টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১১৫ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার বলে জানা গেছে। তারা লেখাপড়া বন্ধ করে এখন স্বামীর সংসার করছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দারিদ্র্য ও দুর্ঘটনা এড়াতে অভিভাবকরা তাঁদের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা।
এ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নে ১৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আটটি কলেজ, ১৪টি মাদরাসা ও তিনটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৯ হাজার ১৯২, কলেজ শিক্ষার্থী আট হাজার ৭৫২ ও মাদরাসায় তিন হাজার ৭৭৫ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা বাল্যবিয়ের খবর পেয়ে বিয়েবাড়িতে উপস্থিত হয়ে কয়েকটি বিয়ে বন্ধও করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই সব পরিবারের অভিভাবকরা বিভিন্ন উপায়ে বয়স বাড়িয়ে মেয়েদের বিয়ে দেন বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।
মির্জাপুর সরকারি সদয় কৃষ্ণ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী এক হাজার ৯৬২ জন।
এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীর সম্প্রতি বিয়ে হয়েছে। এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৮৮ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন ও ২০২২ সালের এসএসসি ৩৪৪ জনের মধ্যে পাঁঁচজন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ।
সদরের মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এক হাজার ৪৬০ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।
বর্তমান বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভোকেশনালসহ নবম শ্রেণিতে ২৯১ জন ছাত্রী রয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জন বিয়ে করেছে। এ ছাড়া ২০২১ সালের ৩০৬ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৪ জন এবং ২০২২ সালের ২৯৩ জন এসএসসি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জন বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। সদরের এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত বিয়ে হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদ্যালয়ে ক্লাস করছে বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা নিশ্চিত করেছেন।
উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত গেড়ামাড়া গোহাইলবাড়ি সবুজ সেনা উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে গত দেড় বছরে ষষ্ঠ শ্রেণির চারজন, সপ্তম শ্রেণির ৯ জন, ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৯ জন ও ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ৯ জন বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ফিরোজ আল মামুন।
এদিকে মির্জাপুর উপজেলা সদরের আফাজ উদ্দিন দারুল উলুম দাখিল মাদরাসায় গত দেড় বছরে অষ্টম শ্রেণির একজন ও নবম শ্রেণির চারজন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। উপজেলার বহুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত দেড় বছরে অষ্টম শ্রেণি পাস তিন শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম।
পোষ্টকামুরী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরফুননিছা খানম জানান, বিদ্যালয়টিতে শিশু শ্রেণি হতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭৯৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। উপস্থিতির হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ বলে জানান তিনি।
মির্জাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা ভালো ছেলে দেখে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। তবে তাঁদের অনেকেই ক্লাস করছে।’ মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাল্যবিয়ের খবর পেলে আমরা উপস্থিত হয়ে তা বন্ধ করি। গত দেড় বছরে এ উপজেলায় কতজন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে—এর একটি তালিকা করা হচ্ছে।’