কোন প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করতে পারলে ভালো লাগবে আপনার?
ভালো লাগবে বলতে জায়গা তো ওই একটাই। শুরু সেখান থেকেই হোক!
অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয় থেকেই শুরু করতে চাইছেন। কিন্তু ভালো লাগার ‘জায়গা ওই একটা’ই কেন? আরো তো অনেক কিছুই থাকার কথা।
হ্যাঁ, তা হয়তো আছে।
কিন্তু খেলা ছাড়ার পর আরো অনেক পরিচয়ও তো যোগ হয়েছে। ক্রিকেটের কথাই যদি বলি, প্রধান নির্বাচক ছিলেন আপনি। এরপর ক্রিকেট প্রশাসনে যুক্ত আছেন দীর্ঘদিন।
দেখুন, আমাকে কেউ ক্রিকেটার আকরামের বাইরে আর কোনো পরিচয়ে চেনে বলে আমার মনে হয় না। আমি অন্তত কোনো সাধারণ মানুষকে কোনো দিন বলতে শুনিনি যে আকরাম বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক। পথচলতি মানুষ কথা বলার জন্য ক্রিকেটার আকরামকেই থামায়। আমিও থেমে থাকতে চাই ওই একটি পরিচয়ে।
এক জীবনের পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়া সেই আসরটিতে ক্রিকেটারদের অনন্ত চাপও তো সামাল দিতে হয়েছিল।
একদম। আসরের শুরু থেকেই প্রচণ্ড চাপে ছিলাম আমরা। কারণ এর আগে ১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফিতে খুব বাজেভাবে ব্যর্থ হয়েছিলাম। এরপর তো ধাপে ধাপে চাপে আরো কোণঠাসা হতে হতে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।
ওই সাফল্য নিয়ে আলোচনা উঠলে ফাইনাল-সেমিফাইনাল নয়, হল্যান্ড ম্যাচটি নিয়েই কথা হয় বেশি। বৃষ্টিবিঘ্নিত সেই ম্যাচে আপনার অপরাজিত ৬৮ রানের ইনিংসটি না হলে বাংলাদেশ আসর থেকে ছিটকেই যেত। অনেককেই বলতে শুনেছি, আপনার ওই ইনিংসটির ওপরই দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট। আপনিও তা-ই মনে করেন কি?
আমি না খেললে হয়তো ওই ইনিংসটি অন্য কেউ খেলত। যার ব্যাটেই ম্যাচ জেতানো ইনিংসটি আসত, তার ক্ষেত্রেও এভাবে বললে হয়তো ভুল বলা হতো না। কারণ একভাবে দেখলে যাঁরা ও রকম কথা বলে থাকেন, দৃষ্টিভঙ্গিটা সঠিক। ওই ইনিংসটি না হলে সত্যি আজকের অনেক কিছু হতো না। আমরা আবার ব্যর্থতার হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে দেশে ফিরতাম। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপও খেলা হতো না আমাদের। পেতাম না ওয়ানডে ও টেস্ট স্ট্যাটাসও। ওইবার ব্যর্থ হলে আবার কবে আমরা বিশ্বকাপে খেলতাম, আমি জানি না। ক্রিকেটও রাতারাতি দেশের এক নম্বর খেলা হয়ে যেত না। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে তিনি আমাকে ওই ইনিংসটি খেলার মতো পরিস্থিতিতে ফেলেছিলেন এবং আমি সেই পরীক্ষায় পাস করেছিলাম। তাই কেউ যখন বলে, ওই ইনিংসের ওপরই আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট দাঁড়িয়ে, আমি সাদরে গ্রহণ করি। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবদান রাখা পেছনের অজস্র মানুষও আছে, যাঁদের খোঁজ কেউ কোনো দিন পাবে না। সুযোগ থাকলে তেমন দু-একজন মানুষের কথাও বলতে চাই।
অবশ্যই। বলুন।
কিছুদিন আগে বিসিবি সভাপতি বোর্ডের সব কর্মীর সঙ্গে বসেছিলেন। কর্মী সম্মেলন বলতে পারেন। পরিচালক হিসেবে সেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। ওখানে সবাই মনের দুয়ার খুলে কথা বলেছেন। এঁদের একজন আমরা আইসিসি ট্রফি জেতার কিছুদিন পর এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন এক আত্মীয়কে রিসিভ করতে। আমিও তখন কোথাও যাচ্ছিলাম বা দেশে ফিরছিলাম। ক্রিকেটার আকরামকে দেখে তিনি এমন পিছু নিয়েছিলেন যে আত্মীয়কে রিসিভ করার কথাই ভুলে গিয়েছিলেন! এর কিছুদিন পর তিনি ক্রিকেট বোর্ডের চাকরিতে চার হাজার টাকা বেতনে যোগ দেন। এখন পান ৫০ হাজার। তাঁর এক জীবন এই ক্রিকেটের পেছনেই গেছে। আরেকজনের কথা বলি, যিনি প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে ঝুলে ঝুলে বিসিবিতে আসেন। হিসাব করে দেখেছেন, জীবনের চারটি বছর তিনি বাসেই পার করে দিয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে আড়ালের এই নায়কদের কথাও আমি মনে রাখতে চাই। নাম না-জানা এ রকম অসংখ্য মানুষ নীরবে অবদান রেখে গেছেন বলেই আজ আমরা এই জায়গায়।
আবার একটু হল্যান্ড ম্যাচে ফিরি। তোয়ালে দিয়ে ভেজা মাঠ সদলবলে মুছতে নেমে যাওয়ার এক গল্পও আছে তাতে। হঠাৎ করে এত তোয়ালের সরবরাহ কোত্থেকে এসেছিল?
(হাসি...) আর যা-ই হোক, তোয়ালের অভাব আমাদের ছিল না। গল্পটা খুলেই বলি। আইসিসি ট্রফি খেলতে যাওয়া দলগুলোর হোটেল ছিল ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। কোনো হোটেল মাঠ থেকে পাঁচ মিনিট দূরত্বে তো কোনোটি আবার ৫০ মিনিট। তবে মাঠের কাছে থাকা দলগুলোর আরাম হয়নি তাতে। কারণ নিয়ম করে দেওয়া হয়েছিল, কাছে-দূরে যেখানেই যে দল থাকুক, কুয়ালালামপুরে সকালের ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে প্রতিটি দলকে ভোর ৫টায় হোটেল থেকে রওনা হতে হবে। আমাদের তাই উঠতে হতো আরো আগে। চোখে ঘুম লেগে থাকত। আবার বাসের এসিতে শান্তিতে ঘুমানোরও উপায় ছিল না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এড়িয়ে একটু ঘুমাতে আমরা নিজেরাই ভেবে একটি পথ বের করলাম। হোটেলে যে যার রুম থেকে যত তোয়ালে আছে নিয়ে নামতাম। বাসে উঠেই তোয়ালে জড়িয়ে দিতাম ঘুম। আমাদের টিম বাস ছিল তোয়ালের বিশাল স্টক। সেই স্টক যে এভাবে কাজে লেগে যাবে, ভাবতে পারিনি। এত বছর আগে আরআরআই (রবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট) মাঠে বৃষ্টির পানি শুকানোর আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। কিন্তু খেলা শুরু করা না গেলে আমরা বাদ। তাই বাস থেকে সব তোয়ালে নামিয়ে আনা হয়। আমরাই শুধু নই, তোয়ালে দিয়ে মাঠ মোছার কাজে নেমে পড়েছিলেন টুর্নামেন্ট কাভার করতে দেশ থেকে যাওয়া সাংবাদিকরাও। সঙ্গী হয়েছিলেন খেলা দেখতে আসা বাংলাদেশি দর্শকরাও।
বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে আপনি নিজেও ঘুরপথের আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিয়মসম্মত না হলেও দেশের জন্য কাজটি আপনি করেছিলেন।
(হাসি...) আমার লক্ষ্যই ছিল যেকোনো মূল্যে সময়ক্ষেপণ করা। কারণ ২০ ওভার হয়ে গেলেই ফল নির্ধারিত হয়ে যেত। ১৫ রানে ৪ উইকেট হারানো আমরা তখন বেশ পিছিয়ে। হেরে বাদও পড়ে যেতাম। হল্যান্ডের বোলাররা দ্রুত ২০ ওভার সেরে ফেলতে চাইছিল, কিন্তু আমি একবার হেলমেট খুলি তো আরেকবার গ্লাভস। আবার কিছুটা পায়চারি করেও সময় নষ্ট করছিলাম। আর ছিলাম বৃষ্টি নামার অপেক্ষায়। মনে আছে, একজন আম্পায়ার ছিলেন ইংলিশ। তিনি বারবার আমাকে সময় নষ্ট করছি বলে সতর্ক করে যাচ্ছিলেন। পরে সে জন্য আমার জরিমানাও হয়েছিল। কিন্তু দলকে বাঁচিয়ে ফেলার পর কী আসে-যায় তাতে! আল্লাহও সহায় ছিলেন। আমরা হৃদয় দিয়ে মাঠ শুকালাম, খেলা হলো এবং আমিও কী করে যেন ওই ইনিংসটি খেলে ফেললাম!
৪৯.৫ ওভারে ১৭১ রান করেছিল হল্যান্ড। বৃষ্টির পর খেলা শুরুর সময় বাংলাদেশকে ৩৩ ওভারে ১৪১ রানের টার্গেট দেওয়া হয়। ওই সময় আপনি নিজে জেতার কত পারসেন্ট সম্ভাবনা দেখেছিলেন?
১০ পারসেন্টও না। দেশের মানুষের দোয়া ছিল। দোয়া ছিল আমার মায়েরও। আবাহনীর এক কর্মকর্তা, আমরা যাঁকে এরশাদ ভাই বলে ডাকতাম, বৃষ্টি বিরতির সময় আমি তাঁর কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে চট্টগ্রামে আমাদের বাসার ল্যান্ডফোনে ফোন করি। সেদিন ছিল শুক্রবার। আম্মাকে ফোন করে দোয়া চাই। তাঁর প্রার্থনার দুই হাতও সেদিন আমার পিঠে ছিল নিশ্চিত।
এত বছর পর পেছন ফিরে তাকালে সেই বাংলাদেশ দলটিকে কোন উচ্চতায় দেখেন?
আপনি সম্ভবত তুলনা করতে বলছেন। আমি কোনো তুলনায় যাব না। এখনকার দলের সঙ্গে তো নয়ই। তবে এটা বলতে পারি, আমরা ছিলাম ‘সেলফ মেইড’। এখনকার ক্রিকেটাররা যত সুযোগ-সুবিধা পায়, এর ছিটেফোঁটাও আমরা পেতাম না। আমরা নিজেরা নিজেদের তৈরি করেছিলাম। ভাবতে ভালো লাগে যে আমরা কষ্ট করেছিলাম বলেই পরের প্রজন্ম সৌভাগ্যের মুখ দেখেছে।
আইসিসি ট্রফি জেতার পরপরই আপনি মুদ্রার অন্য পিঠ দেখতে শুরু করেছিলেন।
মানুষের জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই। এটা ঠিক যে আমার ফর্মও ভালো যাচ্ছিল না। নেতৃত্ব হারালাম। তবে কষ্টটা অন্য জায়গায়। (আমিনুল ইসলাম) বুলবুলকে অধিনায়ক করে নেপালে একটি টুর্নামেন্ট খেলতে যে দলটি পাঠানো হয়, আমি তাতে ছিলাম না। দুঃখের বিষয়, না থাকার খবরটি আমি জেনেছিলাম সাংবাদিকদের কাছ থেকে। আর ‘রেডিমেড’ ফল পাওয়ার জন্য আইসিসি ট্রফি জেতার পরপর দলে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। আমাদের ক্রিকেট কালচারই এ রকম। সেটা এখনো বদলায়নি। বদলায়নি বলেই দেখুন, ১৯৯৭-এর পর এত বছরে আর একটি ট্রফিও আমরা জিতিনি।
বলছিলেন যে নির্বাচকরা না জানিয়েই আপনাকে দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন। পরে নির্বাচকজীবনে এই শিক্ষাটি কি আপনি কাজে লাগিয়েছেন?
অবশ্যই। যে যেখান থেকেই আসুক, আমি সম্মান করি। আমার কাছে সবাই সম্মানিত। চাপে থাকা ক্রিকেটারদের আমি স্বস্তিতে রাখার চেষ্টা করেছি। কাউকে বাদ দিলে সবার আগে আমি নিজেই তাঁকে বিষয়টি জানাতাম। নাসির হোসেন, রকিবুল হাসান, নাঈম ইসলামসহ অনেকেই বাদ পড়ার আগে থেকে জানত যে ওরা দলে থাকছে না।
২০১২-র এশিয়া কাপের দলে তামিম ইকবালকে না রাখার জন্য চাপ দিয়েছিলেন তখনকার বোর্ড সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল। এর প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচকের পদ থেকে আপনার পদত্যাগও স্মরণীয় হয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। ওই ঘটনার ভেতর থেকেও একটু ঘুরিয়ে আনুন আমাদের।
ঘটনা কিন্তু শুধু তামিমের নয়, আরো দু-একটা ছিল। প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার সাফ কথা ছিল, ‘আপনার সঙ্গে আলোচনা সব সময়ই করব, কিন্তু একবার আমি সই করে ফেললে সেই দল আর বদলানো যাবে না।’ তিনিও সম্মত ছিলেন। সেবার অবস্থাটা এমন যে ফিজিওর ক্লিয়ারেন্স পেলে তামিম দলে থাকবে, না হলে নয়। সেটি পেয়ে যাওয়ার পর আমি দল করে ফেলি। কিন্তু তিনি (কামাল) তামিমকে দলে না থাকার জন্য জেদ ধরেন। তাই পদত্যাগ করি।
পদত্যাগ করে আবার ফিরতেও হয়েছিল।
হ্যাঁ, অনেক বিতর্ক হচ্ছিল। পত্রপত্রিকায় কামাল ভাইয়ের তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল। এর মধ্যে একদিন গণভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে ডেকে পাঠান। সেখানেই টুটুল ভাইকে (বিসিবির সাবেক পরিচালক ও ফুটবলার দেওয়ান শফিউল আরেফীন) তিনি বলে দেন, আমাকে যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়।
ওই সময় দলের সবচেয়ে বড় দুই তারকা সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের বিরুদ্ধে কিন্তু বিস্তর অভিযোগ ছিল; বিশেষ করে দলীয় শৃঙ্খলা মানার ক্ষেত্রে। নানা ঘটনায় ওই দুজনেরও কি দায় ছিল না?
অস্বীকার করছি না। তবে বোর্ডও দায় এড়াতে পারে না। আমি তখন প্রধান নির্বাচক ছিলাম। ডিসিপ্লিন আমার দেখার বিষয় ছিল না। তখনকার ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির প্রধান (এনায়েত হোসেন সিরাজ) বিষয়গুলো ভালোভাবে সামলাতে পারলে ওদের নিয়ে এত বিতর্ক হতো না।
২০১৩ সালে বিসিবির নির্বাচন থেকে পরিচালক হয়ে আসা আপনি ক্রিকেট অপারেশন্স প্রধানের দায়িত্ব নেন। সেই সময়ও তো শৃঙ্খলাপরিপন্থী অনেক ঘটনাই ঘটিয়েছেন তারকা ক্রিকেটাররা।
নির্দিষ্ট করে বললে সুবিধা হয় কথা বলতে।
২০১৪ সালে অনুমতি না নিয়েই সিপিএল (ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ) খেলতে চলে যাওয়া সাকিবকে লন্ডন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন মাত্রই কোচ হয়ে আসা চন্দিকা হাতুরাসিংহে এমন কঠোর ছিলেন যে বিসিবি তাঁকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। প্রচার আছে যে সাকিব আপনার মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতেই লন্ডনের ফ্লাইট ধরেছিলেন। কিন্তু পরে পরিস্থিতি বুঝে আপনি বিষয়টি চেপে গিয়েছিলেন বলেও আলোচনা শুনেছি।
একদম ভুল কথা। ছুটি দেওয়ার দায়িত্ব আমার ছিল না, সেটি সিইওর (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা)। ক্রিকেটাররা ছুটির আবেদন করে তাঁর বরাবর। তবে অনেকেই সরাসরি বোর্ড সভাপতির অনুমোদন নিয়ে চলে যেত। সাকিব সিপিএলে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে কথা বলেনি। পাপন ভাই (সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান) ছাড়া ও কারো সঙ্গে কথা বলত নাকি? অনেক অনুমতি পাপন ভাই নিজেই দিতেন। পরের ১০ বছরেও তা-ই হয়েছে। পুরো সিস্টেমটা এখানেই নষ্ট হয়ে গেছে।
আপনি ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রধান থাকাকালে ‘পঞ্চপাণ্ডব’দের সেরা সময়ের কারণে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সোনালি যুগ চলছিল। এঁদের সবাইকে সামলানোর হ্যাপাও নিশ্চয়ই ছিল।
হ্যাঁ, আমার সময়টা সবচেয়ে কঠিন ছিল। সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক ও রিয়াদ—প্রত্যেকেই ভালো খেলোয়াড় এবং প্রতিভাবান। ওদের একেকজনের ছিল একেক রকম দাবিদাওয়া। সেসব মেটাতে হতো। মুশফিকের দাবি যেমন থাকত একেবারেই অন্য রকম। ওকে খুশি রাখতে অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হতো। এই যেমন ধরুন, ঈদের পরদিন ওর অনুশীলনের জন্য মিরপুরের উইকেট তৈরি রাখতে হবে। সেটি করতে গেলে আবার মাঠকর্মীদের ঈদের ছুটি বাতিল করতে হতো। আমি নিজে যেহেতু ক্রিকেটার ছিলাম, ওদের চাহিদা যথাসাধ্য পূরণের চেষ্টা করেছি। এটা বলতে পারি যে ওরা এর ফলও দিয়েছে।
সাকিবকে সামলানো কতটা কঠিন ছিল?
আগেও বলেছি, আমি সবাইকে সমান চোখে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু খারাপ লাগত একজনের জন্য সবকিছু কত সহজ আর অন্যদের জন্য কত কঠিন! ওর জন্য যেকোনো অনুমতি পাওয়া ছিল সহজ ব্যাপার। বোর্ড সভাপতিও চাইতেন—পারফরম করছে যেহেতু, খুশি রাখি। সাকিব এর সুবিধা নিত। আমি ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রধান, কিন্তু সাকিবের বিষয়গুলো দেখতেন পাপন ভাই। এগুলো দেখা আমার জন্য কঠিন তো অবশ্যই ছিল।
হাতুরাসিংহের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এ রকমই ছিল?
হ্যাঁ, হাতুও আমাকে টপকে বোর্ড সভাপতির কাছে চলে যেতেন। আসলে হাতে গোনা দু-তিনজনের জন্যই নিয়মভঙ্গের ঘটনাগুলো বেশি ঘটত। একই সঙ্গে এটি না বললে নয় যে সাকিব যেমন টাফ টাইম দিয়েছে, তেমনি অনেক সময় অনেক কিছু সহজও করে দিয়েছে। পারফরম করে বাংলাদেশকে বড় বড় ম্যাচ জিতিয়েও দিয়েছে। দেশের জন্য ওর অবদানকে খাটো করার সুযোগ তাই নেই।
এমন কথাও চালু আছে যে সাকিবের মতো তারকা ক্রিকেটারদের কিছু বলার সাহস ছিল না বিসিবির পরিচালকদের। কতটা সত্য?
১০০ ভাগ। বিসিবিতে দুই পদের পরিচালক আছেন। এক পদের আছেন, যাঁরা টাকা-পয়সা খরচ করে আসেন এক্সপোজার নিতে। খেলোয়াড় ছিলেন না, এমন পরিচালকদেরই সাহস ছিল না ক্রিকেটারদের কিছু বলার।
আপনি ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রধান থাকার সময় বাংলাদেশ দলের সেরা সাফল্য কোনটি?
অনেক তো! কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি? ২০১৭-তে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনাল খেলা। শ্রীলঙ্কার মাটিতে ওদের হারিয়ে শততম টেস্ট জয়। ২০১৬-তে টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা। ফাইনাল খেলেছি ২০১৮-র ওয়ানডে এশিয়া কাপেরও। সেই সঙ্গে টেস্টে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডকে হারানো। আমার কাছে এই সাফল্যের মূল্যটা বেশিই। এখন বলতে পারেন, দেশের মাঠে স্পিন সহায়ক উইকেটে এই সাফল্য। কিন্তু আমরা হোম অ্যাডভান্টেজ নেব, সেটি জেনেই অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এসেছিল। আর এমনও তো নয় যে ওরা স্পিনার ছাড়াই খেলতে এসেছিল!
এই দায়িত্ব পালনকালে কোনো কষ্ট আছে?
অবশ্যই আছে। ভালো ভালো খেলোয়াড় আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ওদের খারাপ পথ থেকে দূরে রাখতে পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট লাভবান হতো।
কয়েকটি উদাহরণ দিন।
দেওয়া কি খুব জরুরি? দিচ্ছি। মোহাম্মদ আশরাফুল, নাসির হোসেন, শাহাদাত হোসেন রাজীব ও রকিবুল হাসানের মতো কিছু নাম।
খারাপ পথ থেকে দূরে রাখতে পারেননি বলছিলেন। এঁদের মধ্যে আশরাফুল আর সাকিবের নামের সঙ্গে স্পট ফিক্সিংয়ের কালি লেপ্টে আছে। আপনারা কি আগে থেকে কিছু টের পেয়েছিলেন?
সাকিবেরটা একদমই টের পাইনি। তবে আশরাফুল যে ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকতে পারে, সে কথা হেড কোচ থাকার সময় জেমি সিডন্স নিয়মিতই বলতেন। তা ছাড়া বোর্ড সভাপতি কামাল ভাইও আশরাফুল এ রকম কিছু করছে বলে সন্দেহ করতেন। কিন্তু আমরাই সিরিয়াস ছিলাম না। তাই ওর যেমন, তেমনি বোর্ডেরও দোষ ছিল। আমরা ওকে ভালো পথে আনার জন্য সিরিয়াস হলে হয়তো এ রকম অসাধারণ একজন ব্যাটারকে হারাতে হতো না।
যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেট কি সেই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছে?
এককথায়, না। ১৯৯৭-এর পর অনেক জনপ্রিয়তা পায় ক্রিকেট। সেই সময় থেকে খেলোয়াড় যতটা বের হয়ে আসার কথা ছিল, ততটা হয়নি। ট্রফিও জিতিনি। যুবারা যুব বিশ্বকাপ জিতেছে, মেয়েরাও এশিয়া কাপ জিতল। কিন্তু ছেলেদের জাতীয় দলের দলীয় কোনো ট্রফি নেই। এই কষ্টটা রয়ে গেছে। খেলোয়াড়দের দোষারোপ করলেই হবে না, বোর্ডও দায়ী। সঠিক পথে আমরা এগোতে পারিনি। পরিকল্পনার অভাবও ছিল। খেলোয়াড়কে থিতু হওয়ার সময় আমরা দিই না। দুই সিরিজ পরই অধিনায়কের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করতে শুরু করি। বোর্ডও সোশ্যাল মিডিয়ার তালে তালে চলতে চায়। আমিও যেহেতু ক্রিকেট প্রশাসনে আছি, তাই এর দায় আমাকেও নিতে হচ্ছে।
সম্পর্কিত খবর
বাইরে কা কা করছে একটা কাক। নাজুকে শোনাতে পারলে খুশি হতো। সেদিন বলছিল, ‘ভোরে এখন আর কাকের ডাক শুনি না। কাক কি হারিয়ে যাচ্ছে? কাকের শহর ঢাকায় সাতসকালে একটা কাক ডাকবে না—এ কেমন কথা!’
কাক নিয়ে অবশ্য মাথাব্যথা নেই মাশুকের।
মাশুকের ভাবনায় বাদ সাধে এক খদ্দের। দিনের প্রথম কাস্টমার।
‘অরিজিনাল লেদার শু আছে?’
প্রশ্নটা বিরক্তিকর! সমিতির মার্কেটে এসেছে লেদার শু কিনতে? মাশুক কুশলী জবাব দেয়, ‘পিওর লেদার পাবেন না, মিক্সড হবে। তবে এগুলা লেদারের চেয়ে কম না।
‘দেখান তো ভাই।’
র্যাক ভর্তি বিভিন্ন ধরনের জুতা সাজানো। এক দিকে আঙুল তুলে মাশুক বলল, ‘ওইখানে নতুন কিছু শু আছে। দেখেন কোনটা পছন্দ হয়।
লোকটা এগিয়ে গেল র্যাকের দিকে। মাশুক এই জুতার দোকানে ক্যাশ আগলায়। জুতা দেখানো বা খদ্দেরের পায়ে গলিয়ে মাপ ঠিক করা তার কাজ নয়। অল্পবয়সী দুই তরুণ কাজটা করে। কিন্তু সকাল সাড়ে দশটায়ও কারো আসার নাম নেই।
‘ভাই, এই জোড়া নামান। নিয়া আসেন, দেখি।’
নরম কুশনের টুলে গিয়ে বসল ক্রেতা। ছোকরা দুটো আসছে না কেন? মাশুকের মাঝেমধ্যে এমন রাগ হয়, দুজনের নামে মালিকের কাছে নালিশ দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু দমে যায়। ওরা দুজনই ছেলের বয়সী। মায়া লাগে।
মাশুক বাধ্য হয়ে লেগে গেল খুবই অপ্রিয় একটা কাজে। লোকটা ধুলোমলিন পুরনো জুতা থেকে পা দুটি বের করতেই ছুটে পালাতে ইচ্ছা করল তার। মোজায় এমন গন্ধ, কেনার পর চিজ দুখানায় কখনো পানি পড়েছে কি না সন্দেহ!
লোকটা নতুন জুতা পায়ে গলিয়ে মচমচ করে কয়েক কদম হেঁটে দেখল। তারপর মুখ বাঁকা করে বলল, ‘নাহ, জুত নাই। রাইখ্যা দেন।’
লোকটার ধুলোমলিন পুরনো জুতা ডাকঘরের সিলমোহরের মতো একটা ছাপ রেখে যায় মাশুকের মনে। পরিবার থেকে দলছুট এই দেহটা এখনো বয়ে বেড়ানো যাচ্ছে। যখন আরো বয়স হবে, কর্মক্ষম থাকবে না, ঠিক ওই ধুলোমলিন জুতা বনে যাবে সে। হায় জীবন!
তাড়াহুড়া করে আসায় সকালের নাশতাটাও সারা হয়নি আজ। পেটে সারিন্দা বাজাচ্ছে ক্ষুধা। কিছু মুখে দেওয়া দরকার। কিন্তু ওরা না এলে বাইরে যাবে কী করে?
পরিষ্কার থাকার একটু বাতিক আছে মাশুকের। লোকটার নোংরা মোজা হাতড়ে গা ঘিনঘিন করছে। হাত না ধুলেই নয়। এ সময় সুরেলা আওয়াজ তোলে মোবাইলের রিংটোন। কল দিয়েছে নাবিলা। হাত ধোয়ার কথা ভুলে কল রিসিভ করে মাশুক।
‘কী করছ, বাবা?’
‘এইতো—দোকানে বসছি।’
‘আজ দুপুরে আসতে পারবা?’
‘কেন?’
‘তোমার এই একটা বিশ্রী স্বভাব, একটা প্রশ্ন করলে জবাব না দিয়া পাল্টা প্রশ্ন করো। আসতে পারবা কি না?’
‘খুব দরকার?’
‘উহু রে, আবার প্রশ্ন! আইসো।’
‘দেখি।’
‘দেখি আবার কী? দেখার কী আছে? আসবা, ব্যস।’
লাইন কেটে দেয় নাবিলা। মাশুকের হৃদয়গভীরে একটা কুলুকুলু স্রোত বয়ে যায়। ওদের কাছে যাওয়ার সুযোগ হলে এমন অনুভূতি হয়। আজব এক পরিস্থিতি। পরিবার নিজের, কিন্তু বাসা ওদের।
মাস কয়েক আগে মিরপুরের রুফটপ ওই ফ্ল্যাটে উঠেছে ওরা। নাজু, নাবিলা আর নাহিদ। বড় একটা রুম দুই ভাগ করে দুটি বানানো হয়েছে। একটায় রান্নাবান্না চলে। সেখানেই এক কোণে খাট পেতে থাকে নাজু আর নাবিলা। বাথরুম একটাই। সেটা ছাদের আরেক প্রান্তে। আরেকটা রুম নাহিদের। সেখানে জায়গা হয়নি মাশুকের। মা-মেয়ে যত স্বচ্ছন্দে একসঙ্গে থাকা যায়, বাপ-ছেলের এক রুমে থাকাটা সহজ নয়। বিশেষ করে ছেলে যদি তরুণ হয় আর মুখের ওপর বলে, ‘কী করলা জীবনে? মায়ের জীবন তো তামা করছই, আমাদের জন্যও তো কিছু করতে পারলা না!’
বাধ্য হয়ে মেসে উঠেছে মাশুক।
এর মধ্যে দোকানের ছেলে দুটি এসেছে। সমিতির মার্কেটের দোকানগুলোতে ক্রেতার ভিড় জমছে। এখানে বেশির ভাগই নিম্নমধ্যবিত্ত। তারা দেখে বেশি, কেনে কম। কিনলেও দোনামনা থাকে—ঠকলাম কি না। এর পরও জুতার দোকানে বিক্রি মন্দ না। দিনে সাত-আট জোড়া বিক্রি করতে পারলে ভালো লাভ থাকে।
দুপুরের দিকে ফোনে মালিকের কাছ থেকে ঘণ্টা তিনেকের জন্য ছুটি নেয় মাশুক। বলে, বাসায় জরুরি কাজ। ছেলে দুটির ওপর দোকানের ভার বুঝিয়ে দিয়ে মিরপুরের বাস ধরে সে। মাথায় এলোমেলো চিন্তা। হঠাৎ এই জরুরি তলব কেন? টাকার দরকার, না অন্য কোনো সমস্যা? নাজু আজকাল নিজে ফোন করে না, মেয়েকে দিয়ে করায়। এখন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। এই মুহূর্তে টাকা দেওয়া সম্ভব না, যা দেওয়ার তা তো দিয়েছেই।
মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বাস থেকে নেমে যায় মাশুক। এখান থেকে বাসায় যেতে রিকশায় ৫০ টাকার মতো লাগে। মাশুক হেঁটেই যায়। গলির মাথায় সবজির ভ্যান। বাসায় কিছু সবজি নেওয়া যায়। খুশি হবে ওরা। কিন্তু দাম শুনে দমে যায় মাশুক। নতুন আলু ৭০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা। সবজির দামের কাছে জীবনের দাম পানি। সস্তার সবজি অবশ্য আছে। মুলা। বিশ টাকা কেজি। মাশুক নেয় কেজিখানেক।
এ বাসায় লিফট নেই। সিঁড়ি ভেঙে ছয়তলায় ওঠা কষ্ট। প্রবল ইচ্ছাশক্তি মাশুককে টেনে তোলে। টুকটুক করে মৃদু টোকা দেয়। নাজু দরজা খোলে।
‘তুমি!’
যেন তিরিশ বছরের জীবনসঙ্গীকে চিনতে অনেক কষ্ট। মাশুক গা করে না। সয়ে গেছে। তবে নাজুর জন্য মাশুকের এখনো অনেক মায়া।
মাশুক বিরস মুখে বলে, ‘নাবু ফোন দিয়া আসতে বলল। ভাবলাম জরুরি।’
‘আসো।’
দরজা থেকে সরে জায়গা করে দেয় নাজু। পেছনে নাবিলা এসে দাঁড়িয়েছে। মাকে তীক্ষ কণ্ঠে বলে, ‘বাবাকে দেইখা চমকানোর কী আছে, মা? নয় দিন পর আসল বেচারা!’
নাজু বলে, ‘আমাকে তো বললি না?’
‘তোমাকে বইলা কী হইব? তিতা কথা ছাড়া কিছু জানো?’
‘তিতা কথা তো এমনিই বাইর হয় না। তোর বাপের চুল পাইকা সাদা হইয়া যাইতেছে, তবু আক্কেল-বুদ্ধি পাকল না! দেখ, মুলা নিয়া আসছে! এইসব বলে কোনো বাসায় নেওয়ার জিনিস!’
‘মাসের কয় তারিখ আইজ? তুমি আমার পকেটের অবস্থা দেখবা না?’
‘টাকা না থাকলে আনবা না। তাই বইলা গ্যাসের ফ্যাক্টরি নিয়া আসবা?’
নাবিলা ফিক করে হেসে ফেলে। নাজুও যোগ দেয়।
মাশুক বিরক্ত হয়ে বলে, ‘এই জন্যই তোদের কাছে আসতে ইচ্ছা করে না। ভালো কিছু করলেও মরণ! মুলা দিয়া পাতা শুঁটকির চচ্চড়ি তুমি পছন্দ করো না? এই জন্যই তো...। এখন বলো কী হইছে?’
নাবিলা বলে, ‘কিছু হয় নাই, বাবা। বাসায় আজ ভালো কিছু রান্না হইছে। আমরা পোলাও-মাংস খাব, আর তুমি বাদ থাকবা, সেইটা কি হয়?’
মাশুক এতক্ষণে খেয়াল করে, রান্নাঘর প্লাস থাকার ঘরটায় দারুণ সুবাস! কয়েক দিনের না-খাওয়া অভাগার মতো হাসি ফোটে তার। বলে ফেলে, ‘পোলাওয়ের সঙ্গে কী করছ তোমরা? গরু, না মুরগি?’
নাবিলাও হাসে, ‘দুইটাই।’
‘কী উপলক্ষে এত কিছু?’
নাজু বলে, ‘আরে, নাহিদ ওর এক বন্ধুরে খাওয়াইব। সেও রাইড শেয়ার করে।’
এখন দুপুর দুইটা। এত বেলা পর্যন্ত না-খাওয়া মাশুকের আর তর সয় না। বলে, ‘কী দিবা দাও। খুব ক্ষুধা লাগছে।’
নাজু ভেতরে ভেতরে টেনশনে অস্থির। আজকের দাওয়াতের বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। নাহিদ যে বন্ধুকে নিয়ে আসবে, সেও পড়াশোনা ছেড়ে রাইড শেয়ার করে। নাহিদ বলেছে, ওর জানা মতে ছেলেটির বাজে কোনো নেশা নেই। কোনো মেয়ের সঙ্গেও নেই, তবে খুঁজছে। পছন্দমতো পেলে বিয়ে করবে। নাবিলাকে দেখে সে রকম আগ্রহ দেখালে বিয়ের কথা পাড়বে নাহিদ।
নাবিলা দেখতে-শুনতে মন্দ না। মেধাবীও। এসএসসিতে সায়েন্স থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। মেডিক্যালে পড়ার ইচ্ছা। না হলে পাবলিক ভার্সিটি। কিন্তু নাহিদ বলে, বাবার যে অবস্থা, কলেজে থাকতে থাকতে নাবিলাকে পার করতে হবে। আইবুড়ো হলে তখন ছেলে পাওয়া মুশকিল।
নাজু একটু আপত্তি তুলেছিল, অমনি রেগে গেল ছেলেটা। বলল, ‘আমি এত বিয়ার করতে পারব না, মা। বোঝা হালকা করতে হইব। আমারও তো ভবিষ্যৎ আছে। বি প্র্যাকটিক্যাল!’
নাজু আর কিছু বলেনি। টাকা-পয়সা না থাকলে এ বয়সে অনেক অধিকার বেদখল হয়ে যায়। নাহিদ পইপই করে বলেছে, ‘বাবা যেন কিছুতেই জানতে না পারে। পরে জানাইলেই হইব।’
এ জন্যই নাজু কিছু জানায়নি মাশুককে। নাবিলাও জানে না এই দাওয়াতের আসল কারণ। মেয়েটা হুট করে বাবাকে নিয়ে আসায় এখন ভারি বিপদ হয়েছে। কখন যে ওরা এসে পড়ে! বাবাকে দেখলে নাহিদ এখন হয়তো কিছু বলবে না, পরে ঠিকই ঝাল ওঠাবে।
নাজু বলে, ‘তাড়াতাড়ি খাইয়া চইলা যাও। দেরি করলে দোকানের মালিক আবার কী বলে!’
হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় বসে পড়ে মাশুক। নাবিলা ঘরে রাখা মোটা কাগজের একটা শপিং ব্যাগ ছিঁড়ে বিছিয়ে দেয় বাবার সামনে। বলে, ‘সকালে কী দিয়ে নাশতা করছ, বাবা?’
মাশুক এড়িয়ে যায়, ‘সকালের কথা এখন জানার দরকার আছে?’
‘রোজ সকালে নাশতা করার সময় তোমার কথা মনে পড়ে, বাবা। মা দুধ-চা দিত, তুমি তেল ছাড়া পরোটা ভিজাইয়া খাইতা। মা বলে আর কাঁদে।’
‘তুইও এখন কাঁদবি নাকি?’
নাবিলা ওদিক ফিরে মুখ আড়াল করে। মাশুকের বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে। করোনার আগে ভালোই ছিল ওরা। তখন এত লোয়ার লেভেলে না, বেশ ভালো একটা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানে হিসাব বিভাগে ছিল। দুই কামরার একটা ছিমছাম বাসায় ছিল। আলাদা কিচেন, দুটি বাথরুম। নাহিদ তখন ঢাকা কলেজে অনার্সে পড়ে। নাবিলা স্কুলে। হুট করে করোনা এলো, ভোজবাজির মতো উধাও হলো চাকরিটা। তারপর কয়েকটা মাস একদম বেহদ্দ বেকার। করোনা গেলে ব্যাংকে যা ছিল, তা দিয়ে শেষরক্ষা হিসেবে একটা ফাস্ট ফুডের দোকান দিয়েছিল। জমল না। পুরো ১০ লাখ টাকা গচ্চা। নাহিদের পড়াশোনা ওখানেই শেষ। তবু ভাগ্যিস, ধারদেনা করে ওকে একটা মোটরবাইক কিনে দিতে পেরেছে। চারটা বছর ছোট-বড় নানা ঢেউ সামলে শেষে এই জুতার দোকানে ঢুকেছে মাশুক। বেতন যা পায়, তা দিয়ে কোনোমতে টেকা যায়, কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়ানো যায় না।
বাবাকে পোলাও-মাংস বেড়ে দেয় নাবিলা। অনেক দিন এমন ভালো খাবার খায় না মাশুক। রাজ্যের ক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সব শেষে দই খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে মাশুক। নাবিলা বলে, ‘তোমার বেতন কি আর বাড়বে না, বাবা?’
‘বাড়বে কিভাবে? বাড়ানোর কথা বলারই তো সাহস হয় না।’
‘তোমার সাহস নাই দেইখাই তো আমাদের এই অবস্থা। ভাইয়া ঠিকই বলে। মালিককে বলবা যে জিনিসপত্রের দাম বেশি, চলা যায় না।’
মাশুক কিছু বলে না। হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ে। নাজুর ফোনে রিংটোন। কল দিচ্ছে নাহিদ। বুকটা ধড়াস করে ওঠে। এসে গেছে নিশ্চয়ই! ভয়ে ভয়ে ফোন ধরে। কিন্তু না, জরুরি কি একটা কাজ পড়েছে। এখন না, রাতে আসবে ওরা। হাঁপ ছাড়ে নাজু। যাক, এ যাত্রা বাঁচা গেছে!
নাজু এবার বলে, ‘খেয়ে একটু আরাম করেই যাও। একদিন একটু লেট হইলে কী আর বলবে?’
মাশুকেরও ভরপেট খেয়ে নড়তে ইচ্ছা করে না। ওই বিছানায়ই চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। নাবিলা মাথার কাছে বসে। বাবার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘আর কয়েকটা মাস কষ্ট করো, বাবা। আমি এইচএসসি দিয়া টিউশনি করব। তোমাকে আর মেসে থাকবে হইব না। তখন আরেকটা ভালো বাসায় উঠব।’
নাবিলা বলেই চলে, ‘আর যদি ভার্সিটিতে ভর্তি হই, হলে উঠতে পারি...’
নাবিলার সব কথা কানে যায় না মাশুকের। আবেশে চোখ বুজে আসে। ঘোরলাগা চোখে স্বপ্ন দেখে সে। সবাই একসঙ্গে নতুন একটা বাসায় উঠেছে। বারান্দায় আসা নরম রোদে গা পেতে বসে আছে সে। ভেতরে চায়ের কাপে টুং টাং। এখনই আসবে ভাপ ওঠা চা। কিন্তু শীত বিকেলটা বড্ড ক্ষণস্থায়ী। কখন যে মিষ্টি বিকেল অস্তাচলে বিলীন হয়, টের পায় না মাশুক।
পুরনো হলেও এখনো চাপা রিনঝিন হাসি ঢেউ খেলে যায় ছ’ফুটি এই গলিতে—বাঁ দিকে সালেহা মঞ্জিলের উঁচু দেয়াল, ডান দিকে আম-কাঁঠালগাছের নিরিবিলি ছায়ায় পর পর দুটি টিনশেড বাংলোবাড়ি। সামনে গলি গিয়ে পড়েছে দু’পায়া পথে আর পেছনে এল সাইজ টিনশেড এই এলাকার থেকে যাওয়া একমাত্র মেস—ইঞ্জিনিয়ার্স মেস। যে ইঞ্জিনিয়াররা গাছপালায় ছাওয়া শান্ত পরিবেশে এই মেসবাড়িটার প্রথম বাসিন্দা ছিলেন, এখন নিশ্চিত কোনো না কোনো অভিজাত পাড়ায় তাঁরা বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন।
ইলিয়াস ঢুকতে গিয়ে পুরনো ভাঙাপ্রায় টিনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে যায়।
সুবাসটা চেনা চেনা, অথচ মোটেই চেনা নয়। হাসিটাও এই রকম—পুরনো হাসির ধরন, যা চেনা যায় যায় না। চকিতে মনে পড়ে ইলিয়াসের মানুষকে চেনার আগেই বোধ হয় তার হাসি চেনা যায়।
স্কুলে হেডমাস্টার সাব আজ বলে দিয়েছেন—আমি দুঃখিত ইলিয়াস সাব, আপনার জন্য বোধ হয় কিছু করতে পারলাম না। কিভাবে করব বলুন, একজন মন্ত্রী যদি সামান্য একটা স্কুল শিক্ষকের চাকরির জন্য রিকমেন্ড পাঠিয়ে আবার টেলিফোনে রিকোয়েস্ট করেন, তাহলে কী করা যাবে! আপনি সাময়িক নিযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন—আপনার একটা দাবি আছে, কিন্তু আমার করার নেই কিছুই।
মন্ত্রীদের হাত কত দীর্ঘ! একটা মানুষের হাত কত দীর্ঘ হতে পারে? কোনো কোনো বংশের লোকদের হাত নাকি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হয়—এ রকম কথা বলা হয়ে থাকে। সেটাও তো আর শরীর ছাড়িয়ে যায় না। তবে মন্ত্রীর হাত শরীরের তোয়াক্কাই করে না, অশ্বখুরের দাগের পরিমাণ ফাঁকফোকরে ননি-মাখনের খানিকটা আভাসও জিহ্বাগত হওয়ার বাইরে থাকে না!
হাত নিয়ে ভাবতে ভাবতে ইলিয়াস মেসে ঢুকছিল। টিনের ভাঙা গেটে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গে ওই হাসি আজও দুরন্ত তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়ল।
গোপন কড়া নাড়ার এই শব্দ ঝরনার মতো বইছে এখন তার বুকের ভেতর। অবাক কাণ্ড, দীর্ঘ হাতের ছোবল যে ক্ষত তৈরি করেছে, তার ওপর ঝরনার পানি পড়তেই বেদনা ধোঁয়ার মতো উড়তে থাকল—আসলে উড়তে থাকল কী! পুরনো অভ্যাস তো থাকে!
মুচকি হাসিটা ধরে রেখেই রুমে ঢুকল। রুমমেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডেপুটি অ্যাকাউন্টস অফিসার রফিক মাড়ির গোড়ায় গুল ঠেসে দিয়ে পুরনো অভ্যাসে অস্বাভাবিক জোরে হাত ঝাড়ছিল।
ইলিয়াস ঢোকামাত্র তার মুখে দৃষ্টি স্থির করে হাতঝাড়া ভুলে উৎসাহিত হয়ে উঠল, কী কাম হইয়া গ্যাচে! হবে না ভাই, আপনের কপাল ভালো। কইছিলাম না—চিন্তা কইরেন না। আরে ভাই—আপনে আপনের কপাল দেখতে না পাইলে কী হইব—আমরা তো দেখতে পাই। আপনের কপালের গড়ন আলাদা—এই রকম গড়নপদের কপাল দেখলেই চিনবার পারি—হেই ইস্ট পাকিস্তান ওয়াপদার আমলে ক্লার্ক হইয়া ঢুকছি—কত কপাল দেখছি। অহন একনজর দেখলেই কইয়া দিতে পারি কী আছে কপালে। না, কপালতত্ত্ব নিয়া পড়াশোনা করি নাই, এইডা অভিজ্ঞতা। বুঝলেন ভাই, অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নাই।
রফিক গুলের ক্রিয়ায় মুখে জমে ওঠা পানি দরজা দিয়ে বাইরে পিক করে ছুড়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তির হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
ইলিয়াসের হাসি মিলিয়ে গেছে—জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলল, কাম হয় নাই, রফিক ভাই!
রফিক বিছানা থেকে উঠে ইলিয়াসের সামনে এসে দাঁড়াল, কন কী, হয় নাই! হয় নাই ক্যান? আপনে তিন মাস কাজ করছেন—অহন আপনে, ডিপার্টমেন্টাল ক্যান্ডিডেট রুলে আছে আপনের প্রিফারেন্স।
ইলিয়াস বলল, কলোনিতে পাঁচ বছর আগে আপনার নামে বাসা অ্যালট হয়েছে—তার পরও বাসায় উঠতে পারছেন না কেন?
রফিক হতাশ হয়ে বিছানায় বসে পড়ে বলল, আরে ভাই, এই কিচ্ছা না কত দিন কইছি। গত পাঁচ বছরে আমি যত কথা কইছি—তার বেশি অর্ধেক খরচ হইছে এই কিচ্ছা কইতেই। তো আর কওয়া যাইব না, পরশু দিন অফিসে হুমকি দিয়া গ্যাছে।
ইলিয়াস বলল, কন কী! হুমকি দেওয়ার জন্য অফিসে গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়েছে?
রফিক হাত-পা ছেড়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল, আরে ভাই, গুণ্ডা হইলে বুঝতাম—গুণ্ডায় হুমকি দিব না তো কী করব, হুমকি দিয়া গ্যাছে ওই মেয়েটা। কই নাই যারা জবরদখল কইর্যা রাখছে বাসা ওদের ওই মেয়েটা। কয় গান গায়—শিল্পী। এ যে কোন শিল্প সে কি আর বুঝি না! জানেন, ছোটবেলায় গেরামে দেহতত্ত্বের গান শুনছি, আর অহন এই সময়ে ঢাকার শহরে দেখছি দেহশিল্পের দাপট!
ইলিয়াস বলল, গোটা দেশটাই এখন মাসলম্যানদের হাতে জিম্মি—এদের হাত থেকে উদ্ধার না পেলে দেশ চলবে না!
রফিক বলল, আরে দূর সাব, আপনে কী কন! এই যে মেয়েটা আমারে রীতিমতো হুমকি দিয়া গ্যাল—সে কি মাসলম্যান? এ হলো সফট মাসল ওম্যান। এখন এদের যুগ, এদের হাতে জিম্মি এখন সমাজ। হার্ডওয়্যারের যুগ শেষ, এখন সফটওয়্যারের যুগ!
ইলিয়াস বিছানায় বসে পড়ে বলল, বুঝলাম না ভাই কী কইলেন সাংকেতিক ভাষায়।
রফিক বলল, আরে ভাই, আপনেরে আর কত বুঝাইবাম। সাংকেতিক ভাষা হইল এই যুগের ভাষা। আপনে তো ম্যালা নভেলটভেল পড়েন। দেখেন না আজকাল মডার্ন জনপ্রিয় লেখকরা কেমন শর্টহ্যান্ডের মতো সংকেত দিয়া দিয়া তরতর কইর্যা লেইখ্যা যায়। মনে হয় চিন্তা নাই ভাবনা নাই—কাগজ-কলম নিয়া বসে আর ফরফরায়্যা লেখা শেষ কইর্যা ফালায়। এই কথা কইছে এক মহাজনপ্রিয় লেখক এক সাপ্তাহিকে সাক্ষাৎকারে। কথা বেঠিক না—চিন্তা-ভাবনা যদি কিছু করতে হয় তো করব পাঠকরা।
ইলিয়াস বলল, এটা আপনার অন্যায়, রফিক ভাই—আপনি জানেন সারা বিশ্বের সাহিত্যে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের লেখকরাও—
রফিক তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, রাত কয়টা দেখছেন? অহন হাতমুখ ধুইয়া খাইতে বসেন।
লোকটার মেজাজ এই বাসা নিয়ে ইদানীং খিটখিটে হয়ে উঠেছে। তবে সময়মতো খাওয়া আর ঘুমানোর ব্যাপারে ইলিয়াসকে প্রতিদিন তাগিদ দিতে ভোলে না।
খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে বাতি নিভিয়ে দিল ইলিয়াস। অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে সেই রিনঝিন হাসিটা তার মশারির ভেতর ঢুকে পড়ল—সে এখন থইথই হাসির ঢেউয়ে নিমজ্জিত। এমন তো হতে পারে, কাল খুব ভোরে এই গলির বাসিন্দারা জেগে ওঠার আগে ভাঙা গেট দিয়ে বের হতেই দেখবে—কী দেখবে! কোনো ছবি স্পষ্ট হয় না। সাদা কাগজের মতো একটা ভোর ওত পেতে রয়েছে—এ রকম সাদার মুখোমুখি হতে ভয় পায় সে, দম আটকে আসে তার।
ইলিয়াস উঠে বসে বিছানায়। মশারি গুটিয়ে টেবিলের ওপর থেকে হাতড়ে পানির গ্লাসটা তুলে নেয়—ঢকঢক করে খানিকটা পানি পান করে।
তারপর ডাকে, রফিক ভাই ঘুমিয়েছেন?
রফিক জিজ্ঞেস করল, ঘুম আসছে না? ঘুমান, ঘুম হইল শরীরের বিশ্রাম। চিন্তা কইর্যা কিছু হয় না—যা হওয়ার এমনিই হয়। ঢাকার শহরটা একটা সমুদ্র—এইখানে রুই-কাতলার পাশাপাশি মলা-পুঁটিও থাকে। তবে থাকার একটা ফরম্যাট আছে—আয়ত্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্থির অস্থির লাগে, হইয়্যা গ্যালে দেখবেন একেবারে নিশ্চিন্ত পানির মতো জীবন। নেন ঘুমান।
ইলিয়াস বলল, আপনি সজাগ ছিলেন—ঘুমান নাই?
রফিক বলল, আরে কইয়েন না, হঠাৎ আপনের ভাবিরে দেখলাম—
ইলিয়াসের কণ্ঠে বিস্ময়, ভাবিরে দেখলেন! কী স্বপ্ন দেখছেন?
রফিক হেসে ওঠে, আরে না—ঘুমাই নাই তো স্বপ্ন দেখব ক্যামনে!
ইলিয়াস বলল, তাহলে ভাবিরে দেখলেন কেমনে?
রফিক বলল, মশারির পাশে আইস্যা দাঁড়াইল। আপনে যখন পানি খাইলেন তখন কইল—যাইগা, ইলিয়াস ভাইয়ে দেখলে কী কইব? শত হউক এইডা মেস তো!
ইলিয়াস থ—লোকটা বলে কী—মাথায় গোলমাল দেখা দেয়নি তো! সে চুপ হয়ে যায়—মুখ থেকে কোনো শব্দ বের করে না।
অনেকক্ষণ পর রফিক কথা বলে ওঠে—কী, ঘুমাইলেন?
ইলিয়াস সাড়া দেয়, না।
রফিক বলল, ইলিয়াস সাব, আপনে আমার ছোট ভাইয়ের মতন, কী কই আপনেরে। জানেন, বিয়া করলাম—দু’টা ছেয়েমেয়েও হইল, কিন্তু সংসার করতে পারলাম না। একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর একজন ঢাকায়। সংসার বলতে যা বোঝায়, প্রতিদিনের সংসার, তা হয়!
রফিকের দীর্ঘশ্বাস ঘরের বাতাস ভারী করে তোলে—এত ভারী যে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
ইলিয়াস জিজ্ঞেস করল, রফিক ভাই, আমি যখন এলাম, তখন বাইরে কোনো হাসির শব্দ শুনেছিলেন?
রফিকের কণ্ঠে বিস্ময়, হাসি! কার হাসি?
ইলিয়াস বলল, এই—এই কোনো মহিলার!
রফিক আপন মনে আওড়াল—মেয়েমানুষের হাসি! না তো—কন কী! শুনছেন আপনে?
ইলিয়াস বলল, হ্যাঁ। গত কয় দিন যাবৎই শুনি—ভাঙা গেটটায় হাত রাখতেই রিনঝিন হাসি...
রফিক হেসে ওঠে, দূর কী কন! আপনে শোনেন আর আমি শুনি না, কেউ শুনে না—এইটা হয় নাকি? এইটা আপনের ভেতরে লুকাইয়া আছে—ফাঁক পাইলেই বাইর হয়!
ইলিয়াস বলল, এটা কী কন রফিক ভাই? আমি স্পষ্ট শুনেছি, একদিন-দুইদিন না, গত এক সপ্তাহ ধরে শুনছি—মিষ্টি সুরেলা হাসি, ঠিক ঝরনা থেকে পানি গড়ায় যেমন শব্দ করে!
রফিক ওকে থামিয়ে দেয়—ব্যস, হইয়া গ্যাছে, আর কইতে হইব না। এই যে আপনের ভাবি আইস্যা দাঁড়াইল—এইটা ক্যামনে? আরে ভাই, ভেতরে লুকাইয়া থাকলে ফাঁক পাইলেই বাইর হইয়া আসে। ভেতরটা যখন অসহ্য হইয়া ওঠে, তখনই বাইর হয়।
ইলিয়াসের গা ছমছম করে ওঠে—সে বুকে হাত দেয়—অনুভব করার চেষ্টা করে সত্যই রিনঝিন হাসিটা ভেতরে আছে কি না!
সকালে হালকা সাজ
সকালে হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা উচিত কারণ এসময় ছিমছাম, স্নিগ্ধ সাজই সুন্দর লাগে।
সকালের পরিবেশে হালকা যেকোনো কিছুই ভালো মানায়। মেকআপ, কনট্যুরিং, ব্লাশ ও মাশাকারায় হালকা ভাব ধরে রাখতে পারেন। সকালে চুলের সাজে পনিটেল করে নিন।
দুপুরে চাই আরাম
গরম আবহাওয়া এখন। রেড বিউটি স্যালনের স্বত্বাধিকারী ও রূপ বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন বললেন, ‘ঈদের দিন দুপুরে ভারী মেকআপ না করাই ভালো। বেইস মেকআপ ম্যাট রাখুন। গরমে ত্বক বেশি ঘামলে বা তেলতেলে হলে ভালো করে মুখ ধুয়ে টোনার লাগিয়ে নিন। চেষ্টা করুন মেকআপের সব উপাদান যেন ম্যাট হয়। এতে গরমে ঘামলেও মেকআপ নষ্ট হবে না। চোখে ঘন মাশকারা ও আইলাইনার দিতে পারেন। চোখের সাজে স্মোকি ভাবও এই সময় সুন্দর লাগবে। পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে লিপস্টিক দিন ঠোঁটে। ন্যুড কালার লিপস্টিকও রাখতে পারেন। কানে দুল আর গলায় হালকা লকেট বেছে নিতে পারেন। দুপুরের সাজে চুল বেঁধে রাখাই বেশি আরামদায়ক হবে।’
রাতে জমকালো
রাতের বেইস মেকআপ মানায় ভালো। সাজও জমকালো হয়। রাতে জমকালো কাজ করা পোশাকের সঙ্গে ভারী মেকআপ, ভারী গয়না, চোখের সাজে রঙের বাহার, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক রাতে আরো বেশি সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলবে। বিন্দিয়া এক্সক্লুসিভ কেয়ারের স্বত্বাধিকারী শারমিন কচি বললেন, ‘রাতের সাজে মানানসই হাইলাইটার ব্যবহার করুন। গাঢ় ব্লাশ অন বেছে নিন। ঠোঁটেও থাকবে উজ্জ্বল রং। চোখে রঙিন সাজ বা স্মোকি আই রাতে ভালো দেখাবে। চুলের সাজে লম্বা বেণি সুন্দর মানাবে। চাইলে চুল ছেড়েও রাখতে পারেন।’
যখন যেমনই সাজুন, সবার আগে নিজের ব্যক্তিত্ব ও আরামদের দিকটা প্রাধান্য দিন। গরমে সাজবেন তো অবশ্যই, তবে তা যেন নিজের সৌন্দর্য আর সুস্থতায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটায়। মনে রাখবেন, সবার আগে নিজেকে সুস্থ রাখা সবচেয়ে জরুরি। তবেই তো ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে মিলেমিশে উপভোগ করবেন।
পাঞ্জাবি পরতে ভালোবাসেন না এমন পুরুষ কমই। ঈদের দিন তো নতুন পাঞ্জাবি ছাড়া জমেই না। এ জন্য ঈদ ঘিরে নতুন নতুন পাঞ্জাবির পসরা সাজিয়ে বসে ফ্যাশন হাউসগুলো। ফ্যাশন হাউস কে ক্রাফটে এসেছে বর্ণিল নকশার পাঞ্জাবি।
বিশ্বরঙের শোরুমে ম্যানিকুইনগুলোর বেশির ভাগই ঈদের পাঞ্জাবি পরা। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বলেন, ‘এবার নকশা ও থিমের চেয়ে আরামই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে পাঞ্জাবির কাপড়ে। কারণ গরমের মধ্যে। সে জন্যই আরামকে বেছে নেওয়া। সুতি, কটন, সেমিকটন, লিনেন ও পাতলা তাঁতের কাপড়ে তৈরি হয়েছে এবারকার ঈদ পোশাক।
প্রিন্টে পরিপাটি
প্রিন্টের পাঞ্জাবির প্রতি ছেলেদের আকর্ষণ সব সময়ই। এবারও প্রিন্টের পাঞ্জাবির জয়জয়কার। ফ্যাশন হাউস ওটু, জেন্টল পার্ক, লা রিভ, টুয়েলভ, অঞ্জন’স, লুবনান, রিচম্যান থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠান ঈদ উপলক্ষে প্রিন্টের নতুন পাঞ্জাবি এনেছে। লালচে সুতি পাঞ্জাবিতে কালো প্রিন্টের নকশা, হাতায় কালো রঙের পাইপিংয়ের প্রিন্ট যেমন দারুণ সাড়া ফেলেছে, তেমনি গাঢ় সবুজ শেডের জমিনে হালকা সবুজ প্রিন্ট, তার সঙ্গে এমব্রয়ডারির নকশা যুক্ত করে অভিজাত ভাব আনা হয়েছে। এসব পাঞ্জাবির বোতামের আলাদা নকশা ও ম্যাটেরিয়ালেও পাওয়া যাবে ভিন্নতা। এ ছাড়া ফুল, ফল, পাখি, লতাপাতা ও প্রকৃতির নানা মোটিফ যুক্ত হয়েছে এবারকার প্রিন্টের পাঞ্জাবিতে।
কাটছাঁটে নতুন কী
গলা, বুক, হাতা ও কাঁধের কাটছাঁটে রয়েছে আলাদা বৈচিত্র্য। সারা লাইফস্টাইলের ডিজাইনার শামীম রহমান বলেন, ‘কম বয়সীদের জন্য জমকালো ও ভিন্ন ধাঁচের প্যাটার্নের পাঞ্জাবি এনেছি। আলাদা কাপড় জুড়ে দেওয়া, বোতামের পরিবর্তন, বুকের কাটে ভিন্নতা, এমব্রয়ডারি ও সুই-সুতার কাজের সাহায্যে নতুনত্ব যোগ করা হয়েছে। কখনো বুকের এক পাশ খালি রেখে আরেক পাশে নকশা, কখনো কাঁধের কাছে ভিন্ন কাপড় জুড়ে দিয়ে ভিন্নতা আনা হয়েছে।’
একেকজনের একেক রকম চাহিদার কথা মাথায় রেখে পাওয়া যাবে তিন ধরনের পাঞ্জাবি—রেগুলার ফিট, স্লিম ফিট ও স্লিম শর্ট। এখনকার ট্রেন্ড লম্বা কাটের লুজ ফিট পাঞ্জাবি। অভিজাত লুকেরও পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে। সিল্ক, মসলিনের মতো দামি কাপড়ে তৈরি এসব পাঞ্জাবিতে অভিজাত ভাব তুলে ধরতে অতিরিক্ত ভ্যালু অ্যাড করতে ব্যবহার করা হয়েছে নানা রকম ম্যাটেরিয়ালের অলংকার।
কখন কেমন পাঞ্জাবি
ঈদের সকালে হালকা রঙের পাঞ্জাবি বেশি মানানসই। ঈদের জামাতে বেশি উজ্জ্বল রং বেমানান মনে হবে। হালকা রঙের পাঞ্জাবি সকালের আবহে স্নিগ্ধ ভাব এনে দেবে। ঈদ বিকেলে ও রাতে উজ্জ্বল রঙের পাঞ্জাবি বেছে নিন। কমলা, হালকা সোনালি, হলুদ ও গাঢ় নীল রঙের পাঞ্জাবি পরা যাবে। বিকেলের সূর্যের সোনালি রং কিংবা রাতের আলো-আঁধারি পরিবেশে দারুণ মানিয়ে যাবে এমন পাঞ্জাবি। বেছে নিতে পারেন ম্যাচিং পাঞ্জাবিও। কয়েক বছর ধরেই ট্রেন্ডে রয়েছে ম্যাচিং পোশাক। সব বয়সী সদস্যদের জন্য পাওয়া যাবে একই নকশার পাঞ্জাবি।
কোথায় পাবেন, কেমন দাম
বসুন্ধরা সিটি শপিং মল, যমুনা ফিউচার পার্ক, সুবাস্তু আর্কেড, রাপা প্লাজা, পুলিশ প্লাজার মতো বড় বড় মার্কেটের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুমগুলোতে পাওয়া যাবে ঈদের নতুন পাঞ্জাবি। একটু কম দামে ভালো মানের পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, বেইলি রোড, মিরপুর শাহ আলী মার্কেটসহ ছোট-বড় মার্কেটগুলোতে। মিরপুর, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, বঙ্গবাজারে আলাদা পাঞ্জাবির মার্কেট রয়েছে। ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবি পাবেন এক হাজার ৩০০ টাকা থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। ব্র্যান্ডের বাইরের পাঞ্জাবির দাম পড়বে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে।