জনশ্রুতি আছে, একসময় মিসরের প্রয়াত শাসক রাজা ফারুক নাকি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে পৃথিবীতে মাত্র দুই ধরনের রাজা-রানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। আর তা হচ্ছে তাসের রাজা-রানি এবং ইংল্যান্ডের (বর্তমান যুক্তরাজ্য) রাজা-রানি। যুক্তরাজ্য এখন একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হলেও সাংবিধানিক দিক থেকে দেশটির আইনানুগ রাজা বা রানি হবেন রাষ্ট্রপ্রধান। অর্থাৎ চূড়ান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী না হলেও রাজতন্ত্র এখনো ঐতিহ্যগতভাবে টিকে রয়েছে।
এলিজাবেথ-উত্তর যুক্তরাজ্য ও চার্লসের ভবিষ্যৎ
- গাজীউল হাসান খান
অন্যান্য

কিংবদন্তি রাজনীতিক ও যুক্তরাজ্যের সাবেক ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল থেকে শুরু করে সবেমাত্র ক্ষমতায় আসা লিজ ট্রাস পর্যন্ত মোট ১৫ জনকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পাঠ করানোর গৌরব অর্জন করেছিলেন। বিশিষ্ট ব্রিটিশ সাংবাদিক ও রাজপরিবারের খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনচরিত রচয়িতা রবার্ট হার্ডম্যান তাঁর ‘কুইন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে বলেছেন, যুক্তরাজ্যের রাজশক্তি (সমসাময়িক) একটি কল্পকাহিনির মতো। সেখানে সদ্যঃপ্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন একজন অদ্বিতীয় ও অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর সত্তর বছরের রাজত্বকালে (১৯৫২-২০২২) বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের পর্যায়ে তিনি ছিলেন শুধু একজনই।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ব্রিটিশ রাজতন্ত্র, উপনিবেশবাদ কিংবা বিভিন্ন বিতর্কের পাত্রী না হয়েও তাঁর পিতার পুরনো রাজত্বকে তিনি ‘কমনওয়েলথ’ নামের একটি ‘বহু জাতির পরিবারে’ পরিণত করেছিলেন, যা তাঁদের স্বাধীনতা লাভের পরও মুক্তিপ্রাপ্ত সদস্যরা (দেশ বা জাতিসমূহ) এখনো টিকিয়ে রেখেছেন। ৫৬ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ সদস্যরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে এখনো বাণিজ্য, শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রকৌশল কিংবা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক কিছুই বিনিময় বা হস্তান্তর (ট্রান্সফার) হচ্ছে। সে কারণেই প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছিলেন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ বহু ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রের সরকারপ্রধান। অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে অনুষ্ঠিত জনমত জরিপ কিংবা গণভোটেও স্থানীয় জনগণ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল রাখার জন্য মত প্রকাশ করেছিলেন। এলিজাবেথ প্রায় সব দিক থেকে অনগ্রসর কমনওয়েলথ সদস্য দেশসমূহকে টেনে ওপরে তোলার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ও সচেষ্ট ছিলেন। কমনওয়েলথ-প্রধান হিসেবে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কোনো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে কখনো অপারগতা প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায় না। তবু বিশ্বরাজনীতি দিনে দিনে অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। পারস্পরিক স্বার্থপরতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সংঘাতে অসহনশীল হয়ে পড়ছে পরিস্থিতি। মানুষ অতীত উপনিবেশের তিক্ত অভিজ্ঞতা কিংবা অন্যায় শোষণ-শাসনকে এখনো ভুলতে পারছে না। যদিও আমাদের উপমহাদেশে মোগল শাসকদের তুলনামূলক অনেক উন্নয়ন ও অগ্রগতির পর ব্রিটিশ শাসকরা শিক্ষাদীক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে আরো অনেক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন, তবু মানুষ পরাধীনতার কথা ভুলতে পারে না। সে কারণেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর কমনওয়েলথভুক্ত অনেক রাষ্ট্র, যাঁরা রানিকে তাঁদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন, তাঁরা এখন সে ধারা আর অব্যাহত রাখবেন কি না? নাকি তাঁরা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শেষ যোগসূত্রটুকুও ছিন্ন করে সম্পূর্ণ প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করবেন? কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ইংরেজিভাষী কিংবা তাদের বেশির ভাগ নাগরিকই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত হলেও শেষ পর্যন্ত তারাও অতীতের যোগসূত্রটুকু রাখতে চাইবেন কি না সেটি এখন নিঃসন্দেহে দেখার বিষয়বস্তু।
বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসকে স্কটল্যান্ডের ব্যালমোরাল রাজপ্রাসাদে শপথ পাঠ করানোর পরই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যুক্তরাজ্য কিংবা বিশ্বমঞ্চ থেকেই প্রস্থান করেছেন। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটিশ রাজনীতির অত্যন্ত এক কঠিন সময়ে অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন। একদিকে বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অঙ্গন ও অত্যন্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, অন্যদিকে আগামী বছর স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সীমান্ত প্রশ্নে উত্তর আয়ারল্যান্ডের ওপর আরোপিত বিধি-নিষেধ লিজ ট্রাসকে যে ব্যাকুল করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে অস্থির বিশ্ব যখন পরিত্রাণের পথ খুঁজছে তখনই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন লিজ ট্রাস। লিজ জানেন ব্রিটেনে যেখানে এখন মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে এবং বিশ্বমন্দা ক্রমে ক্রমে গ্রাস করছে তাঁর দেশকে; সেখানে তাঁর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কোনো অবকাশ নেই।
অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র এখনো চায় ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ চালিয়ে যাক। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সংঘর্ষ থামিয়ে একটি আপস-নিষ্পত্তির প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। কিন্তু সামনে আসছে ইউরোপ কিংবা পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে কঠিন শীত ও নিদারুণ শৈত্যপ্রবাহ। জনজীবন প্রায় সম্পূর্ণভাবেই স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় কিসের প্রতিরোধ লড়াই আর কিসের বিশ্ববাণিজ্য। জ্বালানি ও খাদ্যসংকট মোকাবেলা করতেই কেটে যাবে আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নতুন বছরের প্রায় মার্চ পর্যন্ত। তাতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডার কোনো বিশেষ অসুবিধা নেই। কারণ তাদের রয়েছে পর্যাপ্ত জ্বালানি সম্পদ, খাদ্যশস্য ও বিশাল দেশীয় বাজার। সুতরাং বিশ্ব বিপন্ন হলেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির অবস্থানেই বহাল থাকবে। তাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার অগ্রগতি ঠেকানো। চীন ও রাশিয়াকে ভবিষ্যতের সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সব ক্ষেত্রে দুর্বল করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এ পরিস্থিতির সমালোচনা করতে গিয়ে একসময় বলেছিলেন, ‘এর নামই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ।’ এটা যে কত সুদূরপ্রসারী ও বিভীষিকাময় তা সময়ই বলে দেবে।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের দীর্ঘ সত্তর বছরের শাসনের পর যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতাসীন হয়েছেন তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তৃতীয় চার্লস ফিলিপ আর্থার জর্জ। নতুন রাজা চার্লস ৭৩ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যসহ ১৪টি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। বিশ্ব গণমাধ্যমের কোনো কোনো সংবাদ বিশ্লেষকের ভাষায়, চার্লস হচ্ছেন তাঁর প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের মতোই ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার। দেশীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাঁরা দুজনই অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, যাঁদের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র চার্লস সম্পর্কে খুব একটা উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না। তিনি জানতেন চার্লস খুব একটা ক্ষুরধার প্রতিভার অধিকারী নন। এ ছাড়া কঠোর জীবনাচরণ কিংবা শৃঙ্খলাবোধের দিক থেকেও তিনি ততটা সংযত নন। নতুবা তাঁর প্রথমা স্ত্রী প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানার জীবনের যে মর্মান্তিক পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তা হয়তো হতো না। রানি ও সমগ্র রাজপরিবার, যুক্তরাজ্য এবং সমগ্র বিশ্ববাসী তাতে আঘাত পেয়েছিল, মর্মাহত হয়েছিল। প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে তৎকালীন প্রিন্স চার্লসের বিবাহ অনুষ্ঠান ছিল একটি রূপকথার দৃশ্যাবলির মতো। তাতে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। বিশ্ববাসী দুই চোখ ভরে তা উপভোগ করেছিল। রাজা চার্লসের সে বিয়ে তাঁর বর্তমান স্ত্রী কামিলার জন্যই সফল হতে পারেনি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাতে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলেন। সে আঘাতের পর ৯৬ বছর বয়সেও অর্থাৎ মৃত্যুর আগেও তিনি চার্লসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি। শুধু চার্লসের ভবিষ্যৎ নয়, সম্পূর্ণ ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং এমনকি কমনওয়েলথের ভবিষ্যৎ নিয়েও রানি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।
ব্রেক্সিট-উত্তর অথবা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ-উত্তর যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তথ্যাভিজ্ঞ মহল এখন বহু কারণেই শঙ্কিত। তাদের অনেকের ধারণা, শুধু রাজতন্ত্রের শেষ যোগসূত্রটিই নয়, সমগ্র যুক্তরাজ্যের, যেমন—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্ত থাকা কিংবা তার অখণ্ডতা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় দেশীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির কথা সরকারের ওপর ছেড়ে দিলেও নিজ অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে কী করবেন রাজা তৃতীয় চার্লস। তাঁর পূর্বপুরুষ, রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল ১৬৪৯ সালে ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে। তখন থেকেই ব্রিটেনের পার্লামেন্ট শক্তিশালী হতে শুরু করে এবং গণতন্ত্র ব্রিটেনে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। কিন্তু বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের সে সম্ভাবনা না থাকলেও যুক্তরাজ্যের বর্তমান অখণ্ডতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান যুক্তরাজ্যকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত রাখার কোনো মন্ত্র কি জানা আছে তাঁর? রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মতো তীক্ষ রাজনৈতিক দৃষ্টি, অভাবনীয় প্রজ্ঞা এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা কিংবা জনপ্রিয়তা তাঁর কতটুকু রয়েছে—এগুলোই এখন বিভিন্ন মহলের কাছে বিচার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শেষ কথা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের সামনে সব দিক থেকেই এ এক কঠিন সময় উপস্থিত হয়েছে। দেখা যাক সুচতুর ব্রিটিশরা কিভাবে তা মোকাবেলা করে।
লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
gaziulhkhan@gmail.com
সম্পর্কিত খবর

এআইয়ের যুগে গণিত বিসিএস থেকে বাদ নয়
- ড. মো. শফিকুল ইসলাম

গণিত হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ভিত্তি। গণিতের জ্ঞান এআই সিস্টেমগুলোকে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, শিখতে এবং অভিযোজন করতে সাহায্য করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে রূপান্তরকারী প্রযুক্তির মধ্যে একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবা, অর্থ, পরিবহন ও বিনোদনের মতো বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্রগুলোতে ব্যাপক বিপ্লব এনেছে। এআই গণনামূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানীয় প্রক্রিয়াগুলো; যেমন—শেখা, লেখা, যুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিলিপি বা বৃদ্ধি করা যায়।
গণিত কিভাবে এআইকে সাহায্য করে? রৈখিক বীজগণিত ডেটা উপস্থাপন ও পরিচালনা করতে সাহায্য করে, যা চিত্র স্বীকৃতি, প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ এবং সুপারিশ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালকুলাস মডেলগুলোকে অপ্টিমাইজ করতে সাহায্য করে, যা মেশিন লার্নিংয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাফল্য গাণিতিক নীতির ওপর নিহিত। এই নীতিগুলো এআই অ্যালগরিদমের ভিত্তি তৈরি করে, যা মেশিনগুলোকে ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, বিশ্লেষণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গণিতের বিভিন্ন শাখা এআই সিস্টেমের বিকাশ ও বাস্তবায়নে অবদান রাখে, যার মধ্যে রৈখিক বীজগণিত, ক্যালকুলাস, সম্ভাব্যতা, পরিসংখ্যান ও অপ্টিমাইজেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়, যার মধ্যে লিখিত পরীক্ষার সিলেবাস অনুসারে সাধারণ ক্যাডার, কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারের প্রার্থীদের জন্য গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতায় ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু সম্প্রতি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ছয়টি আবশ্যিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে নম্বর পুনর্বণ্টনের সুপারিশ করে। কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে বাংলা, ইংরেজি রচনা, ইংরেজি কম্পোজিশন ও প্রিসিস, বাংলাদেশের সংবিধান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, আন্তর্জাতিক ও চলতি বিষয়, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সমাজ ও পরিবেশ, ভূগোল প্রতি বিষয়ে ১০০ নম্বর করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতায় যে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা দিতে হতো, তা এখন না রাখার সুপারিশ করছে কমিশন, যা আসলে ঠিক হয়নি বলে মনে হচ্ছে। আজকে বিশ্বজুড়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তা কিন্তু গণিত, পরিসংখ্যান ও কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অবদান। তাই ভবিষ্যতে যারা নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে চাই, তাদের অবশ্যই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যদি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চায়, তাহলে আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে দক্ষ হতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে এর জন্য আলাদা প্রজেক্ট গ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে, যারা এ বিষয়ে কাজ করতে চায়। তাই কমিশনের সুপারিশে গণিত বাদ দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণ করা যাবে না। বিসিএসসহ যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় গণিত অবশ্যই রাখতে হবে। গণিতের গুরুত্ব অনুধাবন করে শিক্ষাব্যবস্থা এবং নিয়োগসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশ চার বা পাঁচ দশক আগেও অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাপকাঠিতে প্রায় আমাদের সমসাময়িক ছিল। কিন্তু এখন ওই সব দেশ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। কারণ তারা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। আর গণিত যেহেতু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দক্ষতা অর্জন করতে কাজ করে, তাই গণিতের বিষয়টি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখা যাবে না। গণিতের গুরুতের কথা তরুণ প্রজন্মকে বোঝাতে হবে এবং কোর্স কারিকুলামের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গণিতের বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।
গণমাধ্যমে দেখতে পাই, অনেক স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যায় গণিত বা বিজ্ঞানের ভালো বা দক্ষ শিক্ষক নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। তাই খারাপ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে, যা গণিত বা বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নয়নে কাজে আসবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে উচ্চশিক্ষায় উদ্ভাবন, গবেষণা ও প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিতে গেলে গণিতের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হবে। অদম্য বাংলাদেশের অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের গণিত শিক্ষাসহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার কার্যকর পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় গণিতের মডেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চিন্তা বা ইচ্ছাকে আরো ভালোভাবে প্রকাশ করা বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে গণিত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গণিতশাস্ত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ; যেমন—বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ইত্যাদির ঝুঁকি অনুধাবন এবং আগাম বার্তা দিতে সহায়তা করে, যা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস করতে ব্যাপক কাজ করে। তাই গণিতের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হবে এবং বিসিএসের মতো পরীক্ষায় গণিত রাখতে হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

প্রত্যাশা সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি
- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ ঘটনাবহুল। ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব দেখেছি, স্বাধীনতা আন্দোলন দেখেছি। তার পরে পাকিস্তান হলো, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হলো। যুক্তফ্রন্টের বিজয় এবং সামরিক শাসন দেখলাম।
জনমত উপেক্ষা করেই এই দুই দল জামায়াত ও হেফাজত নামের দুই সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এতে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। অতীতের ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং সাম্প্রতিক ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আমাদের দেশে সর্বজনীন হয়নি। বামপন্থী ও মৌলবাদীরা গণহত্যা এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তবু দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিবাদ করেছে; বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। এতেই বোঝা যায় তারা কত বেশি সাম্রাজ্যবাদনির্ভর। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপস ও তোষামোদ করে ক্ষমতায় থাকে এ দেশের শাসকদল। স্বাধীন এই রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণ দরকার কেবল নয়, ছিল অতি আবশ্যিক। ক্ষমতা শুধু সচিবালয়ে কেন্দ্রীভূত না রেখে স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল। নৈতিকতার উপাদানকে কাজে লাগাতে হবে, শক্তিশালী করতে হবে। এমন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাম্রাজ্যবাদের প্রতি আপস থাকবে না, সন্ত্রাসের লালন হবে না এবং সংখ্যালঘুর ওপর নিপীড়ন ও অনিরাপত্তা থাকবে না।
প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন একটি বিকল্প ধারা ছিল, অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্তেও সেটি পূরণ হলো না। অধরাই রয়ে গেল, যার সামনে লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে। যে গণতন্ত্রে সমাজতন্ত্রের উপাদান আছে, যে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি হলো ইহজাগতিকতা এবং যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদমুক্ত অঙ্গীকার আছে; সেই ধরনের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের জন্য গণভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করা প্রয়োজন। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাম দলগুলো সেই সুযোগ কাজে না লাগিয়ে দশকের পর দশক ব্যর্থ হয়েছে। বাম দলগুলো বড় দলের জোটভুক্ত হয়ে কিছুই করতে পারবে না। এসব দল ব্যর্থ হলেও তাদের প্রয়োজন আছে গণচেতনার সংগ্রামের জন্য। তবে তাদের অবশ্যই ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তির মোহ ত্যাগ করতে হবে। তাদের প্রধান কাজই হবে জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল প্রধান দলগুলোর ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে। যারা নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে না, তারা দেশ চালাবে কী করে? রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শবাদিতা নিম্নস্তরে নেমে গেছে, স্বার্থবাদিতা প্রবল হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিকে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিমুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আগে ছাত্ররা রাজনীতি করত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এখন করে ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক মুনাফা ও লুণ্ঠনের অভিপ্রায়ে।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছে তিন জোটের রূপরেখাকে উপেক্ষা করে। একের পর এক সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু এতে জনগণের কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। বিপরীতে দলীয় রাজনীতির অনুকম্পায় অবাধ লুণ্ঠন-নৈরাজ্য চলে।
মানুষের জীবন-জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং নিপীড়ন প্রবল হয়েছে। দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বেড়েছে, বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিরোধী দল দেশে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। দেশ দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে, জনগণের গচ্ছিত টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট হয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার বেসুমার পাচারের ফলে রিজার্ভ ঘাটতিতে দেশের অর্থনীতি নাকাল হয়ে পড়েছে। ব্যাংক এলসি বন্ধ রেখেছে। ফলে আমদানিনির্ভর দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য অকল্পনীয় বৃদ্ধি পেয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতিতে দেশ এখন অতীতের সব আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি ম্লান হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের সমাজ মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য, তা নরকে পরিণত হয়েছে। এ দেশের বুর্জোয়া তথাকথিত জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল দেশবিরোধী, গণবিরোধী। রাষ্ট্রের চরিত্র বদলের জন্য তারা কিছুই করেনি। মৌলবাদের অন্ধকার থেকে, সাম্প্রদায়িকতার ছোবল থেকে, লুটেরা পুঁজির দুঃশাসন থেকে মুক্তির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের। ক্ষমতা লাভে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের সর্বক্ষেত্রে লুণ্ঠনের সুযোগ ঘটে আর ক্ষতি হয় দুর্বল শ্রেণির। ক্ষমতাসীনরা একচেটিয়া লুণ্ঠন করে। গণমাধ্যমকেও একচেটিয়াভাবে ভোগ করে চলে। ক্ষমতসীনরা ক্ষমতা ব্যবহার করে দখল, লুণ্ঠন ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। দেশি-বিদেশি সুযোগ তারা কুক্ষিগত করে, জনগণকে বঞ্চিত করে।
বাংলাদেশ জাতি রাষ্ট্র নয়, মুসলিম রাষ্ট্রও নয়। এখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে বড়াই করে, অথচ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কোনো স্বীকৃতি দিতে চায় না। সচেতন আদর্শবাদী মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সব জাতিসত্তার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে। ঘরে-বাইরে নৃশংসতা ও ভোগবাদিতা প্রবল হচ্ছে। সমাজ রূপান্তরের জন্য সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্থানীয় ও জাতীয় আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্র ও রাজনীতির মাধ্যমেই সমাজ বদলাতে হবে। রাজনীতিকদের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কারণে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসে, সামরিক আমলারা ক্ষমতা গ্রহণ করেন। অথচ আর্মি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, আমলারাও কোনো রাজনৈতিক দল নন। জাতীয় উন্নয়নে রাষ্ট্রকেই উপায় বের করতে হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করা দরকার, অথচ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো তা করে না। স্থানীয় পর্যায়ে সন্ত্রাস দমন, দুর্বল ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা বৃদ্ধি, যুব উন্নয়নে পাঠাগার স্থাপন, প্রশিক্ষণ দান ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, দুর্যোগে-বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নেই, শ্রমিকের কর্মসংস্থান নেই, বরং চালু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নাকাল অসহায় মানুষ। মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, নিপীড়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পেয়েছে মব ভায়োলেন্স। জনগণের অর্থ ব্যাংক থেকে লোপাট হলেও কারো যেন কিছু করার নেই। আবারও গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা চলছে। মানুষের দুর্ভোগের অন্ত নেই। এসব বিষয় এবং দুর্নীতিসহ প্রভৃতি জাতীয় পর্যায়ের প্রধান ইস্যু এখন। এসব জাতীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই।
আন্দোলনের মাধ্যমে শক্তি বৃদ্ধি করা যায়। সব পর্যায়ে আন্দোলন প্রয়োজন। গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতিকর্মী ও ছাত্ররা কাজ করবেন। এ ব্যাপারে আবৃত্তি, নাটক, গান, পাঠচক্র, আলোচনাসভা করা প্রয়োজন। নেতৃত্ব ওপর থেকে আসবে না, স্থানীয় পর্যায়ে থেকে তা গঠন করতে হবে। ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীকে আমরা গুরুত্ব দেব, শ্রেণিচ্যুতরা গরিবদের পাশে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু আদর্শচ্যুতরা তা পারবে না। স্থানীয়, জাতীয় পর্যায়ে পেশাগতদের আন্দোলনে দরকার। স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু করা দরকার স্থানীয় সরকারকে। সিভিল সোসাইটিকে আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। তারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে ঘোষণা দেয়, কিন্তু কাজটি করে রাজনৈতিক। সিভিল সোসাইটি নতুন ধারণা, এটি আগে ছিল না। তারা দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলে, অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব দারিদ্র্য বিমোচন করা, শিক্ষা বিস্তার করা। শিক্ষা দিয়ে কী হবে, যদি শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান করা না যায়? এনজিও বিস্তৃত হচ্ছে সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্বলতার কারণে। দাতারা সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলো দিয়ে কাজ করায়। সরকারের কাছ থেকে ভালো কাজ না পেয়ে দাতারা এনজিওগুলোকে টাকা দেয়, নানামুখী তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। সরকারের সমান্তরাল এনজিওর প্রতিনিধিদের বিদেশভ্রমণ করানো, তাদের প্রশংসা করা, পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের মতো এনজিওর এত তৎপরতা নেই। সেখানে আছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। এনজিওর কর্মকর্তাদের জীবনের সঙ্গে গরিবদের জীবনের কোনো মিল নেই। সরকারি আমলার সমান্তরালে তাই এনজিও প্রতিনিধিদের দাঁড় করানো হয়েছে। সিভিল সোসাইটির লোকেরা এনজিওর প্রতিনিধি, তাঁরা রাজনীতিক নন।
এত দিন চালু ছিল আধুনিকতা মানে পাশ্চাত্যকরণ। আধুনিকতা মানেই আমেরিকানায়ন, ইউরোপীয় ভাবধারায় চালিত হওয়া। এই ধারণায় অতি দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে, মোহ ভেঙে গেছে। এখন আধুনিকতা বলতে আমেরিকান আধুনিকতাকে বোঝায় না। কারণ আমেরিকান আধুনিকতার মধ্যে যে একটি বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা আছে, সেটি লক্ষণীয়। আধুনিকতার প্রয়োজনে এখন দরকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, মাতৃভাষার চর্চা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিকশিত করা। আরেকটি দার্শনিক মতবাদ হলো উত্তরাধুনিকতাবাদ। এটির মোহ এ দেশের তরুণসমাজ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। উত্তরাধুনিকতার প্রবণতা হলো খণ্ডবিখণ্ডতা, বিচ্ছিন্নতা। এটি পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, নারী-পুরুষ, ট্রেড ইউনিয়ন প্রভৃতির মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিচ্ছিন্নতার ধারণা ও তৎপরতাকে উসকে দিয়েছে। উত্তরাধুনিকতাবাদ বিশ্বায়ন ও সাম্রাজ্যবাদের দর্শন। বিশ্বায়ন মানেই আধিপত্য; সে আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধী। আন্তর্জাতিকতাবাদে বহুজাতি ও বহুভাষার অস্তিত্ব আছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নানা ভাষার অনুমোদন আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে যে বিশ্বায়ন সৃষ্টি হয়েছে, তার আধিপত্যবাদী হাতিয়ার হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। সব রকমের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এই ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ভাষার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব বেড়েছে। আমরা গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী ও আধিপত্যবাদী বিশ্ব চাই না। আমরা এমন গণতান্ত্রিক বিশ্ব চাই, যেখানে সম-অধিকার ও সহমর্মিতা হবে সম্পর্কের ভিত্তি। রাষ্ট্রের অধীনে নাগরিকদের অধিকার সংহত থাকবে।
সাম্রাজ্যবাদ আকাশে থাকে না। তাদের প্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করেন। সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্য বিস্তার করছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রভু হয়ে। সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত বিশ্বায়নের রূপ নিয়ে সমস্ত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে দিয়ে পদানত করতে চায় সারা বিশ্বকে। পৃথিবী এখন সাম্রাজ্যবাদ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এই দুই ভাগে বিভক্ত। বাংলাদেশে যাঁরা উদারনীতির চর্চা করেছেন এবং যাঁরা ভেবেছেন উদারনীতির মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আসবে, আজ তাঁরাও বুঝতে পেরেছেন সাম্রাজ্যবাদ কত নৃশংস ও আক্রমণাত্মক হতে পারে। আমাদের মাটির নিচে যে সামান্য প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, যে তেল ও গ্যাস আছে, সাম্রাজ্যবাদের চোখ পড়েছে সেখানেও। তারা তা দখল করে নিতে পারে যেকোনো সময়ে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। এই উপলব্ধিটি সর্বজনীন হয়েছে। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর-ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। তারা মার্কিনদের সব হামলা-আগ্রাসনের বৈধতা দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের দাঁড়াতে হবে বড় শক্তি সেই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আমাদের স্থানীয়ভাবে কাজ করতে হবে, ক্ষুদ্র আন্দোলন করতে হবে মুক্তির জন্য। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় আন্দোলন প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। গণমুক্তির লক্ষ্যে এই উপলব্ধিকে কাজে লাগাতে হবে। নয়তো আমাদের সমষ্টিগত মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি নিশ্চিত হবে না।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্রাম্পের নীতি ও বিশ্বব্যবস্থার নতুন দ্বন্দ্ব
- ড. সুজিত কুমার দত্ত

কংগ্রেসের যৌথ কক্ষে সম্প্রতি এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে আমেরিকা ‘পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা’ হয়ে উঠবে। ট্রাম্পের এই দাবিটি বিশাল এবং প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে, যা আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ, শূন্য-সমষ্টি চিন্তা-ভাবনা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্রমবর্ধমান ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় নিমজ্জিত। এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি একক, প্রধান প্রতিপক্ষ চীন। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁর ২০২০ সালের বই ‘আমেরিকান ক্রুসেড’-এ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, যেখানে চীন কেবল ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি ‘আধ্যাত্মিক প্রতিপক্ষ’।
বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক বিলি গ্রাহামের পুত্র এবং ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থক ফ্র্যাংকলিন গ্রাহাম চীনের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের MAGA আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব স্টিভ ব্যানন, কিছু ইভানজেলিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রতিধ্বনিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার গতিশীলতা এবং চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের বিষয়ে।
ট্রাম্পকে নিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর দুশ্চিন্তাও রয়েছে। কারণ এত দিন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব ও প্রভাবকে ব্যবহার করে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো বহুমুখী চরিত্রের সংকট। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা তথা বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যেক সংকটে ফেলে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের চীন ও রাশিয়ার প্রতি মনোভাবও উদ্বেগজনক। তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, কিন্তু একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিও তাঁর সহানুভূতি দেখা যায়। এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসে এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়, তবে বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট শূন্যতা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো পূরণ করতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও সংঘাত বাড়তে পারে। ট্রাম্পের নীতি বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধ এবং সংরক্ষণবাদী নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনতে পারে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় এই দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চীন তার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে তারা এই দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউরোপে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। ইউক্রেন সংকট ইউরোপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। রাশিয়া ইউক্রেন সংকট ও অন্যান্য ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে তার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি বিশ্বশৃঙ্খলায় গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সহযোগিতা অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মতো ইস্যুগুলো কোনো একক দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি এই সমস্যাগুলোর সমাধানে বাধা সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে। ট্রাম্পের নীতির কারণে কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই সংকট তৈরি হয়নি, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গভীর বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর অভিবাসনবিরোধী মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে বর্ণবাদ এবং বিভাজনকে উসকে দিয়েছে। অতএব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত সম্মিলিতভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি থেকে সরে এসে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ফিরে আসা। অন্যথায় বিশ্বব্যবস্থা আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়বে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে দৃঢ়তর করবে
- এ কে এম আতিকুর রহমান

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আমন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৬ মার্চ ২০২৫ চার দিনের এক সরকারি সফরে চীন যান। সফরকালে তিনি ২৮ মার্চ প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। তিনি চীনের হাইনান প্রদেশে আয়োজিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে যোগ দেওয়া ছাড়াও চীনের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বৈঠকে মিলিত হন। গত বছরের আগস্ট মাসে সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।
দুই.
প্রধান উপদেষ্টা ২৭ মার্চ দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশের বোয়াওয়ে অনুষ্ঠিত বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং বক্তব্য দেন। তিনি বলেন যে এশিয়ার দেশগুলোর গন্তব্য হচ্ছে পরস্পরগ্রন্থিত।
তিন.
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৭ মার্চ রাতে বোয়াও থেকে রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছেন। ২৮ মার্চ সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর প্রতিনিধিদলসহ হলে প্রবেশ করলে প্রেসিডেন্ট শি তাঁদের স্বাগত জানান। অত্যন্ত আন্তরিক এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান উপদেষ্টা গত বছর বাংলাদেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনা চীনা প্রেসিডেন্টকে অবহিত করার সময় তাঁর অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। তিনি পারস্পরিক স্বার্থেই দ্বিপক্ষীয়, বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি চীনের কাছে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্নপূরণে সহায়তা চেয়ে একটি চীন সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানান। তিনি চীনা প্রকল্প ঋণের সুদের হার কমানো এবং প্রতিশ্রুত অর্থের জন্য আরোপিত প্রতিশ্রুতি ফি মওকুফের অনুরোধ করেন। ড. ইউনূস বলেন, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তিনি চীনের কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন। এ ছাড়া তিনি শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেন।
প্রেসিডেন্ট শি প্রধান উপদেষ্টার প্রতি চীনের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশকে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের দেওয়া শূন্য শুল্ক সুবিধা ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বহাল রাখার কথা জানান। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের পথকে সুগম করার জন্য তিনি বাংলাদেশ-চীন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিনিয়োগ চুক্তির জন্য আলোচনার প্রস্তাব দেন। প্রধান উপদেষ্টার অনুরোধে চীনা প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগ ও উৎপাদনকেন্দ্র স্থানান্তরের বিষয়ে উৎসাহিত করবেন বলে অবহিত করেন। তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষ চীনা শিল্পাঞ্চল ও শিল্প পার্ক নির্মাণে চীনের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট শি বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানো, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে বাংলাদেশকে উন্নতমানের সহযোগিতা প্রদান এবং ডিজিটাল ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের চীনের ইউনান ও অন্য প্রদেশগুলোতে চিকিৎসার জন্য স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দেন। তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তাঁর দেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যে পাঁচটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তা হলো—বিনিয়োগ আলোচনা শুরু, বাংলাদেশে চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে একটি রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং চীনা অনুদান হিসেবে বাংলাদেশকে একটি হৃদরোগ সার্জারি যানবাহন প্রদান।
তথ্য মতে, মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে চীন। এ ছাড়া চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসেবে আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বোপরি রয়েছে অনুদান ও অন্যান্য ঋণ সহায়তা।
প্রধান উপদেষ্টা চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোইয়িংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং এ বিষয়ে চীনের কাছ থেকে ৫০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
চার.
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষ হওয়ার পর সেদিনই তিনি বেইজিংয়ের দ্য প্রেসিডেনশিয়ালে অনুষ্ঠিত চীনা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বিনিয়োগ সংলাপে অংশ নেন। মূলত প্রধান উপদেষ্টার সফরকে কেন্দ্র করেই ওই সংলাপ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সংলাপের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সম্পর্কে চীনা বিনিয়োগকারীদের অবহিত করা। প্রধান উপদেষ্টা একই ভেন্যুতে তিনটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন, যার বিষয়বস্তু ছিল টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ : উৎপাদন ও বাজারের সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা ও থ্রি-জিরো বিশ্বের ভবিষ্যৎ। ওই সব আলোচনা প্রধান উপদেষ্টাকে বিভিন্ন কম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সামাজিক ব্যবসা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও চীনের স্বনামধন্য কম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ এনে দেয়।
ড. ইউনূস চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ উল্লেখ করে তিনি বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সমুদ্র যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি নেপাল ও ভুটান ছাড়াও ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্য স্থলবেষ্টিত উল্লেখ করে এদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের মানবসম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ বাস করে, যাদের বেশির ভাগই যুবক, যারা উদ্যম, সৃজনশীলতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি এই তরুণ জনগোষ্ঠীর অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গত বছর ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের রূপান্তর প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে দেশে নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, যা ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
চীন সরকার ও চীনা কম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২১০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। দেশটির প্রায় ৩০টি কম্পানি বাংলাদেশের বিশেষ চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।
পাঁচ.
২৯ মার্চ সকালে চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ড. ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। এই উপলক্ষে সেখানে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বিশ্বকে বদলে দিতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি স্বপ্ন দেখারও জায়গা। আপনি যদি স্বপ্ন দেখেন, তবে তা ঘটবেই। আপনি যদি স্বপ্ন না দেখেন, তবে তা কখনো ঘটবে না। এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে, কেউ না কেউ আগে তা কল্পনা করেছিল।’
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ‘তিন শূন্য তত্ত্ব’—শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য দারিদ্র্য এবং শূন্য বেকারত্বের ওপরও আলোকপাত করেন। তিনি তাঁর ‘সামাজিক ব্যবসা’ তত্ত্বটিও তুলে ধরে বলেন যে এটি এমন একটি ব্যবসা, যা সামাজিক সমস্যার সমাধান করে। শিক্ষার্থীদের কার্বন নির্গমনে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবার উচিত নিজেদের ‘তিন শূন্য’ ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।
ছয়.
চীন সফরটি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরাজমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিন দিন দৃঢ়তর ও গভীর হচ্ছে। এই সফর বিদ্যমান সম্পর্কে আরো নতুন শক্তি জোগাবে বলেই বিশ্বাস। আমরা এর প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, যখন প্রধান উপদেষ্টা ও চীনা প্রেসিডেন্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে উভয় পক্ষ ঐকমত্য পোষণ করে।
চীন যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব বাস্তবায়ন করা গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে আরো সচল এবং গতিময় করবে। দেশে যখন বিনিয়োগপ্রবাহ নেতিবাচক ধারার দিকে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে চীনের নতুন বিনিয়োগ দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবেশ, বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
যেকোনো দেশের জন্যই চীন একটি বড় বাজার, কিন্তু বাংলাদেশ সেই বাজারটি ধরতে পারেনি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে রপ্তানির চেয়ে আমদানি প্রতিবছরই বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চীন থেকে দুই হাজার ১১২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। অথচ একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৮ কোটি ডলারের পণ্য। রপ্তানি বাড়াতে হলে চীনের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এ ছাড়া যেসব পণ্য চীনের চেয়ে বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ কম হবে, সেসব উৎপাদনের জন্য চীনা বিনিয়োগকারীদের এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ওই সব পণ্য চীন ছাড়াও অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা যাবে।
বাংলাদেশ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী প্রতিবেশী ভারত ছাড়াও থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরে গিয়ে থাকে। বাংলাদেশের কাছাকাছি চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশিদের চিকিৎসাসেবার জন্য চারটি হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধির আভাসও দেওয়া হয়েছে। যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় যদি তুলনামূলকভাবে কম হয় এবং চিকিৎসার মান উন্নত হয়, তাহলে এই প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয় হবে। এ ছাড়া নতুন করে যেসব চুক্তি বা স্মারক স্বাক্ষরিত হলো, তা বাস্তবায়িত হলে সেসবের মাঝে এই সফরের সাফল্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে চীন সব সময়ই বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে। আমাদের বিশ্বাস, চীন মায়ানমারকে চাপ দিলে প্রত্যাবাসন সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু চীন যে ভূমিকা নিলে প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে, তা নেবে কি না সেই প্রশ্নটি রয়েই যায়।
আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে যে সমীকরণ রক্ষা করে চলছে, সেভাবেই চলবে বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। কারণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে আছে।
যা হোক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব