তারা সবাই শিক্ষার্থী। তাই শুক্রবার এলেই তারা বেরিয়ে পড়েন কিছু মানুষের খোঁজে। পথে প্রান্তরে, সড়ক-মহাসড়কে, হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট এলাকায় ঘুরতে থাকেন সেই সব মানুষের খোঁজে। সমাজে চরম অবহেলায় যাঁদের দিন কাটে, সেই সব মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ খুঁজে বের করেন।
তাদের জীবনের একটি পরম লক্ষ্য হচ্ছে পথের ভারসাম্যহীন মানুষ পথ থেকে তুলে নেওয়া। পরিবার বাস্তুচ্যুত এই মানুষগুলো কারো মমতা পায় না। যে মানুষদের দিকে একবারে বেশি কেউ তাকায় না, যাদেরকে কেউ চায় না, সেইসব ভবঘুরেদের পরম যত্নে ঘরে তুলে নেয়াই তাদের নেশা।
বরিশাল নগরীর উপকণ্ঠ চরবাড়িয়ার ইউনিয়নের তালতলীর একটি ভাড়াটিয়া বাসায় তারা গড়ে তুলেছেন আশ্রয়কেন্দ্র।
নাম দিয়েছেন ‘আদর্শ নিবাস বৃদ্ধাশ্রম’। করোনার সময় থেকে শুরু হওয়া সেই পরিবারে এখন সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। তাদের মধ্যে নয়জন নারী আর দুইজন পুরুষ। যারা তাদের পরিচয় কেউ বলতে পারছেন না। পারছেন না নিজেদের ক্ষুধার কথা কাউকে বলতে, না পারছেন বেঝাতে। কারণ সেই অনুভূতিটুকু তাদের নেই।
বিভিন্ন স্থান থেকে ১১ জন বেওয়ারিশ মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধাদের আশ্রয় তারা দিয়েছেন। কি নেই সেই আশ্রয়কেন্দ্রে। বেওয়ারিশদের মুখে তারা শুধু অন্নই তুলে দেন, তাদের গোসল থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা সবকিছুই তারা নিশ্চিত করেন।
বেওয়ারিশ বৃদ্ধাদের নিয়ে তারা ঈদ উদযাপন করেছেন।
নেপথ্যে নায়ক চারজন
এই তারা হচ্ছেন, মো. তাজুল ইসলাম আশ্রাফী, মো. হেদায়েতুল্লাহ, মো. হুজাইফা তামিমী এবং মো. রহমতুল্লাহ। তারা সবাই বরিশাল নগরীর বাজার রোডস্থ জামিয়া আরাবিয়া খাজা মঈদ উদ্দিন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সেখান থেকে হাফেজি পড়া শেষ করেছেন। তাদের সহযোগী হয়েছেন একই মাদ্রাসার আরো ৫ জন। সহযোগির তালিকায় আরো রয়েছেন, হাজি ওমর শাহ বটতলা মাদ্রাসার ৩ জন, জামিয়া ইসলামিয়া মাহমুদিয়া মাদ্রাসার ৩ জন এবং জামিয়া হোসাইনিয়া নথুল্লাবাদ মাদ্রাসার ২ জন শিক্ষার্থী। তারা সবাই বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনার কাজে যুক্ত করেছেন। এই ১৭ শিক্ষার্থীর টিউশনির টাকায় পরিচালিত হচ্ছে এই বৃদ্ধাশ্রম। কিন্তু দিনদিন বেওয়ারিশদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তারা বৃদ্ধাশ্রমটি পরিচালনা করতে গিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। তাই আশ্রমটি পরিচালনার এর পর্ষদ বাড়িয়ে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট করা হয়। সেখানে দুই গৃহিনীসহ অপর ৮জনই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। যারা প্রতিষ্ঠানটি চালানোর জন্য আর্থিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। বরিশাল জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে আশ্রমের পাশে দাঁড়ান।
ঈদ উদযাপন
আশ্রমের ১১জন কারও মা, কারও বাবা। কিন্তু আজ আর কেউ নেই এদের জন্য। কেউ রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিল, কেউ হারিয়ে ফেলেছে নিজের ঠিকানা। জীবনের এই শেষবেলায় এরা রয়ে গেছে এক অনিশ্চিত আশ্রয়ে, স্মৃতি আর বাস্তবতার দোলাচলে। তাদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোর জন্যই শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র প্রয়াস। ঈদের দিনে ‘আদর্শ নিবাস বৃদ্ধাশ্রম’ শিক্ষার্থীরা আয়োজন করেছিলেন ভালোবাসার এক ঈদ উৎসব। সকাল শুরু হয়েছিল সেমাই-পায়েসের মিষ্টি স্বাদে, দুপুরে ছিল সুস্বাদু তেহারি, আর রাতে গরুর কলিজা ভুনার আয়োজন। কেক কেটে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ারও আয়োজন ছিল। শুধু খাবার নয়, ঈদের পূর্ণতা দিতে দাদিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ঈদ সালামি।
ঈদ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বরিশাল বিভাগের কোথায় এই ধরনের বেওয়ারিশদের নিয়ে বৃদ্ধাশ্রম নেই। শিক্ষার্থীরা এটি গড়ে তুলে অনণ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তারা টিউশনির টাকায় আশ্রমটি পরিচালনা করছেন।
তিনি আরো বলেন, অবেগ-অনুভূতিহীন ১১জন নারী-পুরুষকে নিয়ে ঈদ উদযাপিত হয়েছে। যাদের নিয়ে এই আয়োজন তারা শুধু খাবারের স্বাদ নিয়েছেন। আর আমরা যারা অংশ নিয়েছি তারা গভীর অনুভূতি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেছিল। যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
যেভাবে পথচলা শুরু
অন্যতম উদ্যোক্তা তাজুল ইসলাম আশ্রাফী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কালীন প্রতিদিনই ভবঘুরেদের সাইকেলে করে বরিশালের বিভিন্ন স্থানে খাবার বিতরণ করতাম। তখন রাস্তার এই অভিভাবকহীন বৃদ্ধদের মানবেতর অবস্থা দেখে হৃদয় কেঁপে উঠতো। সেখান থেকে প্রথমে পোর্ট রোডের এক আধাভবঘুরে বৃদ্ধকে নিয়ে বিভিন্ন আশ্রমে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিভিন্ন আশ্রমের সীমিত জায়গা বা অন্যান্য সমস্যার কারণে কেউ নিতে রাজি হননি। তখনই চার শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নেন যে নিজেরাই আশ্রম গড়বেন।
আরেক উদ্যোক্তা হেদায়েতুল্লাহ বলেন, প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন এসব অসহায় ব্যক্তিদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করতে, কিন্তু আমরা ব্যর্থ হই। পরবর্তীতে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে এক ছাদের নিচে এই অজ্ঞাত, অসহায় ও গৃহহীন ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী ২০২১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বরিশালের নতুল্লাবাদের হাজেরা খাতুন স্কুলের পাশে একটি ভাড়া বাড়িতে বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বাসা ভাড়া বেশি হওয়া আমরা পরবর্তিতে শহরের উপকণ্ঠ তালতলীতে কম টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি।
হুজাইফা তামিমী বলেন, নিবাসে একজন নারী রান্না থেকে শুরু করে সকল কাজ করছেন। তাকে মাসে একটি নিদৃষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হচ্ছে। নিবাসের তিনজন নারী একটি খিটখিটে স্বভাবের। তাদের আমরা প্রতিদিন পর্যায়ক্রমে গোসল করাই। তিনবেলা খাবার ওই নারীই তাদের খাইয়ে দেন। বাসা ভাড়া ছয় হাজার দুইশত টাকা। খাবার খরচ মিলিয়ে কম করে প্রতিমাসে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা প্রায় ৩০ হাজার টাকা দেন। বাকিটা পরিষদের নিকট আত্মীয়দের কাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়।
তিনি আরো বলেন, পলাশপুরের অটোরিকশা চালক সাইফুল ইসলাম বিনা ভাড়ায় বৃদ্ধদের হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আশ্রমে দিয়ে যান।
মো. রহমতুল্লাহ বলেন, বৃদ্ধাশ্রমটি ভাড়াকৃত স্থানে পরিচালিত হচ্ছে। যা আর্থিকভাবে বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদেরও মতো শিক্ষার্থীদের টিফিনের টাকার পাশাপাশি সীমিত ডোনেশনের মাধ্যমে জোগাড় করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। এই মহান উদ্যোগে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা এগিয়ে এলে এই প্রতিষ্ঠানটি আরও সুসংগঠিত ও টেকসই হয়ে উঠবে।