• ই-পেপার

প্রথমবার আজান শুনল নিউ ইয়র্কের আস্টোরিয়াবাসী

ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের তাগিদ

মাওলানা আল আমিন সরকার
ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের তাগিদ

মানুষের বানানো কোনো আইন দিয়ে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আত্মসমর্পণ করতে হয় আল্লাহর বানানো আইনের কাছে। কোরআনের কাছে। নবীর কাছে। এমন সরল স্বীকারোক্তির পর যে কেউ নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি নিজেকে আল্লাহর আইনের কাছে, কোরআনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, নাকি লোভ-মোহ-স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি; আমি কি কোরআনের আইন অনুযায়ী শান্তির ফেরিওয়ালা হয়েছি, নাকি হানাহানি, মারামারি আর রাহাজানির কালো ডোবায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবতার কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও শান্তি নিশ্চিতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন’ (সুরা নাহল, আয়াত ৯০)

এই নীতির আলোকে একজন মুসলমানকে ধর্ষণ, হত্যা, গুম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মুনাফাখোরি, মজুদদারিসহ সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা ফরজ। কারণ এসব অপরাধ শুধু আইন ভঙ্গ করে না; বরং সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধও ধ্বংস করে দেয়।

সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে ইনসাফভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান নিরাপদ থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! হত্যার বদলে হত্যার (কিসাস) মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে’ (সুরা বাকারা-১৭৯)

একইভাবে ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যার চেয়েও হালকা।’

তবে ইসলাম কখনো আবেগনির্ভর বিচার বা মবকে সমর্থন করে না। কোনো অপরাধের উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া ইসলামে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনরোষের নামে অনেক সময় প্রকৃত বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী’ (সুরা মায়েদা-৮)।

সমাজের কল্যাণ, অপরাধ দমন ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নারীর প্রকৃত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছে ইসলাম। ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পদ, ভরণপোষণ, সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার দিয়েছে।

মা হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং স্ত্রী হিসেবে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করেছে। অথচ আধুনিকতার নামে অনেক সময় নারীকে ভোগবাদী সংস্কৃতির উপকরণে পরিণত করা হচ্ছে, যা প্রকৃত সম্মান নয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’

একইভাবে সুদ, ঘুষ ও অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধেও ইসলাম দাঁড়িয়েছে শক্তভাবে। সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ এটাই। এসব অন্যায় মানুষের মধ্যে বৈষম্য, শোষণ ও অবিচার বৃদ্ধি করে। বাজার সিন্ডিকেট, পণ্য মজুত এবং কৃত্রিম সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং মানবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’ (সুরা বাকারা-২৭৫)।

মহানবী (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন।

ন্যায় ও মানব কল্যাণের প্রশ্নে জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও শ্রেণিভেদে বৈষম্য করার সুযোগ নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান- সব মানুষই ন্যায়বিচার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে বিভাজন, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান’ (সুরা হুজুরাত-১৩)

তেমনি ইসলাম অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও অবাধ সম্পর্কের বিপক্ষে; পরিবার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের পক্ষে। কারণ সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

ইসলামে হালালা নামক পরিকল্পিত বিয়ে নিন্দনীয়

মুফতি সায়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ইসলামে হালালা নামক পরিকল্পিত বিয়ে নিন্দনীয়
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম সমাজের কিছু সংকট আছে, যেগুলো ইসলামের কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং ইসলামের বিধানকে না বোঝার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ‘হালালা’ সেগুলোর অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে এমন বহু ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যেখানে তিন তালাকের পর পুনরায় সংসার করার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নারীদের এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়েছে, যা তাদের ব্যক্তিসত্তা, মর্যাদা এবং মানবিক অনুভূতির জন্য গভীরভাবে অপমানজনক। কোথাও ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে, কোথাও সামাজিক চাপে, কোথাও আবার অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে একটি ধারণা জন্মেছে—এ বুঝি ইসলামেরই নির্দেশ।

কিন্তু ইতিহাস, ফিকহ এবং হাদিসের সূত্রগুলো অন্য কথা বলে। কোরআন মাজিদের দ্বিতীয় সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে যে বিধান বর্ণিত হয়েছে, তার পেছনে ছিল একটি বিশেষ সামাজিক বাস্তবতা। জাহেলী যুগে আরব সমাজে তালাককে অনেক পুরুষ খেলার বস্তুতে পরিণত করেছিল। তারা স্ত্রীকে তালাক দিত, আবার ফিরিয়ে নিত, আবার তালাক দিত। নারীর জীবন ঝুলে থাকত পুরুষের খেয়ালের ওপর। এই অনিশ্চয়তা, এই মানসিক নির্যাতন এবং এই অবিচারের অবসান ঘটাতেই ইসলাম তালাকের একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রবর্তন করে। তালাকের সংখ্যা সীমিত করা হয়, পুনর্মিলনের সুযোগ নির্ধারণ করা হয় এবং চূড়ান্ত বিচ্ছেদকে এমন এক সিদ্ধান্তে পরিণত করা হয়, যার পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে আগেই ভাবতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর সে যদি (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে নারী তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩০)

এই আয়াতের উদ্দেশ্য ছিল পুরুষকে সতর্ক করা, তাকে দায়িত্বশীল করা এবং বিবাহকে খেলায় পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ করা। অর্থাৎ বিধানটির লক্ষ্য ছিল পরিবারকে রক্ষা করা, পরিবার ভাঙা নয়।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে কিছু মানুষ এই বিধানের উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে ফেলে। তারা এমন এক পদ্ধতির প্রচলন করে, যেখানে শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকে—একজন নারীকে সাময়িকভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তালাকের মাধ্যমে তাকে পূর্ববর্তী স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সমাজে এটিই ‘হালালা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অথচ ইসলামী আইনশাস্ত্রে এই প্রক্রিয়ার নাম ‘নিকাহে তাহলিল’, এবং এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান ছিল অত্যন্ত কঠোর। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মুহাল্লিল (যে হালাল করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করে) এবং মুহাল্লাল লাহু (যার জন্য তা করা হয়)—উভয়ের ওপর লানত করেছেন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ২০৭৬, জামে তিরমিজি, হাদিস : ১১২০, সুনান ইবন মাজাহ, হাদিস : ১৯৩৬)

হাদিসের এই ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তে ‘লানত’ শব্দটি সাধারণ অপছন্দনীয় কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না। এটি এমন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। অর্থাৎ বিবাহকে যদি একটি কৌশল, একটি ফাঁকি কিংবা একটি পূর্বপরিকল্পিত নাটকে পরিণত করা হয়, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।

প্রখ্যাত তাবেয়ি ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ.) থেকে শুরু করে চার মাজহাবের অসংখ্য ফকিহ এই ধরনের পরিকল্পিত তাহলীলকে কঠোরভাবে অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ আল্লামা ইবন আবিদিন (রহ.) লিখেছেন, যদি বিবাহের উদ্দেশ্যই হয় কাউকে পূর্ববর্তী স্বামীর জন্য হালাল করা, তবে তা মারাত্মকভাবে মাকরুহ এবং গুনাহের কাজ।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কোরআন যে বিবাহের কথা বলেছে, তা একটি স্বাভাবিক, বাস্তব ও স্থায়ী বৈবাহিক সম্পর্ক। সেখানে সংসার করার ইচ্ছা থাকবে, পারিবারিক জীবন থাকবে, দাম্পত্য সম্পর্ক থাকবে। পরবর্তী সময়ে যদি স্বাভাবিক কারণে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু শুরু থেকেই যদি বিচ্ছেদের পরিকল্পনা থাকে, তবে সেটি কোরআনের বর্ণিত বিবাহ নয়; বরং বিবাহের আবরণে একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা।

আজকের সমাজে কোনো কোনো সময় দেখা যায়, এই বিকৃত ধারণার শিকার হচ্ছেন নারীরা। একজন পুরুষের আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত, রাগের মাথায় উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ কিংবা পারিবারিক অস্থিরতার মূল্য দিতে হয় একজন নারীকে। অনেক ক্ষেত্রে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না; তাকে একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলাম নারীকে কখনো কোনো পুরুষের ভুলের বোঝা বহনের জন্য সৃষ্টি করেনি। বস্তুত হালালা বিতর্ক আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি শরিয়তের বিধানগুলোকে প্রকৃত উদ্দেশ্যের আলোকে বুঝছি, নাকি শুধু শব্দগত ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি?

ইমাম আবু ইসহাক আশ-শাতিবি (রহ.) তাঁর আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে শরিয়তের প্রতিটি বিধানের পেছনে একটি উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরিয়াহ) রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মর্যাদা রক্ষা, পরিবার সংরক্ষণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। কোনো ব্যাখ্যা যদি এই উদ্দেশ্যগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে সেই ব্যাখ্যা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

হালালার নামে আজ যে অপসংস্কৃতি সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা মূলত শরিয়তের ভাষাকে ব্যবহার করে শরিয়তের উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করার একটি উদাহরণ। এখানে বিবাহের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয়, নারীর মর্যাদা আহত হয় এবং ধর্মকে মানুষের কাছে একটি কঠোর ও অমানবিক ব্যবস্থারূপে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ইসলাম এসেছে মানুষের জীবনকে সহজ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক করার জন্য।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইসলামের সমালোচকরা প্রায়ই এই অপব্যবহারকেই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে একটি সমাজের অজ্ঞতা ও কিছু মানুষের স্বার্থপরতার দায় এসে পড়ে ধর্মের ওপর। অথচ ইসলামকে বিচার করতে হলে দেখতে হবে তার মূল উৎসগুলোকে—কোরআনকে, সুন্নাহকে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ইসলামী আইনচিন্তার ঐতিহ্যকে।

তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক উপলব্ধির। প্রয়োজন মানুষকে তালাকের বিধান সম্পর্কে সচেতন করা, আবেগের পরিবর্তে প্রজ্ঞার সঙ্গে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা এবং ধর্মের নামে চলা অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে জ্ঞানভিত্তিক অবস্থান তৈরি করা।

কারণ হালালার নামে যে অপমান আজ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, তা ইসলামের নয়; বরং ইসলামের শিক্ষাকে ভুল বোঝার ফল। আর ইতিহাস বলে, যখনই মানুষ বিধানের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে, তখন বিধান থেকে জন্ম নেয় জটিলতা, আর ধর্ম থেকে জন্ম নেয় ভ্রম ও ভ্রান্তি।

কোরআনের বাণী

কোরআনের ভাষায় যারা পৃথিবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কোরআনের ভাষায় যারা পৃথিবীর প্রকৃত উত্তরাধিকার
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 

 وَ لَقَدۡ كَتَبۡنَا فِی الزَّبُوۡرِ مِنۡۢ بَعۡدِ الذِّكۡرِ اَنَّ الۡاَرۡضَ یَرِثُهَا عِبَادِیَ الصّٰلِحُوۡنَ

সরল অনুবাদ : 
‘আর উপদেশ দেওয়ার পর আমি কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার নেককার বান্দারাই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০৫) 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
আয়াতে زبور শব্দটি একবচন, এর বহুবচন হলো زبر। এর অর্থ কিতাব। দাউদ (আ.)-এর প্রতি নাজিলকৃত বিশেষ কিতাবের নামও জাবুর। তবে এখানে জাবুর বলে কি বোঝানো হয়েছে, এ সম্পর্কে বিভিন্ন উক্তি আছে। কারো কারো মতে ذكر বলে তাওরাত আর زبور বলে তওরাতের পর নাজিলকৃত আল্লাহর অন্যান্য গ্রন্থসমূহ বোঝানো হয়েছে; যথা ইঞ্জিল, জাবুর ও পবিত্র কোরআন। আবার কোন কোন মুফাসসিরের মতে ذكر বলে লাওহে মাহফুজ আর زبور বলে নবীদের ওপর নাজিলকৃত সকল ঐশী গ্রন্থই বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে কুরতুবি, ইবন কাসির, ফাতহুল কাদির)

কোন কোন মুফাসসির বলেন, এখানে পৃথিবী বলে বর্তমান সাধারণ দুনিয়ার জমিন ও জান্নাতের জমিন উভয়টিই বোঝানো হয়েছে। জান্নাতের জমিনের মালিক যে এককভাবে সৎকর্মপরায়ণরা হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক সময় তারা এককভাবে দুনিয়ার জমিনের মালিক হবে বলেও প্রতিশ্রুতি আছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে এই সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবী তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে সেটার উত্তরাধিকারী করেন। এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১২৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৫৫) (ইবন কাসির, তাফসিরে জাকারিয়া)

নিশ্চয় আমার সৎকর্মশীল বান্দারা পৃথিবীর অধিকারী হবে। কোন কোন মুফাস্‌সির الأرض (পৃথিবী) বলতে জান্নাত অর্থ নিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, তার অর্থ : কাফেরদের দেশ ও জমি-জায়গা। আয়াতের অর্থ হল, আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারাই পৃথিবীর অধিকারী হবে। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, মুসলিমরা যতদিন সৎকর্মশীল ছিল, ততদিন তারাই পৃথিবীর উপর ক্ষমতাসীন হয়ে উন্নতশির ছিল এবং ভবিষ্যতেও যখনই তারা এই গুণের অধিকারী হবে, আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা তাদের হাতেই আসবে। বলা বাহুল্য, মুসলিমদের পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকার বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে যেন কোন প্রকার সংশয় ও প্রশ্ন উদিত না হয়।

যেহেতু এ প্রতিশ্রুতি মুসলিমদের সৎকর্মশীলতার সাথে শর্ত-সাপেক্ষ। তাই যখন মুসলিমরা ঐ শর্ত পালনে অক্ষম হল, তখন তারা পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা ও আধিপত্য থেকে বঞ্চিত হল। সুতরাং এখানে শাসন-ক্ষমতা পাওয়ার উপায় ও পথ বলে দেওয়া হয়েছে, আর তা হল সৎকর্ম। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিধি-বিধান অনুসারে জীবন-যাপন করা এবং শরীয়তের নিয়ম-কানুন ও সীমা মেনে চলা। মুসলিমরা যেদিন নিজেদের জীবন ও পরিবারে ইসলামী সংবিধানকে বাস্তবায়িত করতে পারবে, সেদিনই ফিরে পাবে পৃথিবীর শাসন-ক্ষমতা। ইনশাআল্লাহ । (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

মৌসুমের নতুন ফল খাওয়ার সময় পঠিতব্য দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মৌসুমের নতুন ফল খাওয়ার সময় পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ফলমূলের আবির্ভাব আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত, দয়া ও অনুগ্রহের এক জীবন্ত নিদর্শন। গ্রীষ্মের রসালো আম, কাঁঠাল ও লিচু হোক কিংবা বর্ষা ও শীতের নানা ফল—প্রতিটি ফলই আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক বিশেষ উপহার। একজন মুমিন যখন মৌসুমের নতুন কোনো ফল প্রথমবারের মতো গ্রহণ করে, তখন সে শুধু তার স্বাদ উপভোগই করে না; বরং সেই নিয়ামতের দাতা মহান রবের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে।

তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, জীবনের প্রতিটি নিয়ামতকে আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে যুক্ত করতে। তাই নতুন ফল হাতে পেলে তিনি আল্লাহর দরবারে বরকত, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করতেন। দোয়াটি হলো—

اَللّٰهُمَّ بَارِكْ لَنَا فيْ ثَمَرِنَا. وَبَارِكْ لَنَا فِيْ مَدِيْنَتِنَا. وَبَارِكْ لَنَا فِيْ صَاعِنَا. وَبَارِكْ لَنَا فِيْ مُدِّنَا

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি সামারিনা ওয়া বারিক লানা ফি মাদিনাতিনা ওয়া বারিক লানাা ফি সাইনা ওয়া বারিক লানা ফি মুদ্দি না।’

অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফল-ফলাদিতে বরকত দিন, আমাদের শহরে বরকত দিন, আমাদের সা তথা বড় পরিমাপক যন্ত্রে বরকত দিন, আমাদের মুদ্দ তথা ছোট পরিমাপক যন্ত্রে বরকত দিন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৩৭৩)

প্রথমবার আজান শুনল নিউ ইয়র্কের আস্টোরিয়াবাসী | কালের কণ্ঠ