মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পারস্পরিক শুল্ক বিশেষভাবে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে চলেছে, ফলে তাদের শ্রমনির্ভর রপ্তানি শিল্প ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হ্রাস পাবে।
বুধবার ঘোষিত ট্রাম্পের শুল্কহার অনুযায়ী, কম্বোডিয়াকে এশিয়ার সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। পোশাক উৎপাদনের বৃহৎ দেশ বাংলাদেশকে ৩৭ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে মায়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যেখানে গত সপ্তাহের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার লেসোথোকে ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে, যা কোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প যখন বলেন, ‘ওহ, দেখুন কম্বোডিয়াকে, ৯৭ শতাংশ’, তখন তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটির আরোপিত শুল্কের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। এতে হাসির রোল ওঠে। তিনি আরো বলেন, ‘তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছে।
’
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একজন কম্বোডিয়ান গড়ে দিনে প্রায় ৬.৬৫ ডলার উপার্জন করেন, যা বৈশ্বিক গড়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম।
এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রকল্পগুলো বন্ধ করার পর আরো ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। এই সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই মায়ানমার ও আফ্রিকাজুড়ে অনুভূত হচ্ছে, যেখানে চীন দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে। হিনরিচ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্যনীতির প্রধান ডেবোরা এলমস বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়।
৪০-৫০ শতাংশ শুল্ক রাতারাতি কার্যকর হলে তা সামলানো একেবারেই অসম্ভব।’
আরো পড়ুন
ট্রাম্পের শুল্কারোপ ১০০ বছরে বিশ্ববাণিজ্যে বৃহত্তম পরিবর্তন
অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেত। কারণ তারা ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এখন তারা ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, কারণ চীনে চাহিদা দুর্বল।
যুক্তরাষ্ট্র এই শুল্কহার নির্ধারণ করেছে একটি ফর্মুলা অনুযায়ী, যা নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে মোট রপ্তানির সঙ্গে ভাগ করে।
এই হিসাব ২০২৪ সালের মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং পরে দুই দিয়ে ভাগ করা হয়েছে, যা ‘হ্রাসকৃত’ শুল্কহার নির্ধারণ করেছে।
এই পদ্ধতির কারণে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ও ভ্যানিলা উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় মাদাগাস্কার ৪৭ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়েছে।
আফ্রিকায় প্রভাব
দক্ষিণ আফ্রিকার বাণিজ্যমন্ত্রী পার্কস তাউ বৃহস্পতিবার বলেন, তার দল বুঝতে পারছে না কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আফ্রিকার শুল্কহার ৬০ শতাংশ হিসাবে নির্ধারণ করল, যেখানে এখন আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। প্রিটোরিয়ার নিজস্ব হিসাবে এ হার মাত্র ৭.৬ শতাংশ।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবের ভিত্তিতে বাণিজ্য ভারসাম্য ও অন্যান্য কারণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, কিন্তু বর্তমানে আমাদের জন্য এটা পরিষ্কার নয়।’
২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪.২ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল, যা তার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তাউ বলেন, লেসোথোর ওপর আরোপিত শুল্ক এই ২.৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশকে ‘আক্ষরিক অর্থে ধ্বংস’ করবে, যা মূলত হীরার ও পোশাকের রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে প্রধানত হীরার রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল বতসোয়ানার ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। দেশটির খনিজসম্পদ মন্ত্রী গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এই রত্নপাথরের বিক্রির প্রচার চালানোর জন্য। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী কোকো উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ আইভরি কোস্টের ওপর ২১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
আরো পড়ুন
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতিতে কোথায় অসুবিধায় পড়বে ভারত
এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাণিজ্যনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য সংহত করতে উৎসাহিত করেছিল। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ‘আফ্রিকান গ্রোথ অ্যান্ড অপারচুনিটি অ্যাক্ট’ চালু করেন, যা এক হাজার ৮০০-এর বেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছিল।
চীনের প্রভাব
এশিয়ার অনেক দেশের জন্য, বিশেষ করে কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিকনির্ভরতা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে চীনের দিকে সরে যাচ্ছে। দেশটি তার বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ওপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
কম্বোডিয়ার প্রধান দুই বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও যুক্তরাষ্ট্র, তবে দেশটি ইতিমধ্যে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, যা বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও কম্বোডিয়ার মোট বাণিজ্য ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার, যার অধিকাংশই কম্বোডিয়ায় উৎপাদিত পোশাক ও জুতা, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়।
এ ছাড়া পোশাক রপ্তানির জন্য মার্কিন বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশও শুল্ক কমানোর উপায় খুঁজছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেসসচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের শুল্ক পর্যালোচনা করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্রুততার সঙ্গে শুল্ক যৌক্তিকীকরণের বিকল্পগুলো চিহ্নিত করছে।’
২০২২ সালের সার্বভৌম ঋণখেলাপির পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকরা বলেছেন, তারা ৪৪ শতাংশ শুল্ক বহন করতে পারবে না। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার মোট রপ্তানির ২৩ শতাংশ গ্রহণ করেছিল।
বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হিসাবের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ এটি দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ভারসাম্যহীন প্রভাব ফেলছে। ওভারসিজ-চায়নিজ ব্যাংকিং করপোরেশনের এশিয়া ম্যাক্রো গবেষণা প্রধান টমি শি লিখেছেন, ‘বিশেষ করে এটি ছোট উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যেমন কম্বোডিয়া, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে পর্যাপ্ত আমদানি করার সামর্থ্য রাখে না।’
এশীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে সস্তা চীনা পণ্যের স্রোত নিয়ে উদ্বিগ্ন। এলমস বলেন, ‘চীনের পণ্যগুলোকে নতুন বাজার খুঁজতে হবে, যা স্বল্প মেয়াদে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।’