিরকপূর্ণ প্রতীক প্রচার
৫. গুনাহের কাজে সহায়ক ডিজাইন

এসব কাজ গুনাহের সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ। তাই তাকওয়ার দাবি হলো অপ্রয়োজনীয় প্রাণীর ছবিনির্ভর ডিজাইন থেকে দূরে থাকা এবং বিকল্প ক্ষেত্র বেছে নেওয়া। বিশেষত ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, ইনফোগ্রাফিক, শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও ব্যাবসায়িক ডিজাইনের ক্ষেত্রগুলো একজন মুসলিম ডিজাইনারের জন্য অধিক নিরাপদ ও প্রশংসনীয়। (ফাতাওয়ায়ে শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক আকিফি, ১/৩০৫)

একজন মুসলিম গ্রাফিকস ডিজাইনারের করণীয়
১. কাজের বিষয়বস্তু শরিয়তসম্মত কি না তা যাচাই করা।
২. অশ্লীলতা ও হারাম বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৩. নারীদের ছবিনির্ভর ডিজাইন এড়িয়ে চলা।
৪. ইসলামী ও কল্যাণকর কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষতা ব্যবহার করা।
৫. সন্দেহপূর্ণ আয়ের ক্ষেত্র থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা।
৬. আল্লাহভীতি ও তাকওয়াকে পেশাগত জীবনের মূলনীতি বানানো।

গ্রাফিকস ডিজাইন বর্তমান যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পেশা। মূলত এটি একটি মাধ্যম, যার বিধান নির্ভর করে এর ব্যবহার ও বিষয়বস্তুর ওপর। শরিয়তসম্মত বিষয় নিয়ে ডিজাইন করা এবং তার মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ। তবে প্রাণীর ছবি ও ডিজিটাল চিত্রের ব্যাপারে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ জন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ ও সন্দেহ রয়েছে, সেগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা একজন মুমিনের তাকওয়ার পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বিন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫২)

অতএব, একজন মুসলিম ডিজাইনারের উচিত এমন ক্ষেত্র বেছে নেওয়া, যেখানে তার দক্ষতা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, উপার্জন হবে হালাল এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক অর্জন, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।