রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায়ের দিন রবিবার (৭ জুন) ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এ দিন রাখেন।
আজ যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে রাষ্ট্র পক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চান বলে সাংবাদিকদের জানান।
তিনি বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে এ মামলায় সম্পূর্ণরূপে সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে প্রমাণ হয়েছে। গতকাল আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের দোষ স্বীকারও করেছেন। সুতরাং আমরা আদালতের কাছে সর্বোচ্চ শাস্তি যেটা মৃত্যুদণ্ড সেটি চেয়েছি।
আরো পড়ুন
ফরিদপুরে ৫ মাস ২ দিনে হামে ২০ শিশুর মৃত্যু
অপরদিকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুছা কালিমুল্যাহ আসামির দোষ স্বীকার করায় তার যাবজ্জীবন চান। অপরদিকে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার যেহেতু তাকে এ হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেছেন এজন্য তাকে ২০১ ধারায় সাত বছর কারাদণ্ড চেয়েছেন আসামিপক্ষের এই আইনজীবী। শুনানি শেষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা জানান।
এদিন সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে কারাগার থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়। পরে সকাল ১১টা ২১ মিনিটে সোহেল রানাকে ও পরবর্তীতে স্বপ্নাকে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। পরে ১১টা ৪৫ মিনিটে আদালতে বিচারক উঠলে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। পরবর্তী দুপুর ১টা ৩৬ পর্যন্ত একটানা চলতে থাকে এই যুক্তিতর্ক।
যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের এ মামলার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে শুনানি করেন। এ সময় তিনি আসামি সোহেল ও স্বপ্নাকে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ পড়ে শোনান। একই সঙ্গে মামলার বাদী ও রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার অভিযোগ আদালতে পড়ে শোনান। একইসঙ্গে মামলার সব সাক্ষীর জবানবন্দি পড়ে শোনান।
এ সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, মামলার প্রত্যেকটা সাক্ষী রামিসার গলা কাটা লাশ দেখেছেন বলে এখানে জবানবন্দি দিয়েছেন।
আরো পড়ুন
বিএসইসিতে ৩ কমিশনার নিয়োগ
ডলারের নাম আসার বিষয়ে আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, এ আসামি জবানবন্দিতে বলেনি ডলারের নাম। এটা মূলত সে যখন অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে কারাগারে থেকেছে সেখান থেকে অন্যান্য আসামিদের কাছ থেকে এই বুদ্ধি-পরামর্শ পান। তবে একই সঙ্গে যেটা বলতে হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসামি সোহেল গতকাল কিন্তু স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন। বলা যায় এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে।
এ মামলায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আইনজীবী দুলু আদালতে বলেন, সে কিন্তু রামিসার এই অবস্থা দেখে বাইরে এসে চিৎকার করে জানাতে পারত কিন্তু তিনি তা করেননি। শুধু সোহেলকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন এমনটি না পুরো ব্যাপারে স্বপ্না সেখানে অবস্থান করে সহায়তা করেছেন। যদি তিনি কাউকে জানাতে পারতেন, তাহলে তিনি নিরপরাধ হতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।
আইনজীবী আরো বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা সেই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ না পাওয়ার কারণ হচ্ছে, পল্লবী এলাকা এত ডেভেলপ না। এ জন্য সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বেলা দেড়টা পর্যন্ত একটানা শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের পিপি আজিজুর রহমান দুলু। পরে এ মামলায় রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী পরবতীতে ১টা ৩১ মিনিট থেকে মুছা কালিমুল্যাহ যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করেন।
তিনি আদালতে বলেন, শুধুমাত্র জবানবন্দির আলোকে চার্জশিট দিয়ে আসামিকে শাস্তি দেওয়া যায় না। একজন নেশাগ্রস্ত আসামি কি জবানবন্দি দিয়েছেন তা গ্রহণ করা যায় না। এটা বলে সে শুনানি শুরু করেন। পরে আইনজীবী দুলু বলেন, ঘটনার সময় সোহেল নেশাগ্রস্ত ছিল সেটা কোথাও প্রমাণিত না।
এ সময় ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী ও উপস্থিত ছিলেন।
আরো পড়ুন
সিংগাইরে ৪ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন
গত ১ জুন পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় বাদী আবদুল হান্নান মোল্লাসহ ১৭ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে গতকাল ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, গত ২৪ মে আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। এরপর চার্জশিটটি আমলে গ্রহণ করে বিচারের জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। একইদিন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে নিয়ে অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ১ জুন দিন ধার্য করেন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তার ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকলে একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে তার জুতা দেখতে পান।
ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা ও অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসা আক্তারের (৮) মাথাবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। আসামি স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তার স্বামী আসামি মো. সোহেল রানা (৩০) হীন কামনা চরিতার্থ করার জন্য রামিসাকে বাথরুমের ভেতরে আটকে রেখে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় ১৯ মে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার দায়েরের প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একইদিন আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।