দেশে পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে সরকার। চলতি মাস থেকেই নতুন দাম কার্যকর হবে। বুধবার (৩ জুন) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। খবর বিবিসি
এই ঘোষণার পর সাধারণ গ্রাহকের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, নতুন মূল্যহারে তাদের বিল কত বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, আপনার বাসায় প্রতি মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। কারণ বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ করা হয় মূলত এই ইউনিটের ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে, আবাসিকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহার করেছে সরকার।
- বিদ্যুতের ইউনিট বলতে কী বোঝায়?
বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো 'ইউনিট'। সহজভাবে বলতে গেলে, এক ইউনিট বিদ্যুৎ মানে ঘণ্টায় এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার। অর্থাৎ, আপনার বাসায় যদি এক হাজার ওয়াট ক্ষমতার কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র এক ঘণ্টা চলে, তাহলে সেটি এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করবে। একইভাবে, ১০০ ওয়াটের একটি বাল্ব ১০ ঘণ্টা জ্বললে কিংবা ৫০ ওয়াটের একটি ফ্যান ২০ ঘণ্টা চললেও সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এই ইউনিটের হিসাবের ভিত্তিতে গ্রাহকের বিল নির্ধারণ করে থাকে। আপনি কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তা জানতে হলে প্রথমে মিটারের রিডিং বুঝতে হবে। বিদ্যুৎ মিটারের ডিসপ্লেতে মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ কিলোওয়াট-ঘণ্টা হিসেবে দেখানো হয়। যত বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, মিটারের সংখ্যা তত বাড়তে থাকবে। আর মাস শেষে বর্তমান রিডিং থেকে আগের রিডিং বাদ দিয়ে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার বা ইউনিট নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, যদি গত মাসে মিটারের রিডিং ১২ হাজার ২০০ ইউনিট থাকে এবং বর্তমানে তা ১২ হাজার ৫০০ ইউনিট দেখায়, তাহলে ওই সময়ে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ ৩০০ ইউনিট।
তবে ঠিক কত টাকা বিল আসবে, শুধু মিটার দেখে তা সবসময় নির্ভুলভাবে বলা যায় না। কারণ ইউনিটের খরচ ছাড়াও বিলে মিটার ভাড়া, ভ্যাট বা অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ যুক্ত থাকতে পারে। যদিও সরকার বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণার এক দিনের মাথায় আবার দাম পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রান্তিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছিলো বিদ্যুৎ বিভাগ। তার প্রেক্ষিতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে বাড়তি বিলের চাপ থেকে রেহাই দিতে দুই শ্রেণির গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিইআরসি জানিয়েছে, আবাসিক লাইফ লাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং আবাসিক প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না হয়ে পূর্বের মূল্যহার বহাল থাকবে। অর্থাৎ, লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি আগের চার টাকা ৬৩ পয়সাই থাকবে। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের মূল্যও আগেরটি থাকবে, পাঁচ টাকা ২৬ পয়সা। বাকি ধাপগুলোর দাম ৩ জুন বিইআরসি ঘোষিত নতুন মূল্যহার অনুযায়ী-ই থাকবে।
এ ছাড়া ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের ক্ষেত্রে দাম হবে আট টাকা ৫০ পয়সা। ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই হার নয় টাকা ৫৯ পয়সা। ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে নয় টাকা ৬২। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের গুণতে হবে ১৫ টাকা ১ পয়সা। আর যেসব গ্রাহক মাসে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।
- এ মাসে আপনার বিদ্যুৎ বিল কত আসবে?
ধরা যাক, এতদিন আপনার মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকা আসতো। কিন্তু বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, আপনার বর্তমান বিল কতটা বাড়বে, তা জানতে হলে প্রথমে দেখতে হবে আপনার মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার কত ইউনিট। কারণ সবার বিল সমান হারে বাড়বে না। যে গ্রাহক যত বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও তত বেশি হতে পারে। এটি জানতে মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি এ মাসে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। তাহলে আপনার বিলের একটি অংশ ৭৬-২০০ ইউনিটের স্ল্যাবে, আরেকটি অংশ ২০১-৩০০ ইউনিটের স্ল্যাবে হিসাব করা হবে। অর্থাৎ, আপনার বিল একাধিক স্ল্যাবের হারে গণনা করা হবে। আরও সহজভাবে বললে, প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল প্রথম স্ল্যাবের হারে, পরবর্তী ১২৫ ইউনিটের বিল দ্বিতীয় স্ল্যাবের হারে এবং শেষ ১০০ ইউনিটের বিল তৃতীয় স্ল্যাবের হারে গণনা করা হবে। অর্থাৎ, পুরো ৩০০ ইউনিটের জন্য একই মূল্য প্রযোজ্য হবে না।
এ বিষয়ে বিইআরসি'র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যখন-ই ৭৫ ইউনিট ক্রস করবে, তখন-ই মাল্টিপল স্ল্যাবে বিল গণনা করা হবে।’
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আগে কারও বিল যদি দুই হাজার টাকা হলে নতুন নিয়মে সেই বিল হয়তো আড়াই হাজার টাকার মতো আসবে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উপরে যত যাবে, দামও তত বাড়বে। কিন্তু এটা ঐকিক নিয়মের মতো বাড়বে। যে ধাপে যত শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী বাড়বে। আবার, কেউ ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তার বিল হয়তো আগে এক হাজার টাকা আসতো। কিন্তু এখন প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে তা হয়তো এক হাজার ২০০ টাকা হতে পারে বলে মত তার।
- বিদ্যুৎ খরচ কমানোর সহজ উপায় কী?
বাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোর মধ্যে সাধারণত সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে এয়ার কন্ডিশনার (এসি), গিজার বা ওয়াটার হিটার, বৈদ্যুতিক চুলা, ওভেন ও ইস্ত্রি। অন্যদিকে ফ্যান, এলইডি বাল্ব ও মোবাইল চার্জারের মতো যন্ত্র তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ফ্যান, বাতি, টিভি, কম্পিউটার ব্যবহার না করলে সব সময় এগুলোর সুইচ বন্ধ করে রাখলে এবং মেশিন বা ইস্ত্রি ব্যবহার না করলে প্লাগ খুলে রাখলে বিদ্যুৎ কম খরচ হয়।
প্রচলিত বাতির তুলনায় এনার্জি বাল্ব বা এলইডি বাতি ব্যবহার করা হলে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক কমে আসে। যেখানে প্রচলিত একটি বাতি একশো ওয়াট ব্যবহার করে, সেখানে একটি এনার্জি বাতি ব্যবহার করে মাত্র ২৫ ওয়াট। এছাড়াও, এখন ইনভার্টারযুক্ত ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল দুই তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাসাবাড়িতে এসি ব্যবহার এখন অনেক বেশি নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু নিয়ন্ত্রিতভাবে এসি ব্যবহার করা গেলে এর বিল কমিয়ে আনা সম্ভব। এসির তাপমাত্রা সবসময় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে হবে। নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর এসি বন্ধ করে ফ্যান চালানো যেতে পারে।
বিদ্যুতের সংযোগ ও তারের ওপর বিদ্যুতের বিল অনেক সময় নির্ভর করে। খারাপ মানের তার হলে, সংযোগ দুর্বল বা নড়বড়ে হলে সেটি লো ভোল্টেজের সৃষ্টি করে, ফলে বিলও বেড়ে যায়। বহুতল ভবনের সাব-স্টেশন পুরাতন হলে সেটি বেশি বিলের কারণ হতে পারে। বছরে অন্তত একবার এসব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে হবে। বাসার এসি ও ফ্রিজের ফিল্টার নিয়মিত সময় পরপর পরিষ্কার করানো হলে সেটি কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে।




