দেশের অন্যতম ও প্রাচীনতম শিক্ষা বিদ্যাপিঠ ‘বগুড়া জিলা স্কুল’। ১৮৫৩ খিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় কবি সাহিত্যক, লেখক, বিচারপতি, বিচারক, সচিব ও রাজনীতিকসহ দেশের অসংখ্য খ্যাতিমান ব্যক্তির পাঠশালা ছিল। শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথা সংলগ্ন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান।
বিদ্যালয়ের প্রাচীর ঘেষে উত্তর-পূর্ব কোনায় রয়েছে পাবলিক টয়লেট।
প্রতিনিয়ত দূর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি উপচে উঠে বিদ্যালয়ের গেটে পারাপার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। টয়লেটের কোনায় সিগারেট বিক্রির নামে ছোট টেবিল-চেয়ারে সাজানো রয়েছে একটি দোকান। মূলতঃ এখান থেকেই সরবরাহ হয় মাদক ও অনৈতিক কর্মকান্ডের খদ্দের। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভাকে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বিশেষ কোনো সুবিধার বিনিময়ে এখনো এই টয়লেটটি অপসারণ করা হচ্ছে না।
পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ১৫ বছর আগে ঐতিহ্যবাহী জিলাস্কুলের কোলঘেষে নির্মাণ করা হয় এই পাবলিক টয়লেট। এরপর নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে বেসরকারিভাবে এক ব্যক্তিকে লিজ দেয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। বছরে একবার টাকা আদায় ছাড়া টয়লেটের মূল নিয়ন্ত্রণ লিজগ্রহীতা ব্যক্তির কাছে।
পথচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের অভিযোগ, লিজ দেওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয় কেন্দ্রিক পুরো পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। টয়লেটটি অপসারণের দাবিতে বেশ কিছুদিন যাবৎ জেলা প্রশাসনকে অবগত করে আসছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন টয়লেট কোনায় আসে মাদকসেবন ও অনৈতিক কাজের জন্য আসা বিশেষ শ্রেণির মানুষ। টয়লেট ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে নগদ টাকা আদায়কারী চেয়ারে বসা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বললেই মিলবে সবকিছু। কখনও গভীর রাত ও ভোরে টয়লেটেই মাদকসেবী ও অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য আগত বিশেষ শ্রেণির মানুষদের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের সামনে টয়লেটের দূর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি জমে আছে। কেবল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকই নয়, চলাচলকৃত সকল পথচারী বিষয়টি নিয়ে জেলা ও পৌর প্রশাসনকে কটাক্ষ করে কথা বলছে। সরকারি আজিজুল হক কলেজ, শাহ সুলতান কলেজ, বগুড়া সরকারি কলেজ, মজিবুর রহমান মহিলা কলেজের কয়েকজন শিক্ষক জানান, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় যে, ঐতিহ্যবাহী শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ বগুড়া জিলা স্কুলের সামনে এমন নোংলা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ও ডাচবাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তারাসহ ব্যবসায়ী সমিতির একাধিক নেতা জানান, নিশ্চয়ই এখানে অন্য কোনো মাসোহারা, দূর্ণীতি অথবা অসৎ বিষয় রয়েছে। যে কারণে বিদ্যালয় সংলগ্ন এই টয়লেটটি অপসারণ করা হচ্ছে না।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) বগুড়ার আহ্বায়ক ডা. আফসারুল হাবীব রোজ এবং আদালতের সহকারি পাবলিক পসিকিউটর (এপিপি) এ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা জিয়ন জানান, জিলা স্কুলের সামনে এমন পরিবেশ নিঃসন্দেহে অস্বাস্থ্যকর এবং বে-আইনি। জেলা ও পৌর প্রশাসনের উচিত, নিজেদের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে দ্রুত টয়লেটটি অপসারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
নবম ও দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী জানান, একদিকে স্কুল গেটের সামনে দূর্গন্ধযুক্ত নোংরা-ময়লা পানি, অন্যদিকে টয়লেটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের ব্যবসা। এরপর আবার বে-আইনিভাবে টাকা নিয়ে বিদ্যালয়ের সামনে গাড়ি রাখাসহ অস্থায়ী দোকান বসানোয় ময়লা-আবর্জনার স্তুপ পড়ে থাকে।
অভিভাবকরা জানান, বিদ্যালয়ের সামনে এরকম পরিবেশ সত্যিই দুঃখজনক।
সদ্য অবসরপ্রাপ্ত দুই প্রধান শিক্ষক তহমিনা বেগম এবং ড্যানিয়েল তাহেরসহ কর্মরত ৪ শিক্ষক জানান, এ বিষয়ে গত বছরের অক্টোবরেজেলা প্রশাসক ও পৌরসভার প্রশাসককে একটি চিঠি দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান গেটের পাশেই পাবলিক টয়লেটটি সকল ধরনের পরিবেশ খারাপ করে ফেলছে। ব্যাহত হচ্ছে পাঠদানসহ স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রম। দ্রুত টয়লেটটি অপসারণ করা প্রয়োজন।
বগুড়া জেলা প্রশাসক ও বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হোসনা আফরোজা জানান, শিক্ষকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি পৌর প্রশাসককে জানানো হয়েছে। তিনিই যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। পৌরসভার প্রশাসক মাসুম আলী বেগ বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, জানালেও টয়লেট অপসারন সম্পর্কে পরিস্কার করে কিছু জানাননি।