চাঁদ দেখা ও প্রমাণিত হওয়ার কিছু বিধান

মুফতি মাহমুদ হাসান
মুফতি মাহমুদ হাসান
শেয়ার
চাঁদ দেখা ও প্রমাণিত হওয়ার কিছু বিধান

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কোরআনে কারিমের বিভিন্ন স্থানে চাঁদের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, সূর্য ও চন্দ্র একটি হিসাবের মধ্যে আবদ্ধ আছে।

(সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৫)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : তারা তোমাকে নতুন চাঁদসমূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো, তা মানুষের ও হজের জন্য সময় নির্ধারক।

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৯)

প্রতি এলাকার মুসলমানদের ওপর আরবি মাসের হিসাব রাখা এবং মাসের শুরুতে চাঁদ দেখা ফরজে কেফায়া।

কিছু লোক যদি দেখে নেয়, তাহলে সবাই দায়িত্বমুক্ত হবে। অন্যথায় কেউ না দেখলে সবাই গুনাহগার হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে চাঁদ দেখতেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও দেখার প্রতি উৎসাহিত করতেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাসের নতুন চাঁদ দেখে এ দোয়া পড়তেন—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনি ওয়াল ঈমান ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলাম ওয়াত্তাওফিকু লিমা ইউহিব্বু রব্বুনা ওয়া ইয়ারদ, রব্বুনা ওয়া রব্বুকাল্লাহ।

(সুনানে দারেমি, হাদিস : ১৭২৯; সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৫১)

এ ছাড়া বিভিন্ন হাদিস শরিফে আরো কয়েকটি দোয়া বর্ণিত হয়েছে। এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) চাঁদ দেখার বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।

যে পদ্ধতিতে চাঁদ প্রমাণিত হয়

আকাশ আচ্ছন্ন থাকলে রমজানের চাঁদ প্রমাণিত হওয়ার জন্য চাঁদের খবর প্রদানকারী একজন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন বালেগ, শরিয়তের অনুশাসন মান্যকারী নির্ভরযোগ্য মুসলমান হতে হবে। এ ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার একই হুকুম।

ঈদের চাঁদ দেখার জন্যও অনুরূপ গুণসম্পন্ন দুজন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা হতে হবে। (আলবিনায়া ৪/২৫; রদ্দুল মুহতার ২/৩৯১; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/১৯৭)

আর আকাশ পরিষ্কার থাকলে রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখার শরয়ি বিধান হলো, এতসংখ্যক লোক চাঁদের সাক্ষ্য দেওয়া জরুরি, যার দ্বারা শরয়ি কাজি বা অভিজ্ঞ মুফতিগণের সমন্বয়ে গঠিত হেলাল কমিটির কাছে তা দৃঢ় বিশ্বাস্য হয়ে যায়। এর জন্য বিশেষ কোনো সংখ্যা নির্ধারিত নেই। (হেদায়া ১/১১৯, আহকামুল কোরআন, জাস্সাস ১/২৮০)

মুসলিম সরকার কর্তৃক পরিচালিত চাঁদ দেখা কমিটি যদি অভিজ্ঞ মুফতি ও আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত হয় এবং উক্ত কমিটি শরিয়তের নীতিমালা অনুযায়ী ঘোষণা দিয়ে থাকে, তাহলে তাদের ঘোষণা অনুপাতে সবার ওপর আমল করা জরুরি, অন্যথায় আমল করা আবশ্যক হবে না। বরং এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতিগণ যদি ইসলামী শরিয়তসম্মত পন্থায় চাঁদ দেখার ঘোষণা দেন, তাহলে তাদের ঘোষণা অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকার লোকেরা আমল করবে।

তবে সব মুসলিম এ বিষয়টি মাথায় রাখবে যে এটি নিয়ে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়। বিজ্ঞ মুফতিরাও চেষ্টা করবেন যেন জাতীয় হেলাল কমিটির মাধ্যমে সঠিক মাসআলা অনুসারে দেশের সব মানুষকে একটি শরয়ি সিদ্ধান্তে একত্র করা যায়। তা নিয়ে এলাকাভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি না হয়। (আলবাহরুর রায়েক ২/২৬৬; রদ্দুল মুহতার ২/৩৮৯; আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৪৬৬; ফাতাওয়ায়ে উসমানি ২/১৬৭-১৬৮, ১৭২)

দুরবিন ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে চাঁদ দেখা

শরিয়ত মানুষকে কোনো ধরনের জটিল বৈজ্ঞানিক তথ্যাদি ও যন্ত্রপাতির মারপ্যাঁচে না ফেলে সাধারণ চোখে চাঁদ দেখার ওপর বিধানের ভিত্তি রেখেছে। কোনো কারণে ২৯ তারিখে চাঁদ দেখা না গেলে বিচলিত না হয়ে মাস ৩০ দিন পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে চাঁদ দেখার জন্য এতটুকু পন্থা অবলম্বন করবে যে এমন জায়গায় গিয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা করবে, যেখানে তার সামনে চন্দ্র উদয়ের স্থলে কোনো প্রতিবন্ধক না থাকে। ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট। তাই হেলিকপ্টারে উঠে চাঁদ দেখা অথবা দুরবিন ও টেলিস্কোপ ইত্যাদির সাহায্য নেওয়াকে শরিয়ত নীতিগতভাবে পছন্দ করে না।

তবে যদি কেউ দুরবিন ও টেলিস্কোপ ইত্যাদির সাহায্যে স্বীয় এলাকার চন্দ্র উদয়স্থলে সঠিক সময়ে চাঁদ দেখে নেয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং এর দ্বারা চাঁদ দেখা সাব্যস্ত হয়ে সব বিধি-বিধান আরোপিত হয়ে যাবে। কেননা যেভাবেই হোক সে সঠিক সময়ে এবং সঠিক স্থলে চাঁদ দেখেছে, তা যেকোনো উপায় অবলম্বন করেই হোক না কেন। (ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১১৫)

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

কোরআন থেকে শিক্ষা

    পর্ব, ৭৩৮
শেয়ার
কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ : হে মুমিনরা! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়নি তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময়ে অনুমতি গ্রহণ করে। ...তারাও যেন অনুমতি গ্রহণ করে যেমন অনুমতি গ্রহণ করে থাকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

(সুরা : নুর, আয়াত : ৫৮-৫৯)

আয়াতদ্বয়ে বিশ্রামের সময় ঘরে প্রবেশের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. মানুষের বিশ্রামের সময় তথা এশারের পর, ফজরের আগে ও জোহরের পর গৃহকর্মী, দাসী ও পরিবারের বুঝমান শিশুরাও অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করবে না।

২. উল্লিখিত ব্যক্তিদের জন্য বিশ্রামের সময় অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। তবে সন্তান সাবালক হয়ে গেলে তার জন্য এ সময়গুলোতে অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব।

৩. যে শিশু অবুঝ, যে নারীদেহ ও লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে ধারণা রাখে না, তার জন্য বিশ্রামের সময়ও অবাধে চলাচল করার অবকাশ আছে।

৪. গৃহকর্মী, দাসী ও শিশু ছেলে হোক বা মেয়ে, মাহরাম হোক বা গাইরে মাহরাম, বিশ্রামের সময় সবাইকে অনুমতি নিতে হবে।

৫. আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, শিশুরা বুঝমান হয়ে উঠলে তাদের আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া পরিবারের দায়িত্ব। (তাফসিরে মুনির : ৯/৬৩৪)

প্রাসঙ্গিক
মন্তব্য

রমজান-পরবর্তী সময়ে মুমিনের করণীয়

জাকি মো. হামদান
জাকি মো. হামদান
শেয়ার
রমজান-পরবর্তী সময়ে মুমিনের করণীয়

রমজান শুধু একটি মাস নয়, বরং এটি সারা জীবনের পথচলার দিকনির্দেশনা, যা হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়, আত্মাকে প্রশিক্ষিত করে এবং ইবাদতের আলোয় আলোকিত করে তোলে। এক মাসের এই প্রশিক্ষণ মুমিনের জীবনে যে পরিবর্তন এনে দেয়, তা যেন সারা জীবনের জন্য একটি দিশারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

এখানে রমজান-পরবর্তী কয়েকটি করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো

১. নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা : মাহে রমজানের আগমন ঘটলে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তির বায়ু প্রবাহিত হয়, যা প্রত্যেককে নেক আমলে উৎসাহিত করে। আর নেক আমল গুনাহের মাধ্যমে আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে।

এ জন্য রমজান-পরবর্তী সময়ে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। কোরআনের ভাষায় : তোমরা নিজেদের আমলকে সেই নারীর মতো কোরো না, যে সুতা মজবুতভাবে বুনতে থাকে আবার তা ছিঁড়ে ফেলে। (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯২)

তাই রমজানের পরও আমাদের আমল অব্যাহত রাখা একান্ত জরুরি।

২. হেদায়েতবিহীন পথ এড়িয়ে চলা : প্রাপ্ত হেদায়েত হারিয়ে ফেলা ভ্রষ্টতার পথ গ্রহণেরই নামান্তর।

এ জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত যে রহমতগুলো প্রাপ্ত হয়েছি তার যথার্থ মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ বলেন : আর তাদের ওই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমরা দিয়েছিলাম নিদর্শনসমূহ, তারপর সে তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অতঃপর শয়তান তার পেছনে লাগে, আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৫)

৩. নাফরমানি থেকে দূরে থাকা : নাফরমানির মূলহোতা শয়তান। শয়তান মানুষের চিরশত্রু এবং তাকে শত্রুরূপেই গণ্য করতে বলা হয়েছে।

আল-কোরআনের ভাষায় : তারপর অবশ্যই আমি (শয়তান) তাদের কাছে আসব, তাদের সামনে থেকে ও পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে ও বাঁ দিক থেকে এবং আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭)

৪. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া : সালাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। মাহে রমজানে সবারই সালাতের প্রতি কমবেশি ঝোঁক থাকে। আর সেই প্রবণতাকে অন্য মাসেও কার্যকর করা আমাদের একান্ত জরুরি।

৫. পরোপকারী মনোভাব বজায় রাখা : পরোপকার মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ।

ইসলামে পরোপকারিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তোমরা সৎ কাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো। (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

সাধারণভাবে মানুষ রমজানে দান-সদকা বেশি করে থাকে, যা অন্যান্য মাসেও করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ সেই বান্দার সহায় হন, যে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে। (মুসলিম)

মনে রাখতে হবে যে পরোপকার শুধু দান-সদকায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সদ্ব্যবহার, সহানুভূতি, পরামর্শ ও সহমর্মিতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।

৬. পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সমাধানে সচেষ্ট থাকা : মাহে রমজানের একটি বড় শিক্ষা হলো যে যখন কারো মাঝে ঝগড়া লাগবে অথবা কেউ কাউকে গালি দেবে তখন বলবে যে আমি রোজাদার।

অর্থাৎ মীমাংসাপূর্ণ মানসিকতা দরকার। এমনকি হাদিস শরিফে পারস্পরিক মীমাংসা করাকে রোজা থেকেও উত্তম বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত, সদাকাহ্র চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বলেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯)

৭. শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা : রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের এই ছয়টি নফল রোজা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে এই কয়েকটি রোজা রাখলেই বাকি ১১ মাস রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের সিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, তাকে সারা বছর সাওম পালন করার সওয়াব দেওয়া হবে! (মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৮)

পরিশেষে মাহে রমজান আমাদের জীবনে একটি প্রশিক্ষণকাল, যা কেবল এক মাসের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা বাস্তব জীবনে অনুসরণ করি, তবে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সুন্দর হবে।

মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমিন।

 

মন্তব্য

মুমিন যেভাবে আল্লাহর প্রিয় হয়

মুফতি আতাউর রহমান
মুফতি আতাউর রহমান
শেয়ার
মুমিন যেভাবে আল্লাহর প্রিয় হয়

আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টাই আল্লাহর প্রতি বান্দার ভালোবাসা। প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহও তাঁর বান্দাকে ভালোবাসবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাঁকে ভালোবাসবে।

(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৫৪)

 

আল্লাহর ভালোবাসার গুরুত্ব

শায়খ আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.) এক ফাতাওয়ায় বলেছেন, মুমিনের জন্য হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসা ওয়াজিব।

যে ভালোবাসার সমকক্ষ আর কিছুই হবে না। সুতরাং আল্লাহই হবেন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে প্রিয়। আর আল্লাহর প্রতি সত্য ভালোবাসার দাবি হলো, তাঁর আনুগত্য করা, পাপ পরিহার করা, আল্লাহর রাসুল ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের ভালোবাসা। আল্লাহর শত্রুদের অপছন্দ করা এবং আল্লাহর জন্য তাদের ঘৃণা করা।

১. আল্লাহর ভালোবাসা ঈমানের দাবি : মুমিনের ঈমানের দাবি হলো আল্লাহকে ভালোবাসা। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের স্বাদ ও মিষ্টতা পেয়ে যায় : ১. যার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অন্য সব কিছু অপেক্ষা বেশি প্রিয় হবে।

(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৮৭)

২. আল্লাহর ভালোবাসা মুমিনের

বৈশিষ্ট্য : আল্লাহর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা লালন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর যারা মুমিন তারা আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)

৩. ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে লেখেন, আল্লাহর ভালোবাসায় অন্তরের শক্তি, আত্মার খোরাক ও চোখের প্রশান্তি। সেটা এমন জীবনীশক্তি, যা থেকে যে বঞ্চিত হয় সে যেন প্রকৃতার্থেই মৃত। আল্লাহর ভালোবাসাই ঈমান ও আমলের প্রাণসত্তা। (মাদারিজুস সালিকিন : ৩/৮)

 

আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়

কোরআন ও হাদিসের আলোকে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের উপায়গুলো বর্ণনা করা হলো

১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনুগত্য : মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য মহান আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ বলেন, বলুন! যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো।

আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। তোমাদের পাপ মার্জনা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)

২. ভালো কাজ করা : মহান আল্লাহ সেসব মানুষকে ভালোবাসেন, যারা সৎকর্মপরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, তোমরা সৎ কাজ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালোবাসেন।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

৩. দেহ ও মনের পবিত্রতা অর্জন করা : যারা পূতঃপবিত্র থেকে ভালোবাসে এবং যারা পাপমুক্ত জীবন যাপন করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। দেহের পবিত্রতা হলো বাহ্যিক নাপাকি থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্তরের পবিত্রতা হলো আল্লাহর কাছে তাওবা করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)

৪. আল্লাহভীতি অর্জন করা : যাপিত জীবনে আল্লাহর ভয় অন্তরে লালন করার মাধ্যমে ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭৬)

৫. আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা : আল্লাহর ওপর আস্থাশীল বান্দাদের আল্লাহ ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

৬. নফল ইবাদত করা : নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভে সাহায্য করে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আমি যা কিছু আমার বান্দার ওপর ফরজ করেছি, তা দ্বারা কেউ আমার নৈকট্য লাভ করবে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫০৩)

৭. ধৈর্য ধারণ করা : ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৬)

৮. ন্যায়বিচার করা : আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। তিনি বলেন, তোমরা ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন। (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৯)

আল্লাহ সবাইকে তাঁর প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
 

মন্তব্য

মহানবী (সা.)-এর কাছে নারী সাহাবিদের বায়াত

আলেমা হাবিবা আক্তার
আলেমা হাবিবা আক্তার
শেয়ার
মহানবী (সা.)-এর কাছে নারী সাহাবিদের বায়াত

মহানবী (সা.) সাহাবিদের থেকে আনুগত্য ও যুদ্ধের বায়াত গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বায়াত ছিল প্রথম আকাবার শপথ। নবুয়তের দশম বছর হজের সময় মদিনার ছয় ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে ঈমান ও আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। নবুয়তের ১৩তম বছর মদিনার ৭৫ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মহানবী (সা.)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন।

তাঁদের মধ্যে ৭৩ জন পুরুষ এবং দুজন নারী ছিলেন। সম্ভবত এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসে নারীদের প্রথম বায়াত গ্রহণের ঘটনা। এরপর মহানবী (সা.)-এর হাতে একাধিকবার নারীরা ঈমান, ইসলাম ও আনুগত্যের বায়াত গ্রহণ করেছেন।

(আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা-১৫৮ ও ১৬১)

 

কোরআনে নারীদের বায়াত

মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) সাফা পর্বতের ওপর অবস্থান করছিলেন।

সেখানে তিনি প্রথমে পুরুষদের বায়াত গ্রহণ করলেন। এরপর নারীদের বায়াত গ্রহণ করলেন। নারীদের অবস্থান ছিল মহানবী (সা.) থেকে নিচে। তিনি উঁচু স্থান থেকে শপথ বাক্য পাঠ করছিলেন আর ওমর (রা.) তা নারীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন।
নারীরা তাঁর কাছ থেকে শুনে শুনে শপথ বাক্য পাঠ করছিলেন। কোরআনে সেই শপথের বিবরণ এভাবে এসেছে, হে নবী! মুমিন নারীরা যখন তোমার কাছে আসে বায়াত করে এই মর্মে যে তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তান হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে বেড়াবে না এবং সৎ কাজে তোমাকে অমান্য করবে না, তখন তাদের বায়াত গ্রহণ করো এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ১২)

 

হাদিসে নারীদের বায়াত

পবিত্র কোরআনের মতো হাদিসেও নারীদের বায়াত গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। উমাইমা বিনতে রুকাইকা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি কয়েকজন আনসারি নারীর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণের জন্য উপস্থিত হই।

আমরা আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার কাছে এই কথার ওপর বায়াত করছি যে আমরা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কাউকে শরিক করব না, চুরি করব না, ব্যভিচার করব না, আমরা কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেব না, ভালো কাজে আপনার অবাধ্য হব না। তিনি বলেন, তোমরা এই বলো যে আমাদের দ্বারা যতটুকু সম্ভব। উমাইমা (রা.) বলেন, আমরা বললাম, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল আমাদের প্রতি কত দয়ালু। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আসুন, আমরা আপনার হাতে বায়াত করব। তখন রাসুল (সা.) বললেন, আমি স্ত্রীলোকের হাতে হাত মিলাই না। কোনো একজন নারীকে আমার বলাটা ১০০ নারীকে বলার মতো।

(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪১৮১)

 

যেভাবে নারীদের বায়াত করান

পুরুষরা মহানবী (সা.)-এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করত। যেমনটি পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, যারা তোমার হাতে বায়াত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়াত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১০)

কিন্তু মহানবী (সা.) নারী সাহাবিদের বায়াত করাতেন মুখে মুখে, তিনি কখনো তাদের হাত স্পর্শ করতেন না। সুনানে নাসায়ির উল্লিখিত হাদিসে যেমনটি বলা হয়েছে। আয়েশা (রা.) বলেন, (নারীদের) এই বায়াত কেবল কথাবার্তার মাধ্যমে হয়েছে। হাতের ওপর হাত রেখে বায়াত হয়নি, যা পুরুষদের ক্ষেত্রে হতো। বস্তুত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত কখনো কোনো গাইরে মাহরাম নারীর হাতকে স্পর্শ করেনি। (মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)

 

যেসব বিষয়ে বায়াত নেন

মহানবী (সা.) নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ে নারীদের থেকে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। তা হলো১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, ২. চুরি না করা, ৩. ব্যভিচার না করা, ৪. সন্তান হত্যা না করা, ৫. অপবাদ না দেওয়া, ৬. মহানবী (সা.)-এর অবাধ্য না হওয়া।

তবে কোরআনে ছয়টি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, জাহেলি যুগের নারীরা উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ে বেশি লিপ্ত ছিল। তাই মহানবী (সা.) এসব বিষয়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন, যেন তারা তাদের অতীত অভ্যাসে ফিরে না যায়। উল্লিখিত আলোচনা ও বিবরণ থেকে বোঝা যায়, তাসাউফের শায়খ ও আলেমরা চাইলে ইসলামের শর্ত মেনে বায়াত গ্রহণ করতে পারবে।

(মাআরেফুল কোরআন : ৮/৪১৭)

আল্লাহ সবাইকে সঠিকভাবে দ্বিন মেনে চলার তাওফিক দিন। আমিন।

 

 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ