ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার আটরশি বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ওরস। দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত সমবেত হয়েছেন। দুই হাজার চুলায় ভক্তদের খাবারের জন্য ২৪ ঘণ্টা চলছে রান্না, রান্নার কাজে নিয়োজিত রয়েছে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক। প্রতি ঘণ্টায় রান্না করা হচ্ছে ৫ লাখ মানুষের খাবার।
ওরসে আসা ভক্তদের জন্য ২৪ ঘণ্টাই চলছে রান্না।
সারি সারি সাজানো চুলা, চলছে রান্না। বিশাল জায়গাজুড়ে দুই হাজার চুলা জ্বলছে একযোগে। দিন রাত ২৪ ঘণ্টা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্তদের জন্য চলছে রান্না, রান্নার কাজে নিয়োজিত রয়েছে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক।
কেউ ভাত, কেউ ডাল, কেউবা মাংস রান্না করছেন।
শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর থেকে রান্নার আয়োজন শুরু হয়েছে, একনাগাড়ে চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত এ আয়োজন। প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ লাখ নারী-পুরুষ ভক্তের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। খাবারের মধ্যে রয়েছে ভাত, আলু দিয়ে ডালের লাবড়া, গরু, খাসি, মুরগি ও দুম্বার মাংস।
মুসলমান সম্প্রদায়ের ভক্তরা ছাড়াও অন্য ধর্মের মানুষের জন্য রয়েছে আলাদা রান্নার আয়োজন।
রান্নার পর সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে খাবার। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট জায়গায়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে ভক্তরা মাটির প্লেটে নিচ্ছেন তাদের খাবার। খাওয়া শেষে মাটির প্লেট ধুয়ে রাখছেন নির্দিষ্ট জায়গায়।
এত ভক্তের সমাগম হলেও নেই কোনো বিশৃঙ্খলা।
ওরসে রান্নার কাজে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক মো. নাছিরউদ্দিন বলেন, ‘আব্বার আব্বা বেঁচে থাকতে এখানকার পাকশালায় ওরসের সময় রান্না করতেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর আমি এই দায়িত্ব পালন করছি। দীর্ঘদিন ধরে ওরসের চার দিন রান্না করে থাকি।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু আমি নই, এখানে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক আছে যারা রান্নার কাজে নিয়োজিত। দুই হাজার চুলায় রান্না করা হয়ে থাকে। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ লাখ ভক্তদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ২৪ ঘণ্টাই এখানে রান্না করা হয়।
স্বেচ্ছাসেবক শাহিনুর রহমান শাহিন বলেন, ‘মুসলমান সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের খাবারের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে ভাত, ডাল দিয়ে আলুর লাবড়া, গরু, খাসি, মুরগিসহ দুম্বাও রান্না করা হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ওরসের সময় পাকশালায় কাজ করি। খুবই ভালো লাগে, মনে শান্তি পাই। এখানে কাজ করলে কোনো কষ্ট মনে হয় না, খুবই আনন্দ পাই। যতদিন বেঁচে আছি এখানে ভক্তদের জন্য এই কাজ করে যাব।’
আরেক স্বেচ্ছাসেবক নাজমুল হাসান বলেন, ‘ওলি আল্লাহদের খেদমতে মনের ময়লা দূর হয়, নবীর মহব্বত সৃষ্টি হয়। এই মহব্বত পাওয়ার জন্যই দরবার শরীফে হাজারো মানুষ খেদমত করে থাকে।’
ওরস উপলক্ষে কয়েক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সড়ক, রেল ও নৌ পথে বিভিন্ন যানবাহনে চেপে আশেকান ও জাকেরানরা সমবেত হয়েছেন। ওরসে আসা সবার জন্য তবারকের পাশাপাশি রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা। প্রতিদিন ফরজ আমলের পাশাপাশি পবিত্র কোরআন তেলোয়াত, জিকির আজগার মোরাকাবা ওয়াজ নসিহত ও সুন্নত ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদত চলছে।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম শাহিন জানান, শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ফজর নামাজের পর ফাতেহা শরীফ পাঠ ও তরিকতের আমল পালনের মধ্য দিয়ে ওরসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন ফরজ আমলের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, জিকির আজগার, মোরাকাবা-মোশাহেদা, ওয়াজ নসিহত, ওয়াজ মাহফিল এবং সুন্নাত এবাদতের পাশাপাশি নফল এবাদত চলছে। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ওরসে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক ভক্ত-মুরিদান অংশ নিয়েছেন।
বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের বৃহত্তর ফরিদপুরের কর্মী প্রধান মো. কবিরুল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, ‘প্রতিবছরের মতো এবছরও লাখো আশেকান-জাকেরান, ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা বিশ্ব দরবার শরিফে উপস্থিত হয়েছেন। ওরসে আসা সবার জন্য তবারকের ব্যবস্থা, রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা ও বিভিন্ন যানবাহন পার্কিংয়ের জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা।’
তিনি আরো্ জানান, বিশ্ব অলি হজরত মাওলানা শাহ সুফি খাজাবাবা ফরিদপুরী (কু ছে আ) কেবলাজান ছাহেবের স্থলাভিষিক্ত পীরজাদা মাহফুজুল হক মুজাদ্দেদী উরস চলাকালীন চার দিনই আশেকান জাকেরানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রদান করবেন। আগামী মঙ্গলবার ফজর নামাজ পর শাহসুফি ফরিদপুরী (কু ছে আ) রওজা জিয়ারত করা হবে। এরপর বিশ্ব শান্তি কামনায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে চার দিনের এই ওরস শরীফ।
শনিবার ফজর নামাজের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ওরস মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী মঙ্গল কামনা করে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে।