এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টাসহ ১৩ জনকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। তাদের বিরুদ্ধে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
গতকাল বিচারিক কাজের শুরুতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরেন।
চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনই ছিলেন সুপ্রিম কমান্ডার : সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিষয়ে শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তার নেতৃত্বে পুলিশের বিভিন্ন শাখা (র্যাব, কেপিবিএন, ডিবি, এসবি) দেশে গুম, হত্যা, আটক, নির্যাতন, লাশ পোড়ানোসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে ও গণহত্যা চালিয়েছে। তিনি ছিলেন এসব কর্মকাণ্ডের প্রধান। তার নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সারা দেশে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলে পুলিশের আচরণ ছিল বেপরোয়া। জুলাই-আগস্টের হত্যা-গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা, নির্দেশনা, প্ররোচনাসহ দায় তার ওপর বর্তায়। তিনিই ছিলেন এসবের সুপ্রিম কমান্ডার।
গণহত্যায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন জিয়াউল আহসান : এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান সম্পর্কে শুনানিতে তাজুল ইসলাম বলেন, ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীতে তিনি কমিশন লাভ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের মতাদর্শের বিরোধী ব্যক্তিদের গুম, খুন, অপহরণ, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি এনটিএমসির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সরকারবিরোধীদের শায়েস্তা করতে নজরদারি করতেন। এনটিএমসির সঙ্গে সরকারের ৩০টি সংস্থার সম্পৃক্ততা রয়েছে। জুলাই-আগস্টের গণহত্যার সময় সারা দেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধে জিয়াউল আহসানের ভূমিকা পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। ইন্টারনেট বন্ধ করে ইনফরমেশন ব্ল্যাক আউটের মাধ্যমে গণহত্যায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
আয়নাঘরের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন এই জিয়াউল আহসান। বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম, ইলিয়াস হোসেন, যুবদল নেতা সাজেদুল হক সুমন, ইফতেখার দীনারসহ অসংখ্য বিরোধী মতাদর্শের ব্যক্তিকে গুমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এই জিয়াউল আহসান। তার এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরও তিনি তার পদে বহাল তবিয়তে ছিলেন। তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পেত না। তিনি পতিত সরকারের এতই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে একের পর এক পদোন্নতি পেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আয়নাঘর নামক যে বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল সেখান থেকে এক ব্যক্তি মুক্তি পেয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন। এর পরই আয়নাঘরের বিষয়টি জানাজানি হয়। আয়নাঘর থেকে যারা বেঁচে ফিরেছেন তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা এ রকম—আয়নাঘরের নির্যাতন ছিল নাৎসি বাহিনীর কনসেট্রেশন ক্যাম্পের চেয়েও ভায়বহ। আর জিয়াউল আহসানকে বসনিয়ার কসাই বলে খ্যাত রাদোভান কারাদিচ ও স্লোবোদান মিলোসেভিচের সঙ্গে তুলনা করা চলে।
তাজুল ইসলাম শুনানিতে বলেন, এরপর গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর মাইকেল চাকমা, আব্দুল্লাহিল আমান আযমী ও মীর আহমেদ বিন কাশেম (আরমান) এই আয়নাঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আকারে পরিচিতি পায়। এনটিএমসিতে ২০২২ সাল থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর জিয়াউল আহসান একের পর এক ব্যক্তির কল রেকর্ড ফাঁস করেছেন, বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনে আড়ি পেতেছেন। আড়ি পাতার নিষিদ্ধ যন্ত্রপাতির আমদানি নিয়েও বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু তার পরও এসব ব্যবহার করে কল রেকর্ড ফাঁস করা হয়েছে।
মিরপুর জোনের উপকমিশনার (ডিসি) মো. জসিম উদ্দিন মোল্লার বিষয়ে শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই-আগস্ট গণ-আন্দোলনে মিরপুরে যত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার প্রধান নির্দেশদাতা ছিলেন এই ব্যক্তি।
লাশ পোড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের ওপর দায় চাপানো : ঢাকার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল কাফির অপরাধ সম্পর্কে বলা হয়, সাভারের শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার নির্দেশদাতা সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা। তাজুল ইসলাম বলেন, আন্দোলন চলাকালে সাভারে পুলিশের এপিসি ভ্যানের ওপর থেকে ইয়ামিন নামের তরুণকে গুলি করে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ভিডিও ফুটেজ ইন্টারনেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলির পরও ইয়ামিন জীবিত ছিলেন, কিন্তু তাকে হাসপাতালে না নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে মৃত্যু ত্বরান্বিত করতে দেখা গেছে। এমনকি তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতেও বাধা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যার পর মরদেহ পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকারীদের ওপর দায় চাপানো, কিন্তু তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উঠে এসেছে।
আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোর ঘটনার সঙ্গে সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত সুপার মো. শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তদন্তে তা উঠে এসেছে বলে শুনানিতে ট্রাইব্যুনালকে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
গুলশান থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল হকের অপরাধ তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকা মহানগরের তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন এই ব্যক্তি। জুলাই-আগস্ট মাসে তিনি ছিলেন গুলশান থানার দায়িত্বে। এ সময় গুলশান জোনে কাফি, বাহাদুর হোসেন মানিক, সোহাগ, ওয়াসিমসহ যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, তার নির্দেশদাতা ছিলেন তিনি।
আমাকে বাঁচান, আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে : এর আগে সাভারের আশুলিয়ায় গণহত্যার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে অপরাধের বিবরণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হলে তিনি কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে বলেন, ‘আমি কখনোই সাভার-আশুলিয়ায় দায়িত্ব পালন করিনি। আমি তখন গুলশান থানার ওসি ছিলাম। আমি ছাত্রদের পক্ষে ছিলাম। আমাকে বাঁচান। আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আপনি যদি নির্দোষ হন, তাহলে ন্যায়বিচার পাবেন।’ এ সময় মাজহার হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন।
গণহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশদাতা ছিলেন ওসি আবুল হাসান : যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, গণ-আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ওয়ারীতে শত শত লোককে হত্যা করা হয়। শুরু থেকেই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এই আবুল হাসান। স্বৈরাচারের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হত্যা, জখম, নির্যাতন, গণহত্যায় তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশদাতা।
দুনিয়ার সামনে, আদালতের সামনে অপরাধ প্রমাণ করব : চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এই ট্রাইব্যুনালে ২০০ ভিকটিম পরিবার অভিযোগ দাখিল করেছে। সেসব অভিযোগ পর্যালোচনা করে তদন্ত সংস্থা দেখতে পেয়েছে, একটা ঘটনার নির্মমতা আরেকটা ঘটনার নির্মমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। অভিযুক্তরা কিভাবে অপরাধ করেছেন তা দুনিয়ার সামনে, আদালতের সামনে প্রমাণ করব। ট্রাইব্যুনালের মাধমে তাদের অপরাধ জাতি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে।’
আমি কখনো আয়নাঘরে চাকরি করিনি : ট্রাইব্যুনালের আদেশ দেওয়া শেষ হলে অভিযুক্ত জিয়াউল আহসানের আইনজীবী তার মক্কেলের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি চান ট্রাইব্যুনালের কাছে। ট্রাইব্যুনাল অনুমতি দেন। এ সময় কাঠগড়া থেকে জিয়াউল আহসান ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি কখনো আয়নাঘরে চাকরি করিনি। আমি চাকরি করেছি যেখানে, সেটি একটি টেকনিক্যাল জায়গা। বারবার আমার বিরুদ্ধে আয়নাঘরকে জড়িয়ে মিডিয়ায় অপপ্রচার করা হচ্ছে।’
তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। আপনার আইনজীবী এখানে আছেন। তারা আপনার পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরবেন। তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট না হলে তখন কথা বলার সুযোগ পাবেন।’ এরপর বিচারকক্ষ ত্যাগ করেন ট্রাইব্যুনাল।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের পতন ঘটে। আন্দোলনে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আহত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। নজিরবিহীন এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার ঘোষণা দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৪ আগস্ট তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।